ঠাকুর আজ কলিকাতায় স্টার থিয়েটারে চৈতন্যলীলা দেখিতে যাইবেন।... কোনখানে বসিলে ভাল দেখা যায়, সেই কথা হইতেছে। কেউ কেউ বললেন, একটাকার সিটে বসলে বেশ দেখা যায়। রাম বললেন, কেন, উনি বক্সে বসবেন। 

ঠাকুর হাসিতেছেন। কেহ কেহ বলিলেন, বেশ্যারা অভিনয় করে। চৈতন্যদেব, নিতাই এ-সব অভিনয় তারা করে।

শ্রীরামকৃষ্ণ (ভক্তদিগকে)— আমি তাদের মা আনন্দময়ী দেখব। তারা চৈতন্যদেব সেজেছে, তা হলেই বা। শোলার আতা দেখলে সত্যকার আতার উদ্দীপন হয়।

মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত তথা শ্রীম-র লেখা ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত’তে ২১ সেপ্টেম্বর ১৮৮৪ তারিখের দিনবর্ণনায় লেখা এ সব। এমন নয় যে, সে দিনই ‘চৈতন্যলীলা’র প্রথম অভিনয়। তারও মাস দেড়েক আগে, ২ অগস্ট স্টারে নেমেছে এই নাটক। চৈতন্য তথা নিমাইয়ের ভূমিকায় এক ও অদ্বিতীয় নটী বিনোদিনী। দক্ষিণেশ্বরের পাগলাটে সাধকটির গাড়ি করে নাটক দেখতে আসার আগের, নাটক দেখার সময়কার এবং শেষ হওয়ার পরের বর্ণনাও কথামৃতকারের লেখনীতে জ্বলজ্বলে। অভিনয় শেষে গাড়িতে ওঠার সময় এক ভক্তের ‘কেমন দেখলেন?’ প্রশ্নের উত্তরে শ্রীরামকৃষ্ণের সেই বিখ্যাত কথাটিও আছে— ‘আসল নকল এক দেখলাম।’ অথচ রামকৃষ্ণভক্ত ও ‘চৈতন্যলীলা’র রচয়িতা-নিদের্শক গিরিশ ঘোষের, বা পষ্টাপষ্টি বললে নটী বিনোদিনীর ‘চৈতন্যলীলা’ নাটকের ইতিহাসে যে ঘটনাটি প্রবাদোপম হয়ে আছে— ভাবস্থ শ্রীরামকৃষ্ণ বিনোদিনীর মাথায় হাত ছুঁইয়ে বলছেন, ‘চৈতন্য হোক’— শ্রীম-র লেখায় তা পাচ্ছি না কেন? বিনোদিনীর অপূর্ব অভিনয় দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ অভিনয় শেষে শিল্পীকে দিচ্ছেন পরম বাঞ্ছিত আধ্যাত্মিক শংসাপত্রটি, তার উল্লেখটুকু থাকবে না? কারণটা কি লেখকের সংস্কার? উনিশ শতকীয় সামাজিক ট্যাবু, যা শিল্পীর চরম অভিনয়নৈপুণ্যকে স্বীকার করেও করতে পারে না! কারণ শিল্পী মানুষটা তো দিনশেষে মুখের রং আর চরিত্রের সাজ ছেড়েছুড়ে ফেললে গণিকা বই আর কিছু নয়!

 

নায়িকা সংবাদ

উপেক্ষা বিনোদিনীর কাছে নতুন নয়। তবে মঞ্চে তিনি উপেক্ষিতা ছিলেন বলা যাবে না। বাংলার রঙ্গমঞ্চ তাঁর প্রতিভা নিংড়ে নিয়েছে, বিনোদিনীও সব উজাড় করে দিয়ে হয়ে উঠেছেন সে যুগের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী, ‘ফ্লাওয়ার অব দ্য নেটিভ স্টেজ’, ‘মুন অব দ্য স্টার কোম্পানি’। ‘গ্রেট ন্যাশনাল’ থিয়েটারে জীবনের দ্বিতীয় নাটকেই তিনি পেয়েছিলেন নায়িকার চরিত্র। মাত্র বারো বছর বয়স তখন (১৮৬৩ তাঁর জন্মের বছর বলে স্বীকৃত)। বালিকা বিনোদকে যুবতী ‘হেমলতা’ সাজাতে সাজঘরে বেশকারীকে হিমশিম খেতে হয়েছিল। ১৮৭৭-এ চোদ্দো বছর বয়সের বিনোদিনী যখন ‘ন্যাশনাল’ থিয়েটারে গিরিশ ঘোষের হাতে এসে পড়ছেন, তার আগেই গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে দীনবন্ধু মিত্রের ‘সধবার একাদশী’ ও ‘নীল দর্পণ’, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সরোজিনী’-সহ ন’টি নাটকে আর বেঙ্গল থিয়েটারে মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দুর্গেশনন্দিনী’, ‘মৃণালিনী’, ‘কপালকুণ্ডলা’-আশ্রিত হেভিওয়েট সব নাটকের প্রধান নারীচরিত্রগুলোয় অভিনয় করা হয়ে গিয়েছে তাঁর। গিরিশের কাছে বিনোদিনীর অভিনয়শিক্ষার দিগন্ত খুলে গিয়েছিল— বড় সত্য। কিন্তু পিতৃপরিচয়হীন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না জানা এক নাবালিকা মধুসূদন-বঙ্কিমচন্দ্র-দীনবন্ধুর মতো ধ্রুপদী লেখকদের সৃষ্টিকে উনিশ শতকের কলকাতার সাধারণ রঙ্গালয়ে দাপিয়ে পরিবেশন করেছে, এ-ও মনে রাখার। প্রতিভা তো বটেই, আত্মবিশ্বাসও কিছু কম ছিল না এই মেয়ের।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

বইপত্র আছেই, তবু উনিশ শতকের কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনয়শিল্পীকে নিয়ে লিখব বলেই ভাবলাম, বিনোদন মাধ্যমে উপস্থাপিত বিনোদিনীকেও দেখে নিই একটু। ১৯৯৪ সালে দীনেন গুপ্ত ছবি বানিয়েছেন ‘নটী বিনোদিনী’, নামভূমিকায় দেবশ্রী রায়। গায়িকা-নায়িকার জীবন নিয়ে তৈরি ছবি তো গানে ভরা থাকবেই। এ ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়। ছবি শুরু হয় গঙ্গাবাইয়ের কাছে বালিকা বিনোদিনীর গান শেখার দৃশ্য দিয়ে। সেই গঙ্গাবাই, যিনি বিনোদিনীর কথায় পরে স্টার থিয়েটারে ‘একজন প্রসিদ্ধ গায়িকা হইয়াছিলেন’, ভাড়া থাকতেন বিনোদিনীদেরই কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়ির একতলার একটা ঘরে। গঙ্গাবাইয়ের সঙ্গে ‘গোলাপফুল’ অর্থাৎ সই পাতিয়েছিলেন বিনোদিনী, তাঁর কাছেই বিনোদের গানে নাড়া বাঁধা। তারও বেশি গুরুত্বপূর্ণ যা— এই গঙ্গাবাইয়ের ঘরে গান শুনতে আসা দুই ভদ্রলোক পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও ব্রজনাথ শেঠের সূত্রে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে দশ টাকা বেতনে যোগ দিয়ে অভিনয়জীবনের সূচনা বিনোদিনীর। আড়াই ঘণ্টার ছবির তাড়া যথেষ্ট, গান গাইতে গাইতেই বালিকা বিনোদিনী তরুণী হয়ে যান, এসে পড়েন গিরিশ ঘোষের কাছে,  জীবনে বিস্তর দুঃখ গ্লানি ইত্যাদি। 

বীণা দাশগুপ্ত বা তাপসী রায়চৌধুরী অভিনীত যাত্রাপালা ‘নটী বিনোদিনী’ও এখন ইউটিউবের সৌজন্যে সহজলভ্য। বিনোদিনীর জীবনের ওঠাপড়া আর টানাপড়েন সেখানেও মোটের উপরে সরলীকৃত; মাধ্যমটা যাত্রা বলেই কিছু অংশে আবেগের তারটা তারসপ্তকে টেনে ধরে রাখা, কিছু অংশ ছায়া-ছায়া, বা অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় বর্জিত। কথা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ এই বিনোদন মাধ্যমের বিনোদিনীকেই দেখবেন-শুনবেন বেশি। আর তাতে আসল মানুষটা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

 

মঞ্চের দাপট আর কলমের জোর

এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায়, যদি কেউ ‘আমার কথা’ পড়েন। স্বয়ং বিনোদিনীর আত্মকথা, গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে ১০৬ বছর আগে, বাংলা ১৩১৯ সনে। মনে রাখতে হবে, বিনোদিনী তখন রঙ্গমঞ্চ থেকে বহু দূরে, নাটক-থিয়েটার ছেড়েছেন সেও হয়ে গিয়েছে ২৫-২৬ বছর। এটাই যে বিনোদিনীর প্রথম লেখা, তা কিন্তু নয়। তার দু’বছর আগেই অমরেন্দ্রনাথ দত্তের ‘নাট্যমন্দির’ পত্রিকায় বিনোদিনীর আত্মকথা লেখা শুরু। তখন তার নাম ছিল ‘অভিনেত্রীর আত্মকথা’। অসম্পূর্ণ ছিল লেখাটা। তারও অনেক আগে থেকেই বিনোদিনী কবিতা লেখেন, গিরিশ ঘোষ স্ব-সম্পাদিত ‘সৌরভ’ পত্রিকায় ১৮৯৫ সালে বিনোদিনীর তিনটে কবিতা, আর এক অভিনেত্রী তারাসুন্দরীর দুটো কবিতা ছাপিয়েছেন (‘উদ্বোধন’ পত্রিকায় তারাসুন্দরী লিখেছিলেন, বিনোদিনীই তাঁকে প্রথম নাট্যশালায় নিয়ে যান, এমনকি বেলুড় মঠেও তাঁর প্রথম যাওয়া বিনোদিনীর সঙ্গেই)। ‘আমার কথা’ প্রকাশের ঢের আগেই বিনোদিনীর দু’-দুটো কবিতার বই বেরিয়ে গিয়েছে— ‘বাসনা’ আর ‘কনক ও নলিনী’। প্রথমটায় ৪১টি কবিতা, দ্বিতীয়টা আরও এক ধাপ এগিয়ে নিজের অস্তিত্ব জাহির করেছে কাহিনিকাব্য বা ‘কাব্যোপন্যাস’ পরিচয়ে! বারাঙ্গনা নটীর এই লেখক-সত্তা ক’জন বাঙালির জানা? গিরিশচন্দ্রের কাছে লেখাপড়ার চেয়েও বেশি একটা জিনিস শিখেছিলেন তিনি— কল্পনা। সে তো মানুষ মাত্রেরই থাকে, কিন্তু তাকেও যে শেখা যায়, চারিয়ে দেওয়া যায় রোজ রাতের অভিনয়মঞ্চে যেমন, তেমনই কবিতার ছন্দে-অলঙ্কারে— তার অনুপম দৃষ্টান্তের নাম বিনোদিনী দাসী। উনিশ শতকেরই আর এক সৃষ্টি, রাসসুন্দরী দাসীর ‘আমার জীবন’ নিয়ে যত চর্চা আর সন্দর্ভ, তার সিকিভাগও বিনোদিনীর আত্মকথা ও কবিতা নিয়ে হয় কি?

 

কত কথা, কথকতা

বিনোদিনীর আত্মকথায় গল্পের ছড়াছড়ি। গল্প নয়, সত্য। পড়লে মনে হয়, এই বায়োপিকের যুগে তাঁকে নিয়ে ফের একটা ছবি হলে, এই ঘটনাগুলোই কমবেশি সাজিয়ে নিলে একটা জম্পেশ চিত্রনাট্য পাবেন পরিচালক। এমন ভাবে লেখেন বিনোদিনী, এক একটা সিন, মায় শট ডিভিশনও চোখের সামনে ফুটে ওঠে। সে কালের বাগবাজারে রসিক নিয়োগীর ঘাটের চাঁদনির উপরে বিরাট এক বাড়ির দোতলায় গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের রিহার্সাল ঘর। ‘একেবারে গঙ্গার উপরে বাড়ী ও বারান্দা, নীচে গঙ্গার বড় বাঁধান ঘাট; দুই ধারে অন্তিমপথযাত্রীদিগের বিশ্রাম ঘর,’ লিখছেন বিনোদিনী। ছোট্ট মেয়ে রিহার্সাল দেবে কী, বারান্দায় ছুটোছুটি করে, খেলে! পরনের জামা একটা বই দুটো নেই দেখে সিনিয়র অভিনেত্রী রাজকুমারী তাকে ছিটকাপড়ের হাত-কাটা জামা বানিয়ে দিয়েছিলেন দুটো। সেই জামা পেয়ে কী আনন্দ! ‘শত্রুসংহার’ নাটকে (বিনোদিনী ভুল করে লিখেছেন ‘বেণীসংহার’) দ্রৌপদীর সখীর চরিত্রে জীবনে প্রথম মঞ্চে নামার অভিজ্ঞতা লিখেছেন: ‘...সমস্ত শরীর ঘর্ম্মাক্ত হইয়া উঠিল, বুকের ভিতর গুর্‌ গুর্‌ করিতে লাগিল, পা দুটীও থর্‌ থর্‌ করিয়া কাঁপিয়া উঠিল...’ মনে মনে ভগবানকে স্মরণ করে মঞ্চে গিয়ে যে ক’টি ডায়লগ ছিল বলে এলেন। দর্শকেরা অভিনয় দেখে হাততালি দিয়েছিলেন, কিন্তু এই মেয়ে তারও অর্থ জানে না। বড়রা বুঝিয়ে দিলেন, অভিনয় সফল হলে দর্শকরা আনন্দে করতালি দেন।

বাগবাজারে গিরিশ ভবনে বিনোদিনীর আবক্ষ মূর্তি

কল শো পেলে আজকের নাটক-দলগুলো শহরের বাইরে, বাংলার বাইরেও অভিনয় করে। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারও ১৮৭৫-এর মার্চে বেরিয়েছিল পশ্চিম দেশে— বিনোদিনীর সঙ্গে তাঁর মা-ও গেলেন। লাহৌর, দিল্লি, লখনউ, বৃন্দাবন— কত জায়গা, কত ঘটনা! লাহৌরে কয়েক দিন ধরে অনেক নাটকের অভিনয় হল— ‘সতী কি কলঙ্কিনী?’, ‘নবীন তপস্বিনী’, ‘সধবার একাদশী’, ‘বিয়ে পাগলা বুড়ো’। এই লাহৌরেই গোলাপ সিংহ নামে এক বড় জমিদার ধরে পড়লেন, বিনোদিনীকে তাঁর চাই। বিয়ে করবেন, যত টাকা লাগে দেবেন। কোনও মতে অভিনয়-শেষে গোটা দল কেটে পড়ল। লখনউয়ে ‘নীলদর্পণ’ নাটকে আর এক কাণ্ড। মঞ্চে নাটকের চরিত্র রোগ সাহেব চড়াও হবে ক্ষেত্রমণির উপরে, তখন তোরাপ দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে সাহেবকে মারবে। এমন সপ্রাণ স্বাভাবিক অভিনয়, দুর্বৃত্ত রোগ সাহেবকে নেটিভ তোরাপ মারছে দেখে দর্শকাসনে সাহেবদের মধ্যে হইহই পড়ে গেল। এক জন তো মঞ্চে উঠে তোরাপ-রূপী অভিনেতাকে দু’ঘা বসিয়ে দেয় আর কী। ফল— নাটক বন্ধ, কলাকুশলীরা সব বেঁধেছেঁদে নিয়ে ধাঁ— সকাল হতেই টা টা লখনউ। 

দিল্লিতে আর এক সমস্যা। মুসলমানপ্রধান শহর দেখে বিনোদিনীর মা ভয়ে জড়সড়। তার উপরে এখানকার ব্যবস্থাপত্র সব আলাদা, ভিস্তিওয়ালার জলে স্নানের ব্যবস্থা। মা কিছুতেই তাতে নাইবেন না। কুয়োর জল তুলে দিতে তবে রক্ষে। গরুর গাড়ি চেপে কুতুব মিনার দেখতে গেছেন সবাই, হঠাৎ কোত্থেকে একটা বাঘ লাফিয়ে পড়ল! অবশ্য গরুটাকে তাক করতে পারেনি, সবার চেঁচামেচিতে ভাগলবা। বৃন্দাবনে দলের জনা চল্লিশ সদস্যের জলখাবার ঘরে গুছিয়ে রেখে বড়রা সবাই গেলেন মন্দির-দর্শনে, ঘরে একা বিনোদিনী। জানালায় কোত্থেকে একটা বাঁদর এসে হাজির, তাকে একটু খাবার দিতেই একটা-দুটো করে এক সময় জানালা, ছাদ, বারান্দা সব বাঁদরময় হয়ে উঠল। মেয়ে ভয়ে এতটুকু, দলের জন্য রাখা খাবার বাঁদরদের দিয়ে দিল, যদি খাবার পেয়ে বিদেয় হয়। পরে সবাই ফিরে লাঠি নিয়ে ধাওয়া করে বাঁদর তাড়ায়। 

বেঙ্গল থিয়েটারের হয়ে এক বার সবাই যাচ্ছেন, জঙ্গুলে পথ পেরোতে হবে হাতির পিঠে বা গরুর গাড়িতে। হাতি চড়ার রোমাঞ্চ নিতে বিনোদিনী গরুর গাড়ির যাত্রীদের বিদায় দিলেন, তারা এগিয়ে গেল। কিছু দূর যেতে বনপথ সরু, দু’পাশে বুক সমান বন, নীচে জলা জঙ্গল। সন্ধে পেরোতে তুমুল ঝড়বৃষ্টি, হাতি নিয়ে এসে ফেলল বেতবনে। রোমাঞ্চ তখন আতঙ্ক, চোখের জল আর বৃষ্টির জলে নাজেহাল দশা। কোনও মতে গন্তব্যে পৌঁছতেই ম্যানেজারবাবু আগুন জ্বালিয়ে নিজে হাতে কিশোরী অভিনেত্রীটির গায়ে সেঁক দিলেন।

বিনোদিনীর ‘আমার কথা’ শুধু নিজের কথা নয়, থিয়েটারের কথা; এক দলে একসঙ্গে খেয়েপরে অভিনয় করে বাঁচা শিল্পী-জগতের জীবনচিত্র। এখানে দলের বড় অভিনেত্রী দিদি রেগে গিয়ে ছোটকে যেমন দুই চড় কষিয়ে দেন, আবার ভিন শহরে পয়সার অভাবে এক জন কিছু কিনতে পারছে না দেখে অন্য অভিনেতা কিনে দেন ফুলকাটা চাদর, কাপড়। এখানে নবাবপুত্রী ‘আয়েষা’র ভূমিকায় অভিনয় করে উঠেই আবার দাসী ‘আসমানি’র প্রক্সি দিতে হয়। গাড়িতে চুয়াডাঙা যাওয়ার পথে দলের এক কর্মী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে একেবারে মৃত্যুমুখে, কারও কাছে একটু জল না থাকায় মেয়ে-কোলে অভিনেত্রী বনবিহারিণী নিজের বুকের দুধ ঝিনুকে করে নিয়ে মুমূর্ষু মানুষটির মুখে তুলে দেন!

 

আদর্শ শিক্ষক, আদর্শ ছাত্রী

শিক্ষক দিবসে কত বন্দনাগাথা লেখা হয় ফেসবুকে, বিনোদিনীর গিরিশ-অর্ঘ্য দেখলে চমকিত হতে হয়। সে শুধু আবেগ-থরথর পায়ে-লুটিয়ে-পড়া নয়। আদর্শ নাট্যশিক্ষক কেমন, কেমন তাঁর পরিচালনা রীতি, লিখে গিয়েছেন বিনোদিনী। গিরিশ চরিত্রগুলির ভাব বুঝিয়ে দেন প্রথমে, বিদেশি নাটক হলে পার্ট মুখস্থ হওয়ার পরে সবার সামনে শেক্সপিয়র, মিল্টন, পোপ, বায়রনের লেখা পড়ে শুনিয়ে বোঝান। শেখান চরিত্রের হাবভাব। তখন কলকাতায় বিলেত থেকে অভিনেতারা আসতেন, সেই থিয়েটার দেখাতে নিয়ে যান। সঙ্গে চলে শেখানোও— ‘কোন এক্‌ট্রেস বিলাতে বনের মধ্যে পাখীর আওয়াজের সহিত নিজের স্বর সাধিত... ব্যাণ্ডম্যান কেমন হ্যামলেট সাজিত, ওফেলিয়া কেমন ফুলের পোষাক পরিত, বঙ্কিমবাবুর ‘দুর্গেশনন্দিনী’ কোন পুস্তকের ছায়াবলম্বনে লিখিত, ‘রজনী’ কোন ইংরাজী পুস্তকের ভাব সংগ্রহে রচিত’... 

বাস্তবধর্মী ও কল্পনাশ্রয়ী, দুই শিক্ষাই আঁজলা ভরে নেওয়ার ফলই বোধহয় বিনোদিনীর অভূতপূর্ব মঞ্চসাফল্য। ‘মেঘনাদবধ’-এ ছ’টি চরিত্র করছেন, ‘দুর্গেশনন্দিনী’তে তিনি একই সঙ্গে বীরাঙ্গনা আয়েষা আর কোমলমতি তিলোত্তমা; স্টারে ‘প্রহ্লাদচরিত্র’ করে উঠেই একই রাত্রে ‘বিবাহ বিভ্রাট’-এ বিলাসিনী কারফরমার মতো তরল চরিত্রে মঞ্চ মাতিয়েছেন (আলাদা আলাদা দিনে শেষের এই দু’টি নাটক দেখেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ)। লিখছেন, ‘কখনও অভিনয় কার্য্যে অমনোযোগী হই নাই। অমনোযোগী হইবার ক্ষমতাও ছিল না। অভিনয়ই আমার জীবনের সার সম্পদ ছিল। পার্ট অভ্যাস, পার্ট অনুযায়ী চিত্রকে মনোমধ্যে অঙ্কিত করিয়া বৃহৎ দর্পণের সম্মুখে সেই সকল প্রকৃতির আকৃতি মনোমধ্যে স্থাপিত করিয়া তন্ময়ভাবে সেই মনাঙ্কিত ছবিগুলিকে আপনার মধ্যে মিলাইয়া মিশাইয়া দেখা, এমন কি সেইভাবে চলা, ফেরা, শয়ন, উপবেশন যেন আমার স্বভাবে জড়াইয়া গিয়াছিল।’ 

‘চৈতন্যলীলা’ প্রথম অভিনয়ের দিন ভোরে গঙ্গাস্নান করে, ১০৮ দুর্গানাম লিখে মনে মনে প্রার্থনা করেছেন, যেন গৌরাঙ্গের কৃপা পান। অভিনয়ের সময়ে নিজেই চৈতন্যময়, ‘হরি মন মজায়ে লুকালে কোথায়’ গানটি গাওয়ার সময়ে ‘এক একদিন এমন হইত যে অভিনয়ের গুরুভার বহিতে না পারিয়া মূর্চ্ছিতা হইয়া পড়িতাম।’ এ কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ‘মৃণালিনী’ নাটক হচ্ছে, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র দর্শকাসনে। ‘মনোরমা’র ভূমিকায় বিনোদিনীর অভিনয় দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মনোরমার চরিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখন যে ইহা প্রত্যক্ষ দেখিব তাহা মনে ছিল না, আজ মনে হইল যে আমার মনোরমাকে সামনে দেখিতেছি।’ স্যর এডউইন আর্নল্ডের ‘দ্য লাইট অফ এশিয়া’ থেকে গিরিশ করেছিলেন ‘বুদ্ধদেব চরিত’। সেই নাটক দেখে সিদ্ধার্থ তথা বুদ্ধের অভিনয়ের পাশাপাশি গোপা-রূপী বিনোদিনীর অভিনয়ের প্রভূত প্রশংসা করেছিলেন আর্নল্ড।

 

চির উন্নত মম শির

গুরুকে শ্রদ্ধা করেন, তা বলে আত্মমর্যাদার প্রশ্নে আপস নয়। বিনোদিনী তাঁর শিক্ষককে নিজের বইয়ের ভূমিকা লিখতে অনুরোধ করেছিলেন, গিরিশ লিখেও দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘আমার কথা’র প্রথম সংস্করণে সেই ভূমিকা ছাপেননি বিনোদিনী। অভিনয়ের বাইরে যে নারী পতিতাবৃত্তি সহায়ে জীবন কাটায়, তাঁর জীবনী বা আত্মকথা লেখার কারণ ও পশ্চাৎপট ভূমিকায় ব্যাখ্যা করেছিলেন গিরিশ। বিনোদিনীর অভিনয়ের, ভাবের উচ্চ প্রশংসা ছিল সেখানে। এই সামান্য বনিতার ক্ষুদ্র জীবনে মহান শিক্ষাপ্রদ উপাদান আছে, লিখেছিলেন গিরিশ। লিখেছিলেন, ‘এ জীবনী পাঠে ধর্ম্মাভিমানীর দম্ভ খর্ব্ব হইবে, চরিত্রাভিমানী দীনভাব গ্রহণ করিবে এবং পাপী-তাপী আশ্বাসিত হইবে।’ 

সমালোচনাও ছিল। মনের কথা বলতে গিয়ে বিনোদিনী সমাজের সহানুভূতি প্রার্থনা করেছেন, আবার সেই সমাজের প্রতিই তীব্র কটাক্ষ করেছেন, তা শিক্ষকের মনঃপূত হচ্ছে না। তাঁর আশঙ্কা, লেখনীর কঠোরতায় পাঠক শুরুর সহানুভূতি-প্রার্থনা বিস্মৃত হবে। আবার যে বিখ্যাত নাটকগুলির অভিনয় বিনোদিনীকে ‘বিনোদিনী’ করেছে, সেগুলি নিয়ে বলতে গিয়ে মেয়েটা ‘আমি আমি’ করেছে বেশি— মাস্টারমশাইয়ের এই মত। বর্ণনায় আবেগ বেশি, গিরিশের মতে তা শিক্ষোপযোগী রূপে বলা হয়নি। তাই নিজেই নাটক ধরে ধরে দেখিয়েছেন, বিনোদিনীর প্রতিভা ও দক্ষতা কোথায়। শিক্ষকের এই সমালোচনা হয়তো বিনোদিনীর পছন্দ হয়নি। তাই প্রথম সংস্করণে বাদ দিয়েছিলেন। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯১২ গিরিশ ঘোষ মারা যান। এর পরে গিরিশের ভূমিকা-সহ ‘আমার কথা’র নব সংস্করণ ছাপিয়েছিলেন বিনোদিনী। গুরুদক্ষিণা?          

 

তোমাকেও ছেড়ে যেতে পারি

বিনোদিনীর জীবন ‘আইকনিক’ আর ‘আয়রনিক’, দুই-ই হয়েছে পাল্লা দিয়ে। এক দিকে দুর্দান্ত অভিনয়গুণে একের পর এক হিট নাটকে কলকাতার মানুষকে সাধারণ রঙ্গালয়ে টেনে আনা তারকা বিনোদিনী, অন্য দিকে পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের ভাগ্যনিয়ন্তা নানান পুরুষের হাতে জর্জরিত বিনোদিনী। ঝামেলার জেরে মালিক প্রতাপচাঁদ জহুরির ন্যাশনাল থিয়েটার ছেড়ে গিরিশ, বিনোদিনী-সহ অনেকে নতুন এক থিয়েটার গড়ার স্বপ্ন দেখছেন তখন। অভিনেতারা বিনোদিনীকে বারবার বলছেন, নতুন থিয়েটার তৈরিতে ‘তুমি যে ভাবে পারো সাহায্য করো।’ ‘যে ভাবে পারো’-র মানেটা বুঝতে হবে। বিনোদিনী তখন থাকেন এক সম্ভ্রান্ত যুবকের ‘আশ্রয়ে’, সেই যুবক দেশের বাড়ি গিয়ে বিয়ে করল। এ দিকে নতুন থিয়েটার করে দেবেন বলে কথা দিয়েছে যে, সেই ধনবান মারওয়াড়ি তরুণ গুর্মুখ রায় মুসাদ্দির শর্ত ছিল, তার বিনোদিনীকে চাই। নতুন থিয়েটারের স্বপ্ন দেখা পুরুষ অভিনেতারা আসলে চাইছিলেন, বিনোদিনী আগের যুবককে ছেড়ে গুর্মুখের রক্ষিতা হয়ে থাকুন! 

দুই পয়সাওয়ালা ‘বাবু’র যুদ্ধ। এক জন লেঠেল দিয়ে বাড়ি ঘেরাও করে, অন্য জনও জবাব দেয় বড় বড় গুন্ডায়। আত্মকথায় বিনোদিনী লিখেছেন প্রাণসংশয়ের কথাও। প্রথম যুবক এক দিন সটান ঘরে এসে দশ-দশ বিশ হাজার টাকা দিতে চাইলেন তাঁকে। প্রত্যাখ্যান করায় কোমরে গোঁজা তলোয়ার বার করে মাথা লক্ষ্য করে আঘাত! দু’বারই লক্ষ্যভ্রষ্ট। আবেগ-অনুতাপের নাটক-শেষে সে চলে গেলে বিনোদিনীকেও কয়েক মাস বাইরে পাঠিয়ে দিলেন নাট্যকর্মীরা। ফিরে আসতে আর এক কাণ্ড। গুর্মুখ রায় বিনোদিনীকে পঞ্চাশ হাজার টাকা অফার করে বসল। থিয়েটার ছাড়ো, আমি এই টাকা দিচ্ছি, তুমি শুধু আমার হও। 

উনিশ শতকে ৫০ হাজার টাকা! গিরিশ ঘোষ, অমৃত মিত্ররা প্রমাদ গুনলেন। কিন্তু বিনোদিনী টাকা চান না, শুধু থিয়েটার চান। তাঁর শর্ত— গুর্মুখ নতুন থিয়েটার তৈরিতে টাকা ঢালুন, তিনি একমাত্র সেই শর্তেই ‘তাঁর’ হবেন। রিহার্সালের পরে থিয়েটার-বাড়ি তৈরির কাজ দেখতে আসতেন বিনোদিনী। নিজে ঝুড়ি করে মাটিও বয়েছেন! তাঁকে কথা দেওয়া হয়েছিল, তাঁর নামের অনুসরণে থিয়েটারের নাম হবে ‘বি থিয়েটার’। রেজিস্ট্রেশনের পরে জানানো হল, নতুন থিয়েটারের নাম ‘স্টার থিয়েটার’! এই প্রবঞ্চনার বেদনা বড় বেজেছিল বিনোদিনীর বুকে। তাঁর ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকারের মূল্যে ‘স্টার’-এর পথ চলা শুরু (এই ‘স্টার’ কিন্তু আজকের ঠিকানার স্টার থিয়েটার নয়) ১৮৮৩-র ২১ জুলাই। শুধু অভিনয়কে ভালবেসে তিনি স্টার-এর হয়ে অন্তত ২০টি নাটকে অভিনয় করেছেন। শেষ অভিনয় ১৮৮৭-র ১ জানুয়ারি। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে, আজকের ভাষায় ‘কেরিয়ারের মধ্যগগনে’ থিয়েটার ছেড়ে দিলেন বিনোদিনী ‘অভিমানিনী’ দাসী।

যে বছর রবীন্দ্র-প্রয়াণ, সেই ১৯৪১ সালেই বিনোদিনীরও মৃত্যু। থিয়েটার ছাড়ার পরে দীর্ঘ ৫৪ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। ষাট পেরিয়েও ‘রূপ ও রঙ্গ’ পত্রিকায় এগারো পর্বে লিখেছেন ‘আমার অভিনেত্রী জীবন’। এক কালে কথা উঠেছিল তাঁর সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক নিয়েও। কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুর সময়ে তাঁর বিছানার পাশে জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে লেখা সে কালের শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর লেখা কয়েকটি চিঠি পাওয়া গিয়েছিল, এমন তথ্য আছে। আত্মকথায় বিনোদিনী লিখে গিয়েছেন নামহীন আর এক পুরুষের কথা, যে ‘হৃদয়দেবতা’র ভালবাসায় ‘বধূ’র মর্যাদায় বহু বছর কেটেছে তাঁর, ১৯১২ সালে সেই মানুষটি মারা যাওয়া পর্যন্ত। একটি মেয়ে হয়েছিল, শকুন্তলা। তেরো বছর বয়সে মারা যায় সেও। ‘আমার কথা’য় আছে সন্তানহারা মায়ের আর্তি। মেয়ের স্মৃতিতে কবিতার বই উৎসর্গ করেছিলেন মা। 

৭৮ বছরের জীবন তো কম নয়। ২৪ বছর বয়সে, নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটা ছেড়ে দেওয়ার পরে বাকি জীবন পথ আগলে থাকে স্মৃতির যে জগদ্দল পাহাড়, শুধু তার কারণেই এই দীর্ঘ জীবন দুর্বহ মনে হওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। উনিশ শতকের অন্যান্য নটীর মতো বিনোদিনীও নিতান্ত গল্পের উপাদান হয়েই থেকে যেতেন, যদি না আত্মকথা লিখে যেতেন। নাটক ছেড়েছেন, নাটক তাঁকে ছাড়েনি। অহীন্দ্র চৌধুরীর স্মৃতিকথায় আছে, ৬০-৬১ বছরের বিনোদিনী স্টারে নাটক দেখতে আসতেন। মেয়েরা ছুটে আসত, ঘিরে ধরত ‘দিদিমা’ বলে। উইংসের ধারে মোড়ায় বসে, চাদরে গা ঢেকে নাটক দেখতেন ‘মুন অব দ্য স্টার কোম্পানি’ বিনোদিনী দাসী। 

কৃতজ্ঞতা: রমাপ্রসন্ন ভট্টাচার্য