ভাল থাকার সূত্র

কেরিয়ার এবং বাড়ি— এই দুই জাঁতাকলে পড়ে বহু মহিলাই নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে ব্যর্থ হন। যদিও বা সময় করে পার্লারে গিয়ে স্পা-ফেসিয়াল করিয়ে নেওয়ার ফুরসত পান, তবে বেশির ভাগই শারীরচর্চা বলতে জিমের বেশি কিছু ভাবেন না। কাজের চাপে ভুলে যান শরীরের বাকি কলকব্জার কথা। বিশেষ করে দেখা যায়, নারীস্বাস্থ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ওভারি এবং ইউটেরাসের ব্যাপারেই তাঁরা উদাসীন। অথচ যাঁরাই ফাইব্রয়েড সিম্পটমের সঙ্গে লড়েছেন, তাঁরা জানবেন যন্ত্রণাদায়ক পিরিয়ডস, পিঠের নীচের অংশে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটভার— এগুলোই ইউটেরাসে সমস্যার লক্ষণ। সচেতন হলে এবং খেয়াল রেখে চললে সে সব উপসর্গ থেকে বাঁচার রাস্তা খুঁজে পাওয়া খুব একটা কঠিনও নয়। 

বিশিষ্ট গাইনিকলজিস্ট সর্বাণী ঘোষের কথা মতো, ‘‘স্ক্রিনিং প্রসিডিয়োরগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা মেয়েদের জন্য ভীষণ জরুরি। স্ক্রিনিং প্রসিডিয়োর বলতে, রোগ হওয়ার আগেই ধরে ফেলা যে, কোথায় কোথায় সমস্যার সম্ভাবনা রয়েছে।’’ তা বলে সব প্রসিডিয়োর কিন্তু সবার জন্য নয়। বয়স অনুযায়ী তার বেশ কিছু ভাগ রয়েছে। ‘‘কম বয়সে যেমন হরমোন ইমব্যালান্স খুব বেশি হয়। যার ফলে অ্যাকনে, অনিয়মিত পিরিয়ডস, ওজন বেড়ে যাওয়া, হেয়ার লস বা অতিরিক্ত হেয়ার গ্রোথ এই সব দেখা যায়। আবার ওজন বেড়ে যাওয়ার ফলেও হরমোনাল ইমব্যালান্স হতে পারে। সে সব ক্ষেত্রে অল্পস্বল্প ওষুধেও কাজ হয়। তবে কাউন্সেলিং এ ক্ষেত্রে বেশি কার্যকরী,’’ বলছিলেন তিনি। যোগ করলেন, ‘‘ওষুধে সমস্যাটা সাময়িক নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পুরোপুরি সারবে না।’’ কমবয়সে কাউন্সেলিং যে জরুরি, তার কারণ এর মাধ্যমেই নিয়মমাফিক জীবন কাটানোর মন্ত্র শেখানো যেতে পারে। কোনটা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল, কীসে ওজন বেড়ে যেতে পারে— কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে এগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করা যায়।

 

সন্ধিক্ষণেই অসুখ নাশ 

কম বয়স বলতে সাধারণ ভাবে ৮ থেকে ১১ বছর বয়সের কথা বলা হচ্ছে। যে বয়সে পিরিয়ডস শুরু হয় মেয়েদের। একটি বাচ্চা যখন প্রথম হাঁটতে শেখে, প্রথমেই তো দৌড়তে পারে না... পিরিয়ডস শুরু হলেও একই হয় ব্যাপারটা। ওভারির ধাতস্থ হতে যেটুকু সময় লাগে, সেটুকুই। এ ছাড়াও হরমোনাল ইমব্যালান্সের কারণে অনিয়মিত পিরিয়ডস হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ব্লিডিং কম হলে ততটাও ভয়ের নয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ব্লিডিং হলে অ্যানিমিয়া হয়ে যেতে পারে। তখন অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। এ সব ক্ষেত্রে ব্লাড টেস্ট করে ওষুধ চালু করা হয়।

এখন যে সমস্যাটা ঘরে ঘরে প্রায় সব মেয়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, সেটা হল পিসিও বা পলিসিস্টিক ওভারি। বিশেষত বয়ঃসন্ধিতে অর্থাৎ, ১১ থেকে ১৮ বছর বয়সেই এর প্রকোপ সর্বাধিক। তবে তা যে সব সময়ে চিকিৎসকেরও হাতে থাকে, তা নয়। অনেক সময়ে জেনেটিক ইনফ্লুয়েন্সের কারণেও হতে পারে। তবে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখলে অনেক সমস্যা থেকে বাঁচা যায় বলেই মনে করেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা। এখনকার বাচ্চারা তো আবার জাঙ্কফুডের অসম্ভব ভক্ত! পিৎজ়া-বার্গার-ফ্রেঞ্চফ্রাই ছাড়া মুখে কিছুই রোচে না তাদের। তাই আগেভাগে সতর্ক হয়ে ডায়েট থেকে জাঙ্কের পরিমাণ ছেঁটে ফেলাই উচিত। অপেক্ষাকৃত রোগা যারা, পিসিও কিন্তু তাদেরও হতে পারে। তবে ওভারওয়েট হলে পিসিও-র সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই খেয়াল রাখা প্রয়োজন। 

 

সমস্যা যখন দীর্ঘস্থায়ী

পিরিয়ডস শুরুর দিককার সমস্যাগুলো ২২-২৩ বছরে গিয়ে আর থাকে না। তবে যাঁদের ওই বয়সেও উপসর্গগুলো থেকে যায়, তাঁদের ক্ষেত্রে কিন্তু সমস্যাটা সারা জীবনের। সে ক্ষেত্রে কী কী অসুবিধে দেখা দিতে পারে? অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা নয়। তবে প্রেগন্যান্সির ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ সব ক্ষেত্রেও কাউন্সেলিংয়ের গুরুত্বের উপরে জোর দেন চিকিৎসকেরা। প্রতিকারের জন্য ওভিউলেশনের ওষুধ দেওয়া হয়, যাতে ডিম্বাণু বেরিয়ে যেতে পারে।

প্রেগন্যান্সির সময়েও নানা জটিলতা দেখা যেতে পারে। সেগুলো সম্পর্কেও সচেতন থাকা দরকার। যদি কোনও মহিলার আগে থেকেই হাই ব্লাড প্রেশার বা ডায়বেটিসের মতো রোগ থাকে, সে সব ক্ষেত্রে ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়াটা জরুরি। কন্ট্রাসেপশন সম্পর্কে জানাটাও গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ সন্তান এসে গেলে অনেকে না জেনেই অ্যাবরশন করিয়ে নেন— এ সব না করে যথাযথ কন্ট্রাসেপটিভ পিল নেওয়াটা অধিক কার্যকরী বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই বলেন, বয়স কমের দিকে থাকতে থাকতেই সন্তান নিলে জটিলতা কমে। এমন পরামর্শের আদৌ কোনও ভিত্তি আছে কি? উত্তরে সর্বাণী বললেন, ‘‘এখন কেরিয়ারের জন্য অনেক সময়েই বাচ্চা নিতে মেয়েদের দেরি হয়ে যায়। তবে ৩৫-এর আগে করে নিলে ভাল...’’ 

নর্ম্যাল পদ্ধতিতে যদি সন্তান না হয়, সে ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরেই ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে অন্য পদ্ধতিতে যাওয়া যেতে পারে। তা ছাড়াও কোনও সমস্যা আছে কি না আলট্রা সাউন্ড পদ্ধতিতে তা দেখে নেওয়া এবং নিউট্রিশন ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও ঠিক রাখাটা প্রয়োজন।

 

পিসিও দূর হটো

অনেক সময়ে পিসিও’র সমস্যা ২০ থেকে ৩০-এর কোঠাতেও থেকে যায়। সে ক্ষেত্রে অনেক মহিলাই সিদ্ধান্ত নেন, বাচ্চা না নেওয়ার। কিন্তু সন্তান না নিলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। চিকিৎসার প্রয়োজন কি তাঁদেরও রয়েছে? অবশ্যই রয়েছে চিকিৎসার প্রয়োজন। পিসিও থাকলে মেয়েদের শরীরে ইস্ট্রোজেন নামক হরমোন বাধাহীন ভাবে থাকে। তাতে কেউ হয়তো ভাবলেন, অনিয়মিত পিরিয়ডস হোক, ওষুধ নেব না! তা হলে কিন্তু ওই বাধাহীন ইস্ট্রোজেন থাকার জন্য ইউটেরাইন ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যেতে পারে। তাই ট্রিটমেন্ট করিয়ে নেওয়াই ভাল।

ইউটেরাসে কোনও সমস্যা রয়েছে কি না, সেটা জানার জন্য প্যাপ স্মিয়ার অব সার্ভিক্স বা প্যাপ স্মিয়ার টেস্টের উপরে জোর দেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞেরা। রিপ্রোডাক্টিভ এজ গ্রুপের প্রত্যেক মেয়ের বছরে অন্তত এক বার এই টেস্ট করানো উচিত। প্রি-ক্যানসার সেলগুলোকে ডিটেক্ট করার জন্যই এই টেস্ট। প্রি-ক্যানসার সেল ক্রমান্বয়ে দশ বছর ধরা না পড়লে তবেই ক্যানসার হয়। ফলে যতটা সম্ভব গুরুত্ব দিয়ে এটা করা যায় ততই ভাল।

 

ফেলে রাখলে বিপদ

বহু মহিলাই দেরিতে সন্তান নিচ্ছেন বলে এন্ডোমেট্রিয়োসিস নামে একটি রোগের প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এর বিভিন্ন তত্ত্ব রয়েছে। তার মধ্যে একটি হল, মেনস্ট্রুয়াল ব্লাড বাইরে না গিয়ে ভিতরের দিকে চলে এসে ক্লটের মতো জমতে থাকা। ক্রমশ সেগুলো বাড়তে থাকা এবং আঠা-আঠা হয়ে ইউটেরাসের চারপাশে আটকে যাওয়া। ফলে ইউটেরাসের চার পাশে সব কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩০-এর কোঠাতেই এই সমস্যাটা বেশি দেখা যায়। সময় মতো চিকিৎসা না করালে অসুখটি প্রচণ্ড যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।

আবার ৪৫-৫০ বছরে যখন মেনস্ট্রুয়েশন বন্ধ হওয়ার সময়টা এসে যায়, তখনও হরমোনাল ইমব্যালান্স-টিউমর এ সব দেখা দিতে পারে। এমনকী ওভারির সিস্টও হতে পারে। এই বয়সকালের তিন-চার বছর আগে থেকেই পিরিয়ডস অনিয়মিত হতে থাকে। কিন্তু তখন কম হওয়াটা সমস্যা নয়। যদি ঘনঘন হয় বা এক মাস ধরে ব্লিডিং চলতে থাকে, তা হলে অবশ্য ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ সেটা টিউমর বা ক্যানসারের জন্যও হতে পারে। যাতে বায়োপসি করা প্রয়োজন। 

 

সচেতনতাই সুরক্ষা

সার্ভিক্যাল ক্যানসারের কথা আজকাল অহরহ শোনা যায়। ওভারির ক্যানসারও একটি মারাত্মক অসুখ। এই রোগটিকে অন্ধকারে কালো বেড়ালের সঙ্গে তুলনা করা হয়। কারণ তাকে সহজে দেখতে পাওয়া যায় না। কিন্তু উপস্থিতিটা বোঝা যায়। আর ধরা পড়ে একে বারে স্টেজ থ্রি বা ফোরে। ইউটেরাসে ক্যানসার এবং ওভারিতে ক্যানসারের মধ্যে একটা ফারাক বুঝিয়ে দিলেন ড. ঘোষ। ‘‘ইউটেরাইন ক্যানসারে ব্লিডিং ইরেগুলারিটির মতো সমস্যা হয়। কিন্তু প্রাথমিক স্তরে ওভারিয়ান ক্যানসারের কোনও উপসর্গ বোঝা যায় না। তাই ৪৫-৫০ বছর এজ গ্রুপে প্রতি বছর একটা ইন্টারনাল এগজ়ামিনেশন করা উচিত। আলট্রা সাউন্ডও। দেখে নেওয়ার জন্য যে, ওভারি এবং ইউটেরাস ঠিক আছে কি না।’’

সমস্যার আশঙ্কা অনেকই। কিন্তু সে সব থেকে বাঁচার হদিশও রয়েছে। আগে থেকে সতর্ক হলে ইউটেরাস এবং ওভারির সার্বিক সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব। এর জন্য যে সচেতনতা প্রয়োজন, তা তো বলাই বাহুল্য। তবে শুধু একার দ্বারা নয়, তার সঙ্গে পরিবার-পরিজনের তৎপরতাও জরুরি।