সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

‘রোম্যান্টিসিজমের চূড়ান্ত এক ব্যক্তিত্ব উত্তমদা’

কাল তাঁর জন্মদিন। বেঁচে থাকলে বয়স হত ৯১ বছর। এত বছর পরেও যিনি বাঙালির আবেগ ও নস্টালজিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত, তিনি মহানায়ক উত্তমকুমার। মানুষটির গভীর সান্নিধ্যে আসা অনুজসম অধীর বাগচী তাঁকে আবিষ্কারের গল্প শোনালেন। শুনলেন পিয়ালী দাস।

Uttam Kumar

Advertisement

পরিচয় পর্ব

উত্তমদাকে আমি নায়ক-মহানায়ক এই হিসেবে দেখি না। উত্তমদা আমার কাছে একটা স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার। তাঁর সঙ্গে যত ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে, একটু একটু করে মানুষটাকে আবিষ্কার করেছি।

আমার বাবা ছিলেন বিখ্যাত সুরকার অনিল বাগচী। বাবার কাছে এক দিন উত্তমকুমার এসেছিলেন তাঁদের ‘লুনার’ ক্লাবের অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করতে। ইচ্ছাকৃত ভাবেই উত্তমবাবুরা ক্লাবটির নাম রেখেছিলেন লুনার। এই শব্দের অর্থ পাগলের আড্ডা।
সেই প্রথম দেখা।

দেখলাম, সুঠাম চেহারার একজন লোক, হাফহাতা শার্ট পরে বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। আমাকে দেখিয়ে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন ‘আপনার ছেলে?’ বাবা বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার ছোট ছেলে।’ আমি তখন স্কুল থেকে এসেছি। দেখলাম তিনি বাবার সঙ্গে কথা বলছেন।

ছোটবেলায় বেশ গোলগাল মোটাসোটা ছিলাম। সুদর্শন পুরুষটি আমার গাল টিপে আদর করে দিয়েছিলেন। বাবা বললেন, ‘উনি উত্তমকুমার, বড় অভিনেতা।’ তখন ছোট ছিলাম। সে ভাবে ওঁর মাপটা বুঝতে পারিনি। 

 

‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’র গানের ইতিহাস

দ্বিতীয়বার উত্তমদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে কাজের সূত্রে, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবির সময়। সে এক ইতিহাস। আমি তখন এক ওষুধের কোম্পানিতে সেলসের কাজ করি। আসলে অনিল বাগচী আমার বাবা হলেও জীবনে খুব স্ট্রাগল করেছি। কিন্তু বাবা আমার সঙ্গে আলোচনা করেই ছবির কাজ করতেন।

একদিনের ঘটনা।

তখন আমি কাজের সূত্রে গুয়াহাটিতে ছিলাম। বাবা আমাকে চিঠিতে লিখলেন, ‘ভুটু, ছবির জন্য একজন প্রোডিউসার এসেছিলেন। একটা হিন্দি গান শুনিয়ে তাঁর বাংলা করতে বললেন, আমি তাঁকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছি।’

তার পর আমি কলকাতা ফিরেই খুঁজে খুঁজে উত্তমদার বাড়ি যাই। আমাকে দেখে বললেন, ‘কে! চেনা চেনা লাগছে!’ বললাম, আমি অনিল বাগচীর ছেলে। তখন বললেন, ‘জানো, তোমার বাবার কাছে একজন প্রোডিউসারকে পাঠিয়েছিলাম একটা ছবির ব্যাপারে। সাবজেক্টটা তোমার বাবা ছাড়া কেউ পারবেন না।’

সেই প্রোডিউসারের নাম ছিল ভোলানাথ রায়। আমি ঠিকানা জোগাড় করে পরদিন তাঁর বাড়িতেও গেলাম। তিনি বললেন, ‘না বাবা, আমি আর যাব না।

একটা গান আছে না মেরে মেহেবুব, তুঝে মেরি মহব্বত কী কসম। এই গানের ক্যাসেটটা নিয়ে গিয়েছিলাম অনিলবাবুর কাছে। উনি ছুড়ে ফেলে দিলেন। আসলে আমি কিছু গান দিয়েছিলাম তাঁকে, এই ধরনের সুরে গাওয়ার জন্য।’ সব শুনে ভোলাবাবুকে আশ্বাস দিয়ে ফিরে এলাম।

পরদিন সকালে আমি ওই গানের সুরটাকে মাথায় রেখে করলাম, ‘আমি যে জলসাঘরে, বেলোয়ারি ঝাড়’। বাবা কাগজ পড়ছিলেন। শুনে বললেন, ‘বাহ, কোথা থেকে পেলি রে?’ আমি বললাম, এই তো তোমার খাতার মধ্যেই গানগুলো আছে।

বাবা শুনে বললেন, ‘দারুণ হয়েছে। তুই সুর কর, আমি দেখছি।’ কিন্তু ‘অধীর বাগচী’ বললে তো কেউ চিনবে না। তাই বাবার নামই থাকল।

এর পর এ নিয়ে তৃতীয় বার উত্তমদার বাড়ি গেলাম। গানটা শোনালাম তাঁকে। উত্তমদা গান শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আরে কী করেছিস!’ এর পর বাবার কাছে গিয়ে আমাকে দিয়ে ছবির গান গাওয়ানোর কথা বললেন।

বাবা বললেন, ‘আনএথিকাল, আনজাস্টিফায়েড। একটা ষোলো-সতেরো বছরের ছেলে এ কাজ করবে! হতেই পারে না! আমি অধীরকে দিয়ে জলসাঘরে গানটা গাওয়াব! ওর গলায় সেই ম্যাচুরিটিই আসেনি। সেই এক্সপ্রেশনটাও তো পাব না।’

আরও পড়ুন: প্রাক পুজোর বুক-ডন আর দু’টি জিলিপির আখ্যান

বাবাকে বললাম, আমি তো গাইব না। কিন্তু মান্না দে’কে দিয়ে গাওয়ালে কেমন হয়? উনি তো হিন্দি ছবিরও গান গাইছেন। শুনে বললেন, ‘কে? কেষ্টবাবুর ভাইপো? তা ঠিকই বলেছিস।’ মান্না দে রাজি হলেন গাইতে। আর বাবাকে বললেন, ‘অনিলদা, কোনও পয়সাটয়সা লাগবে না।’ অবশেষে সমস্যার সমাধান হল।

আমি  উত্তমদাকে বললাম, আমার গিফটটা কী? উত্তমদা তখন বললেন, ‘আমি বললে অনিলদা একদম আপত্তি করবেন না। বলব, ভোলা ময়রার গান কালুদা (অসিতবরণ) গাইতে পারবে না। ওই গান তুমিই গাইবে।’ বাবা এই প্রস্তাব শুনে উত্তমদাকে বললেন, ‘অধীর গাইলে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু ও কি কবিগান কোনও দিনও শুনেছে?’

আমার প্রতি বাবার ঠিক আস্থা ছিল না। অনেক বকাঝকা তিরস্কার সহ্য করেই নিজেকে তৈরি করলাম। তার পর ফাইনালি রেকর্ড করলাম মান্না দে’র সঙ্গে। বাবা শুনেই দু’হাত বাড়িয়ে আমার দিকে ছুটে এলেন। বললেন, ‘ঠিক এইটাই আমি চাইছিলাম।’

উত্তমদা বললেন, ‘দেখলেন তো, কী গাইল মান্না দে’র পাশে!’ আমি রেগে গিয়ে বাবাকে বললাম, একদম ছোঁবে না আমাকে! বাবা বললেন, ‘এ সব না বললে এটা হতো না রে।’ বাবা বাড়ি ফেরার সময় আমাকে সন্দেশ খাওয়ালেন। তার পর তো ছবির গানগুলো সুপারহিট হল। এটাই ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এই সময় থেকেই উত্তমদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকল।

 

সম্পর্কের অন্তরঙ্গতা

উত্তমদার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল ছোট ভাইয়ের মতো। ভাল মন্দ সব কিছু নিয়ে উত্তমদার সঙ্গে মন খুলে কথা বলতাম। এমনকী, আমিও নানান বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ দিতাম।

এক সময়ের কথা বলি। তখন উত্তমদা প্রচণ্ড জনপ্রিয়। ‘চাঁদের কাছাকাছি’ ছবিতে অসাধারণ অভিনয়। ‘দুই পৃথিবী’, ‘সমাধান’ এই সব ছবিতে উত্তমদা অভিনয় করছেন, আমি গান গাইছি, মিউজিক করছি। এ দিকে লোকজন বলছে, উত্তমদা প্রোডিউসারদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন অধীর নামে একটা ইয়ং ছেলের সঙ্গে।

আসলে উত্তমদা যেখানে যেখানে যেতেন, আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবিতে উত্তমদা আমাকে দিয়ে জোর করে সঙ্গীত পরিচালনা করালেন। ছবিটাও সুপারহিট হল।

এত সুন্দর গান বুঝতেন উত্তমদা! কী ভাবে গান গাইয়ে নিতে হয়, কী ভাবে এক্সপ্রেশন দিতে হয়। এই লেভেলটা আমি অন্য কোনও পরিচালক বা অভিনেতার মধ্যে আর কখনও দেখিনি। 

 

সাহিত্যচর্চা

উত্তমদার প্রথাগত শিক্ষার পরিসর আমার জানা নেই। কিন্তু সেই মানুষটার সাহিত্যচর্চা, তাঁর ইংরেজি পড়া দেখে অবাক হয়ে যেতাম। পৃথিবীর বিখ্যাত সাহিত্যিকদের বই পড়ার নেশা ছিল উত্তমদার।

শ্যুটিংয়ের অবসরে প্রায়ই তাঁকে দেখা যেত বই হাতে।

এ রকমই একদিন শ্যুটিংয়ের অবসরে গা এলিয়ে দিয়ে একেবারে মগ্ন দৃষ্টিতে একটা বই পড়ছিলেন। আমার নজর এড়ায়নি। বইটা দেখে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম!

বললাম কী পড়ছ? উত্তর এল ‘ওই কাফকার একটা বই ‘দ্য ট্রায়াল’ পড়ছি।’ সে দিনই জ্ঞানপিপাসু উত্তমদাকে আবিষ্কার করেছিলাম।

 

ব্যক্তিত্ব

উত্তমদার মতো এমন চরম ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সুপুরুষ আমি জীবনে দ্বিতীয়টি দেখিনি। এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যিনি একজন মানুষকে দেখলে এক সেকেন্ডে তার ক্ল্যারিটি বুঝে যেতেন।

আর একটা বৈশিষ্ট্য মানুষটার মধ্যে দেখেছি। যার মধ্যে গুণ আছে, সাবজেক্ট আছে, তাকে কখনও অবহেলা করতেন না। একটা

মার্গে রাখতেন।

অনেকে বলে থাকে, উত্তমদার মহিলাপ্রীতির কথা। তবে বুদ্ধিদীপ্ত মহিলা ছাড়া যার-তার সংসর্গ তিনি উপভোগ করতেন না। কী গুণই না ছিল উত্তমদার মধ্যে! বন্ধু বলতে পারেন, গায়ক বলতে পারেন, একজন বড় শিল্পী বলতে পারেন। রোম্যান্টিসিজমের চূড়ান্ত এক উদাহরণ তিনি।

আমার মতে, উত্তমদা এমন এক মানুষ, যার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে বীর অর্জুনের। ওই রকমই একটা স্ট্রাকচার। হাত-পা যতটা লম্বা হওয়া উচিত ছিল, কোমর যতটা প্রোপোরশনেট হওয়া উচিত ছিল, ঠিক ততটাই!

 হাইট ছিল পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। চোখে খুব এক্সপ্রেশন ছিল, ঠোঁটটা বেশ মোটা ছিল। কিন্তু সব মিলিয়ে তাঁর একটা আলাদা ঔজ্জ্বল্য ছিল। উত্তমদা আমার কাছে বরাবরই একজন অসাধারণ মানুষ।

রোম্যান্টিক নায়কের রোম্যান্টিসিজম

রোম্যান্টিসিজম উত্তমদার কাছে কোনও সংজ্ঞা বা গতে বাঁধা ছকে আবদ্ধ ছিল না। একবার আমি কৌতূহলবশত উত্তমদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রোম্যান্টিসিজম সম্পর্কে তুমি কী জানো? উত্তর এসেছিল, ‘এ বিষয়ে তেমন পড়াশোনা নেই, শেক্সপিয়রের কিছু লেখা পড়েছি মাত্র। তবে রোম্যান্টিসিজম ব্যাপারটা স্বপ্নের মতো কোনও কোনও মেয়েকে দেখলে এমনিই উঠে আসে।’ প্রশ্ন করেছিলাম কী রকম মেয়ে দেখলে অমনটা হয়? বললেন, ‘সবার জন্য হয় না, কিছু মেয়েকে ডিজগাস্টিং লাগে। আবার হয়তো হঠাৎ কোনও বুদ্ধিদীপ্ত চোখমুখ, স্ট্রাকচার বা কথা বলার ধরন দেখলে যেচে কথা বলতে ইচ্ছে হয়।’

আমাকে বললেন, ‘যেমন ধর তোর বউ (রুবি বাগচী)। যার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলা যায়। তবে অন্য ভাবে নিস না, নিছকই ভাই-বউ হিসেবে বলছি।’ এ নিয়ে আরও বলেছিলেন, ‘বুঝলি, প্রেমটা ঠিক বলার ব্যাপার নয়। আসলে অভিনয় করতে করতে ভেতর থেকে রোম্যান্টিসিজম নিজেই বেরিয়ে আসে। আর সে জন্যই চরিত্রগুলো এত গ্রহণযোগ্য হয় তখন।’

মা’কে অসম্ভব ভালবাসতেন উত্তমদা। তাঁর জীবনে ফার্স্ট লেডি ছিলেন মা। সে রকম বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে পেলে টানা দু’-তিন ঘণ্টা কথা বলে যেতেন। তেমন সাবজেক্ট পেলে শিক্ষিত মেয়েদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে কাটিয়ে দিতেন। রুপোলি পরদায় তাঁর বিপরীতে অভিনয় করা নায়িকাদের মধ্যে সুচিত্রা সেন, সাবিত্রীর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। তবে কার সঙ্গে কতটা সময় কাটাতে ভাল লাগত, তা একান্ত আলোচনায় উত্তমদা আমাকে বলে ফেলতেন।

নায়ক ছবির একটি দৃশ্যে উত্তমকুমারের সঙ্গে শর্মিলা ঠাকুর

‘নায়ক’ ছবির নেপথ্যে

‘নায়ক’ ছবি করার সময় শর্মিলাকে উত্তমদার খুব ভাল লেগেছিল। আমাকে ওঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘মেয়েটার মধ্যে কিছু আছে রে, ও শুধু অভিনেত্রী নয়।  She has got something।’ আরও বললেন, ‘আমার ওই অভিনয়টা দেখেছিস নায়ক-এ? ওটা যদি শর্মিলা না থাকত, সত্যজিৎ রায় কিছুতেই করাতে পারতেন না! মানিকদার লেখা সংলাপ নয়। অনেক সময় শর্মিলাকে দেখে স্বাভাবিক ভাবেই এক্সপ্রেশন বেরিয়ে আসত।’

শর্মিলার প্রতি উত্তমদার একটা রোম্যান্টিসিজম ছিল। আর তিনি খুব কল্পনাপ্রবণ ছিলেন। অভিনয়ের সময় ভেবেই নিয়েছিলেন, শর্মিলা যেন সত্যিই তাঁর প্রেমিকা। যে কিনা আবার সাংবাদিক।

বলতেন, ‘মাঝে মাঝে আমি শর্মিলার পার্সোনালিটি দেখে অভিভূত হয়ে গিয়েছি। কথা বেরিয়ে এসেছে আপনা থেকেই...’

 

আক্ষেপ

উত্তমদা খ্যাতির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে, নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে এক কল্পনার পুরুষ করে তুলেছিলেন। তবুও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে হতাশা ও গ্লানি গ্রাস করেছিল এক সময়। আমি তো উত্তমদার ছোট ভাই, বন্ধুর মতো ছিলাম। তাই আমাকে একান্ত আপনজন ভেবে অনেক গোপন ও ব্যক্তিগত কথা বলে ফেলতেন।

যেমন একদিন বেশি পড়াশোনা করতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন আমার কাছে। ইংরেজি উচ্চারণটাও খুব একটা ভাল না হওয়ায় আলগা একটু আক্ষেপ ছিল।

ব্যক্তিগত মুহূর্তে

একবার মুম্বইয়ের এক বড় হোটেলের একটা ঘরে আমি আর উত্তমদা। ওই একদিনই পাগলের মতো কাঁদতে দেখেছিলাম তাঁকে। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। উত্তমদা আমাকে বললেন, ‘আমি অনেক কিছু বুঝি, করতে চাই। কিন্তু আমার অক্ষমতা পারিবারিক কারণে। আমি যে পরিবারে জন্মেছি তাতে এডুকেশনটা ঠিকমতো পাইনি।’

উত্তমদার বাবা ছিলেন মেট্রো সিনেমার চিফ অপারেটর। তাই প্রায়ই চলে যেতেন ছবি দেখতে। পয়সা লাগত না। মার্লিন ব্র্যান্ডো ছিলেন উত্তমদার স্বপ্নের অভিনেতা। প্রায়ই তাঁকে নকল করতেন। ইচ্ছে ছিল হলিউডের এই মাপের অভিনেতার মতো অভিনয় করার। আমি বলতাম, টাকার জন্য তুমি তো একটা ফিল্ম ইনস্টিটিউট খুলতে পারো।

বলতেন, ‘আমি শেখানোর পদ্ধতি জানি না। কেউ আমার কাছ থেকে এমনিই যা নেওয়ার নিতে পারে।’ এই হচ্ছে উত্তমদা। বলতেন, ‘আমি জানি কী করে মহানায়ক হয়েছি। ক্যামেরাটাকে গুলে খেয়েছি। অভিনয়টা করি আমার অভিজ্ঞতা থেকে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে, আর আমার উচ্চারণটা স্পষ্ট।’

কারণ উত্তমদা কোনও কালেই সুপুরি খেতেন না, জিভটাও মোটা হয়নি। উত্তমদা বলতেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে আমার এক্সপ্রেশন, আমার রোম্যান্টিসিজম।’

উত্তমদার জীবনে অনেক বুদ্ধিদীপ্ত সুন্দরী রমণী এসেছেন। যাঁদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের। কারও সঙ্গে আবার গভীর প্রেমের সম্পর্কও ছিল। তবুও সারা জীবন অদ্ভুত এক শূন্যতা গ্রাস করেছিল তাঁকে। একান্ত আপন স্বপ্নের নারীকে তিনি হয়তো খুঁজে পাননি সারা জীবনেই।

একদিন উত্তমদার বাড়িতে কেউ ছিল না। ঘরের মধ্যে দেখি, উত্তমদা টেলিফোনে কার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলছেন। অনুমান করলাম, কোনও নারী হবে।

সে দিন আমার সঙ্গে খোলা মনে কথা বলেছিলেন। জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কাউকে ভালবাসোনি?’ বলেছিলেন ‘না, নিজেকে ছাড়া কাউকে নয়।’ তার পর কী ভেবে বললেন, ‘শুধু একজন, না ঠিক আছে, ছাড়...’

 

মৃত্যুদৃশ্যে

একদিন মৃত্যুর শট দেবেন। আমাকে বললেন, ‘অনিলদা কী ভাবে মারা গেছিলেন রে?’ বললাম, বাবার তো আলসারটা বার্স্ট করেছিল। একদম বাচ্চা ছেলের মতো বাবা আমার হাতটা ধরে হাতের বাঁধনটা খুলে দিতে বলছিলেন। মাঝে মাঝে কেমন নেতিয়ে যাচ্ছেন, আবার শ্বাস নিচ্ছেন। এ রকম মিনিট দশেক। তার পর গলাটা বার বার শুকিয়ে যাচ্ছিল। নার্সকে জিজ্ঞেস করায় জল দিতে বললেন। এর মধ্যে আমি সবে এক পাশে ঘুরেছি। অমনি বাবার গলা থেকে তিনটে আওয়াজ। ব্যস, সব শেষ! এর পরই উত্তমদার ‘দুই পুরুষ’ ছবির মৃত্যুদৃশ্যটা দেখে মনে হয়েছিল, অবিকল যেন বাবার চলে যাওয়ার সেই দৃশ্য! আর তা ছিল এক শটে ‘ওকে’।

খাদ্যরসিক

উত্তমদা খেতে খুব ভালবাসতেন। খাওয়াতেও। তাঁর প্রিয় খাবার ছিল স্যুপ। স্টুডিয়োতে বেণুদি প্রায়ই স্যুপ বানিয়ে আনতেন উত্তমদার জন্য। একটা বড় গ্লাসে করে স্যুপ খেতেন, সঙ্গে ব্রেড। খুব ভাল রান্না করতেন বেণুদি। উত্তমদার অভিনয়ের জন্যও বেণুদি অনেক কিছু করেছেন। তাঁর দেখাশোনা, যত্নআত্তি সবটাই নিজের হাতে করতেন। কারণ স্ত্রী গৌরীদেবীর সঙ্গে উত্তমদার সম্পর্ক খুব একটা বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না। কাজেই যে কথা স্বর্তস্ফূর্ত ভাবে সুপ্রিয়া দেবীকে বলতে পারতেন, সে সব স্ত্রীকে বলতে পারতেন না।

যাই হোক, উত্তমদা রোজ সকালে উঠে তেতো খেতেন। শুনেছিলাম একটা সময় কব্জি ডুবিয়ে মাংস খেতে পারতেন। একসঙ্গে নাকি চল্লিশটা রসগোল্লাও খেয়ে ফেলতেন! পরে ‘উত্তমকুমার’ হওয়ার পরে সব ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমাকে বলতেন, ‘অধীর, গান গাইছিস, মাংস খাবি। মিষ্টি বেশি খাবি না, ভুঁড়ি হবে।’ উত্তমদার সবচেয়ে পছন্দের খাবার ছিল মদ। খুব বেশি খেতেন না। তবে একেক সময় অনেকটা খেয়ে ফেলতেন। কোনও হতাশার জন্য কি না জানি না। কিন্তু কখনও ড্রিংক করে অশালীন মন্তব্য করতেন না। আমি তাঁকে কোনও দিনও নেশাগ্রস্ত হতেও দেখিনি।

একবার ৩ সেপ্টেম্বর উত্তমদার জন্মদিনে, সারারাত ধরে মদ্যপান করেছিলেন। সন্ধে থেকে শুরু করে ভোর চারটে পর্যন্ত। কিন্তু আমার সঙ্গে গান গেয়েছেন, কথা বলেছেন সারাক্ষণ। আমি এক বিন্দুও তাঁকে  টলতে দেখিনি।

 

নীরবে চলে যাওয়া ...

খুব নীরবে চলে গিয়েছিলেন উত্তমদা। আমি জানতেও পারিনি। সে রাতে আমার পরিচিত সুনুদা হঠাৎ বাইরে থেকে চেঁচাচ্ছেন ‘অধীর, অধীর’ বলে। গ্রাহ্য করিনি। তখন আমার ১০৫ ডিগ্রি জ্বর। তার পর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

পরদিন সকালবেলা কাগজে দেখলাম নাকে তুলো গোঁজা ছবি। হেডলাইন ‘মহানায়কের প্রয়াণ’।

শঙ্কর চক্রবর্তী বলে একজন কমেডি অভিনেতার সঙ্গে আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। সেই সকালে আমার বাড়ি এসে বললেন, ‘অধীরদা, যা হওয়ার হয়ে গেছে। সারা কলকাতা তোলপাড় হচ্ছে। উত্তমকুমার নেই!’ তখন আমার জ্বরে উঠে বসার ক্ষমতাও নেই।

কোনও রকমে রেডি হয়ে একটা ট্যাক্সি ডেকে পৌঁছে গেলাম উত্তমদার বাড়ি।

আমি তখনও ভাবতে পারছি না যে উত্তমদা নেই! গিয়ে দেখি, মানুষটাকে একটা নিচু বালিশের উপর শুইয়ে রাখা হয়েছে। আমি তখন ওই বালিশটা দেখিয়ে বুড়োদাকে (তরুণকুমার) বললাম, আর কোনও বালিশ ছিল না? তখন অন্য বালিশের ব্যবস্থা করা হল।

সেই দৃশ্যটা আমি আজও ভুলতে পারিনি! মনে হল যেন আমার দ্বিতীয় পিতৃবিয়োগ হয়েছে। একেবারে কেঁদে ফেললাম। মা-বাবা মারা যেতেও এত কষ্ট পাইনি।

উত্তমদা আমার জীবনে ফ্রেন্ড ফিলজফার গাইড সব ছিলেন।

পরে আমি অবশ্য উত্তমদার মৃত্যুর কারণটা জানতে পেরেছিলাম। লেকগার্ডেন্সে একজনের বাড়িতে যেতেন। তাঁর বাড়িতে এক রাতে পার্টি ছিল। সেখানে খাবারদাবার খেয়েছেন, মদ্যপানও করেছিলেন।

বাড়ি ফিরেছেন পরদিন ভোর-রাতে। সে সময় তিন নম্বর ময়রা স্ট্রিটে সুপ্রিয়া দেবীর ফ্ল্যাটে থাকতেন উত্তমদা।

বাড়ি এসে মেয়ে সোমাকে নিয়ে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন। গায়ে খুব ঘাম হচ্ছিল। তখনই কিছু একটা ফিল করছিলেন। সোমাকে বলেছিলেন, ‘আমার তো দু’বার স্ট্রোক হয়ে গেছে। এই ঘামটা কিন্তু স্বাভাবিক নয়। আমি বরং একবার বেলভিউতে ঢুকি।’

তাঁকে দেখা মাত্রই ডাক্তাররা বলেছিলেন ‘অসম্ভব! এঁকে ছাড়া যাবে না।’ ফলে তখনই অ্যাডমিট করে নেওয়া হয়। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে উত্তমদাকে ইনজেকশন পুশ করা হয়েছিল। তার পর হার্টটা ঠিক হয়েছিল, কিন্তু কিডনি ফেলিওর হয়। এর পর তো মারাই গেলেন।

শেষ দিকে উত্তমদার বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে গিয়েছিল। আমি নিজে দু’-তিনবার চোখের জল ফেলতে দেখেছি মানুষটাকে। একবার গাড়িতে দেখেছি নিজের স্ত্রী এবং বেণুদির বিষয়ে কথা বলার সময়। টাকাপয়সা নিয়ে একটা টানাপড়েন চলত দুই নারীর মধ্যে। আসলে একটা টাসেলের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন উত্তমদা।

আমি তখন উত্তমদাকে বলেছিলাম, তোমার তো আর একটা ফ্ল্যাট আছে। সেখানে গিয়ে থাকতে পারো। কারও কাছে থাকতে হবে না। বলেছিলেন, ‘হয়তো ঠিকই বলছিস। আমিও ভাবছি।’ কিন্তু ভাবতে ভাবতেই মানুষটা চলে গেল!

 

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন