সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অরণ্য ও ইতিহাস

জলপ্রপাত, জঙ্গল আর ইতিহাস মিলেমিশে রয়েছে ঝাড়খণ্ডের আনাচে-কানাচে। রাঁচি, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ, বেতলার জঙ্গল ঘুরে খোঁজা হল সেই সব

Water Fall
জোনহা জলপ্রপাত

কয়েক মাস আগে একটি বই বিপণিতে গিয়ে চোখ আটকে গেল ঝাড়খণ্ডের উপরে লেখা একটি বইয়ে। মনে পড়ে গেল, এক সময়ে রাঁচি, ম্যাকলাস্কিগঞ্জ, নেতারহাট, হাজারিবাগ, পালোমৌর জঙ্গলের পটভূমিতে তৈরি হয়েছে বিস্তর বাংলা সাহিত্য। আর বিহারের (এখন ঝাড়খণ্ড) এই জায়গাগুলোই তো ছিল বাঙালিদের পশ্চিমে হাওয়াবদলের জায়গা। একটু যেন নস্টালজিক হয়ে উঠলাম।

কলকাতায় পুজোর ভিড় এড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঝাড়খণ্ডের উদ্দেশে। প্রথম গন্তব্য এই রাজ্যের রাজধানী রাঁচি, সিটি অফ ওয়াটারফলস। সেখানে পৌঁছে বুঝলাম, প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জার দৌ়ড়ে এই শহরও পিছিয়ে নেই। প্যান্ডেল হপিং ও জগন্নাথ মন্দির দর্শনের পরে শহর থেকে বেরিয়ে গেলাম ৪০ কিমি দূরে দাসম জলপ্রপাত দেখতে। শহর পেরোতেই কংক্রিটের জঙ্গল ভ্যানিশ। গাড়ি যেখানে থামল, সেখান থেকে কয়েকটা সিঁড়ি নামতেই চোখ আটকে গেল দাসমের রূপ দেখে। একটা নয়, বেশ কয়েকটা ধারা নেমে আসছে এক জায়গায়। সেখান থেকে জল নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে। স্বচ্ছ সবুজ জল, সাদা পাথরের উপরে জলের আছড়ে পড়ার আওয়াজের টানে তিনশোরও বেশি সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলাম প্রপাতের নীচে। দাসম মানে কী? ‘‘আসলে ‘দা-সং’। মুন্ডা ভাষায় ‘দা’ মানে জল আর ‘সং’ মানে ধারা। দাসং ক্রমে লোকমুখে হয়েছে দাসম,’’ হেসে বললেন চায়ের দোকানের শিবু মুন্ডা। ঝা়ড়খণ্ডে প্রায় ৩২টি আদিবাসী গোষ্ঠীর বাস। গোটা সফরেই চোখে পড়েছে আদিবাসীদের গ্রামের বাড়ির দেওয়ালে অপূর্ব চিত্রকলা। জলপ্রপাতের পরে দেউড়ি মন্দির। বহু প্রাচীন এই মন্দিরের আকর্ষণ ১৬ হাতের দুর্গা। অষ্টমীর রাতে মন্দির সেজে উঠেছিল নানা রঙের আলোয়। পরদিন যাওয়া হল এই রাজ্যের সবচেয়ে উঁচু জলপ্রপাত হুড্রুতে। এখানে শুধু দেখা নয়, জলপ্রপাতের জলের স্পর্শে মেতেও রইলাম কিছুক্ষণ। হুড্রুর পরে জোনহা ফলসের জন্য পৌঁছলাম শাল গাছে ঘেরা মনোরম এক পরিবেশে। চারশোরও বেশি সিঁড়ি নামার ক্লান্তি মিটে গেল শান্ত সবুজ পরিবেশে জলপ্রপাতের দৃশ্য দেখে। মনের তৃপ্তির পরে কাঁচা শালপাতায় গরম ভাত, ডাল, তরকারি আর বনমোরগের ঝোলে উদরও তৃপ্ত হল। এখানকার স্থানীয় মানুষদের হাতের রান্না যে কোনও নামী শেফকে লজ্জায় ফেলতে পারে! 

রাঁচি থেকে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ গাড়িতে এক-দেড় ঘণ্টার পথ। পথের দু’পাশে জঙ্গল। গাছ-গাছালির মধ্যে মধ্যে উঁকি দিচ্ছে ব্রিটিশ আমলের বাংলো। কোনওটা ভঙ্গুর, কোনওটা বেঁচে। চোখে পড়ল একটা-দুটো গির্জা। ১৯৩২ সালে কলকাতার অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ী আর্নেস্ট টিমোথি ম্যাকলাস্কি এই অঞ্চলে আসেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে দশ বছরের মধ্যে প্রায় ৪০০টি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবার এখানে পাকাপাকি ভাবে চলে আসে। তৈরি হয় স্কুল, গির্জা, স্টেশন। অস্তিত্বের সংকট থেকে মুক্তি পেয়ে এটাই হয় তাঁদের মুলুক। মনোরম জল-হাওয়া ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির টানে কিছু বাঙালিবাবুও বাংলো তৈরি করেন এখানে। এখন অবশ্য সব ইতিহাস। অধিকাংশ বাংলো হাত বদল হয়ে হয় ছাত্রাবাস, নয় তো হোমস্টে। ইতিহাস হয়নি ম্যাকলাস্কিগঞ্জের ছবির মতো প্রাকৃতিক পরিবেশ। এখানকার ছোট্ট স্টেশন, আলাপি স্টেশন মাস্টার ও ফাঁকা ওয়েটিং রুম যেন কোনও ছোট গল্পের অলঙ্করণ। স্টেশনের কাছে পুজো প্যান্ডেলে অপরিচিত মুখ দেখে এগিয়ে এলেন এক হিন্দিভাষী ভদ্রলোক। পরে জানলাম, তাঁর পদবি মুখোপাধ্যায়! তিন পুরুষের বাস এখানে। এখন পদবি ছাড়া বাঙালিয়ানার কোনও চিহ্নই তাঁর মধ্যে নেই। তাঁর কথা মতো পরদিন যেখানে পৌঁছলাম, সেখানে পাশাপাশি আছে একটি মাজার, মন্দির, মাটিতে পোঁতা লম্বা ক্রুশ ও একটা অসমাপ্ত গুরুদ্বার। সব ধর্মের মানুষের প্রার্থনার জায়গা। দেখলাম, প্রাঙ্গণে বিরাট বটের ছায়ায় বসে গল্প করছেন পূজারি ও মৌলবি। এখানকার জঙ্গল, মাটি, আলোর সঙ্গে ধর্মীয় সম্প্রীতিও মিলেমিশে আছে। শুধু মাত্র হোমস্টের খাবারের অতিরিক্ত দাম বিপাকে ফেলে দিয়েছিল। 

ম্যাকলাস্কিগ়ঞ্জে সর্বধর্ম স্থান 

ম্যাকলাস্কিগঞ্জের পরে পালামৌর জঙ্গলে বেতলা অভয়ারণ্য। পৌঁছতে সময় লাগল পৌনে তিন ঘণ্টা। গাছগাছালির মধ্য দিয়ে রাস্তা। হেঁটে আসতেই চোখে পড়ল পাঁচিলের ও পারে সবুজ ময়দানে হাতির ছানা খেলছে তার মায়ের সঙ্গে। এত তাড়াতাড়ি হাতি দেখে তো আহ্লাদে আটখানা। ভুল ভাঙল কিছু পরেই। এরা সাফারির হাতি। তেড়ে আসবে না। আর এই সুযোগ নিয়ে কিছু পর্যটক শুরু করল তাদের সঙ্গে সেলফি তোলা। তার জন্য ছানার শুঁড় ধরে টানতে ও খাবারের মিথ্যে টোপ দিতেও পিছপা হল না! অভয়ারণ্যের কিছু দূরে জঙ্গলের মধ্যে সাড়ে চারশো বছর আগের চেরো রাজাদের ইতিহাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নয়া ও পুরানা পালামৌ কেল্লার ভগ্নাবশেষ। 

ইতিহাস সন্ধানের পরে সূর্যাস্ত দেখতে পৌঁছে গেলাম কেচকি সঙ্গমে। এখানে মিলেছে কোয়েল ও ওরগা নদী। বিস্তৃত বালির চর। সকলে হেঁটেই নদী পারাপার করে এই সময়ে। বর্ষায় অবশ্য অন্য রূপ। এই বালুরাশিতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য স্বর্গীয়। এইখানে কিছুটা শুটিং হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘অরণ্যের দিন রাত্রি’র। পরদিন সকালে জঙ্গলের মধ্যে মিরচাইয়া ফলস দেখে গোধূলির সময়ই বেছে নিলাম সাফারির জন্য। ভাগ্য সহায় হল। দেখা মিলল একাধিক হরিণ, বাইসন, হনুমান, লঙ্গুর, হাতি এবং বেশ কিছু পাখির। কিন্তু সাফারির নিয়মের ফাঁকফোকর এত বেশি যে, বন্যপ্রাণ এখানে কতটা নিশ্চিন্তে আছে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই গেল!

ঊর্মি নাথ

ছবি: লেখক

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন