কোলের বাচ্চা থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া শিশুদের আঘাত লাগার ঘটনা নতুন নয়। একে তো তারা ছোট, কোনও ঘটনার ফলাফল সম্পর্কে অবহিত নয়। ফলে এমন অনেক কাজই তারা করে ফেলে, যাতে নিজেদেরই আঘাত লাগে। অসতর্কতাবশত আঘাত লাগাও স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু ক্ষতস্থানে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা জরুরি। তা হলে সেই আঘাত বা ব্যথা বেশি ছড়াতে পারে না।

 

হাত পা কেটে বা ছড়ে গেলে

দৌড়াদৌড়ি করে খেলার সময়ে পড়ে গিয়ে বা বাড়িতে ধারালো কোনও জিনিসে বাচ্চার হাত-পা কেটে যেতেই পারে। সে ক্ষেত্রে প্রথমেই অ্যান্টিসেপটিক লিকুইড দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে নিতে হবে। তার পরে অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম ক্ষতস্থানে লাগিয়ে, তুলো দিয়ে ঢেকে বেঁধে দিন। হাতের কাছে ওষুধ না পেলে কাটা জায়গায় চিনি ধরে রাখুন। রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে। তবে যদি অনেক গভীর পর্যন্ত ক্ষত ছড়িয়ে যায়, তা হলে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত। চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেবেন সেখানে সেলাই পড়বে কি না। লোহার কোনও কিছুতে কেটে গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টিটেনাস ভ্যাকসিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে।

 

পুড়ে গেলে

সরাসরি আগুনে পুড়ে যাওয়া আর গরম কিছুর ছেঁকা খাওয়া, দুটো কিন্তু আলাদা। কতটা জায়গা পুড়েছে তা গুরুত্বপূর্ণ। বুক বা পেটের কাছে পুড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের আপৎকালীন বিভাগে নিয়ে যাওয়াই শ্রেয়। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অপূর্ব ঘোষ জানালেন, ‘‘পুড়ে গেলে ইনফেকশন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই খুব বেশি অংশ পুড়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।’’ হাত বা পা অল্প পুড়ে গেলে প্রথমে সেখানে কোল্ড কমপ্রেস করতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিকও দিতে হতে পারে। 

 

পোকামাকড় কামড়ালে

কী ধরনের পোকা কামড়াচ্ছে, তা সব সময়ে বোঝা যায় না। প্রথমে চুলকানি ও পড়ে তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে দেখতে হবে, ক্ষতস্থানে কিছু ফুটে আছে কি না। যেমন বোলতা হুল ফোটাতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই হুল আগে বার করতে হবে। তার পরে অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে পারেন। তবে পোকামাকড়ের কামড় থেকে যদি শ্বাসকষ্ট হয় বা জ্বর চলে আসে, সে ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। 

 

গলায় আটকালে

সব কিছু মুখে পুরে দেওয়ার স্বভাব থাকে বাচ্চাদের। খেলনা থেকে শুরু করে কাগজ, গাছের পাতাও তারা মুখে পুরে দেয়। কিন্তু খেলার ছলেই যদি বাচ্চা কিছু গিলে ফেলে? বিশেষত ব্যাটারি বাচ্চাদের নাগাল থেকে দূরে রাখুন। ব্যাটারি বা খেলনার টুকরো গলায় আটকে সন্তানের প্রাণহানির ভয়ও থাকতে পারে। আর বাচ্চার গলায় যদি কিছু আটকে যায়, বাড়িতে তা বার করার চেষ্টা না করে সোজা হাসপাতালে নিয়ে যান। অনেক বাড়িতেই প্রশিক্ষিত লোকের অভাব, ফলে গলায় আটকে থাকা বস্তু আরও ভিতরে চলে যাওয়ার ভয় থাকে। 

 

মাথায় আঘাত লাগলে

বাচ্চাদের খাট থেকে মাটিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা তো আকছার ঘটে। এ ক্ষেত্রে আগে যথাযথ পর্যবেক্ষণ জরুরি। ডাক্তার অপূর্ব ঘোষ বললেন, ‘‘খেয়াল রাখতে হবে, বাচ্চার মাথায় রক্ত জমে গিয়েছে কি না। বাচ্চা ঘনঘন বমি করছে কি না, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। যদি মাথায় আঘাত বেশি হয়, সে ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান করতে বলা হয়।’’ বাচ্চা যদি স্বাভাবিক থাকে, দুধ খায় ও খেলা করে, বমি না করে, তা হলে ভয় পাওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই। তবে চব্বিশ ঘণ্টা বাচ্চার উপরে নজর রাখতে হবে। 

 

বিষক্রিয়ায়

খাবারের সঙ্গে বা নিঃশ্বাসের সঙ্গে কোনও বিষাক্ত বস্তু শরীরে প্রবেশ করলে বিষক্রিয়া শুরু হতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষও দ্রুত ছড়ায়। তাই বাচ্চার যদি শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যা দেখা দেয় বা যদি বাচ্চা ঘুমে ঢলে পড়ে, সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। 

 

ফার্স্টএড কিট

স্টেরিলাইজ়ড গজ প্যাড, অ্যাডহেসিভ ব্যান্ডেজ, টেপ, ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক ওয়াইপস, অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্ট, হাইড্রোজেন পারক্সাইডের মতো অ্যান্টিসেপটিক সলিউশন, কাঁচি, ক্যালামাইন লোশন, থার্মোমিটার, অ্যালকোহল সোয়্যাবস, নন-ল্যাটেক্স গ্লাভস, ডিসপোজ়েব্‌ল কোল্ড প্যাক দিয়ে একটি ফার্স্টএড কিট বানিয়ে বাড়িতে রাখতে পারেন।

 

সতর্কতা প্রয়োজন

• প্রাথমিক চিকিৎসার আগেও প্রয়োজন সতর্ক থাকা। বাচ্চার হাতের কাছে যেন ব্যাটারি, ছুরি, কাঁচির মতো জিনিস না থাকে।

• গরম জিনিসও বাচ্চার থেকে দূরে রাখতে হবে। 

• ছোট বাচ্চাকে সব সময়ে চোখের সামনে রাখতে হবে।

নিজেকেও সংযত থাকতে হবে। বাচ্চার সামনে নখ খাওয়া, হাত না ধুয়ে খাওয়ার মতো বদভ্যেস ত্যাগ করতে হবে। 

মডেল: দেবশ্রী দত্ত, শ্রীনিকা বন্দ্যোপাধ্যায়; ছবি: অমিত দাস; 

মেকআপ: সৈকত নন্দী; 

পোশাক: ওয়েস্টসাইড, ক্যামাক স্ট্রিট

লোকেশন: লাহাবাড়ি, ঠনঠনিয়া