রচনাসমগ্র ২/ শম্ভু মিত্র

সম্পাদক: শাঁওলী মিত্র

৬০০.০০ 

আনন্দ পাবলিশার্স

অন্নদাশঙ্কর রায় একদিন কথায় কথায় শম্ভু মিত্রকে বলেছিলেন, কলকাতার যে-থিয়েটারগুলো আছে সেগুলো সব বিলিতি থিয়েটারের দশম শ্রেণির অনুকরণ। আমাদের নিজস্ব থিয়েটার গড়তে গেলে রবীন্দ্রনাথের কাছে যেতেই হবে। এই কথোপকথনটুকু হয়েছিল ১৯৫০-এ। ‘‘কথাটা তখন আমি সম্পূর্ণ বুঝিনি।’’ জানিয়েছেন শম্ভু মিত্র, কারণ এর আগে নবান্ন করেছেন, তাতে বিলিতি রিয়ালিস্টিক থিয়েটার অনুযায়ী মঞ্চরূপারোপ করেননি। তারপর পথিক, উলুখাগড়া করেছেন, এবং করতে চলেছেন ছেঁড়া তার, তাতেও তাঁর কল্পনা বিলিতি পদ্ধতি অনুসরণ করে চলেনি।

‘‘কিন্তু রক্তকরবী করার সময়েই ক্রমশ মনে হতে থাকলো যে ভারতীয় নাট্যপ্রকাশের একটা ধরন যেন আমরা দেখতে শিখলুম।’’— কেন তাঁর এমন মন্তব্য তা সবিস্তারে ব্যাখ্যাও করেছেন শম্ভু মিত্র। ‘‘কারণ আমরা যেমন নিজেদের সংস্কৃত করিনি, তেমনি নিজেদের উৎস সম্পর্কেও অবহিত ছিলুম না। রবীন্দ্রনাথের নাটক আমরা পড়েছি কিন্তু বুঝিনি, তাকে আত্মভুক্ত করতে শিখিনি।’’ আমাদের মঞ্চ নানা কারণে রবীন্দ্রনাট্যের গুণ সমসাময়িক কালে আত্মসাৎ করতে পারেনি। আসলে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গিতে যে যুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধিৎসা ছিল, তাতে বাস্তব পৃথিবীকে তিনি শুধু মন দিয়ে জানতে চাননি, প্রাণ দিয়ে বুঝতে চেয়েছিলেন। তাই সমাজ ও মানুষ সম্পর্কে তাঁর মৌলিক বক্তব্যকে তিনি প্রকাশ করেছিলেন এমন এক নাট্যরূপে যা বাস্তববাদীদের চোখে অবাস্তব লাগে। অথচ সেই নাট্যরূপ আমাদের দেশজ নাট্যসংস্কৃতিরই রূপ, সেটা বিদেশ থেকে আমদানি করা নয়।

সমস্ত ঘটনাকে একটা নাট্যক্ষেত্রে আনা, অন্তর্জীবন ও বহির্জীবনকে একত্রে বিবৃত করা, ব্যক্তি ও প্রতীককে একই রূপের মধ্যে প্রকাশ করা... রবীন্দ্রনাটকের এই রকম নানান বৈশিষ্ট্য, সে-নাটক তথাকথিত অ্যাকশন-নির্ভর নাটক নয়। রক্তকরবী ও মুক্তধারা মঞ্চায়নের সূত্রে শম্ভু মিত্রের মনে হয়েছে, ‘‘ইওরোপীয় নাটকের রূপ নয় এদের। বাস্তবানুসৃত যে চরিত্রাঙ্কণ পদ্ধতি তা একেবারেই অবলম্বন করা হয়নি এই সমস্ত নাটকে। অথচ অভিনয় করলে বুঝতে পারি যে এর সব জায়গাটাই ভীষণ বাস্তব।... চেষ্টা করতে হবে স্বাভাবিকতার সঙ্গেই যেন অন্তরের কথাগুলোও অতি সহজে অনর্গল হয়ে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ এই দু’টো স্তরে সঞ্চরণ খুব সহজে হয়। বাইরের জীবন আর অন্তর্জীবন, দু’টোই যেন গায়ে গায়ে মিশে অঙ্গাঙ্গিভাবে বর্তমান থাকে।’’ আর রাজা-র আলোচনায় আরও স্পষ্ট ভাবে চিনিয়ে দিয়েছেন অভিনয়ের শিল্পরূপ: ‘‘অভিনেতা নিজের সর্বাঙ্গ দিয়ে অভিনয় করতে শিখবে। তার চলা ফেরা দাঁড়ানো রূপময় হবে, কাব্যময় হবে। এবং এই ব্যঞ্জনা প্রকাশের ভঙ্গি কিন্তু কোনো অতিকৃতিতে নয়। বাস্তবের কাছাকাছি থেকে, তারই তট ছুঁয়ে ছুঁয়ে।’’ এই নতুন শিল্পরূপটি চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও
কেউই তা মঞ্চগ্রাহ্য করে তুললেন না। অথচ রবীন্দ্রনাটকের আগে আমাদের জাতীয় মানসকে যথাযথ প্রকাশ করতে পারে এমন কোনও বিশিষ্ট নাটকীয় রূপ আমাদের নাটকে আসেনি।

স্বাধীনতার অব্যবহিতে সমবেত উদ্যোগে তৈরি তাঁর বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠী থেকেই শম্ভু মিত্র একের পর এক রবীন্দ্রনাটকের মঞ্চায়নে ব্রতী হলেন। রবীন্দ্রনাথে যে-নাট্যচর্চার শুরু, তার মধ্যে জীবনের গভীরতা ও জটিলতা বোঝবার যে-প্রচেষ্টা, তার সঙ্গে ‘‘সাধারণ রঙ্গালয়ের যোগ কোথায়? কেবল তাঁর কতকগুলো নাটক অভিনয় হয়েছিলো বলে?’’ প্রশ্ন তুললেন তিনি। বললেন ব্যতিক্রমের কথা, এবং একই সঙ্গে দর্শকদের পাঁচিল হয়ে-ওঠার কথাও, ‘‘শিশিরকুমার তপতী অভিনয় করেছিলেন, বিসর্জন অভিনয় করেছিলেন, চলেনি... জাতি যদি তৈরি না-থাকে তাহলে জাতীয় নাট্যকলা গড়ে ওঠে কী করে?’’ প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাঙালির প্রধানতম আধেয় যে-রবীন্দ্রনাথ, তাঁকে আমাদের দৈনন্দিনে, শ্বাসেপ্রশ্বাসে, ঘামেরক্তে, প্রতি মুহূর্তের স্বকীয় বাঁচার কঠিন আনন্দে স্পন্দ্যমান করে তুললেন তিনি। আবার সঙ্গে-সঙ্গে এক নতুন দর্শকসমাজ সংগঠনের কঠিন দায়ও তুলে নিলেন নিজের কাঁধে।

‘‘ক্রমশ রবীন্দ্রনাথের নাটকীয়তা উপলব্ধি করতে শুরু করলাম।’’ লিখছেন শম্ভু মিত্র, তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল: ‘‘আমাদের দেশের নাট্য কোন বিশিষ্ট রূপে জগৎসভায় নিজের পরিচয় প্রকাশ করবে? আমরা কি পাশ্চাত্য নাটমঞ্চের অক্ষম অনুকরণ করতে করতে যাবো, নাকি নিজেদের কোনো বিশিষ্ট নাট্যচিন্তা প্রকাশ করতে পারবো।’’ উত্তর খুঁজতে-খুঁজতে তাঁর উপলব্ধি: ‘‘দেশজ রূপটা গড়ে তোলার সমস্যা আমাদের প্রধানতম শিল্পগত সমস্যা।’’ এর মোকাবিলায় দৃঢ়কল্প তিনি: ‘‘এমন একটা নাট্যভঙ্গি আয়ত্ত করতে হবে যা একেবারে ভারতের, একেবারে বাঙালির।... যেটা দেখে পৃথিবীর লোক বলবে, এ একটা অদ্ভুত গভীর নাট্যপ্রকাশ, যেটা ভারতের নিজস্ব।’’

শম্ভু মিত্র (১৯১৫-১৯৯৭) বঙ্গরঙ্গমঞ্চে নিজেকে জড়াতে শুরু করেন গত শতকের তিরিশের দশক থেকে। বাঙালি মধ্যবিত্তের যে-চৈতন্য তিরিশের দশক পর্যন্ত সমাজ ও ইতিহাসপ্রবাহের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতে সচেষ্ট ছিল, চল্লিশের দশকে তাতে জাতীয় জীবনের অচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবেই স্বাধীনতা আন্দোলন, মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, দেশভাগ, এমনকি কমিউনিস্টদের লড়াইও অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। এ-সমস্তই তিনি তাঁর আত্ম-আবিষ্কারের দায় করে তোলেন, আবার এই ব্যক্তিগতের দায় থেকে যে নৈর্ব্যক্তিকরণকে  খোঁজেন, তা তাঁকে তাঁর জীবনব্যাপী শিল্প পরিক্রমার ভিতর দিয়ে, বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের বিভিন্ন ভাঙনের ভিতর দিয়ে, ভারতীয় সংস্কৃতির অবশ্যম্ভাবী সংকটের ভিতর দিয়ে, স্বাধীনতার পর এ-দেশের নানান সর্বনাশের ভিতর দিয়ে পৌঁছে দেয় স্বদেশজিজ্ঞাসার তত্ত্ববিশ্বে।

লেখেন, ‘‘রাষ্ট্র যদি অর্থ দেয়, রাষ্ট্রেরও অনুজ্ঞা থাকে। রাষ্ট্রচালনার পথে সাহায্য হবে তো? তাহলে কোথায় যাবে অর্বাচীন সে নাট্যপ্রেমিক!  অথচ আমি তো বলতে চাই (যদি শিল্পী হই) রাষ্ট্রভিত্তি অন্যায়ের পরে, সাধারণতন্ত্র বলো কিংবা সাম্যতন্ত্র, দুই-ই হোল সমান অসহ্য।’’ তিরিশের দশক থেকে ষাটের দশকের শেষ অবধি তাঁর অভিজ্ঞতায় উঠে আসে স্ট্যালিনের আমলে সোভিয়েট রাশিয়ায় শিল্পীর কণ্ঠরোধ, সমাজতন্ত্রী চিনের ভারত আক্রমণ, এ-দেশে শাসকদল হিসাবে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ও কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙন, আবার ‘স্বাধীন সমাজ’-এর ধ্বজা-ওড়ানো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী ভাবে ‘ভিয়েৎনামের মতো ক্ষুদ্র একটা দেশে বোমা মেরে গুন্ডামি ফলায়।’ স্বভাবতই তখন তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠের গণতন্ত্র সম্বন্ধে সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠেন, ‘‘আত্মধর্ম আর সত্যের সম্মান বাঁচাতে কখনো-কখনো মানুষকে সমষ্টি থেকে একলা হতে হয়। সেই একক ধর্মযোদ্ধা তখন সোজা হয়ে বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়ায় অনেক প্রচলিত ক্ষয়ে যাওয়া সত্যকে ফেলে, অনেক ঘুণে-ধরা তত্ত্বকে ভেঙে নিজের সার্থকতার পথ বেছে নেয়।’’

নিপুণ সম্পাদনায় শাঁওলী মিত্র সাজিয়েছেন রচনাসমগ্রের সাম্প্রতিক খণ্ডটি, জানিয়েছেন, ‘‘এই খণ্ডে মূলত ১৯৬২ থেকে ১৯৭২-এর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত প্রবন্ধ-গল্প-নাটক-নাট্যপাঠ স্থান পেয়েছে।... ক্রমানুসারে প্রকাশিত রচনা একজন শিল্পীর— তাঁর শিল্পের সম্পর্কে ধারণা, তাঁর দর্শন, তাঁর ভাবনার পরিবর্তন ও বিবর্তন— অথচ সে সত্ত্বেও মূল আদর্শের প্রতি তাঁর আনুগত্য— এ-সবই প্রকাশ করে।’’

ইতিহাসে ব্যক্তি হিসাবে শিল্পীর ভূমিকা বরাবরই রহস্যময়। শিল্পচর্চার ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্র তাঁর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যকে শিল্পকর্মের মৌলিকতার সঙ্গে এমনই মিশিয়ে দিতে পেরেছিলেন যে, শিল্পের ইতিহাসে তিনি হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র এবং অনিবার্য। তিনি নিজেই যেমন ইতিহাসের প্রণেতা, তেমনই ইতিহাসও তাঁর শিল্পভাষার রচয়িতা।