• বিভাস চক্রবর্তী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

থিয়েটারেও কাছে টানি না

নবাব-বাদশাদের নয়, মুসলমান সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের জীবন আমাদের বেশির ভাগ গ্রুপ থিয়েটারে আজও উঠে আসেনি।

Theatre
সমাজচিত্র: সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ-র উপন্যাস অবলম্বনে ‘প্রাচ্য’ প্রযোজিত ‘লালসালু’ নাটকের দৃশ্য। ছবি সৌজন্য: শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়

বেশ কয়েক বছর আগে, সময়টা ঠিক মনে পড়ছে না, পরিচালক মানস ভৌমিক চারটি গল্প নিয়ে একটি টেলিফিল্মের সিরিজ় করেছিলেন দূরদর্শনের জন্য। সিরিজ়টির নাম ছিল ‘ভেদ-বিভেদ’। তার একটিতে আমাকে অভিনয়ের জন্য ডেকেছিলেন মানস। গল্পটি ছিল অল্পবয়সি এক স্বামী-স্ত্রী জুটিকে নিয়ে, যারা বিয়ের পর থাকার জায়গা খুঁজে পাচ্ছিল না এই শহরে। কারণ ছেলেটি মুসলিম এবং মেয়েটি হিন্দু। এ বার নিশ্চয়ই সিরিজ়টির নামকরণের সার্থকতা বোঝা যাচ্ছে। আমার ‘ভট্টাদা’ নামের চরিত্রটি ছিল একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির, খানিকটা চালচুলোহীন টাইপের। ওই সদ্যবিবাহিত দম্পতি একটি ফ্ল্যাটের খোঁজে কলকাতার এ মাথা থেকে ও মাথা চষে ফেলার পর কারও পরামর্শে এই ভট্টাদার শরণাপন্ন হয়েছে। সব শুনেটুনে আমি ওদের কাছ থেকে কিছু টাকা অ্যাডভান্স হিসেবে নিয়ে বেশ কিছু দিনের জন্য বেপাত্তা হয়ে যাই। ওরা তো ভেবেই নিয়েছে, এ বার বোধহয় আমও গেল ছালাও গেল। হঠাৎ এক দিন আমি যোগাযোগ করলাম ওদের সঙ্গে, একটা ঠিকানা দিয়ে ওদের দুজনকে মালপত্র সঙ্গে নিয়ে চলে আসতে বললাম। দেখা গেল, আমার ছোট বাড়িটার উঠোনে একটা প্রায়-পরিত্যক্ত ঘর সারিয়ে-টারিয়ে নিয়ে ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি— দেরিটা সেই কারণে। আর এ ব্যাপারে আমার প্রধান মদতদাত্রী হলেন আমার মা শোভা সেন। গল্প হলেও এ রকম একটি কাজ করতে পেরে খুব ভাল লেগেছিল।

গল্প হলেও সত্যি। সম্প্রতি আনন্দবাজার পত্রিকায় এই বিষয় বা সমস্যা নিয়ে কয়েক কিস্তিতে রিপোর্ট বেরিয়েছিল, যাতে এ রকম বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ ছিল। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর আমাদের নাট্যদল সুধীর চক্রবর্তীর ‘সদর মফস্‌সল’-এর একটি সত্য কাহিনি নিয়ে একটা ছোট নাটক করেছিল, তাতে হিন্দু বাঙালিবাবুদের সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতার চেহারাটা তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। এ এক বিচিত্র শহর, ঢাকাতেই হোক, অসমেই হোক বা কলকাতায়— সে রকম লাগসই কোনও ঘটনা ঘটলে কয়েকজন মিলে শহরের কোথাও না কোথাও প্রতিবাদের বুড়ি ছুঁয়ে বুকভরা সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কম্পালসারি ওয়েটিংয়ে চলে যাই আমরা। মুসলিমদের তোষণ করে চলি ‘অসাম্প্রদায়িক’ লেবেলটা ধরে রাখার জন্য, কিন্তু পোষণ ততটা করি না— অর্থাৎ আদর করে তাদের কাছে টানতে পারি না, মূলস্রোতে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারি না। বেশি কথা কী, নাট্যদলগুলোর দিকে তাকালে কী দেখতে পাই আমরা? ‘বহুরূপী’তে মহম্মদ জাকেরিয়ার কথা জানি, ওঁর অভিনয় দেখেছি ‘রক্তকরবী’ ও ‘সেদিন বঙ্গলক্ষ্মী ব্যাংকে’ নাটকে। পরে ঢাকায় চলে গিয়েছিলেন, সেখানে ওঁর সঙ্গে দেখাও হয়েছে আমার। কলিম শরাফি ছিলেন, ছিলেন মহম্মদ ইসরাইল। নিজের গড়া ‘অনুশীলন সম্প্রদায়’-এ ছিলেন গণনাট্যশিল্পী মমতাজ আহমেদ, প্রয়াত ১৯৮৩ সালে। মুন্সী আবদুল বারি নামে এক মেক-আপ আর্টিস্টকে আমরা পাই সবিতাব্রত দত্তদের ‘রূপকার’-এ। ‘নান্দীকার’-এ কোনও মুসলিম সদস্য ছিলেন বা আছেন বলে আমার জানা নেই। আমি থাকাকালীন ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’-এও তাই। ‘সুন্দরম’-এ একজন অভিনেত্রী ছিলেন, বেশ কিছু দিন হল তাঁকে দেখছি না। আমার বর্তমান দলে এক জন মাত্র ছিল, সে-ও মুম্বই চলে গিয়ে বেশ ভালই আছে। বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘সংসদ বাংলা নাট্য অভিধান’-এর নামগুলি দেখলে দুধ কা দুধ পানি কা পানি হয়ে যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে তো এক-একটা দলে অনেক হিন্দু-মুসলিম ছেলে-মেয়েদের একসঙ্গে কাজ করতে দেখেছি। শুধু ঢাকায় নয়, দেশের নানা প্রান্তে। অথচ শতকরা হিসেবে এই বঙ্গে মুসলমানদের সংখ্যা ওপার বাংলার হিন্দুদের সংখ্যা থেকে অনেকটাই বেশি। আমাদের মফস্‌সলের চিত্রটা ততটা জানা নেই আমার, খানিকটা ভিন্ন হলে হতেও পারে হয়তো।

মুসলিমদের সমাজ ও জীবন আমাদের নাটকে-থিয়েটারে কতটা এসেছে? না, আলমগির-জাহাঙ্গির-আলিবর্দিদের মতো নবাব-বাদশাদের কথা বলছি না, গ্রাম-শহরের সাধারণ মানুষের কথা বলছি। মাঝেমধ্যে অলিখিত ‘কোটা’য় মুসলিম চরিত্র ঢুকে পড়েছে আমাদের নাটকে। কিন্তু এই দেশের নাগরিক হিসেবে, এই সমাজের মানুষ হিসেবে তাদের যাপনচিত্র কতটা উঠে এসেছে আমাদের নাট্যচর্চায়? সে বিষয়ে আমাদের আগ্রহই বা কতটা? এই যে রাজীব গাঁধীর আমলের শাহ বানু মামলা, কিংবা সম্প্রতি তিন তালাক নিয়ে বিতর্ক— তার পক্ষে-বিপক্ষে কিছু বলা প্রয়োজন মনে করেছি আমরা? স্বাধীনতার সত্তর বছর পর্যন্ত যে-সব মানুষ কয়েক প্রজন্ম ধরে রাষ্ট্রহীন নাগরিক অধিকারবিহীন অবস্থায় দুই বাংলার অসংখ্য ছিটমহলে জীবন কাটালেন, তাদের কথা একটি নাটকেও কি আমরা বলতে পেরেছি? না কি নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছি, ভেবেছি ও সব আমাদের বিষয়ই নয়? প্রখ্যাত সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) একাধিক নাটক লিখেছেন। ১৮৭২-৭৩ সালের পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা তাঁর ‘জমিদার দর্পণ’ শিলিগুড়ির ‘উত্তাল’ নাট্যদলের প্রযোজনায় দেখেছিলাম। ১৭৮২-র রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ অভিনয় করতে দেখেছি ঢাকার ‘নাগরিক সম্প্রদায়’কে, এখানে মঞ্চস্থ করেছেন ‘কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্র’। ওই ১৮৭২-এ চব্বিশ পরগনা জেলার উত্তরাঞ্চলে তিতুমিরের নেতৃত্বে কৃষক বিদ্রোহ ঘটেছিল, ইতিহাসের সেই অধ্যায় নিয়ে উৎপল দত্ত নাটক লিখেছেন, করেছেন। এ সব বিদ্রোহ-বিপ্লব পরাধীন ভারতের সামগ্রিক ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয়। কিন্তু মুসলমান সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের জীবন কতখানি প্রতিফলিত হয়েছে আমাদের নাট্যে? গণনাট্যের সূচনাপর্বে তবু কিছু প্রবণতা বা প্রয়াস লক্ষ করা যায়, কিন্তু তৎপরবর্তী সময়ে, স্বীকার করতেই হবে, হয়নি বললেই চলে।

একটি মুসলিম কৃষক পরিবারের মর্মন্তুদ ট্রাজেডি নিয়ে প্রথম যে নাটকের অত্যন্ত সু-অভিনীত প্রযোজনা দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, সেটা তুলসী লাহিড়ির ‘ছেঁড়াতার’, অভিনয় করেছিলেন, শম্ভু মিত্র, তৃপ্তি মিত্র, গঙ্গাপদ বসু, অমর গঙ্গোপাধ্যায়, কুমার রায়, শোভেন মজুমদারের মত শিল্পীরা। সেই ‘বহুরূপী’ প্রযোজনার প্রথম অভিনয় ১৯৫০-এ, ১৯৬১-র কয়েকটি অভিনয়ে আমিও ঢুকে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম গাজনের দলের ভিড়ে। রাজনীতি এবং অর্থনীতি কী ভাবে ধর্মীয় কুসংস্কার বা কুচক্রের হাত ধরাধরি করে চলে, তার একটি অসাধারণ দৃষ্টান্ত ‘রক্তকরবী’র দোর্দণ্ডপ্রতাপ সর্দার এবং তার তল্পিবাহক গোঁসাই। রবীন্দ্রনাথের কথায় ‘একজন গোঁসাইজি আছেন, তিনি নাম গ্রহণ করেন ভগবানের কিন্তু অন্ন গ্রহণ করেন সর্দারের। তার দ্বারা যক্ষপুরীর অনেক উপকার ঘটে।’ ‘ছেঁড়া তার’-এর রহিমের মধ্যে আমরা পাই বঙ্কিমচন্দ্রের হাসিম শেখ বা শরৎচন্দ্রের গফুরের মতো কৃষককে, যারা এক দিকে পরাধীন ভারতের ওপর চাপানো সাম্রাজ্যবাদী এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির সংঘর্ষজাত বিশ্বযুদ্ধ এবং দুর্ভিক্ষ, অন্য দিকে সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থরক্ষী শ্রেণিসমূহ এবং ধর্মীয় অন্নদাসের দল— এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে সর্বহারা শ্রেণিতে পর্যবসিত। রহিমের স্ত্রী ফুলজান তার শিশুসন্তানকে নিয়ে দুর্ভিক্ষের দিনে সরকারি লঙ্গরখানায় দুটি ভাতের জন্য দাঁড়ালে স্থানীয় মাতব্বর হাকিমুদ্দি তাদের তাড়িয়ে দেয়।এই অজুহাতে যে রহিম সরকারি খাতায় একজন ট্যাকসোদাতা— বিধি অনুযায়ী এই সাহায্য তার স্ত্রী-পুত্রের প্রাপ্য নয়। রহিম তাৎক্ষণিক ক্রোধের বশে পাল্টা চাল দিয়ে বসল ফুলজানকে তালাক দিয়ে, এই আশায় যে দুর্দিন কেটে গেলে সে আবার নিকা করবে তাকে, মাঝখানে আর কারও সঙ্গে নিয়মরক্ষার শাদি এবং তালাকের পর। কিন্তু রহিমের এই কষ্টকল্পিত কৌশল কাজে দিল না— ফুলজানকে সে আর ফিরে পেল না, ফলে বিড়ম্বিত ভগ্নমনোরথ রহিম আত্মহত্যার পথ বেছে নিল। ফুলজান আর বসির ভেসে গেল।

গত পাঁচ বছরে এমন কিছু কাজ হয়েছে যা উল্লেখের দাবি করতে পারে। বর্ধমানের রত্না রশীদের চার খণ্ডের গবেষণাধর্মী গ্রন্থ ‘মুসলিম বিয়ের গান’ দারুণ ভাবে প্রভাবিত করে নাট্যকার চন্দন সেনকে, তিনি লিখে ফেলেন ‘বিয়ে-গাউনি কাঁদনচাপা’ নাটক। প্রযোজনা করে ‘থিয়েটার ওয়ার্কশপ’, অশোক মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায়। বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়ার প্রত্যন্তবাসী মুসলিম মেয়েদের চাপা কান্না নিয়ে এই নাটক। জীবনের যত কষ্ট আর বঞ্চনা, প্রতিদৈনিক নির্যাতন আর হাহাকার, পুরুষের একবগ্‌গা জবরদস্তি, ধূসর ভালবাসার বিলয়-চিহ্ন লেগে থাকা দাম্পত্য, যখন-তখন শরীর আর পেটের খিদে মেটানোর দায়হীন দাপট— সব মিলিয়ে যে অনিবার্য অন্ধকারের বিধিলিপি নিয়ে এই ভাগ্যহত মেয়েরা সংসারে প্রবেশ করতে বাধ্য হয় তাদের নিরক্ষর বিবর্ণ অস্তিত্বকে হঠাৎ রাঙিয়ে দেয় তাদের নিজেদেরই লেখা আর সুর দেওয়া গান। নিরক্ষর নির্যাতিতাদের এই গান শুধু গীতায়িত কান্না নয়, ব্যঙ্গে বিদ্রুপে নিজেকে আর স্বজনদের নিয়ে নির্মম রসিকতায় দর্শক বা রসিকদের সামনে এক নবীন নকশিকাঁথা মেলে ধরে। বিয়ে-গাউনিদের পাশাপাশি তাদের পুরুষ অভিভাবক, মোল্লা-মৌলবি, এমনকি গ্রামীণ দালাল, পুলিশ কনস্টেবল, সালিশি সভা, ঝগড়ুটে সতিন— এ সব নিয়েই এদের রংতামাশায় ছড়া-কাটা গান আর যাপন। যেন এক সরস পরোক্ষ প্রতিবাদ। সম্পূর্ণ এক নতুন ভুবনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ রত্না রশীদ এবং চন্দন সেনের কাছে।

আধুনিক ভারতের উর্দু সাহিত্যে যে ক’টি নাম সর্বাগ্রগণ্য তাঁদের মধ্যে সাদাত হাসান মান্টো এবং কৃষন চন্দরের সঙ্গে উল্লেখনীয় ইসমত চুঘতাই। ১৯১৫ সালে জন্ম, লেখিকা হিসেবে খ্যাতি বা কুখ্যাতি জোটে ১৯৪২-এ ‘লেপ’ (‘লিহাফ’) গল্পটি লেখার পর। এক নবাবের অন্দরমহলে তার প্রায় বন্দিনী বা পরিত্যক্তা বেগমের শারীরিক চাহিদা মেটানোর বিস্ফোরক কাহিনি, বা প্রতিবাদও বলা যায়। এর জন্য লেখিকার ওপর রক্ষণশীল সমাজের নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ইসমত চুঘতাইকে পথভ্রষ্ট করা যায়নি। ‘প্রগতি লেখক সঙ্ঘ’-এর সদস্য এই লেখিকা স্বধর্মে অবিচল ছিলেন আজীবন। মৃত্যু ১৯৯১ সালে।

উত্তরপ্রদেশের মুসলিম সমাজ এবং সেই সমাজের নারীদের তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন কাছ থেকে। তাঁদের নিষ্পেষিত দমিত শৃঙ্খলিত জীবনযাপন বিধৃত হয়েছে তাঁর লেখনীতে। তেমনই একটি গল্প ‘চতুর্থীর জোড়’। মুসলিম মেয়েদের বিয়ের চতুর্থ দিনে এই জোড় পরিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো রেওয়াজ। কাপড় ছেঁটে কেটে জুড়ে, জরি কাচ বসিয়ে সেলাই করে জোড় বানানোয় পিতৃহীন কুবরা আর হামিদার মা-র জুড়ি নেই এ তল্লাটে। কুবরা বড়, দুবলা, দেখতে সুন্দর নয়, বিয়ের বয়েস পেরিয়ে যাচ্ছে— অনেক আশা তারই মামাতো ভাই রাহতের সঙ্গে শাদি হবে তার। ছেলেটি আসবে এখানে অফিসের কাজের সূত্রে, থাকবে সেই ক’টা দিন তাদেরই বাড়িতে। মা, বোন, হামিদা, এমনকি মা-র পাতানো সই বিন্দুর মা— সবারই একমাত্র কাজ রাহতকে খুশি করা, কুবরার গার্হস্থ্য গুণপনার পরিচয় জাহির করা।

রাহত সকালে খেয়েদেয়ে কাজে বেরিয়ে রাতে বাড়ি ফিরে আবার একপেট খেয়ে ঘুম দেয়, জানেও না কুবরা কত যত্নে তার জন্য নানা রকম খাবার তৈরি করে, জামাকাপড় কাচে, ঘরদোর পরিষ্কার করে। মা-বোন তাকে উৎসাহিত করে রাহতের নজর কাড়তে, কিন্তু অন্তর্মুখী কুবরা নিজেকে আড়ালে রেখে সব কাজে এগিয়ে দেয় বোন হামিদাকে, আর হামিদা এক দিকে দিদিকে রাহত সম্পর্কে, আর রাহতকে দিদির সম্পর্কে ভাল ভাল কথা বানিয়ে বানিয়ে বলে, শ্যালিকাসুলভ রঙ্গ-রসিকতা করে। শিকারি রাহতের লক্ষ্য কিন্তু হামিদার ভরন্ত শরীর। মা তাঁর নামমাত্র গহনা বা এটা-সেটা বন্ধক দিয়ে পয়সা জোগাড় করেন হবু জামাইকে আদরযত্ন করে খুশি রাখার জন্য।

তার পর ঘটে একের পর এক বিপর্যয়— হামিদাকে সুযোগ পেয়ে ধর্ষণ করে রাহত, কুবরা জ্বরে পড়ে, আর রাহত ফিরে যায় তার বাড়িতে। কাহিনি শেষ হয় কুবরার মৃত্যুতে। তার জন্য মা জোড় বানিয়ে চলেছেন। তার শরীরে লাল চাদরের ওপর সাদা কফনের কাপড়। তুলিকা দাসের নির্দেশনায় ‘বহুস্বর’ প্রযোজনা ‘চতুর্থীর জোড়’ (নাট্যরূপ: পুষ্পল মুখোপাধ্যায়) দেখে আচ্ছন্ন বোধ করেছিলাম। পরে ঝাপসা চোখে বেদনা বুকে নিয়ে গল্পটি পড়েছি সঞ্চারী সেনের বঙ্গানুবাদে। ইসমত চুঘতাই-এর সঙ্গে মঞ্চে প্রথম সাক্ষাৎ একটি ঘটনা হয়ে থেকে গেল স্মৃতিতে। কন্যাকে অরক্ষণীয়া রাখা যাবে না, জীবনপণ রেখে পাত্রস্থ করতেই হবে, পাত্রপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে আত্মত্যাগের শেষ সীমানায় পৌঁছতে হবে— অপমান, উপেক্ষা, এমনকি ধর্ষণের মত অপরাধও সহ্য করতে হবে। এ কেমন সমাজ আর তার রীতিনীতি?

হিন্দু সমাজও কিন্তু এই সব বিকার থেকে মুক্ত নয়। আবার এটাও সত্য, সেই সমাজের আলোকপ্রাপ্ত অংশ সাহিত্যে, নাটকে, সিনেমায়, থিয়েটারে এবং সংবাদমাধ্যমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। কিন্তু হাল আমলে সমাজের এই অংশটিই আবার মুসলিমদের ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিনীতি সংস্কার নিয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলতে যেন ইতস্তত বোধ করেন, হয়তো বা কথাকথিত ‘সংখ্যালঘু’দের সম্ভাব্য বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে।

বাংলাদেশের থিয়েটার বা অন্যান্য সামাজিক পাটাতনে বা আন্দোলনে লক্ষ করেছি এই আড়ষ্টতা ভাঙছে, ওখানকার মানুষরা এ জাতীয় অনেক ইস্যুতে সরব হচ্ছেন, সক্রিয় হচ্ছেন। কিন্তু এখানে অনেক প্রগতিশীলকে দেখি তালাক প্রথা বিলোপ নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত বা নীরব, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরেও। বাংলাদেশে ‘মেরাজফকিরের মা’ লিখতে আবদুল্লা আল মামুন, বা সেটা মঞ্চস্থ করতে রামেন্দু মজুমদার দু’বার ভাবেন না। এখানে আমরা পিছিয়ে যাই, সিঁটিয়ে থাকি। ধর্মাচরণের ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই ভিন্ন, কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে বা মানবিকতার প্রশ্নে আমরা এক হতে পারি না কেন?

প্রসঙ্গটি উত্থাপন করলাম এই কারণে যে অতি সম্প্রতি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’র নাট্যরূপ মঞ্চে দেখার সুযোগ হল। ‘প্রাচ্য’ নাট্যদলের এই মঞ্চায়নের নির্দেশক অনেক সার্থক নাট্যের স্রষ্টা অবন্তী চক্রবর্তী। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১) ভারত-পাকিস্তানের এক বিদগ্ধ এবং বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক, যদ্যপি এ-পার বাংলায় অধ্যাপক দেবীপদ ভট্টাচার্য এবং শিবনারায়ণ রায় ব্যতিরেকে আর কেউ তাঁর সাহিত্যকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে আমার অন্তত জানা নেই। নিজের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘I want to write মুসলমান সমাজ নিয়ে— আমার সমগ্র মনের ইচ্ছে সে দিক পানে। এও এক রকম passion থেকে সৃষ্ট। মুসলমান সমাজ সম্বন্ধে আমরা কেউ হয়ত অজ্ঞ নই, কিন্তু অধঃপতন এই যে একটা চূড়ান্ত অবস্থা, এই-অবস্থা নিয়ে লিখে আমার লেখা কলঙ্কিত করতে চাই।’

চতুর, উচ্চাকাঙ্ক্ষী মজিদ মিঞা নিজের গ্রাম ছেড়ে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়ে পড়েছিল। পৌঁছে গিয়েছিল মোটামুটি সম্পন্ন একটি গ্রামে, মহব্বতনগরে। বাঁশঝাড়ের ধারে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এক পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা মাজার আবিষ্কার করে সে এবং সেটাকে কোনও এক কাল্পনিক মোদাচ্ছের পীরের মাজার বলে চালায়, গ্রামবাসীকে তিরস্কার করে অবহেলায় ফেলে রাখার জন্য। মাজারের সংস্কার হয়, মজিদ অচিরেই নিজেকে এক জন ধর্মীয় নেতা রূপে প্রতিষ্ঠিত করে এবং মানুষগুলিকে করে তোলে ধর্মভীরু। মাজারকে মূলধন করে সে ধনসম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠে, স্বামীরূপে দুই স্ত্রীলোকেরও— এক জন বিধবা রহিমা, অন্য জন কন্যাসমা জামিলা। গ্রামে সর্ব বিষয়ে তার কথাই শেষ কথা— সব প্রতিপক্ষ, প্রতিকূলতাকে পরাস্ত করে সে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহিনী যুবতী স্ত্রী জমিলাই তার বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে এক রাত্রে মাজারে ফেলে রেখে আসে সে। আর সারা রাত্রিব্যাপী ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ভোরে মাজারে গিয়ে আবিষ্কার করে নগ্নবক্ষ জমিলার মৃতদেহ, দেখে ‘মেহেদি দেয়া তার একটা পা কবরের গায়ের সঙ্গে লেগে আছে’। আতঙ্কিত মজিদ বেরিয়ে পড়ে, বাইরে তখন গ্রামবাসীদের হাহাকার— গ্রামের সমস্ত ধানখেত শিলাবৃষ্টিতে লন্ডভন্ড।

ঢাকায় বসে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যে অধঃপতনের কাহিনি বলতে চেয়েছিলেন ১৯৪৮-এ, সত্তর বছর পরে আজ ২০১৮ সালে অবন্তী কলকাতার নাটমঞ্চে সেই ধর্মান্ধতা, নারীত্বের অবমাননার আখ্যান তুলে ধরেছেন নাট্যসৃজনের মাধ্যমে। এবং সেই সঙ্গে বিপ্লব বন্দ্যোপাধ্যায়ের জটিল-কুটিল মজিদ তাঁর অভিনয়জীবনের মাইলফলক হয়ে রইল। আমরা সমস্ত ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় অনাচার যেন ধর্মনিরপেক্ষ ভাবেই দেখতে শিখি। কোনও সাম্প্রদায়িকতা বা বিপরীত-সাম্প্রদায়িকতা (রিভার্স কম্যুনালিজ়ম) যেন আমাদের দৃষ্টি বা বিচারবুদ্ধিকে আচ্ছন্ন না করে।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন