• তরুণ মজুমদার
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মন্দিরচূড়া থেকে উড়ে গেল ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি

সাহিত্যে যেমনটা লেখা আছে, চলচ্চিত্রে হুবহু তা করা যায় না। ভাবনাটা অক্ষত রেখে প্রকাশভঙ্গি আমূল বদলাতে হয়, তৈরি করতে হয় সিনেমার ভাষা। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ বা ‘অশনি সংকেত’-এর মতো ছবি আমাদের সেই ভাষাই শেখায়। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

Aparajita
অন্তিম: ‘অপরাজিত’ ছবিতে হরিহরের মৃত্যুদৃশ্য। এর পরেই বারাণসীর মন্দিরচূড়া থেকে উড়ে যাবে পাখির ঝাঁক

Advertisement

এ বার আসছি পরের প্রসঙ্গে। সম্পাদনা অর্থাৎ এডিটিং। সত্যজিৎবাবু বলতেন, সম্পাদনা হচ্ছে যে কোনও ছবির প্রাণ। ঘুরিয়ে বললে এমনটাও বলা যায় 

যে, ঠিকঠাক সম্পাদনার হাত ধরে ছবিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়। 

বলতেন, গানের সঙ্গে সম্পাদনার অনেক মিল আছে। গানে যেমন ছন্দ থাকে, তাল থাকে, লয় থাকে, সম থাকে— ভাল করে লক্ষ করলে বোঝা যায়, ছায়াছবিতেও তা-ই। গানের মতো তাকে কানে শোনা যায় না বটে, কিন্তু অনুভবে ধরা পড়ে। অন্তত অবচেতনে। ঠিকঠাক মতো সম্পাদনা না হলে ছবিতে তাল কাটে, রসভঙ্গ হয়।

উনি সাধারণত অন্য কারও এডিটিং রুমে পা রাখতেন না। কিন্তু যেহেতু আমাদের ঘর পাশাপাশি আর সম্পাদকও এক, দুলাল দত্ত, এক বার একটা মজার ঘটনা ঘটল। মুখে বলছি ‘মজার’ কিন্তু আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তখন সন্ধে হব-হব। দিনের কাজ শেষ করে উনি বেরিয়ে যাচ্ছেন আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে। হঠাৎ ‘মুভিওলা’ যন্ত্রের সামনে আমাদের বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলেন, ‘‘কী? ভাল?’’

দুলাল বলল, ‘‘হ্যাঁ, মানিকদা।’’

বললেন, ‘‘কী হচ্ছে? রাফ কাট?’’

আমি বলে উঠলাম, ‘‘হ্যাঁ, আসুন না!’’

কী ভেবে উনি সত্যি সত্যিই ঢুকে পড়লেন। বলতে বলতে এলেন ‘‘ভীষণ ইন্টারেস্টিং জিনিস ওটা। কত রকম এক্সপেরিমেন্ট যে করা যায়!’’

দুলাল চেয়ার ছেড়ে দিল। আমিও। কিন্তু উনি বসলেন না। দুলাল বলল, ‘‘একটা সিন কাটছি। তাতে একটা জায়গা একটু অন্য রকম কেটেছি। ভাবছি, উচিত হবে কি না।’’

উনি বললেন, ‘‘উচিত-অনুচিতের কী আছে? ভেতরে যেটা ফিল করছেন, মন যাতে সায় দিচ্ছে, সে রকমই কাটুন। দেখবেন, সেটাই ঠিক হচ্ছে। এডিটিংয়ের কোনও গ্রামার হয় না। আজ যা ঠিক, কালই হয়তো তা পুরনো হয়ে যাচ্ছে।’’

খুব খুঁটিনাটি মনে নেই, তবে এটুকু আছে যে, অ্যাডভান্স কাটিং, প্যারালাল কাটিং আর লেট কাটিং-এর ফলে যে একই জিনিসের আলাদা আলাদা চেহারা হয়, সেটা বুঝিয়ে বলেছিলেন।

আমি হাঁ করে গিলছিলাম। কে শেখাবে এমন হাতে ধরে?

পরে ওঁর ছবি দেখতে দেখতে, বার বার দেখতে দেখতে একটু একটু করে এর মর্ম বুঝতে পারি।

উনি বলতেন, ঠিকঠাক এডিটিং-এর এফেক্ট হয়তো সেই মুহূর্তেই সবটা বোঝা যাবে না। কারণ এর ক্রিয়াকলাপ অনেকটাই দর্শকের অবচেতনে। পাশাপাশি আবার এমন দৃষ্টান্তও আছে যেখানে সুতীব্র অভিঘাত রচনার চেষ্টায় এডিটিং-ও পুরোপুরি দৃষ্টিগোচর হয়ে দাঁড়ায়। বলা বাহুল্য, এডিটিং একক ভাবে এ কাজটা করতে পারে না। অবশ্যই চিত্রনাট্য তাকে সেই পথে চালিত করবে।

উনি একটা ভাবনার বীজ মনের মধ্যে গেঁথে দিয়ে সে দিনকার মতো চলে গেলেন। বিষয় হল: চিত্রনাট্যের সঙ্গে এডিটিং-এর সম্পর্ক। নিজে নিজেই ভাবতে বসলাম। চিত্রনাট্য না বলে দিলে সিনেমা তৈরির বাকি সব বিভাগগুলিই অচল। ক্যামেরার কাজ, শব্দের ভূমিকা, শিল্প নির্দেশনার প্রত্যেকটা ধাপ— সবগুলিই তো যে যার মতো চলবে। তা সত্ত্বেও আলাদা করে, এবং বিশেষ করে, চিত্রনাট্যের সঙ্গে সম্পাদনার সম্পর্কের কথা তুললেন কেন? ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে ভেসে এল ‘অপরাজিত’ ছবির একটা দৃশ্য। পরে, সুযোগ পেয়ে এক দিন ওঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘আপনি কি এ রকমই কিছু একটা বোঝাতে চেয়েছিলেন?’’

‘‘অনেকটা।’’ এই ছিল ওঁর উত্তর।

দৃশ্যটা বলি। সকলেরই জানা অবশ্য। কাশীতে হরিহরের মৃত্যুর দৃশ্য। স্বামীর মৃত্যুতে সর্বজয়া বলে উঠল, ‘‘কী হল? কী হল?’’ আর সঙ্গে সঙ্গে ‘কাট’ করে দেখা গেল, কাশীর ঘাটে একটা মন্দিরের চূড়া থেকে অসংখ্য পাখি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে আকাশে উড়ে গেল।

যে কোনও মৃত্যুই তার নিজের মতো করে ঘটবে। আবার মন্দিরের চূড়া থেকে পাখির ঝাঁক উড়ে যাবে, এর মধ্যে আবার নূতনত্ব কী আছে?

কিন্তু আছে বইকি!

পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কহীন এই দুটি শট জুড়ে দিলে এক নিমেষে দুইয়ের সঙ্গে দুইয়ের যোগফল অঙ্কশাস্ত্রের সমস্ত নিয়মকে অগ্রাহ্য করে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়— সেটা বোঝাতে আমার আর কথা খরচ করার দরকার আছে বলে মনে হয় না।

এমন সব উদাহরণ ওঁর প্রায় সব ছবিতে লুকিয়ে আছে। আমি শুধু আর একটা ছবির কথা উল্লেখ করব— ‘অশনি সংকেত’, যেটা মুক্তি পেয়েছে ‘পথের পাঁচালী’র অনেক অনেক পরে। নিজেকে আমি কখনওই বেশ ভারী ওজনের চলচ্চিত্রবোদ্ধা বলে মনে করি না, তবু আমার মনে হয়েছে এই দৃশ্যটির চিত্রনাট্য আর সম্পাদনার যুগলবন্দি যে কোনও ফিল্ম ইনস্টিটিউট অথবা ফিল্ম স্টাডিজ়-এর ছাত্রছাত্রীদের বাধ্যতামূলক ভাবে দেখানোর আয়োজন করা উচিত। এক বার নয়, বার বার।

আপনাদের সকলেরই মনে থাকতে পারে, ছবিটা কেমন ভাবে শুরু হয়েছিল, আর তার শেষটা। একটা সাধারণ, শান্ত গ্রাম, সাধারণ মানুষ আর তাদের সাধারণ জীবন নিয়ে। এক দিন অনঙ্গ বৌ নদীতে স্নান করছে—

মূল গল্পে এর পর আছে...

‘‘প্রৌঢ়া বললে, ও বামুনদিদি, ওঠো, কুমীর এয়েচে নদীতে...’’

পরিচালক কুমিরের মতো কোনও স্থূল জিনিস দিয়ে ছবিটা শুরু করতে চাননি। অমন চমক এ ছবিতে অনভিপ্রেত বলে ভেবেছেন। তাঁর ছবি শুরু হয় এই ভাবে—

ছোট্ট গ্রামের পাশে ছোট্ট নদী। সেই নদীর বুকে একটা ক্লোজ় শট। মৃদুমন্দ স্রোত বয়ে চলেছে। ধীরে ধীরে সেই স্রোতের তলা থেকে ভেসে ওঠে অনঙ্গ বৌয়ের হাত। থামে। এমন জায়গায় এসে থামে যেখানে হাতের তালুর ওপর দিয়ে জলের ধারা বয়েই চলেছে। শটটির দিকে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে— এতই সুন্দর। গল্প যতই এগোবে, এই সুন্দরের রূপান্তর ঘটতে থাকবে। এই গ্রামের ওপর দিয়ে প্রথম উড়োজাহাজ উড়ে যাবে, যুদ্ধের আগাম বার্তা নিয়ে। জীবন ক্রমশ জটিলতায় ভরে যাবে। এত দিন ছিল অভাব-অনটন। জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতা। এ বার তাকে এলোমেলো করে দিয়ে যায় নানা অজানা অভিজ্ঞতার ছায়াপাত। ছবি শেষ হয় সেই মারাত্মক দুর্ভিক্ষের বার্তা দিয়ে, মানুষের তৈরি দুর্ভিক্ষ, যাতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ যায়।

মাঝের অংশটাকে আমরা ছেড়ে দিই। বরং সোজা চলে আসি ছবির শেষ দৃশ্যে। দৃশ্যটির মূল কথা: দুর্ভিক্ষের ছায়া ক্রমশ এগিয়ে আসছে। অচিরে সারা দেশটাকে গ্রাস করবে। এর থেকে কারও কোনও নিষ্কৃতি নেই।

বূলতে গেলে কথাটা সোজা, কারও কোনও নিষ্কৃতি নেই। কিন্তু এটাকে ছবিতে দেখানো যাবে কী করে? দুর্ভিক্ষ তো কোনও মূর্তিমান রাক্ষস নয় যাকে চর্মচক্ষে দেখা যাবে। তা হলে? 

সাহিত্য মাঝে মাঝে চলচ্চিত্রের সামনে এই ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। পাঠ্য হিসেবে অনবদ্য। কিন্তু ছবিতে ফোটাতে গেলে পরিচালকের মাথায় হাত। চলচ্চিত্রের যা কিছু ভাষা তা সমস্তই ছবির বা ভিজ্যুয়ালস-এর ভাষা। কোনও তত্ত্ব, তথ্য, অথবা মানুষের নিবিড়তম অনুভূতি যদি ফোটাতে হয় তা হলে ছবি— একমাত্র ছবির ভিতর দিয়েই তাকে ফোটাতে হবে। ‘অশনি সংকেত’-এ সত্যজিৎ রায় এমন নিপুণ ভাবে সেই ছবি আবিষ্কার করেছিলেন, যা ভাবলে আজও বিস্মিত আর রোমাঞ্চিত হতে হয়। কী সেই ছবি, সেই আলোচনায় একটু পরেই আমরা ঢুকব। কিন্তু এই যে আদি সমস্যা, অর্থাৎ সাহিত্যে যা অনবদ্য আর অনায়াসলভ্য, চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে তা শুধু কঠিনই নয়, মাঝে মাঝে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়— সেই ব্যাপারে বরং একটু কথাবার্তা বলে নেওয়া যাক।

এমনি কথায় কাজ হবে না। দুটো দৃষ্টান্ত তুলে ধরি।

প্রথমটি ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস থেকে। উপন্যাসের শেষ বিভূতিভূষণ করেছেন এই ভাবে: ‘পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া বলেন— মূর্খ বালক, পথ তো আমার শেষ হয়নি তোমাদের গ্রামের বাঁশের বনে, ঠ্যাঙাড়ে বীরু রায়ের বটতলায় কি ধলচিতের খেয়াঘাটের সীমানায়। তোমাদের সোনাডাঙা মাঠ ছাড়িয়ে, ইছামতী পার হয়ে, পদ্মফুলে ভরা মধুখালি বিলের পাশ কাটিয়ে, বেত্রবতীর খেয়ায় পাড়ি দিয়ে পথ আমার চলে গেল সামনে, সামনে, শুধুই সামনে... দেশ ছেড়ে বিদেশের দিকে, সূর্যোদয় 

ছেড়ে সূর্যাস্তের দিকে জানার গণ্ডি ছাড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশে...

দিনরাত্রি পার হয়ে, জন্ম-মরণ পার হয়ে, মাস, বর্ষ, মন্বন্তর, মহাযুগ পার হয়ে চলে যায়...তোমাদের মর্মর জীবন-স্বপ্ন শেওলা-ছাতার দলে ভরে আসে, পথ আমার তখনও ফুরায় না... চলে... চলে... চলে... এগিয়েই চলে...

অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ।

সে পথের বিচিত্র আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক তোমার ললাটে পরিয়েই তো তোমায় ঘরছাড়া করে এনেছি...

চল এগিয়ে যাই।’

এই দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেওয়ার একটা কারণ আছে। বিভূতিভূষণ আমাদের অতি প্রিয় এক জন লেখক। তাঁর অসংখ্য রচনা পাঠকদের হৃদয় জয় করেছে, আর আজও করে। তাঁর লেখা নিয়ে ছায়াছবিও কম হয়নি। ‘পথের পাঁচালী’ ছবি হিসেবে এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছে।

কিন্তু বিভূতিভূষণ যে ভাবে তাঁর লেখাটি শেষ করেছেন, আক্ষরিক ভাবে তা কি ছবিতে রূপান্তরিত করা যায়? এর উত্তর হল— না, অসম্ভব।

‘পথের দেবতা’, ‘জানার গণ্ডি ছাড়িয়ে অপরিচয়ের উদ্দেশ্যে’, ‘অনির্বাণ তার বীণা শোনে শুধু অনন্ত কাল আর অনন্ত আকাশ’, ‘আনন্দ-যাত্রার অদৃশ্য তিলক’... এ সব বাক্যাংশকে কী ভাবে ছবিতে রূপ দেবে চলচ্চিত্রকার? তাই ভাবনাটিকে অক্ষত রেখে তার প্রকাশভঙ্গিকে আমূল বদলাতে হয়। ফলে, সাহিত্যের ফর্মকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন একটা ফর্ম তৈরি করতে হয় যা কিনা আমরা ফিল্ম-ফর্ম অথবা সিনেমার ভাষা বলে থাকি।

অথবা আসা যাক ‘আরণ্যক’-এর শেষটায়। কী লিখে গিয়েছেন বিভূতিভূষণ সেইখানে?

‘নাঢ়া-বইহারের সীমানা পার হইয়া পাল্কি হইতে মুখ বাড়াইয়া একবার পিছনে ফিরিয়া চাহিয়া দেখিলাম।

বহু বস্তি, চালে-চালে বসত, লোকজনের কথাবার্তা, বালক-বালিকার কলহাস্য, চীৎকার, গোরু-মহিষ, ফসলের গোলা। ঘন বন কাটিয়া আমিই এই হাস্যদীপ্ত শস্যপূর্ণ জনপদ বসাইয়াছি ছয়-সাত বছরের মধ্যে। সবাই কাল তাহাই বলিতেছিল— বাবুজী, আপনার কাজ দেখে আমরা পর্যন্ত অবাক হয়ে গিয়েছি, নাঢ়া লবটুলিয়া কী ছিল আর কী হয়েছে!

কথাটা আমিও ভাবিতে ভাবিতে চলিয়াছি, কী ছিল, আর কী হইয়াছে!

দিগন্তলীন মহালিখারূপের পাহাড় ও মোহনপুরা অরণ্যানীর উদ্দেশে দূর হইতে নমস্কার করিলাম।

হে অরণ্যানীর আদিম দেবতারা, ক্ষমা করিয়ো আমায়। বিদায়।’’

এই যে এক অরণ্যপ্রেমী যুবককে নিজের তত্ত্বাবধানে বন কেটে বসত বসাতে হল, তার নিগূঢ় ব্যথা আর বিদায়ের সময় অরণ্যানীর আদিম দেবতাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা— এর কি আক্ষরিক ভাবে ছবিতে প্রতিফলন ঘটানো যেতে পারে? উত্তর সেই একটাই।

না। অসম্ভব।

কিন্তু কেন নয়?

লেখক যখন লেখেন তখন তাঁর সামনে ছবির মালা না গেঁথেও ইচ্ছেমতো লিখে যেতে পারেন। তাঁর আবেগ, পর্যবেক্ষণ, তাঁর চরিত্র আর সমাজ-বিশ্লেষণ— এগুলিই তাঁর প্রধান কাজ। কিন্তু ছায়াছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে, চিত্রনাট্য রচনার ক্ষেত্রে পরিচালককে তাঁর মনের মধ্যে নিখুঁত ভাবে ছবির পর ছবি সাজিয়ে যেতে হবে। ছায়াছবি রচনার বেলায় এ শুধু প্রাথমিক নয়, একমাত্র শর্ত।

এ সব আমরা শিখেছি সত্যজিৎ রায়ের কাজ দেখে দেখে। তাঁর আগে অনেকেই হয়তো এই 

চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এত সরল ভাবে আমাদের মাথায় ঢোকেনি।

এই শিক্ষার একটা চমৎকার উদাহরণ ‘অশনি সংকেত’-এর শেষ দৃশ্যটা।

গঙ্গাচরণ আর অনঙ্গ বৌয়ের চরিত্র দুটিতে অভিনয় করেছিলেন যথাক্রমে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর ববিতা। পাশাপাশি আরও একটি চরিত্র— পাশের গাঁয়ের সেই নিত্য অভাবগ্রস্ত বয়স্ক মানুষটির চরিত্রে গোবিন্দ চক্রবর্তীর অসাধারণ অভিনয়ের কথাটা এক বার মনে করুন। শেষ দৃশ্যে যখন অনঙ্গ বৌ তার স্বামীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে গ্রামের সীমার বাইরে থেকে মাঠ পেরিয়ে কারা যেন বোঁচকা-বুঁচকি-হাঁড়ি-কলসি নিয়ে এগিয়েই আসছে— জনাছয়েক লোকের একটা গোটা পরিবার। একটু পরে বোঝা যায়, সেই পরিবারটির কর্তা গোবিন্দ চক্রবর্তী। ক্যামেরায় ধরা কম্পোজিশনটা এমন যে ফ্রেম-এর ডাইনে-বাঁয়ে তিলমাত্র ফাঁকা জায়গা নেই। সবটাই জুড়ে পরিবারের সেই সদস্যরা। এর পরেই শুরু হয় আঙ্কিক নিয়ম মেনে ছন্দোবদ্ধ কাটিং— সেই দলটির সেকশনাল ক্লোজ় শট। সেই ক্লোজ় শট-এ কারও মাথায় একটা মাটির হাঁড়ি, কারও বগলে একটা ছেঁড়া মাদুর, কেউ হাত দিয়ে ধরে আছে কোনও শিশুর হাত। দুঃস্থ পরিবারের শেষ সম্বলটুকু সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে আসছে।

এর পরেই শুরু হয় আসল ম্যাজিক। চিত্রনাট্য আর সম্পাদনার যোগফলের সেই অনন্য অভিজ্ঞতা। আমরা ফিরে যাই সেই আদি শটটিতে। ক্যামেরার ফ্রেম জুড়ে এগিয়ে আসছে সেই পরিবারটির মানুষজন। এ বার ক্যামেরা পিছোতে থাকে। দেখা যায়, শুধু মুষ্টিমেয় সেই ক’টি লোকই নয়, তার দু’পাশে, পিছনে অসংখ্য মানুষ, মানুষ আর মানুষ। দুর্ভিক্ষ ওদের তাড়া করেছে, ঘরছাড়া করেছে। নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে ওরা যাত্রা করেছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। শটটা কিছু ক্ষণ আমাদের চোখে সইয়ে এর ওপর ভেসে ওঠে একটি নির্লিপ্ত, নিরাসক্ত লেখা: সে বার মানুষের তৈরি মন্বন্তরে মোট এত লক্ষ লোকের মৃত্যু ঘটেছিল।

এই দৃশ্যটি নিয়ে প্রচুর নাটকীয়তা আর কৃত্রিম আবেগ তৈরি করা যেত। উনি সে পথে হাঁটেননি। যখনই ছবি করেছেন, এই অলঙ্ঘনীয় সূত্রটি মেনে চলেছেন। এটাও আমাদের কাছে একটা শিক্ষা।

খুব যে আমাদের মধ্যে ঘন ঘন দেখা হত, তা নয়। কিন্তু হত। আর যখনই হত, নানা কথার ফাঁকে ফাঁকে এক-একটা কথা উঠে পড়ত— যার জন্য কোনও আগাম প্রস্তুতি ছিল না। কিন্তু তার ভিতর থেকেও বেরিয়ে আসত নির্ভুল পথনির্দেশ। 

যেমন এক বার হল।

আমরা জানতাম, উনি চিত্রনাট্য লিখতেন এক ধরনের খেরো খাতায়। ছোট ছোট স্কেচ আর তার এক পাশে হয়তো সংলাপ অথবা কে কী ভাবে নড়াচড়া করবে, উঠবে কী বসবে— তার আভাস। আমি বলেছিলাম, আপনি নাহয় শিল্পী, অনায়াসে স্কেচগুলো করে দিতে পারেন, কিন্তু এমনও তো অনেক পরিচালক আছেন, গুণী পরিচালক, কিন্তু ছবি আঁকার হাত নেই, তাঁরা যদি আপনার পদ্ধতি অনুসরণ করতে চায়, তার বেলায় কী হবে?

উনি বললেন, ‘‘ছবি আঁকা আমার কাছে অনেকটা ইঙ্গিতের মতো। এক নজরে বুঝে নিই পর পর কম্পোজ়িশনগুলো কী ধাঁচের হবে। যাঁরা পারবেন না, দরকার নেই। কিন্তু কাগজে না থাকলেও ছবিগুলি কিন্তু তাঁর মনের মধ্যে, এবং চোখের সামনে, একেবারে স্পষ্ট হয়ে থাকা চাই। নইলে মাঝপথে গিয়ে হাতড়াতে হবে। যা তুমি বলতে চাও— সবই বলতে হবে ‘ইন টার্মস অব ভিস্যুয়ালস’। সংলাপ দিয়ে নয়। সংলাপ হল কমিউনিকেশন‌্স-এর সবচেয়ে দুর্বল হাতিয়ার।’’

আর এক বার কথা উঠল জীবনের বাস্তবতা আর ছায়াছবির বাস্তবতা নিয়ে। দুটোই কি এক? নাকি, এর মধ্যে কোনও পার্থক্য আছে?

উনি বললেন, ‘‘তোমার কী মনে হয়?’’

আমতা আমতা করে বললাম, ‘‘বাস্তবধর্মী ছবিতেও তো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের ব্যবহার হয়। সুখেও ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আবার দুঃখের বেলাতেও। কিন্তু সত্যিকারের জীবনে আমাদের চলাফেরায়, কী সুখে, কী দুঃখে— কোথাও তো পিছন থেকে সেতার অথবা সরোদ অথবা তারসানাই বেজে ওঠে না। তাই বলছিলাম—’’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘শাঁসটা এক হলেও বাইরের খোলসটা একেবারেই আলাদা। জীবনের বাস্তবতা অথবা অভিজ্ঞতাকে ফোটাতে গেলে অনেক সময় এমন কোনও কোনও জিনিসের আশ্রয় নিতে হয়, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনও সম্পর্ক নেই। ফিল্মে আমরা নিখাদ রিয়্যালিটিকে হাজির করতে পারি না। যেটা করি সেটা আসলে রিয়্যালিটি নয়, ইলিউশন অব রিয়্যালিটি। বাস্তবতা নয়, বাস্তবতার বিভ্রম। দেখো না, আমাদের ক্যামেরায় তো অনেক ধরনের লেন্স থাকে। ফিশ আই থেকে শুরু করে ৩২, ৩৫, ৪০, ৫০, ৭৫, ১০০ এমনকি ২৫০ থেকে ৫০০ পর্যন্ত। যখন যেটা দরকার সেটাকে কাজে লাগাই। কিন্তু বাস্তব হল, মানুষের দৃষ্টির পরিধি কিন্তু মোটামুটি, ওই যাকে বলে ৫০ লেন্সের কাছাকাছি। এর এ পাশে-ও পাশে যাওয়ার স্বাধীনতা নেই। তার বেলায় কী বলবে? সুতরাং গোদা বাস্তব আর শিল্পের বাস্তবের মধ্যে তফাত আছে বইকি!

ক্রমশ

 

২৭ এপ্রিল ২০১৯ শিশির মঞ্চে সত্যজিৎ রায় সোসাইটি আয়োজিত ‘দ্য পেঙ্গুইন সত্যজিৎ রায় মেমোরিয়াল লেকচার’

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন