গ্রীষ্মের খরদহনের পর পুবালি হাওয়ায় আকাশে মেঘ জমেছে। শোনা যাচ্ছে দেয়ার ডাক। ঘন-ঘন বিদ্যুৎ-চমকে দিগন্ত উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে। চারিদিক থমথম করছে। তবুও মেঘ হতে জল ঝরছে না। সব শুকিয়ে গেল, পৃথিবী বন্ধ্যা হয়ে রইল। অথচ আদিত্য এসে পৌঁছেছেন উত্তরায়ণের চরমবিন্দুতে। প্রজ্ঞার অনুত্তর মহিমা— কিন্তু প্রাণ কই? কে তাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে?— বৃত্র। কে সে অবরোধ ভাঙবেন? বিদ্যুদ্দৃষ্টি রুদ্রিয় মরুদ্‌গণের সহায়ে পরমদেবতা ইন্দ্র।’’ (শ্রী অনির্বাণ, বেদমীমাংসা, তৃতীয় খণ্ড)

ঋগ্বেদের প্রধান দেবতা ইন্দ্র। একটি-দুটি নয়, আড়াইশোর বেশি কবিতায় (সূক্তে) তাঁর স্তুতি করা হয়েছে, যেখানে ঋগ্বেদের মোট কবিতার সংখ্যা ১০২৮। ইন্দ্রের যে-কীর্তির জন্যে সব থেকে বেশি বার তিনি স্তুত, তা হল বৃত্র বা অহিকে হত্যা করে পৃথিবীর বুকে জলধারাদের বইয়ে দেওয়া। ‘যো হত্বাহিমরিণাৎ সপ্ত সিন্ধূন্‌’ (ঋ ২/১২/২) – ‘যিনি অহিকে হত্যা করে সাতটি নদীকে বইয়ে দিয়েছিলেন।’ যে ইন্দ্র দেবতাদের রাজা হিসেবে মহাভারত বা পুরাণে পরিচিত, যাঁকে আমরা প্রধানত হরেক দুষ্কর্মের কর্তা বলে জানি, স্বভাব-চরিত্র যাঁর মোটেই সুবিধের নয়, সুযোগ পেলে যিনি তাঁর গুরুপত্নীকে পর্যন্ত ছাড়েন না, মুনি-ঋষিদের তপস্যা করতে দেখলেই যাঁর বুক দুরুদুরু— ‘এই রে, আমার ‘ইন্দ্র’ পদটা এ বার গেল বুঝি’, ছলে বলে কৌশলে দেবতাদের রাজা হয়ে থাকতে পারাটাই যাঁর প্রধান লক্ষ্য, তিনি কিন্তু ঋগ্বেদের অনন্য যোদ্ধাও। তিনিই শত্রুদের আটকে রাখা জলের ধারা উন্মুক্ত করে দিয়ে বাঁচান জলের অভাবে মরতে-বসা প্রাণিকুলকে। 

ইন্দ্রের অসংখ্য সাহসী কীর্তির স্তুতিতে মুখর বিশ্বের সর্বপ্রাচীন সাহিত্য ঋগ্বেদ। তবে সেই সমস্ত কীর্তির মধ্যে সব থেকে প্রধান তাঁর বৃত্রকে হত্যা করার কৃতিত্ব। কে এই বৃত্র? বিভিন্ন প্রাচীন কাহিনিসূত্র অনুযায়ী ইনি হলেন ত্বষ্টা নামে এক প্রজাপতির ছেলে। যে দেবতারা প্রাণীদের সৃষ্টি করেন, তাঁরাই হলেন প্রজাপতি। ইন্দ্রের ওপর বিশেষ রুষ্ট হয়ে ত্বষ্টা এক বার এক যজ্ঞ করলেন এমন একটি পুত্রের প্রার্থনায়, যে কিনা ইন্দ্রকে হত্যা করতে পারবে। কিন্তু তাঁর নিজেরই ভুলে সেই যজ্ঞের ফলে যে ছেলেটি জন্মাল, সে ইন্দ্রের হত্যাকারী তো হলই না, উল্টে ইন্দ্রই হলেন তার হত্যাকারী। এই কাহিনি জানিয়ে দেয়— বৃত্রকে ইন্দ্রের হাতেই মরতে হত, তা দৈবনির্দিষ্ট। এই বৃত্রকে ঋগ্বেদে বহু জায়গায় ‘অহি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অহি মানে যে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে, আটকে রাখে প্রাণসম্পদ। ‘বৃত্র’ মানেও প্রায় তাই, যে আবৃত করে রাখে, ঢেকে রাখে বিপুল জলের ধারাকে, সে-ই হল বৃত্র। এক কথায় বহুজনের শত্রুই হল বৃত্র— তার নানান নাম, নানান চেহারা। যে নিজের স্বার্থের জন্যে বঞ্চিত করে বহুজনকে, সে-ই বৃত্র। 

ইন্দ্রের বৃত্রবধের কাহিনি ইঙ্গিত করে অতি প্রাচীন এক সংঘর্ষের দিকে, যে সংঘর্ষের কেন্দ্রে ছিল জলের অধিকার নিয়ে লড়াই। যদিও বলে রাখা ভাল যে, ইন্দ্র-বৃত্র লড়াইকে যুগে যুগে ভিন্ন-ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন ঋগ্বেদের ভাষ্যকাররা। পুরাণ-অনুযায়ী এটি দেবাসুরের অনেক যুদ্ধের মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি যুদ্ধ, বৃত্রাসুরকে হত্যা করে ইন্দ্র দেবতাদের জিতিয়ে দিয়েছিলেন অসুরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতেরা আবার এই উপাখ্যানটিকে দেখেন বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির মধ্যে সংঘর্ষের রূপক হিসেবে। তাঁরা বলেন ঋগ্বেদের ইন্দ্র আসলে বৃষ্টির দেবতা আর অনাবৃষ্টিরূপী অসুর হল বৃত্র বা মেঘ, যে-তার বিপুল আয়তনের মধ্যে আটকে রাখে বৃষ্টির জলকে, ইন্দ্র তাঁর বজ্রের আঘাতে এই মেঘকে বিদীর্ণ করে মুক্ত করেন বৃষ্টিধারাকে, আর এ-কাজে তাঁর প্রধান সহায় হলেন মরুৎরা, যাঁরা আসলে ঝড়ের দেবতা। তাঁদের এই যুক্তি কিন্তু ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী নয়, কারণ বৈদিক যুগে ইন্দ্র তো বৃষ্টিরই দেবতা, নিরুক্তকার যাস্ক (আনুমানিক খ্রি.পূ. ৫০০ শতক) ইন্দ্রকে অন্তরিক্ষের দেবতা বলে মেনেছেন, যাঁর প্রধান কাজগুলির মধ্যে একটি হল ‘বর্ষকর্ম’ অর্থাৎ বৃষ্টি ঝরানো। বৃত্র শব্দটির অর্থও ‘আবরণকারী মেঘ’ হিসেবেই ধরেছেন যাস্ক। ঋগ্বেদের আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দেবার যাঁরা পক্ষপাতী সেই শ্রী অরবিন্দ, শ্রী অনির্বাণ বা দয়ানন্দ সরস্বতীর মতে ইন্দ্র হলেন আমাদের সর্বোচ্চ চেতনা। আমাদের আধ্যাত্মিক উত্তরণের পথে যা-কিছু বাধা, তা-ই হল বৃত্র বা অহি, আমাদের নিজেদের মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকা নানা ক্ষুদ্রতা। পরম চৈতন্যরূপী ইন্দ্র তাঁর বজ্রাঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দেন সেই সব ক্ষুদ্রতার আবরণকে, মুক্ত করেন পরম আনন্দের মহা স্রোতোধারাকে। 

এই চমৎকার ব্যাখ্যাগুলি ছাড়াও ইন্দ্রের বৃত্রবধের উপাখ্যানকে দেখা যেতেই পারে অতি প্রাচীন ইন্দো-ইরানীয় জাতির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব হিসেবে। যে-দেবতারা ভারতীয় পুরাণে শুভশক্তির প্রতীক, তাঁরাই কিন্তু পড়শি ইরানের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আবেস্তায় ‘দএব’ নামের অশুভশক্তি। ভারতীয় ধারায় অসুররা যদিও অশুভশক্তি, কিন্তু আবেস্তায় সর্বোচ্চ শুভশক্তি হলেন ‘অহুর মাজদা’, বৈদিক অসুর শব্দটির আবেস্তীয় রূপ হল অহুর। মজার ব্যাপার এই যে, দুই জায়গাতেই কিন্তু দেব এবং অসুরদের জন্ম একই উৎস থেকে হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে; এমনকি বেদের প্রাচীন অংশে সব দেবতাদের এক অসুরত্বের কথাও বলা আছে—‘মহদ্দেবানাম্‌ অসুরত্বম্‌ একম্‌’— দেবতাদের মহান অসুরত্ব একটিই। ‘অসুর’ শব্দটির প্রাচীন অর্থ কিন্তু ‘আলো ঝলমল’ বা ‘সপ্রাণ’, যা দেবশব্দের প্রায় সমার্থক। এটি ইঙ্গিত করছে— অতি প্রাচীন কালে দেব ও অসুররা ছিলেন একই গোষ্ঠীভুক্ত, অতি প্রাচীন কাল থেকেই নানান জিনিস নিয়ে তাঁদের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব শুরু হয়, যার মধ্যে একটি প্রধান বিষয় ছিল জলের অধিকার। বৈদিক আর্যদের যাঁরা প্রধান বীর, দেবতা স্থলাভিষিক্ত, তাঁরাই আবেস্তায় ভিলেন; যেমন ইন্দ্র, নাসত্য (অশ্বী দেবতারা) বেদের গুরুত্বপূর্ণ দেবতা হলেও আবেস্তায় নিন্দিত। এই দুই পড়শি দেশের পুরাণ যেন একে অপরের কাউন্টার ন্যারেটিভ। 

এ বার আসা যাক ইন্দ্রের জল-দস্যুদের বাধা দেওয়ার কাহিনিতে। বৃত্র ছাড়াও ইন্দ্র বধ করেছিলেন জল আটকে রাখা শম্বর, নমুচি, পিপ্রু, শুষ্ণ, উরণ এমন অনেক দানবকে। বলা বাহুল্য, এই কাহিনিগুলি ঋগ্বেদে সংগৃহীত হয়েছিল তৎকালে প্রচলিত লোকগাথা থেকে, সেগুলি তখনকার মানুষের এত বেশি জানা গল্প যে, তাদের উল্লেখমাত্রই যথেষ্ট ছিল ঋগ্বেদের কবির কাছে। তার ফলে এই গল্পগুলোর বিশদ ইতিবৃত্ত অন্তত ঋগ্বেদ বা সমকালীন সাহিত্য থেকে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এই কাহিনিগুলি পরম্পরাক্রমে সমাজে প্রচলিত ছিল, এবং নানা পরিবর্তন, অতিরঞ্জনের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে পরবর্তী কালে তারা পুরাণ-সাহিত্যে স্থান পেয়েছে, হয়তো বা একেবারে ভিন্ন ভাবে। কিন্তু, এই কাহিনিগুলির বেশির ভাগেরই মধ্যে খুব গুরুত্ব পেয়েছে ইন্দ্রের বৃত্র বা অহি এবং আরও কিছু অসুরকে পরাজিত করে জলস্রোত উন্মুক্ত করে দেওয়ার ঘটনাটি। ব্যাপারটি ভেবে দেখার মতো।

অহিকে হত্যা করে সাতটি নদীর মুক্তধারা বইয়ে দিয়েছিলেন ইন্দ্র, এ উল্লেখ আগেই করেছি। এই সাত নদী কারা? প্রাচীন ভাষ্যকারদের মতে এই সাত নদীর উল্লেখ আছে ঋগ্বেদেরই নদীসূক্তে (১০।৭৫।৫), যেখানে প্রধান নদীগুলির মধ্যে প্রথম সাতটি হিসেবে নাম আছে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, শুতুদ্রী, পরুষ্ণী, অসিক্‌নী, মরুদ্বৃধার। আধুনিক পণ্ডিতরা অবশ্য অনেকেই মনে করেন এই সাতটি নদীর মধ্যে আছে পঞ্জাবের পাঁচটি নদী— বিতস্তা (ঝিলম), অসিক্‌নী (বর্তমান চন্দ্রভাগা বা চেনাব), পরুষ্ণী (পরবর্তী কালে ইরাবতী বা রাভী), বিপাশ্‌ (বিপাশা বা বিয়াস), শুতুদ্রী (শতদ্রু বা সাটলেজ), সিন্ধু এবং সরস্বতী (কেউ কেউ সরস্বতীর জায়গায় কুভা বা কাবুল নদীকে রাখতে চান)।

ঋগ্বেদে বলা আছে, ‘বৃত্রের গহনে গহনে (এখন) বিচরণ করছে জলেরা। দীর্ঘ অন্ধকারে শুয়ে পড়ল ইন্দ্রশত্রু’— বৃত্রস্য নিণ্যং বি চরন্ত্যা’পো দীর্ঘং তমঃ আ শয়দ্‌ ইন্দ্রশত্রুঃ (১।৩২।১০); ‘ওই দাসের আধিপত্য মেনে, অহির পাহারায় এত ক্ষণ নিরুদ্ধ ছিল জলেরা... জলেদের যে গহ্বর ঢাকা ছিল, বৃত্রকে বধ করে তা উন্মুক্ত করলেন ইন্দ্র’। ঋগ্বেদের অনেক মন্ত্রে বৃত্রকে জল-অবরোধকারী বলে উল্লেখ করা হয়েছে (৬।২০।২, ৪।১৯।২ ইত্যাদি)। ইন্দ্রের সেই জলধারা মুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে বহু মন্ত্রে। 

শুধু বৃত্র বা অহি-ই নয়, অনাবৃষ্টির জন্যে দায়ী শুষ্ণ (যে সব কিছু শুকিয়ে দেয়, জল টেনে নেয়) নামে অসুরকে হত্যা করার কাজে ইন্দ্র সাহায্য করেছিলেন কৌৎসকে। বৃহস্পতির গোরুগুলি চুরি করে এনে পণিরা লুকিয়ে রেখেছিল বল নামে অসুরের খোঁয়াড়ে, ইন্দ্র জলধারার মতোই মুক্ত করেছিলেন সেই গাভীদের (২।১২।৩)। চোদ্দো বছরের চেষ্টায় শম্বর নামে অসুরের ৯৯টি দুর্গ ভেঙে ইন্দ্র উন্মুক্ত করেছিলেন তার লুকনো সম্পদ (২।১২।১১, ৪।৩০।১৪)। 

শেষ পর্যন্ত এ কথাটা মনে হওয়া দোষের নয় যে, অতি প্রাচীন কোনও জল-বিবাদের প্রসঙ্গ লুকিয়ে আছে ইন্দ্রের এই অসুরবধের বৃত্তান্তগুলিতে। ঋগ্বেদের বৈদেশিক ব্যাখ্যাকাররা যতই এই বিবাদকে প্রাকৃতিক শক্তির সংঘর্ষের রূপক বলে তকমা এঁটে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করুন না কেন, তাঁদের মধ্যেই কেউ কেউ, যেমন ওল্ডেনবার্গ ‘দি রিলিজিয়ন অব দ্য বেদা’ গ্রন্থে বলেছেন ঋগ্বেদের বৃত্রবধের কাহিনির পাহাড় আর নদীগুলিকে শুধুই প্রতীক আর কাল্পনিক বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, ঋগ্বেদের কবির কাছে সেগুলি এই পৃথিবীরই। আর নদীগুলি যদি সত্যিকারের হয় তবে তাদের জল আটকে রাখা লোকেরাও সত্যি, আর ইন্দ্রের মতো জাতীয় বীরের সেই জল মুক্ত করার যুদ্ধের কাহিনিও সত্যি। বিশ্ব উষ্ণায়নের আবহে আমরাও আজ ইন্দ্রকে ডাকছি, যে-জল প্রকৃতির দেওয়া প্রতিটি প্রাণের জন্যে নিঃশর্ত উপহার, তাকে মুক্ত করতে।