পূর্বানুবৃত্তি: স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে অরুণ। অভিরূপের সঙ্গে দেখা করতে হাসপাতালে যায় সে। সকালে রোগী দেখার সময় চেম্বারে হঠাৎ অরুণকে দেখে বেশ অবাক হয় অভিরূপ। এই সময় তো ঠিক গল্প করার নয়। ভুল ভাঙে অভিরূপের। আড্ডা নয়, অন্য কারণে অরুণের আগমন। তিয়াষার সঙ্গে অভিরূপ যে দূরত্ব তৈরি করেছিল তাকে ‘ঠকানো’ তকমা দিয়ে সরাসরি তাকে অভিযোগ করে অরুণ। অভিরূপ জানায়, তার স্ত্রী চুমকি বিচ্ছেদ দেবে না। তা ছাড়া নতুন করে সে আইনি ঝামেলায় পড়তে চায়নি। তাই সরে এসেছে তিয়াষার কাছ থেকে।

 

আরে বাহ... তোমার গায়ে এত লাগছে কেন অরুণ? আর অতই লাগছে তো ট্রাই ফর হার... তিয়াষা তো তোমারও খুবই পছন্দের বলেছিলে,’’ আলগা হাসে অভিরূপ।
হাসিটা অরুণের মুখে প্রসারিত হয়ে ভারী হয়ে যায়। বুজে আসা গলায় অরুণ বলে, “সেই পথটা আর আমার জন্য থাকল কোথায়? তুমি সে রাস্তা রাখোনি।’’ হাতের ফাইল থেকে দুটো ছবি বার করে অভিরূপের সামনে টেবিলের দামি কাটগ্লাসের উপরে রাখে অরুণ। ছবিতে দেখা যাচ্ছে লাইফ ডেলি-র অফিসের সামনের ফুটপাতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে তিয়াষার রক্তাক্ত শরীর। মহান মৃত্যু এসে ধূসর রঙের শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে দিয়ে যাচ্ছে মেয়েটার বিশ্বাসভঙ্গের অপমান, লাঞ্ছনা। সে দিন শিমরনের সঙ্গে অফিসে গিয়ে আর ফেরেনি তিয়াষা। অফিস বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে দু’হাত বাড়িয়ে, শরীর ভাসিয়ে ছুঁতে চেয়েছিল হঠাৎ মিথ্যে হয়ে যাওয়া ভালবাসার গ্যাস বেলুনটা। 
স্তম্ভিত অভিরূপ হতবাক দাঁড়িয়ে থাকে ছবি দুটোর দিকে তাকিয়ে। ওর কাঁপা কাঁপা ঠোঁট থেকে শুধু বেরিয়ে আসে কয়েকটা ভাঙাচোরা শব্দ, 
“আই ফেইলড ...আই ফেইলড...আমি ব্যর্থ হয়ে গেলাম অরুণ।’’
“জানতে না? আমি জানি তুমি জানতে না। মাত্র গত পরশুই তো ঘটেছে। তুমি মানি-মেকিং মেশিন হয়ে গিয়েছ অভিরূপ, নইলে জানতে পারতে,’’ অরুণ টেবিলের উপর মাথা রেখে নিজেকে সামলায়। তার পর উঠে দাঁড়ায়। পরিষ্কার করে নেয় আওয়াজ। এগিয়ে আসে অভিরূপের দিকে, “আমি তোমার বিরাট ভক্ত ছিলাম। তোমাকে বাঁচানোর জন্য আমিই এগিয়ে এসেছিলাম গত বার। কিন্তু যা তুমি করেছ তিয়াষার সঙ্গে, তোমাকে শাস্তিটাও এ বার আমিই দেব। আমি তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব। চলো, তৈরি হয়ে নাও।’’
স্থির চোখে তাকিয়ে থাকে অভিরূপ, একটুও চমকায় না, জানতেও চায় না কিসের অভিযোগ। যেন অরুণের এই প্রতিক্রিয়া, এই অভিযোগ, সবই কোনও চিত্রনাট্যের অংশ।

“বাই পাস পি এস থ্রিফর্টিটু বাই এইটিন আন্ডার সেকশন থ্রি হান্ড্রেড সিক্স আই পি সি— আমরা আপনাকে অ্যারেস্ট করতে বাধ্য হচ্ছি ডক্টর মুখার্জি। চলুন,’’ ঘরের মধ্যে কখন ঢুকে এসেছে ইন্সপেক্টর শতপথী এবং তাঁর ফোর্স। 
হাসপাতালের সুস্থিতির কথা চিন্তা করে পুলিশ পার্সোনেল সবাই প্লেন ড্রেসে এসেছিলেন। বাইরের রিসেপশন জুড়ে জড়ো হয়ে থাকা অজস্র রোগীর চোখের সামনে দিয়ে একটা ছোটখাটো দল অভিরূপকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকে করিডোর ধরে। বিভিন্ন ওয়ার্ডে চলেছে ব্যস্ত দিনের বিবিধ কর্মকাণ্ড। কেউ বুঝতেই পারে না কী ভাবে ইন্দ্রপতন ঘটে যাচ্ছে। শুধু কয়েক জন অপেক্ষমাণ রোগী অঞ্জলির কাছে ছুটে গিয়ে অনুযোগ জানায়, “সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করছি। কিন্তু দিদি, ডক্টর মুখার্জি তো চলে গেলেন কোথায়।’’
অঞ্জলি তার সহজাত চাতুর্য দিয়ে শান্ত করে অধৈর্য রোগীদের, ‘‘আরে উনি এক বার ওটি-তে গেলেন। এখনই আসবেন। আপনি বসুন, আমি ঠিক ডেকে নেব।’’
অভিরূপের মুখ দেখে মনের ভাব বোঝা যায় না। চারপাশের এত জন মানুষ ঘুণাক্ষরেও ছুঁতে পারে না তার কঠিন চোয়ালের তলায় প্রবল আন্দোলন সৃষ্টিকারী ভাঙা হৃদয়ের টুকরো। গাড়িতে ওঠার আগে একটাই কথা বলে অভিরূপ, “মিস্টার শতপথী, গিভ মি ফাইভ মিনিটস প্লিজ়, ওয়ান ফোন কল...’’ বাধা না দিয়ে কিছু দূরে সরে দাঁড়ায় শতপথী, অরুণ এবং অন্যান্যরা। 
কাঁপা কাঁপা আঙুলে মোবাইলে পিয়াসের নম্বর ডায়াল করে অভিরূপ। বেজে যাওয়া মোবাইল ও পাশ থেকে কেউ তুলছে না। এই ভরদুপুরে কার্শিয়াং পাহাড়ের মেন্টাল অ্যাসাইলামে অমন একটা সিরিয়াস পেশেন্টের ঘরে কোনও অ্যাটেন্ড্যান্ট নেই? আশ্চর্য! নিজের ফিল্ডের লোকজনেদের অপেশাদারিত্বে এই রকম চরম পরিস্থিতির মধ্যেও কপালে ভাঁজ পড়ে অভিরূপের। কিন্তু পিয়াসকে যে এই খবরটা না দিলেই নয় যে এখন আর বহু দিনের মধ্যে তাকে দেওয়া কথা রাখতে পারবে না, যত দিন না আবার নতুন জন্ম নিয়ে ফিরে আসছে তিয়াষা। অবশ্য যদি সত্যিই পরজন্ম বলে কিছু থাকে! আত্মবিশ্বাসী অভিরূপের ভিতর থেকে সমস্ত ব্যক্তিত্বের আবরণ তছনছ করে আছড়ে পড়ে দীর্ঘনিঃশ্বাসের মরুঝড়। কিন্তু এই পরিবর্তন বুঝে উঠতে পারে না দু’হাত দূরে দাঁড়ানো মানুষগুলো। 
ট্রাই, ট্রাই অ্যান্ড ট্রাই। অভিরূপ মোবাইল টিপেই যেতে থাকে। সেই রাতে ওর কাছে পাগলের মতো ছুটে আসা পিয়াস, পিয়াসের অবুঝ কান্না, বারে বারে নিজেকে শেষ করে দিতে চাওয়া, সব মিলিয়ে ক্রমশ হারিয়ে ফেলতে বসা মানসিক স্থিতি— সব কিছুর জন্য নিজেকে দায়ী করে অভিরূপ সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেনি। নিজের আনন্দের চেয়েও ডাক্তার অভিরূপ মুখার্জির কাছে অনেক বেশি ছিল যে কোনও মানুষের প্রাণ। সে বুঝেছিল, তিয়াষার মধ্যেই আছে পিয়াসের আগামী জীবনের বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ। অভিরূপের ব্যক্তিগত জীবন অন্ধকার ছিল, সে পারবে সেই অন্ধকার বুকে নিয়ে বেঁচে থাকতে। শুধুমাত্র মানুষের জন্য সে আগেও বেঁচেছে, পরেও বাঁচতে পারবে। কিন্তু পিয়াস পারবে না তিয়াষাকে ছাড়া এক দিনও স্বাভাবিক থাকতে। তার বুকের ভিতরে ভালবাসার ডালপালা এতটাই ছড়ানো। প্রায় অসংলগ্ন পিয়াসকে নিজের উদ্যোগে কার্শিয়াং পাঠিয়েছিল সে চিকিৎসার জন্য। আর সেই সঙ্গে একটু একটু করে তিয়াষার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতেও শুরু করেছিল। প্রতিদিন প্রতি মূহূর্তে বুকের মধ্যে কাঁটাছেঁড়া হয়নি কি? তীব্র আগুন শলাকা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়নি তিয়াষার প্রতিটি আকুল ডাক উপেক্ষা করার মুহূর্তে? হয়েছে। বুকের রক্ত লুকিয়ে অপটু অভিনয় করতে করতে যত বেশি রক্তাক্ত হয়েছে অভিরূপ, তত বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছে অভিনয়ে। একটাই আশা নিয়ে, তিয়াষা আঘাত পেতে পেতে এক সময় ফিরে যাবে পিয়াসের কাছে। কিন্তু যত দক্ষ ও নামী ডাক্তারই হোক সে, দেখা গেল, এই ক্ষেত্রে তার ডায়াগনোসিস ভুল প্রতিপন্ন করে দিয়ে গেল তিয়াষা। এই ভুলের বোঝা নিয়ে তো গত দু’দিন ধরে অপেক্ষাতেই ছিল অভিরূপ, কখন নেমে আসবে শাস্তির খাঁড়া। এই বিশাল পৃথিবীতে কেউ না জানুক, অভিরূপ তো জানে, এই শাস্তিটা এ জীবনের জন্য কত জরুরি তার কাছে। বাকি দিনগুলো লক-আপের দেওয়ালে দেওয়ালেই না হয় লেখা হবে তার আর তিয়াষার অসমাপ্ত প্রেমের গল্পটা। সেই গল্প, যেখানে শুরুর পাতায় মৃত্যুর আগের মুহূর্তে রঙিন বাবলে আঁকা প্রেমের বন্যায় ভাসতে চেয়েছিল একটা মেয়ে। সময় বিশেষে অভিরূপ জানে কী ভাবে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। চুমকির সঙ্গে দিনের পর দিন অশান্তির পরেও সে শান্ত মন নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোগী দেখেছে। আজও তিয়াষার কথা ক্ষণিকের জন্য সরিয়ে রেখে অভিরূপ মনে করল, তিয়াষার মৃত্যুর খবরটা পিয়াসকে জানানো দরকার। ফোনে না পেলে, অন্তত ওর বাড়ির ঠিকানাটা জানানো দরকার কর্তৃপক্ষকে, যাতে ট্রিটমেন্টটা বন্ধ না হয়। ফোনটা বারে বারে ট্রাই করেই যেতে থাকে অভিরূপ। বেশ অনেকটা সময় হয়ে গিয়েছে। শতপথী এগিয়ে আসে, “স্যরি, ডক্টর মুখার্জি, উই আর গেটিং লেট, এ বার তো যেতে হয়।’’ 
সত্যিই পুরনো সম্পর্কের খাতিরে অনেকটাই সময় দিয়েছে সে। বিফলমনোরথ অভিরূপ মোবাইল ঢুকিয়ে রাখে পকেটে। মাথা নেড়ে বলে, “চলুন।’’

সাদা একটা বড় গাড়ি বেরিয়ে যায় হাসপাতাল থেকে। তাদের সব চেয়ে নামী ও দামি, জনপ্রিয় ডাক্তারটিকে সঙ্গে নিয়ে। 
তিয়াষার অভিমানী আত্মা, যদি আত্মা বলে কিছু সত্যিই থেকে থাকে, সে তার সবচেয়ে ভালবাসার মানুষের এই পরিক্রমণে খুশি হল কি না বোঝা যায় না। শুধু অনেক দূর থেকে ভেসে ভেসে আসে উদ্দালকের বেহালার চোখ-ফাটা সুর। আজ আর সে মিউজ়িকাল কর্নারে নেই। আবার কোথা থেকে ছেঁড়া ঝুলঝুলি প্যান্ট-জামাটা জোগাড় করে পরে ফেলেছে। আবার গিয়ে ঠেস দিয়ে বসেছে হাসপাতালের গেটে। রাতে নয়, আজ সে বেলাতেই বসে পড়েছে তার বাজনা নিয়ে। বোধহয় উদ্দালক মনের ভিতর টের পেয়েইছিল, অনেক উপরে রাখা মানুষটা আজ পথের ধুলোয় নেমে আসবে। অভিরূপ যে উদ্দালকশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে হাসপাতালের মিউজ়িশিয়ান অ্যাপয়েন্ট করেছিলেন, সে নয়, কোন এক শঙ্কাপাগলা এই মুহূর্তটাকে সেলিব্রেট করতে চায় তার বেহালার উদ্দাম ছড় টেনে টেনে। তার মাথার ভিতর সাজিয়ে রাখা মানুষ বিষয়ক রিসার্চ পেপারগুলো বেহালার সুরে সুরে উড়িয়ে উড়িয়ে সে পৌঁছে দিতে চায় আকাশময় ছড়িয়ে থাকা কোনও ব্যথাভরা অশ্রুসজল দু’খানা ব্যাকুল চোখের কাছে, যে চোখের অশরীরী দৃষ্টি বুঝি এখনও শুধু অভিরূপকেই খুঁজে ফিরছে। 

(সমাপ্ত)