পূর্বানুবৃত্তি: তিয়াষা তার সহকর্মী শিমরনকে জানায়, কেস থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে ডাক্তার অভিরূপ নিজেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে তিয়াষার কাছ থেকে। ডাক্তার অভিরূপের এই দূরে সরে যাওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে অবসাদে ডুবে যায় তিয়াষা। তাকে আবার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করে শিমরন। তাকে অফিসে নিয়ে যেতে চায় সে। তিয়াষাও মেনে নেয় শিমরনের কথা। এ দিকে ডাক্তার অরুণের স্ত্রী বিপাশা সন্দেহ করে, তার স্বামীর সঙ্গে অন্য কারও সম্পর্ক আছে। 

কলহ শুরু হয় তাদের মধ্যে।  

 

এবার অরুণ শান্ত চোখে তাকিয়ে বলে, ‘‘শোনো বিপাশা, তোমার যা ভাবার ভাবতে পারো, আমার কিচ্ছু এসে যায় না... তোমার কোনও প্রশ্নের উত্তর দেব না।’’

অরুণ বরাবর নির্বিবাদী ভাল মানুষ। তার জেদ আছে কিন্তু তা কাজের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ, আজ পর্যন্ত প্রতি পদেই সে তার স্ত্রী ডাক্তার বিপাশা সাহার সঙ্গে সন্ধি করেই চলতে চেয়েছে, বাঁচিয়ে চলতে চেয়েছে তার সংসার, তার সামাজিক সম্ভ্রম। আর সেই কারণে‌ সারাক্ষণ তাকে সহ্য করে যেতে হয়েছে অনন্ত অপমান। আর এ যাবৎ বিপাশা অরুণের ভালমানুষির সুযোগ নিয়ে এসেছে। কিন্তু বিপরীতে আজ পর্যন্ত কখনও অরুণের কাছ থেকে এই ভঙ্গিতে উত্তর পায়নি। এ রকম ডেয়ারিং অরুণকে বিপাশা চেনেই না। ও হাঁ করে তাকিয়ে থাকে অপরিচিত হয়ে ওঠা চেনা মানুষটির দিকে। সে দিকে এক বারও না তাকিয়ে বাজতে থাকা মোবাইল কানে চেপে অরুণ বলে, “কামিং। ইউ গেট রেডি। আমি তুলে নিচ্ছি। আমরা এক সঙ্গেই যাব... হ্যাঁ... ওক্কে... ওখানেই থাক... গিভ মি হাফ অ্যান আওয়ার...’’  

ড্রয়্যার থেকে গাড়ির চাবিটা নিয়ে সদর দরজার বাইরে পা রাখে অরুণ। পিছন থেকে নিজের জমি ধরে রাখতে চেয়ে আরও এক বার কুৎসিত ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে ওঠে বিপাশা, “নষ্টামি করার জায়গা পাওনি? কোথায় যাচ্ছ? কার সঙ্গে যাচ্ছ? দেখবে, তোমায় কেমন ডাউন করতে পারি সোসাইটিতে?’’

বাড়ানো পা থামিয়ে ফিরে তাকায় অরুণ। বিপাশার চোখে চোখ রেখে নিষ্ঠুর ভাবে হাসে, “সে তুমি পারো। আমি জানি। কিন্তু এখন এ সব আর আমার ভাবায় না। ডু হোয়াটএভার ইউ লাইক টু ডু... আই জাস্ট ডোন্ট বদার।’’ স্তম্ভিত দাঁড়িয়ে থাকা বিপাশার কানের পর্দায় অরুণের গাড়ির আওয়াজ ঘা মেরে মেরে গড়িয়ে যায় অনেকটা দূরে। বেলা তখন দুটো। 

অভিরূপের পেশেন্ট এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি। কার্ডিয়োলজিতে এলে সকলেই এক বার অন্তত অভিরূপকে না দেখিয়ে যেতে চায় না। স্বাভাবিক ভাবেই কাজের চাপ অনেক বেড়ে গিয়েছে। আজও সকাল থেকে উন্মুখ প্রতীক্ষায় আশি জন পেশেন্ট বসে আছে অভিরূপের অপেক্ষায়। আগে এক জন প্রাইভেট সেক্রেটারি ছিলই, এখন আরও দু’জন এক্সট্রা ডিউটি করছে। তিন জন লোক মিলেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। 

চেম্বারের দরজার কাছে দশ-বারো জন পেশেন্টের সঙ্গে কথা বলছিল অঞ্জলি। কথা মানে তাদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিজের জায়গায় ফেরত পাঠানোর চেষ্টা। অনেকেরই ধারণা, চেম্বারের দরজার কাছে এসে দাঁড়াতে পারলেই আগে আগে ঢুকে পড়া যাবে। সেটা যে হয় না, সবাইকেই যে সিরিয়ালি যেতে হবে, এটাই বোঝানোর ব্যাপার। ভিড়টাকে পাশ কাটিয়ে চেম্বারের দরজা ঠেলে ঢুকতে যায় অরুণ। হাঁ-হাঁ করে ওঠে অঞ্জলি, “স্যর পেশেন্ট দেখছেন, আপনি প্লিজ় ভিতরে যাবেন না।’’

“আই হ্যাভ টু...আমি ডক্টর অরুণ সাহা,” কথা ক’টা ছুড়ে দিয়ে, মেয়েটাকে আর একটাও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দরজা খুলে সটান ভিতরে ঢুকে পড়ে অরুণ। ভিতরের পেশেন্টটি বেরিয়েই আসছিল। অরুণকে দেখে রোগীর সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারও উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে।

“অরুণ! কী ব্যাপার... তুমি হঠাৎ?” অভিরূপ অবাক। এই টাইমটা কখনওই কোনও ডাক্তারের আড্ডা দেওয়ার সময় নয়। অরুণও যথেষ্ট ব্যস্ত ডাক্তার। অঞ্জলি উঁকি মারে বাইরে থেকে। সে অরুণ সাহাকে চেনে না। নিজের চাকরিটা অক্ষত রাখাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। দুম করে বাইরের এক জনের ঢুকে পড়াটা অভিরূপ ভাল মনে নেবেন না। মিনমিন করে সে বক্তব্য পেশ করতে যায়, “আমি... ওঁকে বারণ করেছিলাম স্যর... উনি না শুনেই...’’

মাঝপথেই হাত নাড়ে অভিরূপ, “তুমি যাও অঞ্জলি, এখন কাউকে পাঠাবে না, হোল্ড করো।’’  তার পর অরুণের দিকে ফিরে চওড়া হাসে, “হোয়াট আ সারপ্রাইজ়... হঠাৎ তুমি?”

“কেন? অবাক হচ্ছ?’’

“তা একটু অবাক হলাম বইকি...আসোনি তো কখনও, তাও আবার এ রকম অসময়ে, অজায়গায়। আমরা অন্য কোথাও মিট করতে পারতাম।’’

“অজায়গা! কেন? এটাই তো তোমার পক্ষে সব চেয়ে ভাল জায়গা। এই জায়গাটা ধরে রাখতে তুমি কত কী করেছ... কত ত্যাগ স্বীকার!’’

“স্যরি? বুঝলাম না,’’ কথাটা বলে অভিরূপ হাই ব্যাক স্ল্যান্টিং চেয়ারে গা ঢেলে আয়েস করে বসে। মুখে সফল প্রফেশনালের পরিতৃপ্ত হাসি, “যাকগে ছাড়ো ও সব। কফি খাও। তার পর বলো কাকে দেখতে হবে? কোনও রিলেটিভ? না কি তোমার নিজেরই কিছু...”

“তিয়াষাকে এ ভাবে ঠকালে কেন অভিরূপ? কী অন্যায় করেছিল সে?’’

আচমকা প্রসঙ্গ পরিবর্তনজনিত চমক সুনিপুণ ভাবে ঢাকা দেয় অভিরূপ। হয়তো ঢাকা দেয় আরও কোনও সুনিবিড় প্রকাশোন্মুখ অভিব্যক্তি। ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকে সামনে বসা মানুষটির দিকে। চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তার পর বলে, “নিজেকে ছাড়া কাউকে আমি ঠকাইনি অরুণ।”

“লায়ার!” চাপা তীব্র গলায় প্রায় ধমকে ওঠে অরুণ, “লায়ার ইউ আর... যত ক্ষণ দরকার ছিল তুমি ওকে ব্যবহার করেছ। তার পর বেল পাওয়ার মুহূর্ত থেকেই ও তোমার কাছে বোঝা হয়ে গিয়েছিল। তুমি নিজেকে সরিয়ে নিয়েছ। সামান্য খবর রাখার কার্টসিটাও দেখাওনি। মেয়েটার কী হল, কেমন আছে... আর... এখনও...’’

“দাঁড়াও দাঁড়াও ...তুমি তো আমাকে একের পর এক দোষারোপ করে যাচ্ছ। অপমান করছ,’’ বলতে বলতে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায় অভিরূপ। খানিকটা পায়চারি করে ঘরের মধ্যে।

“ইউ ডিজ়ার্ভ ইট। আমার প্রশ্নের উত্তর দাও,” অরুণ হিসহিস করে বলে। সে দিকে তাকিয়ে একটু হেসে দু’কাঁধ ঝাঁকিয়ে নিরূপায় ভঙ্গি করে অভিরূপ, “হ্যাঁ এটা ঠিক যে আমি আর ওর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারলাম না। আই মিন, রাখা গেল না। দো আই ট্রায়েড। চুমকি আমাকে ডিভোর্স দেবে না, পরিষ্কার বলেই দিল। আমার সোশ্যাল স্টেটাসটা চুমকি ছাড়তে চায়নি। আমি ভেবে দেখলাম আবার সেই মামলা, কোর্ট। এ সবে ঢুকলে কারওই কোনও লাভ নেই। আফটার অল আমি ডাক্তার। শান্তিতে নিজের কাজটুকু করতে পারলে আর বেশি কী চাই। শি ইজ আ প্রমিসিং রিপোর্টার, দু’দিনেই আমায় ভুলে যাবে। তা ছাড়া আমার তো একটা সোশ্যাল ডিগনিটিও আছে। এ সব লিভিং টুগেদার আমাকে মানায় না। চুমকিও বড্ড ঝামেলা করছিল। আমার  সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে ভীষণ প্রভাব ফেলছিল। তাই আমি সরে এলাম।’’

“তাই বেল আউট হওয়ার মুহূর্ত থেকে তুমি সরে এলে? তার আগে চুমকি ঝামেলা করেনি? বাহ, চমৎকার।’’ অরুণ হেসে ওঠে হাততালি দিয়ে, ‘‘তুমি তিয়াষাকে ভালবাসনি এক দিনও? সত্যি করে 

বলো তো?”

“কী মুশকিল! ভালবাসা মানে তো নিজেকে শেষ করে দেওয়া নয়।”

অদ্ভুত ভাবে হাসে অরুণ, “তোমার কাছে তা নয়, কিন্তু কারও কারও কাছে হয়তো ভালবাসা মানে সত্যিই নিজেকে শেষ করে দেওয়া।’’

জানালার কাছে পিছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকে অভিরূপ। দু’পকেটে হাত ঢোকানো। কিছু চিন্তা করছে। ধীরে ধীরে একটা একটা করে শব্দ বোধহয় নিজের উদ্দেশেই ছুড়ে ছুড়ে দেয়, “তোমাকে লুকোব না অরুণ। তিয়াষার মধ্যে আগুন আছে, যাতে আমিও পুড়েছি। কিন্তু অনেক ভেবে দেখলাম, আমার কাছে বোধহয় আমার কেরিয়ারের আগে আর কিচ্ছু নেই। তুমি আমাকে স্বার্থপর ভাবতেই পারো, কিন্তু নাথিং ডুইং... আমি এই রকমই।”

অরুণ অশান্ত হয়ে থামিয়ে দেয় অভিরূপকে, ‘‘তিয়াষার জন্য তোমার কেরিয়ারের ক্ষতি হচ্ছিল! বরং ওর জন্যই তুমি ক্লিন বেরোতে পেরেছিলে। ভুলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে? ছিঃ ছিঃ...শেম অন ইউ।”

“নাহ...ভুলিনি। কিন্তু চুমকি, আমি জানতে পেরেছিলাম... শি ওয়জ় নট গোয়িং টু স্পেয়ার মি। আবার সেই কোর্ট... চিন্তা... অশান্তি... উফফ...হরিব্‌ল! আমার এত দিনের স্টেটাস... পোজ়িশন... এভরিথিং ওয়জ় টু বি রুইনড। আর তিয়াষাও কেরিয়ারিস্ট মেয়ে, ও নিশ্চয়ই বুঝবে, আস্তে আস্তে সব ভুলেও যাবে।” নিজের দিকটা সাধ্য মতো ব্যাখ্যা করতে পেরে যেন হালকা শোনায় অভিরূপের গলা। কিন্তু পরমূহূর্তেই অরুণের কথায় বদলে যায় সেই সাময়িক সুস্থিতি। 

“আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, ডাক্তার তুমি যতই ভাল হও, মানুষ তুমি অতি নিকৃষ্ট।’’

“এ বার কিন্তু তুমি বাড়াবাড়ি করছ অরুণ। এগুলো আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তুমি আমার বন্ধু বলে উত্তর দিচ্ছিলাম। কিন্তু আর সহ্য করব না।’’ 

“তুমি একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিয়েছ অভিরূপ। তুমি খুন করেছ। তুমি খুনি!’’

ক্রমশ