বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে এ রাজার পুরী। তবে এ রাজ্যের সবাই জানে এ রাজপুরী নয়। বিষবৈদ্যের বাড়ি। এ পুরীর ভেতরে মস্ত বড় বাগান। বাগানে কত রকম গাছ। সেই সব গাছের কত গুণ। কোন রোগ করলে কী গাছ কাজে লাগে তা সবই জানেন বৈদ্য। আর তাঁরই অধিগত সেই মহাজ্ঞান। সাপের দংশনে যখন নীল হয়ে আসে শরীর, প্রাণ যখন যাই যাই, চেতনা যখন ক্রমশ ডুবে যায় অজ্ঞানে. সেই অন্তিম মুহূর্তেও ভেষজের বাঁধনে মানুষকে আবার জ্ঞানে ফিরিয়ে আনতে পারেন মহাজ্ঞানী বিষবৈদ্য। জ্ঞানের সাধনা তাঁর, জ্ঞান  ফিরিয়ে দেওয়ার সাধনা। এত বড় পুরীতে একাকী থাকেন তিনি। তাঁর বিত্ত আছে বিলাস নেই, বৈভব আছে বাসনা নেই। শুধু একটাই বেদনা তাঁকে মাঝে মাঝে গ্রাস করে। এই অমিত বিদ্যা কাকে দান করবেন তিনি? শিষ্য যে নেই তা নয়, আছে। তবে কাউকেই মহাজ্ঞানের পূর্ণ অধিকারী বলে মনে হয় না তাঁর। বিষ-বিমোচন বিদ্যার অল্প-স্বল্প কিছু তিনি কাউকে কাউকে শিখিয়েছেন, চিনিয়েছেন বৃক্ষ-লতা। অল্প চিনেই তারা জাদুকর হয়ে উঠতে চায়— ডুব দিতে চায় যশ-খ্যাতির সরোবরে। আর তখনই কৃপণ হয়ে ওঠেন তিনি। আর শেখান না। অজ্ঞানকে জ্ঞানে ফিরিয়ে আনবে যে সে তো জাদুকর নয়, সে প্রকৃতি-পড়ুয়া। তার লোভ থাকে না, নিষ্ঠা থাকে। বৃক্ষলতার কাছে নতজানু হয়ে সে শেখে অমৃত ও বিষের পার্থক্য। অমৃত আর বিষ যে আলাদা করতে শিখেছে তার বিত্তবাসনা থাকার কথা নয়।

কয়েক দিন ধরে বাতাসে একটা খবর পাক খাচ্ছে। বিষবৈদ্য ধন্বন্তরীও শুনেছেন সে সংবাদ। হাসান-হোসেনের রাজ্য সর্পের দৌরাত্ম্যে শ্মশান হয়ে গেছে। সাপ যে ধর্ম বিচার করে কাটে না, তিনি এ কথা জানেন। এত দিন তাঁর সর্প ও বিষের সঙ্গে সহবাস। মানুষের শরীরের নীল বিষ তিনি জল করে দেন। তিনি জানেন, সাপেরা যখন কাটে তখন নির্বিচারেই কাটে। তবু বাতাসে খবর ছড়ায়। হাসান-হোসেনের ওপর নাকি নেমে এসেছে মা মনসার কোপ। মা মনসা সাপের দেবী। সাপেরা তাঁর প্রজা। তাঁরই হুকুমে নাকি দল বেঁধে সাপেরা আক্রমণ করতে পারে রাজ্যের পর রাজ্য। বিষবৈদ্য মনসাকে চেনেন না, দেখেননি। দেবতাদের কেই বা দেখেছে! তবে কিছু দেবতা বা দেবী আছেন, তাঁদের না দেখলেও মানুষ মানে। হয়তো কোনও অতীতে তাঁদেরকে কল্পনা করে নিয়েছিল মানুষ, তাদেরই কোনও সহবাসীর আদলে। সাপের বিষকে জল করতে পারেন বলে তাঁকেই কি কেউ কেউ ভগবানের মতো ভয় ভক্তি করে না?

চাঁদবেনে আর ধন্বন্তরী যে রাজ্যের বাসিন্দা, হাসান-হোসেনের নগর তার থেকে অনেক দূরে। সে পুরী শ্মশান হয়ে যেতে এ রাজ্যের কেউই দেখেনি। যদি শ্মশান হয়েও থাকে তা হলে সে এখন নয়। অনেক চাঁদ আগে ঘটে গেছে সে কাণ্ড। খবর আগুনের মতো ছড়ালেও সে আগুন দ্রুতগামী নয়। বৈদ্য জানেন, এ রাজ্যের মানুষজন খুবই ভরসা করে তাঁকে। তিনি থাকতে তারা দংশনের ভয় মাত্র করে না। এ রাজ্যের এক দিকে তাঁর পুরী, অন্য দিকে চাঁদবেনের বিশাল প্রাসাদ। দেশ দেশান্তরে চাঁদের বাণিজ্য। বংশানুক্রমে এই বণিক বংশের বাণিজ্যযাত্রা চলে আসছে। এখন নদীপথের গতি গেছে ঘুরে। বাণিজ্যযাত্রার সে পূর্বমহিমা অস্তমিত। তবে চাঁদের সম্পদ এখনও কিছু কম নয়। ধন্বন্তরী নীরবে বসে থাকেন। ভাবেন এ রাজ্যে সর্প দংশনের সংবাদ এলেই ছুটে যাবেন তিনি। প্রয়োগ করবেন অধীত বিদ্যা। জয়গান গাইবে সবাই। তবে ক্লান্ত লাগে। কী হবে দেবতার মতো এই সম্ভ্রম পেয়ে! বড় বৈচিত্রহীন তাঁর এই বিলাসবাসনাহীন জীবন। একাকিত্ব বড় ভয়ঙ্কর। তাঁর মাঝে মাঝে মনে হয়, দেবতা হয়েছেন যাঁরা তাঁরা বড় একা। বণিক চাঁদের প্রাসাদের সামনে নীলকণ্ঠ শিবের মহিমময় মূর্তি। বিষবৈদ্য জানেন, শিব তাঁরই মতো এক জন কেউ, কণ্ঠে বিষ ধারণ করতে পারতেন। সে কত যুগ আগের ঘটনা কে জানে! 

মেয়েটিকে আগে এ রাজ্যে কেউ দেখেনি। দ্রুত গতিতেই সে অতিক্রম করছিল রাজপথ। কোনও একটা উদ্দেশ্য নিয়ে যে সে এসেছে তা বোঝা যাচ্ছিল তার পদচারণায়। নগরের সাধারণ মানুষ এক ঝলক দেখে নিচ্ছিল তাকে। মেয়েটি কোন বর্ণের তা বোঝার উপায় নেই। ব্রাহ্মণকন্যারা এ ভাবে দিবালোকে একাকিনী প্রকাশ্য রাজপথে চলাচল করেন না। ক্ষত্রিয়কন্যারাও এমন কাজ করার আগে দু’বার ভাববেন। মেয়েটি হয় বণিককন্যা, নয় শূদ্রাণী। শূদ্রাণীদের পথে চলাচলে বিধিনিষেধ নেই। নানা কাজ করতে হয় তাদের, শ্রমসাধ্য সেই কাজ করতে গেলে পথে তো নামতে হবেই।

শৈল্পিক: বাংলার পটে দেবী মনসার জন্মকথা। সুজিতকুমার মণ্ডল সম্পাদিত ‘দুখুশ্যাম চিত্রকর: পটুয়া সঙ্গীত’ (গাঙচিল) বই থেকে।

তবে মেয়েটিকে সপ্রশ্ন লোকচক্ষুর সামনে খুব বেশি ক্ষণ থাকতে হল না। নগরের যে দিকে সে চলে এল সে দিকে লোক চলাচল নেই। জনবিরল সেই অংশেই যে বিষবৈদ্যের বাড়ি, তা মেয়েটি শুনেছে। জনবিরল সেই অংশ দিয়ে দ্রুত এগোতে এগোতে অদ্ভুত হাসি খেলে গেল তার ঠোঁটে। পথশ্রমে তার ঠোঁটের ওপর স্বেদ জমেছে। তাতে বিদায়ী সূর্যের আভা এসে লাগছে। এখনও সূর্য অস্তমিত হয়নি, তবে নিভে যাবে। এই রাজ্যে সূর্য নিভে গেলে এখন শীত নেমে আসে। অস্তসূর্যের দিকে তাকিয়ে মেয়েটির মনে হল, কবে যে এই যাত্রা শেষ হবে! সেই কত দিন আগে শুরু হয়েছিল।

কে তার মা সে জানে না। যে তার বাবা, মেয়েটি সে মানুষকে অবশ্য চেনে, আত্মপরিচয় দিয়েছিল সেই মানুষ। তাকে লালন-পালন করেছিল। গোপনে শরবনের জঙ্গল অতিক্রম করে জলাভূমি ডিঙিয়ে এক পর্ণকুটিরে রেখেছিল তাকে। বড় হল যখন, মেয়ে যখন নারী হল, তখন এক দিন সেই মানুষটি তাকে নিয়ে চলল তার বাড়ি। সে বাড়িতে ঠাঁই হল না মেয়ের। তখন মেয়েকে নিয়ে আবার পথে নামে সে মানুষ। মাঠ ডিঙোয়, ঘাট ডিঙোয়। শেষ অবধি এসে থামে পাহাড়ঘেরা এক দেশে। সেখানেই শেষ অবধি মেয়েটির দিনযাপন, এক দল সখীও জুটল। পাহাড়ি সে অঞ্চলে আর যা কিছুর অভাব থাক, সাপের অভাব ছিল না। সাপ দেখতে দেখতে মেয়েটি ক্রমশ সাপেদের স্বভাব কেমন হয় বুঝে ফেলল। কোনও রমণী বুঝি তার আগে সাপেদের স্বভাব এমন করে বোঝেনি, এমন করে সাপেদের আদর করে আহার দেয়নি। সাপেরা তাকে দংশন করে না। মেয়েটিও তার কপালে এঁকে নিলে সাপের আলপনা। দুই বাহুতে সেই সর্প নকশা আশ্চর্য অলঙ্কারের মতো দেখায়। নাভিতে, পায়ের পাতায় তার সর্প-আলপনার নানা বিন্যাস। এ বিন্যাস সবাই সহ্য করতে পারে না। যার সঙ্গে বিবাহ হয়েছিল তার, সেই পুরুষটি তাকে সইতে পারেনি। নিরাভরণ শরীরে নানাবিধ সর্পের আলপনা নিয়ে রাত্রি মধ্যযামে সেই মেয়েটি এসে দাঁড়ায়। রমণীর শরীরে উদ্যত নমনীয় সাপেদের নকশাকে আলিঙ্গন করার সাহস সে পুরুষের ছিল না। কোনও পুরুষেরই কি আছে? বিষবৈদ্যের কথা লোকমুখে শুনেছে মেয়েটি। ভগবানের মতোই ক্ষমতাবান এই বিষবৈদ্য। সাপেদের নাকি সইতে পারেন তিনি, তাই এই মেয়ের আগমন।

সূর্য নিভে গেল। বিষবৈদ্যের এ পুরীতে প্রহরা থাকে না। এ রাজ্যে তাঁর মতো নিরাপদ আর কে? ঘরের এক দিকে একটি প্রদীপ জ্বলছে। অন্য দিকে আনমনে একা বসে আছেন ধন্বন্তরী। চোখ একটু নত হয়েছিল। সহসা গৃহে কারও উপস্থিতি টের পেলেন তিনি। কে? এই সন্ধ্যায়? সর্প দংশনের বেদনা নিয়ে কেউ কি এসেছে? ধন্বন্তরী চোখ তোলেন। চোখ তুলতেই বাক্যিহারা। প্রদীপের আলোয় দেখেন এক রমণী। শরীরটি নিরাভরণ। রমণী শ্যামা নন, বিদ্যুৎবর্ণা। নির্মেদ গাত্রে মেয়েটি বড় যত্ন করে সর্প-আলপনা এঁকেছে। স্তনের বিভাজিকা থেকে উদ্যত দুই সর্প তাদের বিস্তৃত ফণা নিয়ে আবৃত করেছে নিপুণ দুই স্তন। বিভাজিকার একটু তলা থেকে এঁকে বেঁকে নাভি স্পর্শ করে আরও অতলে নেমে গেছে যে রাজসর্প,তার মস্তকটি অপরূপ ছত্রবৎ, কারুকার্যখচিত। বাহুদেশ, নিতম্ব সর্বত্র নানা আলপনার বিন্যাস। শ্বেতাভ উজ্জ্বল বিদ্যুতের মতো শরীরের ওপর এই আলপনার কালো এক আশ্চর্য আলোছায়ার জন্ম দিচ্ছে। ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ান বিষবৈদ্য। অভিভূত তিনি। এই রমণীকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করার সামর্থ্য তাঁর নেই। তবে সমগ্র জীবনে সর্প ও সর্পবিষের চর্চা করেও যা শিখতে পারেননি তিনি, এই রমণী তা পেরেছে। বৈদ্যের কাছে সর্পদংশনে মুহ্যমান রোগীর আরোগ্যই সব। ক্রমাগত আরোগ্য প্রদান করতে করতে তিনি বিস্মৃত হয়েছেন শরীরের রূপ। সাপেরা যে সর্বদা দংশন করে না, তারা যে প্রকৃতির সখা হতে পারে, এ সহজ কথাটি গেছেন ভুলে। দংশন আর আরোগ্য, এই চক্রে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। আজ দেখলেন সাপের দংশনহীন রূপ।

নিজের গৃহকোণে যে গোপন গহ্বরে রেখেছিলেন তাঁর শাস্ত্রগ্রন্থ, সেটি নিলেন হাতে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলেন সেই রমণীর দিকে। মহাজ্ঞানগ্রন্থ নামিয়ে রাখলেন রমণীয় পদতলে। তার পর নতজানু হয়ে পরম মমতায় তুলে নিলেন সেই বিদ্যুৎবর্ণার অপরূপ পায়ের পাতা। আলতো করে চুম্বন করলেন। বড় ভাল লাগল। প্রশমিত হল ক্লান্তি। সর্পদংশনের চিকিৎসা তিনি আর করবেন না। এই মেয়েটিই তাঁর যথার্থ উত্তরাধিকারী। সহসা দমকা বাতাসে ঘরের প্রদীপ নিভে গেল, নেমে এল রমণীয় অন্ধকার।

 

(কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, বিজয়গুপ্ত ও নারায়ণদেবের মনসামঙ্গল কাব্যের উপাদান থেকে আখ্যানটি পুনর্নির্মিত)