খাতা! যে সে খাতা নয়, একেবারে জাবেদা খাতা, সবুজ আর কালো বাঁধাইয়ে থরে থরে সাজানো, যেন খোদ চিত্রগুপ্ত মহাশয়ের কমপ্লিট ওয়ার্কস। তার সন্ধানে যেতে হবে পাতালে। মহাকবি দান্তে ও ভার্জিল যে ভাবে নেমেছিলেন নরকের ন’টি বৃত্ত বরাবর, সে ভাবে আমাদেরও নেমে যেতে হবে লন্ডনস্থিত ব্রিটিশ লাইব্রেরির ভূগর্ভে। সেখানে মেরুদেশের শৈত্য ও নৈঃশব্দ্য, যমদূতদের পরনে সোয়েটার ও মাফলার। মাইলের পর মাইল শুধু বইয়ের তাক, তারই কোনও এক শেল্ফমার্ক জুড়ে শ’খানেকের কাছাকাছি জাবেদা খাতা।

কী আছে খাতায়? এর উত্তর জানতে ফিরে যেতে হবে ১৮৬৭ সালে। মাত্র এক দশক আগে সিপাহি বিদ্রোহের পর কোম্পানি-রাজের অবসান ঘটিয়ে ভারতবর্ষের রাজত্বভার হাতে নিয়েছে ব্রিটিশ রাজসিংহাসন, ফলে নানা নতুন আইন প্রণয়নের হিড়িক, যেমন ১৮৬৭ সালের ২৫ আইন ‘দ্য প্রেস অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’। এই আইনবলে ভারতবর্ষে সমস্ত ছাপা বইয়ের খতিয়ান সরকার-বাহাদুরের আওতায় চলে এল। ধরুন আপনি মুদ্রাকর, প্রকাশক বা পুস্তকবিক্রেতা, গাঁটের কড়ি দিয়ে একটি দু-চার ফর্মার চটি বা থান-ইট সদৃশ বই ছেপেছেন। এই আইন মোতাবেক তিনটি কপি আপনাকে জমা দিতে হবে সরকার বাহাদুরের করকমলে, সঙ্গে দিতে হবে গ্রন্থবিদ্যা-সম্মত দীর্ঘ ফিরিস্তি—মুদ্রণযন্ত্রের নাম, পৃষ্ঠাসংখ্যা, মূল্য, প্রাপ্তিস্থান, লেটারপ্রেস না লিথোয় ছাপা ইত্যাদি। এই রেজিস্ট্রির ফলে আইনের চোখে আপনার বই মান্যতা পেল। আর যদি হিসেব দাখিল না করেন? পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে দু’বছর পর্যন্ত জেল। এ ছাড়া প্রকাশকদের আইনমুখী করে তোলার জন্য সরকার বাহাদুর রীতিমতো ইনসেন্টিভেরও ব্যবস্থা করেছিলেন, বিধিসম্মত তিন কপির বিক্রয়মূল্য প্রকাশকের হাতে তুলে দেওয়া। তিন কপি তো বিক্রি হল, এর ফলে যে কী কেলেঙ্কারি হল তা পরে বর্ণনা করব।

এই ‘রিটানর্স’ প্রতি তিন মাস অন্তর ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এর অ্যাপেন্ডিক্স রূপে মুদ্রিত হত, ‘বেঙ্গল লাইব্রেরী’ শিরোনামে। সাধারণের জন্য নয়, শুধু আইসিএস-ক্যাডার ভুক্ত রাজপুরুষদের জন্য। বিশাল ১৬-কলাম বিশিষ্ট এই ‘বিগ ডেটা’ তাদের কী কাজে লাগত তা খুব পরিষ্কার নয়। ইতিহাসবিদ রবার্ট ডার্ন্টন মনে করেন যে নজরদারি বা অনুরূপ শাসনযন্ত্র হিসেবে এই তালিকাকে কাজে লাগানোর তাগিদ তখনও সে ভাবে অনুভুত হয়নি। আমার ধারণা, এই তালিকা প্রধানত যার প্রণোদনায় নির্মিত, তিনি বাংলা মুদ্রিত বইয়ের আদি খাজাঞ্চি রেভারেন্ড জেমস লং। অনেকেই জানেন, ১৮৪৮-৫৫ এই সাত বছরে, লং সাতটি পঞ্জি প্রকাশ করেন, যার মধ্যে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ১৮৫৫ সালের স্যান্ডার্স ও কোনস মুদ্রিত আ ডেসক্রিপটিভ ক্যাটালগ অব বেঙ্গলি ওয়ার্কস।  

এর কয়েক বছর পর ‘নীল দর্পণ’ মামলায় মূল অভিযুক্ত লং সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছিলেনঃ ‘I have aimed for the last ten years in my leisure hours to be an exponent of Native opinion in its bearing on the spiritual, social and intellectual welfare of Natives of this land; as for instance, when applied to, on the part of the Court of Directors, seven years ago, to procure for their Library copies of all original works in Bengali, or as when, lately, I sent to Oxford by request copies of all Bengali translations from Sanskrit.’ অর্থাৎ বিলেতে বাংলা বই বাছাই ও প্রেরণ করার কাজ স্বেচ্ছাশ্রম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন লং। কিন্তু ষাটের দশকে মুদ্রিত বাংলা বইয়ের সংখ্যা যে হারে বাড়তে থাকে, তাতে সেগুলির হিসেব রাখা এক জন লোকের কর্ম ছিল না। লং-এর পরে রেভারেন্ড জন রবিনসন কিছু দিন, তার পর জন ওয়েঙ্গার-এর উদ্যোগে ১৮৬৫-তে প্রকাশিত হয় বাংলা ও সংস্কৃত ভাষায় মুদ্রিত গ্রন্থপঞ্জি। এর পরেই এসে গেল ২৫ আইন, এবং পুস্তকসুমারির গুরু দায়িত্ব সরকারের কাঁধে অর্পিত হল।

‘বেঙ্গল লাইব্রেরী’ শিরোনামে ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এ সে সময়কার প্রকাশিত বইয়ের খতিয়ান। সৌজন্য: ব্রিটিশ লাইব্রেরি, লন্ডন

ঠিক দেড়শো বছর আগের একটি তারিখ দেখা যাক। এপ্রিল-জুন ১৮৬৮, এই তিন মাসের যা খতিয়ান পাওয়া যায়, তা থেকে দেখা যায়, ২ জুন ১৮৬৮ বেরিয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বর্ণপরিচয় ১ম ভাগের ত্রিংশতম সংস্করণ, মুদ্রণসংখ্যা মাত্র এক লক্ষ, মূল্য এক আনা। সেই একই দিনে বেরিয়েছিল ৩২ নিমতলা ঘাট স্ট্রীটের সংবাদ জ্ঞানরত্নাকর প্রেস থেকে সংস্কৃত ভাষায় কীরতার্জ্জুনীয়ম, পৃষ্ঠাসংখ্যা ৯৬, মুদ্রণসংখ্যা এক হাজার, মূল্য আট আনা। পরের দিন, ৩ জুন প্রকাশিত হয় শেখ সমিরদ্দি প্রণীত ও মুদ্রিত বেদারেল গাফেলেন, পৃষ্ঠাসংখ্যা ১০৮, মুদ্রণসংখ্যা ২৭৫০, মূল্য আট আনা। ছাপাখানা দি বেঙ্গলি প্রিন্টিং প্রেস, ৮০-২ আহিরীটোলা স্ট্রীট, বইটির বিষয় ‘Instructions on the duties and rites of Mahomedans’। অনতিদূরে ৮, ডালহৌসি স্কোয়ার থেকে পি এস ডি’রোজারিও কোং ১৬ জুন প্রকাশ করছে লাতিন ভাষায় ফেদ্রাসের ফেবলস, মাত্র ১২ পৃষ্ঠার চটি বই, মুদ্রণসংখ্যা মাত্র ৫০! এ ছাড়াও জুনের প্রথম অর্ধে বেরোয় উর্দু ভাষায় কানুন আরাজি ও খেরাজ আরাজি, হিন্দিতে হাতেম তাই, বাংলায় শেক্সপিয়রের সিম্বেলিন নাটক অবলম্বনে চন্দ্রকালী ঘোষের কুসুম-কুমারী নাটক। এবং সব শেষে, সেই অদ্ভুত মন-কেমন-করা নামের সূর্য-উজল বিবির পুঁথি, যার একটি কপিও পাওয়া যায় না, যদিও ছাপা হয়েছিল তিনটি হাজার।

এ এক আশ্চর্য ঐশ্বর্য। দু’সপ্তাহের মধ্যে ছাপা হচ্ছে অন্তত ছ’টি ভাষায় বই, এবং খাতার দৌলতে জানা হয়ে যাচ্ছে প্রতিটি বইয়ের এমন সব খুঁটিনাটি, যা আজকের তথ্যসংপৃক্ত যুগেও দুর্লভ। এই তথ্য থেকে আমরা অনায়াসেই নির্মাণ করতে পারি উনিশ শতকের বইপাড়া ও বই পড়ার এক নব্য মানচিত্র, এবং তার ওপর স্থাপন করতে পারি গুগল ম্যাপস-এর মতো অত্যাধুনিক দিকচিহ্ন। অথবা জিআইএস–এর সাহায্য নিয়ে প্রতিবিম্বিত করাতে পারি সেই সময় ও এই সময়ের বইপাড়াকে।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ লাইব্রেরি শুরু করে ‘টু সেঞ্চুরিজ় অব ইন্ডিয়ান প্রিন্ট’ প্রকল্প। প্রাথমিক লক্ষ্য, ১৭১৪-১৯১৪, এই দুশো বছরে ভারতীয় ভাষায় মুদ্রিত সমস্ত গ্রন্থের (যেগুলি শুধু ব্রিটিশ লাইব্রেরিতেই আছে) সম্পূর্ণ ডিজিটাইজেশন। শুধু বাংলা ভাষাতেই এ হেন ‘ইউনিক টাইটল্‌স’-এর সংখ্যা আনুমানিক ১৫০০। যেহেতু সম্প্রতি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে উনিশ শতকের বাংলা মুদ্রিত গ্রন্থের সুলুকসন্ধান সহ একটি পঞ্জি প্রস্তুত করা হয়েছিল, সেহেতু বাংলা বইকে নিয়ে এই প্রকল্পের সূচনা। ইতিমধ্যেই চারশোর বেশি উনিশ শতকের ডাউনলোডসাধ্য দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ পাওয়া যাচ্ছে লাইব্রেরির ওয়েবসাইটে। একই সঙ্গে বাংলা হরফের নির্ভরযোগ্য OCR সফটওয়্যার তৈরি করার গবেষণা চলছে, এই সফটওয়্যার তৈরি হলে এই গ্রন্থগুলির পাঠ কি-ওয়ার্ড দ্বারা সন্ধান করা সম্ভব হবে, যেমনটা সম্ভব রোমান হরফে। রোমান হরফে বর্ণসংখ্যা কম বলে এ কাজ সহজসাধ্য, তুলনায় ভারতীয় হরফসমূহে স্বর, ব্যঞ্জন ও সংযুক্ত বর্ণের প্রাচুর্যের কারণে এ কাজ ঠিক ততটাই দুরূহ। অনলাইন পাওয়া যাচ্ছে সমস্ত জাবেদা খাতাও— ‘কোয়ার্টার্লি লিস্টস’ শিরোনামে।            

শেষে, এক চোরাগোপ্তা সম্ভাবনার প্রস্তাবন। অনেকেই জানেন, বাংলায় গোয়েন্দা কাহিনির জনক প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি ১৮৭৮ থেকে ১৯১১ কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পেশাদারি অভিজ্ঞতাসমূহ গল্পাকারে দারোগার দপ্তর পত্রিকায় প্রকাশ পেত। পত্রিকার আষাঢ় ১৩০১ সংখ্যায় ‘বাঃ গ্রন্থকার, অর্থাত পুস্তক-প্রণেতার অদ্ভুত জুয়াচুরি রহস্য!’ শীর্ষক একটি গল্প বেরোয়, যার বিষয়বস্তু পূর্ণানন্দ ভক্ত নামক জনৈক বই-জালিয়াতের কীর্তিকলাপ। জালিয়াতির বৈচিত্র ও উদ্ভাবনী ক্ষমতার জন্য তাকে অনায়াসেই ‘বাংলার Curll’ উপাধি দেওয়া যায়।

কিন্তু খাতা বা আইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী? গল্পের প্রথম দিকে পাই: ‘‘আমি যে সময়ের কথা বলিতেছি, সে অধিক দিবসের কথা নহে। তথাপি এখন রেজিষ্টারী আফিসের যেরূপ নিয়ম হইয়াছে, সেরূপ নিয়ম তখন ছিল না। তখন নিয়ম ছিল, এতদ্দেশে যে কোন পুস্তক প্রকাশিত হইবে, প্রকাশক তাহার তিনখানি রেজেষ্টারী আফিসে প্রদান করিবেন। সেই পুস্তকের উপর যে মূল্য লিখিত থাকিবে, গবর্ণমেণ্ট তাহা প্রকাশককে প্রদান করিবে; এখনও প্রকাশককে তাহার প্রকাশিত সমস্ত পুস্তক পূর্ব্বের মত অর্পণ করিতে হয় সত্য, কিন্তু গবর্ণমেণ্ট এখন আর তাহার মূল্য প্রদান করেন না। যে ঘটনা অবলম্বনে আমাকে এই প্রবন্ধ লিখিতে হইতেছে উক্ত ঘটনা ঘটিবার পর হইতেই গবর্ণমেণ্ট এক নতূন আইন পাশ করেন। সেই সময় হইতেই প্রকাশকদিগকে প্রদত্ত পুস্তকের মূল্য পাইতে বঞ্চিত হইতে হয়।’’ কী সেই ঘটনা? এক সকালে উক্ত পূর্ণানন্দ একটি কাবুলিওয়ালাকে ঠকিয়ে সাড়ে চার টাকার মূলধন সংগ্রহ করেন। তার পর: ‘‘পরদিবস আমি বটতলায় গিয়া উপস্থিত হইলাম। সেখানে বাজে পুস্তকের অভাব নাই, বাছিয়া বাছিয়া অতি অল্পমূল্যে তিনখানা বৃহদাকারের পুস্তক বটতলার দরে খরিদ করিলাম। সেই পুস্তকের উপর মূল্য লেখা ছিল পাঁচ টাকা, কিন্তু আমি খরিদ করিলাম— পাঁচ আনা হিসাবে। কেবলমাত্র পনের আনা খরচ করিয়া তিনখানি পুস্তকের সংস্থান হইল।’’

নথি: জেমস লং কৃত গ্রন্থপঞ্জির (১৮৫৫) পাণ্ডুলিপির পৃষ্ঠা।

অতঃপর ছাপাখানায় গমন, তিনটি মনগড়া আখ্যাপত্র ও মলাট মুদ্রণ। মূল আখ্যাপত্র ছিঁড়ে ফেলে সে স্থলে নতুন আখ্যাপত্র প্রতিস্থাপন, তিন দিক থেকে ছেঁটে ঈষৎ ভিন্ন আকার প্রদান। ‘‘এখন সেই পুরাতন পুস্তকত্রয় নূতন কলেবর ধারণ করিল... পুস্তক যে দেখিল, তাহারই উহা নূতন বলিয়া ভ্রম হইল।’’ নতুন মূল্য ধার্য হল দশ টাকা। এর পর রেজিস্টারি আপিসে গমন, ও ২৫ আইন মোতাবেক তিন কপি জমা দিয়ে ৩০ টাকা লওন। নিট খরচ আড়াই টাকা, লাভ ২৭ টাকা ৮ আনা। প্রিয়নাথের জবানি অনুযায়ী, পূর্ণানন্দ আরও কয়েক বার এই জালিয়াতি করে লাভবান হন, কিন্তু শেষে রেজিস্টারি আপিসের সন্দেহ হওয়ায় পুলিশে খবর দেওয়া হয়। পূর্ণানন্দের অকপট স্বীকারোক্তি: ‘‘আমাকে ধরতে আপনাদিগের কোন কষ্ট হয় নাই। কারণ সেই সকল পুস্তকের উপর আমার নাম মুদ্রিত আছে; এবং যে ছাপাখানা হইতে সেই সকল নূতন মলাট ছাপা হইয়াছে, সেই সকল ছাপাখানার নাম এবং ঠিকানা উহারই উপর লেখা সুতরাং ছাপাখানার সন্ধান পাইলেই আমাকে ধরিতে আর বিলম্ব হইবে কেন?’’

তা হলে জাবেদা খাতা কি সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ নয়? তার সারণিতে কি গা ঢাকা দিয়ে আছে পূর্ণানন্দ ভক্তের ভৌতিক বইদের দল? তাদের ধরার জন্য দরকার এক নতুন ভূত-শিকারি মেজকর্তা!

 

ঋণস্বীকার: ব্রিটিশ লাইব্রেরি, লন্ডন