চিত্তরঞ্জন ভবনে সে দিন আলোচনার বিষয় ছিল ‘বন্দে মাতরম এবং জাতীয়তাবাদ’। বক্তা ছিলেন অধ্যাপক সাংসদ সুগত বসু। সাংবাদিক জয়ন্ত রায়চৌধুরী চিত্তরঞ্জন ভবনের দায়িত্বভার গ্রহণের পর আজকাল মাঝেমধ্যেই দিল্লির চিত্তরঞ্জন পার্কে সন্ধ্যায় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নাগরিক সমাজ বেশ নানা ধারনের আলাপ-আলোচনায় সক্রিয়।

সুগতবাবু বলছিলেন, ২০১৭ সালের জাতীয়তাবাদে অতীতের পরমতসহিষ্ণুতার ঐতিহ্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হচ্ছে। অতীতে গাঁধী-নেহরু-সুভাষ, নানা বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সেটি কখনওই ঔপনিবেশিক বিরোধী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতার কারণ হয়নি। সুগতবাবু যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারতের নানা প্রান্তের নানা ভিন্নতার কথা বলছিলেন। নানা ধরনের সত্তা আর নানা ধরনের সত্তার মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় থাকাটাও বিশেষ জরুরি ছিল। ভাষা-ধর্ম-জাতপাত-আঞ্চলিক প্রত্যাশা, বিবিধ সংঘাতের মধ্যে মহান মিলন ছিল সে দিন। আলোচনা সভায় এসেছিলেন তসলিমা নাসরিন। সম্প্রতি অজিণ্ঠা-ইলোরা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে নিয়ে মুম্বই গিয়ে কী ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি, সভা শেষে সে কথা জানাচ্ছিলেন তসলিমা। তসলিমার বিরুদ্ধে আবার মুসলিম ধর্মাবলম্বী বহু মৌলবাদী সোচ্চার। বিভিন্ন রাজ্যে গেলেই এঁরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তসলিমা বলছিলেন, এ দেশে হিন্দু মৌলবাদীদের সঙ্কীর্ণতাবাদ যেমন নিন্দনীয়, ঠিক সে ভাবে ইসলাম ধর্মের নামে অসহিষ্ণুতার প্রদর্শনেরও তীব্র নিন্দা হওয়া প্রয়োজন। এ ব্যাপারে একপেশে মনোভাব নেওয়ার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার আবহ তৈরিতে অসুবিধা বাড়ছে।

সাংবাদিক গৌতম হোড় সভা পরিচালনা করছিলেন। তিনি সুগতবাবুর কাছে ২০১৭ সালের বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সুগতবাবু নিজে কিন্তু তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে কোনও রাজনৈতিক নেতা বা কোনও রাজনৈতিক দলের নাম না করে আজকের পরিস্থিতির রাজনৈতিক পরিবর্তিত পটভূমিটাই তুলে ধরেন। আমি জানতাম না, সুগতবাবু তো মহাত্মার উদ্ধৃতি শুনিয়েই বললেন, মোহনদাস নাকি বলেছিলেন, ‘বন্দেমাতরম’ বা জাতীয় সঙ্গীতের সময় উঠে দাঁড়ানো মানেই শ্রদ্ধা প্রকাশ নয়। বস্তুত, এই উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোটা মূলত পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। আবার জানলাম, ‘জয় ভারতমাতা কি জয়’ ও ‘বন্দেমাতরম’, এই দুই স্লোগানের মধ্যে কী ভাবে গাঁধী ‘বন্দেমাতরম’ সম্পর্কেই বেশি দুর্বল ছিলেন। পূর্ব ভারতের সঙ্গে গাঁধীর আবেগমথিত সম্পর্কের কথাও সুগতবাবু বললেন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে নোয়াখালিতে যাওয়ার নেপথ্য কাহিনি তিনি শোনালেন। কাশ্মীর ও লাহৌর হয়ে তিনি কী ভাবে দাঙ্গার সময় নোয়াখালি পৌঁছলেন, সে সব কথা তিনি জানালেন। সুরাবর্দি বিতর্কিত চরিত্র। নোয়াখালি সফরের সময় গাঁধী সম্পর্কে সুরাবর্দি ইতিবাচক ভূমিকা নেন বলেও সুগতবাবু জানান। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে গিয়ে প্রদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‘সুগতবাবুর বক্তব্যের সঙ্গে কারও মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আমরা ওঁর বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনায় মুগ্ধ।’’

গত ৪ অগস্ট গুজরাতের বনসকঁঠার লালচক থেকে হেলিপ্যাডে ফেরার পথে একটি বড় পাথরের চাঁই উড়ে এসে পড়ে রাহুল গাঁধীর গাড়িতে। ছবি: পিটিআই।

নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তিন বছর অতিবাহিত। মোদী নিজেই বলেছেন, রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি এবং স্পিকার— তিনটি সাংবিধানিক পদই এখন একই মতাদর্শের ছাতার তলায়। আপনার পছন্দ হোক আর না হোক, এটা মানতেই হবে যে, মোদীর আমলেই বিজেপি একক ভাবে ক্ষমতায় এসেছে ২৮২টি আসন নিয়ে। কোনও রাজনৈতিক দলের মতাদর্শগত বিজয়কেতন ওড়ানো তো অন্যায় নয়, কিন্তু এ কথা সত্য। নেহরুর সময় রজনী কোঠারি বলেছিলেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি হল ‘কংগ্রেস সিস্টেম’। আর আজ কংগ্রেসের অবক্ষয়ের প্রেক্ষিতে রামচন্দ্র গুহ বলেছেন, এ হল ‘বিজেপি সিস্টেম’। কিন্তু নেহরুর সময়ে ‘কংগ্রেস সিস্টেম’ থাকলেও জনসঙ্ঘ তথা আরএসএস-এর রাজনৈতিক পরিসর ছিল এ দেশে। কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম ১৯২০ সালে তাসখন্দে। ভারতে ১৯২৫ সালে। দীর্ঘ দিন ধরে ভারতের রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পরিসরও ছিল। কিন্তু আজ? প্রতিপক্ষের মতাদর্শগত কোনও পরিসরই থাকছে না।

এর জন্য নরেন্দ্র মোদীকে একতরফা দোষারোপ আমি করব না। আসলে, গোটা পৃথিবী জুড়েই এই নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গোটা পৃথিবী জুড়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে হতাশা ও ক্লান্তি এসেছিল। তাই তখন মানুষের গণতন্ত্রের ক্ষুধা খুব বেড়ে যায়। গোটা পৃথিবী জুড়ে বহু গণতান্ত্রিক ‘নেশন স্টেট’ তৈরি হয়। এখন এসেছে আর এক নতুন ধরনের প্রবণতা। এখন পৃথিবী জুড়ে এসেছে গণতন্ত্র সম্পর্কে ক্লান্তি। ‘ডেমোক্র্যাসি ফ্যাটিগ’। আর তাই দেশ দেশে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের ‘অথরিটেরিয়ান পপুলিজম’। স্বৈরতন্ত্রী, কিন্তু জনপ্রিয়। সিজারের মতো। অথবা ফ্রান্সের ‘বেনিভোলেন্ট ডেসপটিজম’-এর মতো। যেমন আমেরিকার ট্রাম্প, টার্কি থেকে লন্ডন, লন্ডন মানে উত্তর-ব্রেক্সিট রক্ষণশীল ব্রিটেন, সর্বত্র এসেছে এই একনায়কতন্ত্রী রাজনীতি। মোদীর ভারত, এই প্রবণতার ব্যতিক্রম নয়। তাত্ত্বিকেরা অনেক শব্দের আমদানি করেছেন। ডিসিভিলাইজেশন, ডিলিবারাইজেশন ইত্যাদি ইত্যাদি। এই প্রেক্ষাপটে মোদীর নেতৃত্বও জনপ্রিয়, কিন্তু সাবেক গণতন্ত্রের পথে নয়।

নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর এ বার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের গৌরবের কথা বলে আগামী দিনের ভারত গঠনের কথা বলছেন। খুবই ভাল কথা। কিন্তু এর মধ্যে আছে এক ক্ষুরধার রাজনীতি। অতীতের ‘কংগ্রেস সিস্টেম’ থেকে আজকের ‘বিজেপি সিস্টেম’-এ আসার এ হল বিশেষ রাজনীতি।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনে কমিউনিস্টদের মতো আরএসএস বা সঙ্ঘ পরিবার যোগ দেয়নি এমন অভিযোগ ছিল, কিন্তু আজ মোদী সরকার এই ঐতিহ্যকে গ্রহণ করে যখন সঙ্কল্প গ্রহণে উদ্যোগী, তখন তার বিরোধিতা করার রাজনৈতিক পরিসরটাই নেতিবাচক হয়ে যায়।

কিন্তু সত্যি সত্যি ভারত কি ভেদ ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে এগোচ্ছে? যদি তাই হত তবে গোটা দেশে এত তীব্র আর্থ-সামাজিক সঙ্কট, এত আত্মপরিচয়ের সঙ্কট কেন? গুজরাতের পাতিদারের পর হরিয়ানার জাঠ আন্দোলন থেকে মহারাষ্ট্রের মরাঠা আন্দোলন, অরাজনৈতিক বলেই কি এত জনপ্রিয়? মানুষ কি এই প্রচলিত গণতন্ত্রে ক্লান্ত? এই প্রবণতাই কি আসলে ‘স্বৈরতন্ত্রী পপুলিজম’?