সাংবাদিককে কি সব সময়েই বিশেষ মতাবলম্বী হতে হবে?

বিষয়টা অনেক পুরনো। কিন্তু আজ, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটভূমিতে বিশেষ ভাবে আলোচনা করা জরুরি বলে মনে হচ্ছে।

মার্কসবাদ একদা মনে করেছিল, এটি বিজ্ঞান। অতএব বিজ্ঞানসম্মত সমাজতন্ত্রকে বিশ্ববীক্ষা হিসাবে গ্রহণ করে সাংবাদিকতার পথ ধরা কর্তব্য। এই কারণে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর সোভিয়েত ইউনিয়নে নানা ধরনের সংবাদপত্রের ধারণা অবলুপ্ত হয়। প্রাভদা হয়ে ওঠে সরকারি মাধ্যম। সর্বহারা একটি শ্রেণী, একটি রাষ্ট্র, অতএব সংবাদপত্রও একটি এবং একটিই মতবাদ। এখন সবাই স্বীকার করছেন, এই ভাবনায় অতিসরলীকরণ ছিল। বহুত্ববাদী গণতন্ত্রই সত্য।

একনায়কতন্ত্রের স্টিম রোলার চালাতে গিয়ে কী হল?

পোল্যান্ডের লেচ ওয়ালেসা এক কথায় বল্কানাইজেশন। চিনেও একই অভিজ্ঞতা হচ্ছে। এখন তো সে দেশে অনেক সংবাদপত্র। তবে, তাদের সম্পাদকীয় নীতিতে বহুত্ব নেই। কিন্তু ওরা বলছে, এই সংবাদপত্রগুলি বানিজ্যিক ভাবে এক জনের সঙ্গে অন্য জন প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। আগে এটুকুও ছিল না। যেন এ রাজ্যের সিপিএমের মুখপত্র লড়ছে ভিন্‌ রাজ্যের মুখপত্র বা মার্কসবাদী পথের সঙ্গে।

জাপানি চলচ্চিত্রকার কুরোশোয়ার ছবি ‘রশোমন’-এর কথা মনে আছে? একটি জঙ্গলে এক মেয়ের ধর্ষিতা হওয়ার কাহিনি! কিন্তু, আসল ঘটনাটি কী? তা জানার চেষ্টা হচ্ছে। এক এক চরিত্রের এক এক রকম ব্যাখ্যা। প্রতিটি ব্যাখ্যা কুরোশোয়া তুলে ধরলেও, নিজে কোনও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি। এর মানে কী? মানে একটাই। একই ঘটনাকে বিভিন্ন ‘পারস্পেকটিভ’ থেকে নানা ভাবে দেখা যায়। সেই মুক্ত চিন্তাকে জানাই কুর্নিশ।

ছাত্রজীবনে বিতর্কসভার আয়োজন করেছিলাম। যেখানে বিষয় ছিল, ‘ইজ পলিটিক্যাল অ্যাপাথি ইজ এ ফর্ম অব পলিটিক্যাল কনসাসনেস?’ রাজনৈতিক উদাসীনতা কি রাজনৈতিক সচেতনতারই একটা রূপ? এ বিতর্ক আজ আবার নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে যখন ভোটদান থেকে বিরত থাকতে চান এমন মানুষদেরও মতামত প্রকাশের আনুষ্ঠানিক সুযোগ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন! ভারতে কোনও রাজনৈতিক দলই আমার ‘মডেল’ নয়। ভোট দেওয়াটাই কি সচেতনতা? নাকি প্রকৃত সচেতনতা আসলে বিরত থাকা? এ বিতর্কে আমার আপত্তি নেই। রণবীর সমাদ্দার সম্প্রতি এক প্রবন্ধে লিখেছেন, হোয়াই দ্য মোস্ট অব দ্য পলিটিক্যাল পার্টিস বিহেভ ইন আ সেম ওয়ে?’ খুব সত্যি কথা। পৃথক ইস্তাহার যাই হোক, পৃথক মতাদর্শ যতই থাকুক, বাস্তবের জমিতে এই আর্থসামাজিক পটভূমিতে দেখা যাচ্ছে বিজেপি-সিপিএম— সবাই আসলে একই রকম আচরণ করছে।

ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিবাস হোয়াইট হাউসের ভিতর বেশ বড়সড়ো একটি মিডিয়া সেন্টার ছিল। নিরাপত্তার ব্যাপারটা আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর নিবাস ৭ নম্বর রেসকোর্স রোডের চেয়ে অনেকটাই কম চিল সেখানে। কিন্তু এমনও নয়, যে কেউ যখন তখন প্রেসিডেন্টের বাড়িতে চলে যেতে পারে। এ বার ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে সদর্পে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি হোয়াইট হাউস থেকে সাংবাদিকদের তাড়িয়ে ছাড়বেন। সাংবাদিকদের বিশেষ ‘অ্যাকসেস’ দেওয়ার বিরুদ্ধতা করেছেন তিনি। পাশাপাশি সাংঘাতিক আক্রমণাত্মক ভাবে বলেছেন, সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যম দুর্নীতিগ্রস্ত। তিনি এ সব আর বরদাস্ত করবেন না। এর প্রতিবাদে গর্জে উঠেছেন মার্কিন সম্পাদকমণ্ডলী। তাঁরা বলেছেন, ‘আমাদের অ্যাকসেস না দিলেও কিছু যায় আসে না। আমরা অ্যাকসেস চাই না। আমরা চাই তথ্য, খবর। অ্যাকসেস ছাড়াই আমরা সে তথ্য আদায় করে নিতে সক্ষম।’

হোয়াইট হাউসে বেশ কয়েক বার যাওয়ার সুযোগ হয়েছে কর্মসূত্রে। বাজপেয়ী যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন তো বিল ক্লিন্টন খুব খাতির করে আমাদের, মানে, সফরসঙ্গী সাংবাদিকদেরও তাঁর বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর বাসভবন ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছিলেন ক্লিন্টন। ওঁর ঘরের বারান্দা থেকে সাদা লিঙ্কন হাউসটা দূরে নাক বরাবর দেখতে খুব ভাল লেগেছিল। মনমোহন সিংহের সঙ্গে ওবামার হোয়াইট হাউসে গিয়েও খুব ঘুরেছিলাম। ওঁর বাগান দেখেছিলাম। আর দেখেছিলাম ক্লিন্টন-বুশের আমলের মিডিয়া সেন্টারটি আগের মতোই অতি সক্রিয়।

সেই মিডিয়া সেন্টারে ছিল একটি সম্মেলন কক্ষ। বক্তৃতা দেওয়ার ছোট মঞ্চের পিছনে হোয়াইট হাউসের ছবির পটভূমি। সাংবাদিকদের বসে কাজ করার জন্য টেবিল-চেয়ার, ল্যাপটপ-কম্পিউটার, ইন্টারনেট এবং টেলিভিশন চ্যানেল দেখার স্ক্রিন। ছোট একটা প্যান্ট্রি রেস্টরুম। সারা ক্ষণ জল, বিয়ার, ফলের রসের ব্যবস্থা। তবে, সবটাই ছিল মেক শিফ্ট অ্যারেঞ্জমেন্ট। স্টিল নির্মিত একতলা কয়েকটি ছোট ছোট ঘর। আমরা সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বন্ধুরা মিলে ছবি তুলেছিলাম। আলোচনা করছিলাম, আমাদের দেশে এই ব্যবস্থা কবে হবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের ভিতর? বেশ মজার স্মৃতি।

এ বার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে যে মনোভাব প্রদর্শন করলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট, তাতে মনে হচ্ছে মার্কিন গণতন্ত্রও আর এক চ্যালেঞ্জের মুখে।

পশ্চিমবঙ্গে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে মহাকরণে প্রেস কর্নার ভাঙার ঘটনা আমরা দেখেছি। আবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নবান্নেও দেখেছি, সাংবাদিকরা চাইলেই লিফট দিয়ে যে কোনও তলায় গিয়ে যে কোনও মন্ত্রী বা আমলার সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদী সাংবাদিকদের নিয়ে বিদেশ যাত্রার প্রথাটাই তুলে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে মিডিয়া উপদেষ্টার পদটিকেও তুলে দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, তথ্য সংগ্রহের জন্য সাংবাদিককে রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করতে হয়। ঘনিষ্ঠতা অর্জন হলে, রাজনৈতিক নেতা বিশ্বাস করলে তবেই তিনি একান্তে সাংবাদিককে অনেক গোপন তথ্য জানাবেন। সাংবাদিক হিসাবে আমি কখনও সে সব তথ্যের সূত্র জানাব না। অসম নিয়ে খবর করায়, সেনা গোয়েন্দারা আমাকে জেরা করেছিলেন। কিন্তু, সেনা অফিসারদের কাছেও আমি বলিনি আমার তথ্যসূত্র কী? জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, আমার সূত্র সেনা না রাজনীতিবিদ? শুধু এটুকু বলা হোক। আমি বলেছিলাম, আদালতে দাঁড়িয়েও আমি সে কথা জানাতে বাধ্য নই।

প্রক্সিমিটি গিভস ইউ অ্যাকসেস অ্যান্ড ইনফর্মেশন— এটা সাংবাদিকতার সাবেকি ক্লাসিক্যাল উপদেশ। কিন্তু, এখন মনে হচ্ছে ‘ক্রনি জার্মালিজম ইজ আ কার্স’। সাংবাদিকের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতার সম্পর্ক, বিশেষ করে শাসকদলের সম্পর্কটা অনেকটাই খাদ্য-খাদকের মতো। এখানে কোনও আত্মীয়সভা গঠন করা যায় না। আমি ঘনিষ্ঠতার জন্য ‘অ্যাকসেস’ পাচ্ছি। কিন্তু, বহু কথা তো জেনেও লিখতে পারছি না। এখন তো মনে হচ্ছে জুনিয়র সাংবাদিকদের তবু ঘনিষ্ঠতার তত্ত্ব প্রয়োজন। কিন্তু একটা বয়সের পর যখন সাংবাদিকতা আপনার কাছে অভিমত প্রত্যাশা করবে, তখন আপনি রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে করবেনটা কী?

তাই, মার্কিন সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে চিঠি দিয়ে যা বলেছেন আমি তাকে সমর্থন করছি।

 

(এখন থেকে ‘শাহি সমাচার’ বুধবারের পরিবর্তে প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হবে।)