ক’দিন আগে এক বঙ্গসন্তান দিল্লিতে আমার দফতরে এসে হাজির। স্যার, কলকাতা থেকে অনেক কষ্ট করে আপনার ঠিকানা জোগাড় করে এসেছি বড় আশা করে।

কী চান আপনি?

২২ বছরের যুবকটি বললেন, একটা চাকরি চাই স্যার। শুনেছি দিল্লিতে আপনার অনেক ক্ষমতা। একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিন স্যার। কৃতজ্ঞ থাকব আজীবন।

কী চাকরি চান আপনি?

স্যার, সরকারি চাকরি। রেল হলে ভাল হয়।

কেন সরকারি চাকরি করতে চান?

তিনটে কারণ আছে স্যার। প্রথমত, সরকারি চাকরিতে চুরি ধরা না পড়লে কোনও দিন চাকরি যাবে না।

দ্বিতীয়ত, কোনও কাজের চাপ নেই। অর্থাৎ কাজ করতে হবে না। আর তৃতীয়ত, চাকরিতে পেনশন পাব স্যার। স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কলকাতার একটা ২২ বছরের ছেলে চাকরি পাওয়ার আগেই অবসরের পর পেনশন পাওয়ার কথা ভাবছে। কাজ না করার কথা ভাবছে। অথচ কাজ না করলেও কী ভাবে চাকরি ক্ষেত্রে নিরাপত্তা থাকে তা ভাবছে।

এই বাঙালি চরিত্র অধুনা বঙ্গে খুবই সুলভ। এই ছেলেরাই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে মাসিক বেকার ভাতা পায়। যে ক্লাবের সদস্য সেই ক্লাবে সরকারি অর্থানুকূল্যে ক্যারম বোর্ড বা রঙিন টিভি উপভোগ করে। এ বার ভোটের সময় দেখলাম, অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক কৌশিক সেন চন্দননগরে গিয়ে এক বেকার যুবকের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, মাসে প্রায় ২০০০ টাকা ভাতা পান সরকারের কাছ থেকে। তাতেই ওই যুবকটির ভাল ভাবে জীবন চলে যাচ্ছে। কোনও টেনশন নেই। কোনও দুঃখ নেই। কোনও হতাশা নেই। হাওয়াই চটিতে পা গলিয়ে দেওয়ার মতোই এক অনায়াস জীবন। এর পাশাপাশি অবশ্য এক অন্য ছবি আছে। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম হচ্ছে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বা এ ধরনের কোনও সফল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সফল ছাত্র। এর পর কম্পিউটার সায়েন্স বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে এই সব ছাত্রছাত্রী অনেকেই চলে যাচ্ছেন ভিন রাজ্যে অথবা মার্কিন মুলুকে।

হে বাঙালি? আমি এক জন নন রেসিডেন্ট বাঙালি। ত্রিশ বছরের অধিক সময় দিল্লিতে কাটানোর পর এখন প্রতি দিন প্রতিনিয়ত অনুভব করছি বাংলার হৃদয়। বয়স যত বাড়ে শিকড়ের টান ততই বাড়ছে। আমার তো মনে হচ্ছে, দিল্লি ছেড়ে আবার পশ্চিমবঙ্গের কোনও প্রান্তে গিয়ে বাকি জীবনটা কাটাই। কিন্তু বাঙালির মানসিকতায় কি কোনও বদল আসবে না? আমরা আজকাল অনেক সময়েই বলি, আহা অতীত কী ছিল আর আজ শিক্ষা ও সমাজের কী হাল হল? সেই সোনামুগের ডাল নেই, সেই মোহনবাগান নেই, সেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও নেই, সেই বাংলাই বা থাকে কী করে? কিন্তু আমার এই অতিতাশক্তিতে পিছে যাওয়ার প্রবণতা নেই। মনে হয়, সে কালেও কিছু ভাল, কিছু খারাপ— দুই-ই ছিল। আজও তাই কিছু ভাল। কিছু খারাপ। এটা একটা প্যাকেজ। রাজনারায়ণ বসুর কথা ভাবুন। তিনি ১৮৭৪ সালে সেকাল আর একাল বলে একটি বই লেখেন। তত্ত্ববোধিনী সভার কাজ চালাতে চালাতে শ্রীযুক্ত বাবু অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়ের হঠাৎ মনে হয়, অতীতে ব্রিটিশ আগমনের সময়কার বাংলার সঙ্গে সে দিনের সময়ের একটা তুলনা হওয়া প্রয়োজন। রাজনারায়ণ বসু তখন অতীতের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকদের সঙ্গে সে দিনের শিক্ষিত বাঙালির সচেতনতার ফারাক সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, অন্ধ ব্রিটিশ অনুকরণেরও সমালোচনা করেন। বইটি কার্যত বাংলার সমকালীন বাঙালি সমাজের ইতিহাস রচনার প্রথম প্রয়াস বলা যায়। লর্ড নর্থব্রুক দুই শত টাকা ব্যয় করে এই বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করতে বাধ্য হন যাতে রাজনারায়ণ কী লিখেছেন তা জানা সম্ভব হয়।

সে কালের সঙ্গে এ কালের তুলনামূলক আলোচনা শেষে গাঢ় কালিমায় আচ্ছন্ন সমকালীন বাঙালি সমাজের শোচনীয় অবস্থার দিকে শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, যখন আমরা শারীরিক বলবীর্য হারাইতেছি-যখন দেশীয় সুমহৎ সংস্কৃত ভাষা ও শাস্ত্রের চর্চা হ্রাস হইতেছে-যখন দেশীয় সাহিত্য ইংরেজি অনুকরণে পরিপূর্ণ-যখন দেশের শিক্ষাপ্রণালী এত অপকৃষ্ট যে তদ্দারা বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ না হইয়া কেবল স্মৃতিশক্তির বিকাশ হইতেছে- যখন বিদ্যালয়ে নীতিশিক্ষা প্রদত্ত হইতেছে না-যখন স্ত্রী শিক্ষার অবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত, যখন উপজীবিকা আহরণের বিশিষ্ট উপায় সকল অবলম্বিত হইতেছে না, যখন সমাজ সংস্কারে আমরা যথোচিত কৃতকার্য্য হইতে পারিতেছি না-যখন চতুর্দিকে পান দোষ, অসরলতা, স্বার্থপরতা ও সুখপ্রিয়তা প্রবল যখন আমাদিগে রাজ্য সম্বন্ধীয় অবস্থা শোচনয়ী-বিশেষত যখন ধর্মের অবস্থা অত্যন্ত হীন-তখন গড়ে আমাদিগের উন্নত কি অবনতি হইতেছে তাহা মহাশয়েরা বিবেচনা করুন।’’ ভাবুন, রাজনারায়ণ বসু সেই সময়েই বাঙালি সম্পর্কে কী ধ্যানধারণা পোষণ করছেন। বিশেষত বাঙালির অন্ধ অনুকরণপ্রিয়তা নিয়ে তো তিনি খুবই বিরক্ত ছিলেন। হিন্দু কলেজের ছাত্রদের এক পাত্র মদ্যপান আর গোলদীঘির কাছে গো-মাংস ভক্ষণ করে আধুনিক হওয়ার চেষ্টাকেও তিনি ভাল চোখে দেখেননি।

আজ আবার আমরা সে কাল ও এ কালের তুলনা করতে বসেছি। আবার আজ দেখছি বঙ্গসমাজের অধঃপতন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের প্রাথমিক আইডেন্টিটি এখন ছাত্রসত্তা নয়, তার চেয়েও আগে জানা বিশেষ প্রয়োজন, হে ছাত্র হে ছাত্রী তুমি এবিভিপি না এসএফআই। তুমি নকশাল না ছাত্র পরিষদ!!

এর পর আমি যদি নিজেকে বলি এক সিনিক প্রৌঢ় সাংবাদিক, ভুল বুঝবেন?