Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বর্ধমানে আগ বাড়িয়ে এগোতে নারাজ এনআইএ

জেহাদ-যোগের প্রমাণ যতই মিলুক, বর্ধমান বিস্ফোরণ-কাণ্ডে আপাতত আগ বাড়িয়ে কোনও রকম পদক্ষেপ করবে না জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। প্রথমে ঠিক ছ

সুরবেক বিশ্বাস
কলকাতা ০৮ অক্টোবর ২০১৪ ০৩:০৩

জেহাদ-যোগের প্রমাণ যতই মিলুক, বর্ধমান বিস্ফোরণ-কাণ্ডে আপাতত আগ বাড়িয়ে কোনও রকম পদক্ষেপ করবে না জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)।

প্রথমে ঠিক ছিল, সোমবার দিল্লি থেকে এনআইএ-র একটি দল বর্ধমানের খাগড়াগড়ে যাবে। পরে ঠিক হয়, দলটি যাবে মঙ্গলবার। কিন্তু পর পর দু’দিনই এনআইএ-র ওই সফর বাতিল করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এনআইএ-র ইউনিটকেও দিল্লির নির্দেশ ছাড়া নড়াচড়া করতে বারণ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তথা রাজ্য সরকারের গড়া যৌথ টাস্ক ফোর্স এই ব্যাপারে কত দূর কী করতে পারে এবং রাজ্য পুলিশ আদৌ তাদের সহযোগিতা চায় কি না, সেটা ক’দিন দেখে নিয়েই পদক্ষেপ করা হবে বলে এনআইএ সূত্রের খবর।

আইন অনুযায়ী, রাজ্যের সম্মতি ছাড়াই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কোনও ঘটনার তদন্তভার এনআইএ-কে দিতে পারে। তবে ২০০৯ থেকে এখনও পর্যন্ত এনআইএ গোটা দেশে সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত ৮৪টি মামলার তদন্তভার হাতে নিয়েছে এবং তা রাজ্যের সম্মতি নিয়েই। এখনও পর্যন্ত এই রাজ্যের দু’টি মামলার তদন্ত করছে এনআইএ। একটি মামলা কলেজ স্ট্রিটে গ্রেফতার হওয়া মাওবাদীদের টেকনিক্যাল অ্যান্ড রিসার্চ উইং-এর প্রধান সদুলা রামকৃষ্ণ-সহ সাত জনের বিরুদ্ধে। অন্য মামলাটি দক্ষিণ কলকাতার একটি পাঁচতারা হোটেলে তোলা চেয়ে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের হুমকি ফোনের অভিযোগের ভিত্তিতে রুজু করা হয়েছিল। ওই দু’টি মামলা রাজ্যই এনআইএ-কে দিয়েছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জোর করে নেয়নি।

Advertisement

সেই ধারাবাহিকতা বর্ধমান-কাণ্ডেও ভাঙতে চাইছে না দিল্লি। কারণ, বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত তৈরি হোক, সেটা এখনই মোদী সরকারের কাছে কাঙ্ক্ষিত নয়। এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বলেন, “সন্ত্রাস একা কেন্দ্রের বা একা রাজ্যের সমস্যা নয়। গোটা দেশেরই সমস্যা। তাই রাজ্যের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতেই এর মোকাবিলা করতে হবে।”

তবে এনআইএ-র বক্তব্য, বর্ধমানের তদন্তে তাদের যুক্ত হতে যত দেরি হবে, সূত্র পাওয়ার সম্ভাবনা ততই কমে আসবে। এনআইএ-র বক্তব্য, রাজ্য পুলিশ তদন্তভার নিজেদের হাতে রেখেও তাদের সাহায্য নিতেই পারত। কিন্তু রাজ্য পুলিশের একাংশের আচরণের ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে রাজ্যের তরফে লিখিত অনুরোধ ছাড়া এনআইএ এই ঘটনার তদন্তে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রেও যুক্ত হতে চাইছে না।

তা হলে বিস্ফোরণের পর থেকে এ পর্যন্ত এনআইএ কি কিছুই করে উঠতে পারেনি? ঘটনার পর দিন এনআইএ-র অফিসারেরা জখম আব্দুল হালিম ও তাঁর স্ত্রী আলিমা বিবি-র সঙ্গে দশ মিনিট করে এবং রাজিয়া বিবির সঙ্গে অল্প কিছুক্ষণ কথা বলতে পেরেছেন। তবে তাতে খুব বেশি লাভ হয়নি বলে মেনে নিচ্ছে এনআইএ। আরও কিছু তথ্য তারা পেয়েছে। তবে সেটা সরাসরি নয়, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা ইনটেলিজেন্স ব্যুরো (আইবি) মারফত।

বর্ধমান বিস্ফোরণে আন্তঃরাজ্য শুধু নয়, আন্তর্জাতিক জেহাদ-যোগেরও প্রমাণ মিলেছে। বিস্ফোরণ-কাণ্ডে নিহত দু’জনের অন্যতম শাকিল আহমেদ তো বটেই, অন্য জন, স্বপন মণ্ডল ওরফে সুবহান-ও বাংলাদেশের নাগরিক এবং সে দেশের জঙ্গি সংগঠন জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য বলে তদন্তকারীদের সন্দেহ। তাঁদের মতে, কওসর নামে যে ব্যক্তিকে খোঁজা হচ্ছে, যে ব্যক্তি মোটর সাইকেলে করে খাগড়াগড়ের ওই বাড়ি থেকে আইইডি (ইম্প্রোভাইজ্ড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) নিয়ে যেত, সে-ও জেএমবি-র সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিন (আইএম)-এরও যোগের সূত্র প্রাথমিক ভাবে পাওয়া গিয়েছে। নিহত শাকিলের মোবাইলের কল লিস্ট বলছে, মুম্বই, চেন্নাই, কাশ্মীর ও দুবাইয়ে নিয়মিত ফোন করা হত। বিভিন্ন রাজ্যের সীমানা ও দেশের সীমান্ত পেরনো সন্ত্রাসবাদের কথা মাথায় রেখেই বিশেষজ্ঞ সংস্থা হিসেবে এনআইএ-কে ২০০৮ সালে তৈরি করা হয়।

অথচ খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর দিন সেখানে যাওয়া এনআইএ-র অফিসারদের রাজ্য পুলিশ ও গোয়েন্দারা ঘটনাস্থলে ঘেঁষতেই দেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিস্ফোরণের পর দিন, ৩ অক্টোবর এনআইএ-র একটি দলকে ঘটনাস্থলে পাঠানোর সময়ে শীর্ষকর্তারা বলে দিয়েছিলেন, রাজ্য পুলিশকে সহযোগিতা করতে হবে। কিন্তু এনআইএ-র অভিযোগ, রাজ্য পুলিশের কিছু অফিসার তাদের কার্যত রবাহূত হিসেবে গণ্য করে সেই মতো আচরণ করেছিলেন!

এনআইএ-র বক্তব্য, গত বছর অক্টোবরে পটনার গাঁধী ময়দানে নরেন্দ্র মোদীর সভায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণ ও পটনা স্টেশনে বিস্ফোরণের তদন্তভার প্রথমে বিহার পুলিশ তাদের দেয়নি। কিন্তু গোড়া থেকে এনআইএ-র সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করেছিল তারা। এনআইএ-কে সেখানে কোনও অসহযোগিতা বা অপমানের মুখে পড়তে হয়নি। পরে, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে বিহার সরকার এনআইএ-র হাতে তদন্তভার তুলে দেয়। সরকারি ভাবে তদন্তে নামার পর এনআইএ-র দিশা পেতে কোনও অসুবিধে হয়নি, কারণ গোড়া থেকেই তারা বিষয়টির সঙ্গে যুক্ত ছিল। আবার এ বছর মে মাসে চেন্নাই সেন্ট্রাল রেল স্টেশনে বেঙ্গালুরু-গুয়াহাটি এক্সপ্রেসে জোড়া বিস্ফোরণের পর ঘটনাস্থলে এনআইএ গেলেও তামিলনাড়ু পুলিশ তাদের সহযোগিতা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল বলে অভিযোগ ওঠে। পরে অবশ্য তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতা নিজে বিবৃতি দিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটান। দু’দিনের মধ্যেই চেন্নাইয়ের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এনআইএ।

আইবি-র এক কর্তার বক্তব্য, খুন হলে ঘটনাস্থলে থানার পুলিশ যেমন যান, তেমনই যান হোমিসাইড শাখার গোয়েন্দারাও। ঠিক যেমন ডাকাতির ঘটনায় থানার অফিসারদের পাশাপাশি থাকেন ডাকাতি দমন শাখার অফিসারেরা। কারণ, খুনের তদন্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান হোমিসাইডের অফিসারদের থাকে। সে জন্য খুনের তদন্তের দায়িত্ব লিখিত ভাবে থানার হাতে থাকলেও অনেক সময়ে দেখা যায় হোমিসাইড শাখার সহযোগিতাতেই রহস্যের কিনারা হয়েছে, ধরা পড়েছে খুনি।

একই ভাবে সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে এনআইএ-র সম্যক জ্ঞান রয়েছে বলে গণ্য করা হয়। সংস্থার গোয়েন্দারা এই বিষয় নিয়েই বছরভর নাড়াচাড়া করেন বলে ঘটনার অতীত ও বর্তমানকে মেলাতে তাঁদের সুবিধে হয়। ফলে, সন্ত্রাসে অভিযুক্ত কাউকে জেরা করে সূত্র পাওয়াটাও তাঁদের পক্ষে তুলনায় সহজ। যেমন, ২০১৩-র মার্চে আইএমের চাঁই মনজর ইমামকে রাঁচির কাঁকে এলাকা থেকে গ্রেফতার করে এনআইএ। মনজরকে জেরা করেই জানা যায়, আইএমের বিহার মডিউল তৈরি হয়েছে এবং হায়দার আলি নামে এক জন তার মাথা। এই হায়দার আলি ওরফে ‘ব্ল্যাক বিউটি’-ই পটনায় নরেন্দ্র মোদীর সভাস্থল ও বুদ্ধগয়ায় ধারাবাহিক বিস্ফোরণের অন্যতম অভিযুক্ত। বুদ্ধগয়া বিস্ফোরণের প্রত্যক্ষদর্শী, শ্রীলঙ্কার নাগরিক এক মহিলার বর্ণনা শুনে এক সন্দেহভাজনের স্কেচ আঁকানো হয়েছিল এবং মনজর ইমাম বর্ণিত হায়দারের চেহারার সঙ্গে ওই স্কেচ হুবহু মিলে যায়। এনআইএ-র বক্তব্য, এ বছর মে মাসে হায়দারকে গ্রেফতার করতে ওই স্কেচ সাহায্য করেছিল।

তা ছাড়া, এনআইএ-র কাছে সন্ত্রাসবাদী ও তাদের কাজের ধরনের তথ্যভাণ্ডার এবং সন্দেহভাজনদের বহু ছবি রয়েছে। সেই সঙ্গে বিস্ফোরণস্থল থেকে থেকে নমুনা সংগ্রহ করার ক্ষেত্রেও এনআইএ পারদর্শী। আইবি-র এক অফিসারের কথায়, “অনেক সময়ে নমুনা সংগ্রহ ঠিক মতো হয় না বলে ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা তা থেকে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রেই বিস্ফোরণস্থলে পাওয়া ব্যাটারিকে গুরুত্ব না দিয়ে ফেলে দেন সাধারণ পুলিশ ও গোয়েন্দারা। কিন্তু ব্যাটারি থেকেই কোনও কোনও ক্ষেত্রে দু’-তিনটি পৃথক জায়গায় হওয়া বিস্ফোরণের যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছে। দেখা গিয়েছে, একই ধরনের ব্যাটারি তিনটি বিস্ফোরণেই ব্যবহার করা হয়েছে। এবং তা থেকে গোয়েন্দারা সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, সব ক’টি বিস্ফোরণই আইএমের একই মডিউল বা গোষ্ঠীর কাজ। পরে এনআইএ-র ওই সিদ্ধান্ত নির্ভুল প্রমাণিত হয়েছে।”

কিন্তু এখনও তো এনআইএ ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে অনেক তথ্য পেতে পারে?

এনআইএ-র এক কর্তার বক্তব্য, “কবে সেই সুযোগ আসবে বলা যাচ্ছে না। তা ছাড়া, যত দিন গড়াবে, ধৃতেরা ততই নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। জেরায় তথ্য পেতে ততই সমস্যা হবে।”

আরও পড়ুন

Advertisement