×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৪ জুন ২০২১ ই-পেপার

ক্ষত সেলাই করছেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা

গৌর আচার্য ও অভিজিৎ সাহা
রায়গঞ্জ ও মালদহ ১৫ জুলাই ২০১৫ ০২:২৬
রায়গঞ্জে ব্যান্ডেজ বাঁধছেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী।—নিজস্ব চিত্র।

রায়গঞ্জে ব্যান্ডেজ বাঁধছেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী।—নিজস্ব চিত্র।

তাঁরা শল্য চিকিৎসক বা নার্স নন। তাঁরা চতুর্থ শ্রেণির কর্মী।

অথচ তাঁরাই দুর্ঘটনায় জখম রোগীদের সেলাইয়ের কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে রায়গঞ্জ জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। এই হাসপাতালে ৬ জন ৬ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী দিনের পর দিন এমন ভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রোগীর পরিজনদের। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টা নাগাদ রায়গঞ্জের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ বিদ্যাভবনের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র গোপাল রবিদাস স্কুলে পড়ে যায়। রায়গঞ্জের বন্দর এলাকার বাসিন্দা ওই বালকের কপালে গভীর ক্ষত তৈরি হয়। খবর পেয়ে পরিবারের লোকজন গোপালকে রক্তাক্ত অবস্থায় রায়গঞ্জ জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিত্সকের পরামর্শে ওই বালককে দিলীপকুমার দাস নামে অস্থায়ী চতুর্থ শ্রেণির কর্মী পাশের একটি ঘরে নিয়ে যান। দিলীপবাবুই গোপালের কপালের ক্ষত পরিষ্কার করেন। পরে সেলাই করে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন। এর পর চিকিৎসক কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে ওই বালককে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিশ্রামে রাখার পরামর্শ দেন। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি এই কাজ করলেন কেন? দিলীপবাবুর দাবি, ‘‘অস্থায়ী চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের সেলাই ও ব্যান্ডেজের প্রশিক্ষণ রয়েছে। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র জরুরি বিভাগে আসা জখম রোগীদের সেলাই ও ব্যান্ডেজ বাঁধার কাজ করে থাকি।’’

চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা যে রোগীদের সেলাই ও ব্যান্ডেজের কাজ করেন তা মেনে নিয়েছেন হাসপাতাল সুপার অনুপ হাজরা। তাঁর দাবি, ‘‘হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত একজন চিকিত্সকের পক্ষে জরুরি বিভাগ ও প্রয়োজনে ওয়ার্ডে গিয়ে রোগী দেখে সেলাইয়ের কাজ করার সময় পান না।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা নিয়ম মতো সেলাইয়ের কাজ করতে পারেন না। কিন্তু চিকিৎসকের অভাব থাকায় আমরা তাঁদের বহুদিন আগেই সেলাই ও ব্যান্ডেজের প্রশিক্ষণ দিয়েছি।’’

Advertisement

একই চিত্র মালদহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও। ইঞ্জেকশন থেকে শুরু করে ক্ষতস্থানে সেলাই করতে দেখা যায় চতুর্থ শ্রেণির অনেক কর্মীকে। কিন্তু এই সব কাজ করার অধিকার তাঁদের নেই। মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ৯২ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মী রয়েছেন। তবে থাকার কথা রয়েছে ১৪৪ জন। প্রয়োজনের তুলনাই কম রয়েছে নার্সও। প্রায় ৩০০ জন নার্স রয়েছেন মেডিক্যালে। চতুর্থ কর্মীদের সাফাই করা, রোগীকে দেখভাল প্রভৃতি কাজ করার কথা। সেলাই করা বা ইঞ্জেকশন দেওয়ার অধিকার যে তাঁদের সেই সে কথা স্বীকার করে নিয়েছেন চিকিৎসকেরাও। তাঁরা জানান, ছোট হোক কিংবা বড়— সেলাই চিকিৎসকদেরই করা উচিত। না হলে সামান্য ভুলে রোগীর ক্ষতি হতে পারে। তা হলে বাস্তবে এর উল্টোটা হবে কেন? মালদহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার তথা সহঅধ্যক্ষ মহম্মদ আব্দুর রশিদ বলেন, ‘‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।’’ হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান তথা রাজ্যের মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী বলেন, ‘‘আমার কাছে এমন অভিযোগ কেউ করেননি। অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’’

মালদহ মেডিক্যাল ও রায়গঞ্জ হাসপাতালের মতো চাঁচলেও একই অভিযোগ উঠছে। চাঁচল হাসপাতাল বা হরিশ্চন্দ্রপুর হাসপাতালে নার্সরাই ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশন দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ। একই ভাবে চিকিত্সকদের বদলে সেলাই করে থাকেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা। যদিও স্বাস্থ্য দফতর সূত্রেই জানা গিয়েছে, ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশন দেওয়ার কথা চিকিত্সকদের। কেন না, নার্সদের ওই ইঞ্জেকশন দেওয়ার প্রশিক্ষণ নেই। একই ভাবে কেটে বা ছিঁড়ে গেলে তা সেলাই করার কথাও চিকিত্সকদেরই। কিন্তু চিকিত্সকেরা গুরুতর সমস্যা ছাড়া সেলাইয়ে হাত লাগানো তো দূরের কথা রোগীর কাছেও থাকেন না বলে অভিযোগ। চাঁচল মহকুমা হাসপাতালের এক চিকিত্সক স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘‘চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের অনেকেই বাড়িতে বা নিজের এলাকায় স্থানীয় কাটাছেঁড়ার রোগীদের সেলাই করে থাকেন। সে জন্য তাঁরা এতটাই দক্ষ যে, তাঁদের উপরে ভরসা করা যায়। আর তাই বিশেষ ক্ষেত্র ছাড়া চিকিত্সকেরা সেলাই করেন না।’’ এ জন্য যে মাঝে মধ্যে রোগীদের সমস্যা হচ্ছে তা কী হবে? সে প্রশ্নের উত্তর অবশ্য মেলেনি। তবে জেলা স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা বলেন, ‘‘শুধু চাঁচলে নয়, মালদহ— সর্বত্রই নার্সরাই ইন্ট্রাভেনাস ইঞ্জেকশন দিয়ে থাকেন। চতুর্থ শ্রেণইর কর্মীরা সেলাইয়ের কাজ করে থাকেন।’’ যদিও জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক দিলীপ মণ্ডল বলেন, ‘‘চিকিত্সকের তত্বাবধানে যাতে ওই কাজ হয় সে দিকে কড়া নজর রাখা হচ্ছে। রোগীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে এমন অভিযোগ পেলে কাউকে ছাড়া হবে না।’’

তবে রোগী ও তার পরিজনদের প্রশ্ন, এ ভাবে আর কতদিন চলতে পারে? প্রশিক্ষণ থাকা সত্ত্বেও নার্সরাই যদি একটা শিশুর আঙুল কেটে দিতে পারে, তা হলে চতুর্থ কর্মীরা সেলাই বা ইঞ্জেকশন করলে আরও বড় বিপদ যে কোনও সময় হতে পারে। এই উত্তর অবশ্য মেলেনি কারও কাছ থেকে।

সহ প্রতিবেদন: বাপি মজুমদার।

Advertisement