×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৮ মে ২০২১ ই-পেপার

বৃষ্টি হোক না হোক, ‘জলপার’ করতেই ১০ টাকা!

দেবাশিস দাশ ও সুপ্রিয় তরফদার
১৪ অগস্ট ২০১৮ ০০:০৯
হয়রানি: জল এড়াতে রাস্তার ধার দিয়ে লাইন করে সাবওয়েতে ঢুকছেন যাত্রীরা ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার

হয়রানি: জল এড়াতে রাস্তার ধার দিয়ে লাইন করে সাবওয়েতে ঢুকছেন যাত্রীরা ছবি: দীপঙ্কর মজুমদার

কাঁধে ব্যাগ, হাতে জুতো, হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে নোংরা জলে থইথই সাবওয়ে পার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। পাশেই জল থেকে বাঁচতে উঁচু জায়গা দিয়ে যাওয়ার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রীরা। আর মাত্র ১২-১৪ মিটারের ওই সাবওয়ে পার করিয়ে দিতে রিকশাচালকেরা হাঁক পাড়ছেন, ‘জল পার ১০ টাকা।’ বৃষ্টি হোক বা না হোক, মাসের অধিকাংশ সময়ে এ ভাবেই জল জমে থাকে ওই সাবওয়েতে।

বেহাল ও ভোগান্তির এই নিত্যচিত্র দক্ষিণ-পূর্ব রেলের হাওড়া-খড়্গপুর শাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল স্টেশন সাঁতরাগাছি সাবওয়ের। বর্তমানে স্টেশনটি সংস্কারের কাজ চলছে। তৈরি হচ্ছে বিশাল ভবন। কিন্তু প্রদীপের নীচে অন্ধকার ঠিক কেমন হতে পারে, তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন নিত্যযাত্রীরা। এই জল-সমস্যা নিয়ে ইতিমধ্যেই হাওড়া পুরসভা ও রেলের টানাপড়েন শুরু হয়েছে। যদিও রেলের আশ্বাস, সমস্যা মেটাতে জেলা প্রশাসন ও হাওড়া পুরসভার সঙ্গে বৈঠক হবে।

নিত্যযাত্রীরা জানান, হাওড়া থেকে সাঁতরাগাছি দিয়ে দক্ষিণ ও মধ্য কলকাতায় পৌঁছনো অনেকটাই সহজ। সাঁতরাগাছি স্টেশনের পাশেই কোনা এক্সপ্রেসওয়ে, সেই রাস্তা ধরে দ্বিতীয় হুগলি সেতু পার হলেই মহানগরী। ভিন জেলা থেকে এসএসকেএম হাসপাতালে আসা অধিকাংশ রোগী এই পথ বেছে নেন। তবে কলকাতাগামী বাস ধরতে গেলে সাঁতরাগাছির ওই সাবওয়ে পার করে স্ট্যান্ডে পৌঁছতে হয়। তখনই জলের কারণে নাস্তানাবুদ হতে হয় তাঁদের। এক নিত্যযাত্রী কালু পুরকাইত বলেন, ‘‘মাত্র ১২-১৪ মিটার সাবওয়ের পার করতে প্রতিদিন ১০ টাকা করে রিকশা ভাড়া দিতে হয়। দূষিত জল থেকে রোগেরও সম্ভাবনা থাকে।’’

Advertisement

কিন্তু কেন এমন অবস্থা? রেলের দাবি, ওই আন্ডারপাসের উচ্চতা না বাড়ালে এই সমস্যা মেটানো সম্ভব নয়। এর জন্য রেল দায়ী করছে আটের দশকের হাওড়া পুরসভার বামফ্রন্ট বোর্ডকে। রেলের তরফে দাবি, সাঁতরাগাছি স্টেশনের আগে কোনা এক্সপ্রেসওয়ের উপরে যে রেল সেতু রয়েছে, সেগুলি তৈরির সময়েই রেলের তরফে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল যে, ওই সেতুগুলি গ্যারেজ মোড়ে না শেষ করে আরও ৫০০ গজ দূরে আন্ডারপাস পেরিয়ে শেষ করা হোক। রেলের বক্তব্য ছিল, সেতুর ওইটুকু দৈর্ঘ্য বাড়ালে ওই জায়গায় যানজটের সম্ভাবনা থাকত না। তেমনই সাবওয়ের উচ্চতাও প্রয়োজনমতো বাড়ানো যেত। কিন্তু পুরসভার আপত্তিতে সেই প্রস্তাব কার্যকর করা যায়নি। তারই খেসারত এখন বছরের পর বছর দিয়ে যেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের এক কর্তার কথায়, ‘‘সাবওয়ে খুব নীচু বলে এই সমস্যা। তখন পুরসভা বাধা না দিলে হলে এই সমস্যা হত না। এখন কোনা এক্সপ্রেসওয়ের এলিভেটেড করিডর তৈরি হওয়ার পর একপ্রেসওয়ে বন্ধ করে সাবওয়ের উচ্চতা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া আর উপায় নেই।’’

জল জমার সমস্যার জন্য আবার রেলকে কাঠগ়ড়ায় তুলছে হাওড়া পুরসভা। পুর কর্তৃপক্ষের দাবি, রেল স্টেশনের সংস্কার করতে গিয়ে সামনের জলাভূমি বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে জলাভূমিগুলির জলধারণের ক্ষমতা কমেছে। জল বেরনোর রাস্তা পাচ্ছে না।

হাওড়ার ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বিনোদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর তিন বছর পরেও ওই আসনে নির্বাচন না হওয়ায় পুরো ওয়ার্ডটি কার্যত অভিভাবকহীন ছিল। গত বছর থেকে ওয়ার্ডটি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয় ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ত্রিলোকেশ মণ্ডলকে। আন্ডারপাসে জমা জলের সমস্যা নিয়ে তাঁর বক্তব্য, ‘‘রেল স্টেশন সংস্কারের নামে দু’টি জলাভূমি বুজিয়ে দিয়েছে। সমস্ত নিকাশি ব্যবস্থা অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। তাই জল বেরোবার রাস্তা পাচ্ছে না।’’

রেলের তরফে অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক সঞ্জয় ঘোষ বলেন, ‘‘সমস্যা মেটাতে সম্প্রতি জেলা প্রশাসনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। বৈঠক করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। বর্তমানে পাম্প বসিয়ে জল সরানোর কাজ হচ্ছে।’’ তবে তা পর্যাপ্ত নয় বলেই অভিযোগ নিত্যযাত্রীদের।

Advertisement