ধর্নামঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
‘‘আগামিকাল এসআইআর শুনানি রয়েছে সুপ্রিম কোর্টে। আমাদের আস্থা আছে আইনের উপরে। কিন্ত আমাদের লড়াই তত ক্ষণ চলবে, যত ক্ষণ না ৬০ লক্ষ মানুষকে তাঁদের ক্ষমতা না ফিরিয়ে দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। জ্ঞানেশ কুমার বলছেন, রাজ্য সরকারের ডিইও, এআরও, এইআরও এরা দায়ী! পোর্টাল করেছেন আপনি। মাইক্রো অবজ়ারভার, রোল অবজ়ারভার লাগিয়ে নতুন করে অফিস খুলিয়ে নাম কাটিয়েছেন আপনি। দিল্লি থেকে সফট্অয়্যার চালিয়ে হেয়ারিং নোটিস পাঠিয়েছেন আপনি। আর দোষ চাপাচ্ছেন রাজ্য সরকারের উপর! রাজ্য সরকারের ফুল বেঞ্চ থাকুক। নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ থাকুক। পদে পদে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করেছেন আপনারাই।’’
‘‘তৃণমূলের অনেকের উপর ইডি-সিবিআই করেছে। আমরা বশ্যতা স্বীকার করিনি। মেরুদন্ড বিক্রি করিনি। আমরা মাথানত করব না।’’
‘‘যে ২০০ জন এসআইআরের জন্য মারা গিয়েছেন, তাঁদের ৫০ শতাংশ হিন্দু। একনায়কতন্ত্র চালিয়ে যাওয়ার জন্য সকলের উপর অত্যাচার করেছেন। অন্ধ্র লড়াই করেছে পারেনি। বাংলা শেষ পর্যন্ত লড়বে। এই মাটি থেকে ছাব্বিশের লড়াই হল। ছাব্বিশে বাংলার জয় দিয়ে ভারতে দ্বিতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হবে।’’
অমিত শাহকে ফের নিশানা করে অভিষেক বলেন, ‘‘আপনি বলছেন দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়বেন। আপনার ডান দিকে, বাঁ দিকে যারা বসে আছে, তারা সবাই কোনও না কোনও কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত। তাদের সকলের মাথায় সিবিআইয়ের চারটে-পাঁচটা করে কেস ঝুলছে। আপনি কাকে বলছেন দুর্নীতিমুক্ত বাংলা গড়বেন? আপনি নিজে জেলখাটা আসামি। সেই অমিত শাহ এসে জ্ঞান দেবেন?’’
বিজেপির স্লোগানকে কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, ‘‘আপনি কী পাল্টাতে চান। আপনি বাংলার মানুষের খাবার পাল্টাতে চান, কৃষ্টি-সংস্কৃতি পাল্টাতে চান— এই বদল আনতে চান। আপনি চান ধর্মের নামে রাজ্যে হানাহানি হোক। একটা বাঙালি বেঁচে থাকতে বাংলায় এই পরিবর্তন করতে পারবেন না। আমাদের যতই ব্যঙ্গ করুন।’’
‘‘অমিত শাহকে বলতে চাই, আপনার জ্ঞানেশ কুমারকে বলুন না , কত জন ‘ঘুসপেটিয়া’ আছে? সংখ্যা প্রকাশ্যে বলুন। না-হলে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান। বাংলা বললে বাংলাদেশি বলা হচ্ছে।’’
মমতা বলেছেন, ধর্না চলবে। তিনি মঙ্গলবারও সকলকে ধর্নামঞ্চে যেতে বলেছেন। সেই মঞ্চ থেকে আবেদন জানালেন অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘আমি দিদিকে অনুরোধ করব... চার দিন হয়েছে। আপনি মানুষের স্বার্থে রাস্তায় থাকতে চান। কিন্তু বাংলার ১০ কোটি মানুষের স্বার্থে আপনার সুস্থ থাকা অত্যন্ত জরুরি। ঝড়-জল-বৃষ্টির মধ্যে আপনি নিজের শরীরের উপর এই অত্যাচার আর করবেন না। তৃণমূলের ছাত্র-যুব তো রাস্তায় আছে। আমরা তো ময়দানে আছি। ১ লক্ষ বিএলএ-টু আছে। ৩৩০০ অঞ্চল সভাপতি আছে। ১ লক্ষ বুথ সভাপতি আছে। সাড়ে তিন হাজার ওয়ার্ড প্রেসিডেন্ট আছে। বুথে বুথে তৃণমূলের প্রহরী আছে। আমরা বুঝে নেব। আমরা শুধু ভোটের সময় রাজনীতি করতে আসি না।’’
‘‘আমি জ্ঞানেশবাবুকে বলব, ক্ষমতায় থাকলে আপনি করে দেখান। আপনি বলেছিলেন, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির তালিকা প্রকাশ করব না। করিয়েছি। ঠেলায় না পড়লে বিড়াল গাছে ওঠে না। ‘ম্যাপড’ কেসে, মানে ২০০১ সালের ভোটার তালিকায় পরিবারের কারও কারও নামে নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা হয়, আপনি কোন অধিকারে ভোটাধিকার কাড়তে পারেন জবাব দিন। আমার একটাই প্রশ্ন, যাঁদের নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠিত, তাঁদের নাম কোন অধিকারে কাড়বেন, সেই জবাব দিন।’’
ভোট নিয়ে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ অভিষেকের। তিনি বলেন, ‘‘আপনি যত দফার ভোট করার করুন। সবে দফারফা করব। গত বার কোভিডের সময় আট দফায় ভোট করেছেন। কত মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন। দফায় দফায় আঘাত করেছি, গণতান্ত্রিক ভাবে জবাব দিয়েছি বিজেপিকে। প্রথম দফায় আপনাদের হাত ভেঙেছিলাম। দ্বিতীয় দফায় পা ভেঙেছিলাম। তৃতীয় দফায় কোমর... এ বার এক দফায় ভোট করুন। সকাল থেকে রাতের মধ্যে রাজনৈতিক ভাবে মাজা, কোমর, শিরদাঁড়া সব ভেঙে মানুষ জবাব দেবে।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘দিল্লি থেকে একজন আমলা ফোন করেছিলেন। বলছেন, এদের ষড়যন্ত্র আরও বৃহৎ। গরিবের অ্যাকাউন্টে যে টাকা আছে, সেগুলো আত্মসাৎ করবে বিজেপি নেতারা। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করবে কেন্দ্রীয় সরকার। পরবর্তী কালে যদি আপনার নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায়, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আপডেট করতে গেলে বলবে কেওয়াইসি জমা করো, ভোটার কার্ড দাও। ভোটার কার্ড দিতে না পারলে মোদীবাবু অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করে টাকাটা নিজেদের নামে নেবে। এটাই এঁদের ষড়যন্ত্র।’’
‘‘আপনি যদি স্বচ্ছ হন, তা হলে আপনি আগে ইস্তফাপত্র পাঠান। জেলে যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক সন্ন্যাস নিতে হলে প্রথমে আপনারই পদত্যাগ করা উচিত।’’
অভিষেক বলেন, ‘‘তিনি (অমিত শাহ) বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি ক্ষমতায় আসেন ভাইপো রাজ্য চালাবেন। উনি নাম নিতে ভয় পান বোধহয়। আমি এই মঞ্চ থেকে চ্যালেঞ্জ করছি। আপনি বলেছেন, তৃণমূল পরিবারকেন্দ্রিক দল। আমি বলি, সংসদে বিল আনুন। এক পরিবার থেকে এক জনই রাজনীতি করবে। সেই বিলে ভোট দিয়ে আমি রাজনীতি ছাড়ব। আপনার ক্ষমতা থাকলে আপনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন।’’
অভিষেক নিশানা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে। তাঁর কথায়, ‘‘উনি বলেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি ক্ষমতায় আসেন ভাইপো রাজ্য চালাবেন। উনি নাম নিতে ভয় পান বোধহয়। আমি এই মঞ্চ থেকে চ্যালেঞ্জ করছি। আপনি বলেছেন, তৃণমূল পরিবারকেন্দ্রিক দল। আমি বলি, সংসদে বিল আনুন। এক পরিবার থেকে এক জনই রাজনীতি করবে। সেই বিলে ভোট দিয়ে আমি রাজনীতি ছাড়ব। আপনার ক্ষমতা থাকলে আপনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন।’’
মঞ্চে অভিষেক। তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা আমাদের বঞ্চিত করে রেখেছে, তাঁদের জবাব দেওয়ার এই ভোট। গতকাল আমি মন্দিরবাজার গিয়েছিলাম। আমার সভা ছিল। গত সপ্তাহে অমিত শাহ গিয়েছিলেন। ৩০ মিনিট বক্তৃতা করেছিলেন। তিনি যতগুলো কথা বলেছিলেন, তার তথ্য ভুল। আমি সেটা পরিসংখ্যান দিয়ে তুলে ধরেছি। এনসিআরবি-র তথ্য দিয়েছি। মহিলাদের উপর অত্যাচার, নারী নির্যাতন, আদিবাসীদের উপর অত্যাচারে ‘গোল্ড মেডেল স্টেট’ ডবল ইঞ্জিন সরকার।’’
কমিশনকে নিশানা করে মমতা বলেন, ‘‘অফিসারদের ভয় দেখাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের বলব মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। এখানকার মানুষ মাথা নত করবে না। আর মে মাসের পর (ভোটের পর) দু’মাস আপনি একটু জবরদস্তি করবেন। ট্যাক্টফুললি হ্যান্ডল করে নেবেন অফিসাররা। তার পর আপনি নিজে কোথায় থাকবেন, তার ঠিক নেই। আপনি মে-র পরেও ব্যবস্থা নেবেন? যেন ‘সুপার গড’ হয়ে গিয়েছে! স্পাইডারম্যান হয়ে গেছে! যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। ওটা তো ছোটদের ভয় দেখানোর জন্য। এখানে ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছেন। একদিন আপনাদের মানুষের পায়ে পড়তে হবে। আপনাদের মতো লোক থাকলে গণতন্ত্রের সর্বনাশ হয়।’’ বিজেপিকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘বাংলার জন্য হ্যাংলা হয়ে গিয়েছে।’’
‘‘আমাদের একটা পয়েন্ট। সবাইকে ভোটাধিকার দিন। বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ করছি। আমাদের একটাই ইস্যু।’’
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমি তো বাংলাদেশের কথা বলিনি। বাংলার কথা বলেছি। বাংলাদেশ আর বাংলা এক নয়। হামলা করে, ভয় দেখিয়ে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়ে যদি ভাবেন ক্ষমতা দখল করব... এত মানুষ মারা গিয়েছেন। সবার পরিবার বাদ দিয়ে শুধু নিজের পরিবার দুধে-ভাতে থাকবে, সেটা হবে না।’’
মমতার নিশানা আমলাদের একাংশকেও। পাশাপাশি সেনা নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘‘কোথাও কোথাও আর্মিতেও পার্টি অফিস বানিয়েছিল। তাই আমাদের মঞ্চ ভেঙে দিতে গিয়েছিল। ওরা কিন্তু কোনও দিন এ সব করে না। চিরদিন নিরপেক্ষ থেকেছে। এখন একপক্ষ হয়ে গেছে সবাই। বিশেষ করে এজেন্সিগুলো। কেন্দ্রের কাউকে ডাকুন। রেলের কাউকে ডাকলে যাচ্ছেই না। যদি ট্রান্সফার করে দেয়। চাকরিটা আমিই দিয়েছিলাম। যারা আজকের এগুলো করছে। রেকর্ড কিন্তু থেকে যাচ্ছে। কাল বিজেপি চলে যাবে। তখন কোথায় যাবেন? তখন তো আমি আপনাকে ফার্স ট্রান্সফার করব।’’
ধর্নামঞ্চ থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করলেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘মে মাসের পরেও নাকি উনি অ্যাকশন নেবেন! আমি বলি, সাহস থাকা ভাল, দুঃসাহস ভাল নয়।’’ তিনি অভিযোগ করেন, এসআইআরের জন্য স্ট্রোকে মারা গিয়েছেন। সেই খবর কি কমিশন রেখেছে?
জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
প্রশাসন থেকে শুরু করে সকলকে ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পরে বলেন, ‘‘কালকেও চলে আসবেন সময়মতো।’’
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy