Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৫ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

নতুন সেলে সিসিটিভির ত্রিনয়নেও বন্দি কুণাল

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ১৭ নভেম্বর ২০১৪ ০২:৫৭

এত দিন তাঁর উপরে চোখ রাখত মাত্র একটি সিসিটিভি। এ বার প্রেসিডেন্সি জেলে তিনটি যান্ত্রিক চোখের নজরদারিতে থাকতে হবে কুণাল ঘোষকে। একটি সিসিটিভি থাকছে তাঁর সেলের ভিতরে। দ্বিতীয়টি সেলের ঠিক বাইরেই। আর তৃতীয় ক্লোজ্ড সার্কিট টিভি নজর রাখবে সেলের সামনের ওয়াচটাওয়ার বা নজরমিনার থেকে।

আট ঘাট বেঁধে পাহারা দেওয়ার জন্যই রবিবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আগেকার ২০ নম্বর সেলের বদলে কুণালকে রাখা হয়েছে ন’নম্বরে। কারণ, ন’নম্বর সেলের ঠিক বাইরেই আছে একটি ওয়াচটাওয়ার বা নজরমিনার। এবং তাতেই থাকছে তৃতীয় সিসিটিভি। কারারক্ষীদের পাহারা তো থাকছেই। সেই সঙ্গে ২৪ ঘণ্টা কুণালকে চোখে চোখে রাখবে কলকাতা পুলিশও। ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহননের চেষ্টার পরে কুণালকে আর কোনও ভাবেই নজরছাড়া করতে চাইছেন না পুলিশ-প্রশাসন ও কারা-কর্তৃপক্ষ। তাই তাঁর সেলের ভিতরে শৌচকর্মের জন্য নির্দিষ্ট জায়গার সিমেন্টের দেওয়ালটাও ভেঙে ফেলা হয়েছে। যাতে শৌচকর্মের সময়েও তিনি সিসিটিভি এবং রক্ষীদের নজরের বাইরে যেতে না-পারেন।

ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করায় বৃহস্পতিবার রাতে এসএসকেএমের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট বা সিসিইউ-এ ভর্তি করানো হয় তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হওয়া সাংসদ কুণালকে। শুক্র ও শনি তাঁর নানান শারীরিক পরীক্ষানিরীক্ষা হয়। প্রশ্ন উঠছে, সিসিইউ-এর রোগীকে জেনারেল ওয়ার্ডে না-পাঠিয়ে কেন ঠিক দু’দিনের মাথায়, ছুটির দিনে নজিরবিহীন ভাবে মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হল?

Advertisement

পিজি-কর্তৃপক্ষ জানান, রবিবার সন্ধ্যার পরে হাসপাতাল-চত্বর তুলনায় ফাঁকা থাকে। তাই ভিড় এড়াতে এ দিন বোর্ড বসানোর জন্য পুলিশ তাঁদের অনুরোধ করেছিল। তাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় বোর্ডের সদস্যেরা কুণালকে পরীক্ষা করেন। তাঁর সব মেডিক্যাল রিপোর্ট খতিয়ে দেখা হয়। তার পরেই তাঁকে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। পৌনে ৮টায় তাঁকে মেন বিল্ডিং থেকে পুলিশি ঘেরাটোপে বার করে তুলে দেওয়া হয় প্রিজন ভ্যানে। মুহূর্তের মধ্যেই ভ্যান ছোটে জেলের দিকে। তাঁকে সেলে ঢোকানো হয় হাসপাতালের পোশাকেই।

পিজি-র একটি সূত্র জানাচ্ছে, কুণাল সংবাদমাধ্যমে মুখ খোলায় প্রথম থেকেই তাঁকে নিয়ে অস্বস্তিতে আছে প্রশাসন। হাসপাতালে তাঁকে ঘিরে যে-ভাবে পুলিশি প্রহরা থাকছে, তাতে সাধারণ রোগী এবং তাঁদের পরিজনদের সমস্যা হচ্ছে। তাই এ দিন তড়িঘড়ি তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। রোগীর অবস্থা খুব আশঙ্কাজনক না-হলে রবিবার সাধারণত মেডিক্যাল বোর্ড বসে না। পিজি সূত্রে জানা গিয়েছে, কুণালের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। রক্তচাপ, নাড়ির গতি স্বাভাবিক। এই অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসার প্রয়োজন নেই।

কুণালকে এত দিন রাখা হয়েছিল প্রেসিডেন্সি জেলের ১-২২ সেল-ব্লকের ২০ নম্বর সেলে। কিন্তু এ দিন হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে এনে তাঁকে সরাসরি ন’নম্বর সেলে ঢোকানো হয়। ওই সেলে রাখা হয়েছিল মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে জঙ্গি হানার মামলায় দণ্ডিত জামিলুদ্দিন নাসিরকে। তাকে সরানো হয়েছে অন্য সেলে। হাসপাতাল থেকে ফিরেই কুণাল জানতে পারেন, তাঁর সেল পরিবর্তন হয়েছে। সিসিটিভির মাধ্যমে তাঁর গতিবিধি ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হবে। কিন্তু তিনি তো কোনও দাগি জঙ্গি নন। জেলে বসে পাকিস্তানে স্ত্রীকে ফোন করছেন বা তোলাবাজির সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন, এমন কোনও অভিযোগও নেই তাঁর বিরুদ্ধে। তা হলে এই নিরাপত্তার ঘেরাটোপ কেন?

জেল সূত্রের খবর, সারদা গোষ্ঠীর আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অন্যতম অভিযুক্ত কুণাল এমন এক জন বিপজ্জনক বন্দি, যিনি আগাম ঘোষণা করে জেলেই ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালাতে পারেন। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারেন, কারা প্রশাসনের নজরদারি কতটা ঠুনকো। তাই কুণালের নিরাপত্তার ব্যাপারে আর কোনও ঝুঁকি নিতে চাইছে না রাজ্য প্রশাসন।

প্রেসিডেন্সি জেলের ২০ নম্বর সেলেই গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন কুণাল। কারা দফতরের কর্তারা জানাচ্ছেন, নজরদারির সুবিধার জন্যই তাঁকে অন্য সেলে পাঠানো হয়েছে। এক কারাকর্তা বলেন, “ন’নম্বর সেলের সামনেই জেলের একটি টাওয়ার রয়েছে। ওই টাওয়ারে একটি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে সরাসরি কুণালের সেলের দিকে তাক করে। তবে ওই ক্যামেরা শুধু কুণালের সেল নয়, তার আশপাশেও নজর রাখবে।” কারারক্ষীরা জানান, সাধারণ ভাবে সেলেই বন্দিদের জন্য এক কোণে ছোট্ট দেওয়াল তুলে শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হয়। কুণালকে কড়া নজরদারিতে রাখতে ওই দেওয়াল ভেঙে ফেলা হয়েছে। কারণ, দেওয়ালের আড়ালে বসে কুণাল রক্ষীদের নজর এড়িয়ে আবার কিছু ঘটিয়ে ফেলতে পারেন। তাই সেলের ভিতরে এমন ভাবে ক্যামেরা বসানো হচ্ছে, যাতে শৌচকর্মে বসলেও তাঁর উপরে নজরদারি রাখা যায়।

১০ নভেম্বর কুণাল আদালতে ঘোষণা করেন, সারদা কাণ্ডে প্রকৃত অপরাধীদের তিন দিনের মধ্যে গ্রেফতার না-করলে তিনি আত্মহত্যা করবেন। তার পরে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে জেলের নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন কুণাল। প্রাথমিক তদন্ত বলছে, তিনি ঘুমের ওষুধ পেয়েছিলেন বাইরে থেকে। এই অবস্থায় তাঁকে নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মুড়ে ফেলতে চাইছে রাজ্য প্রশাসন। কারা দফতরের এক শীর্ষ কর্তা বলেন, “কুণালের সেলের ভিতরে-বাইরে তিনটি সিসি ক্যামেরার সব ক’টিই লাগিয়েছে কলকাতা পুলিশ। শুধু ওঁর উপরে নয়, ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চালানো হবে প্রেসিডেন্সি জেলের অফিসের উপরেও।”

জেলে সিসিটিভি-র মাধ্যমে কলকাতা পুলিশের এমন নজরদারি নতুন না-হলেও বিরল বলে জানাচ্ছেন কারাকর্তারা। মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের সামনে হামলায় দণ্ডিত আফতাব আনসারি-সহ কয়েক জন বন্দির উপরে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চালিয়েছিল তারা। কিন্তু এখনও রাজ্যসভার সদস্য-পদে আছেন, এমন বন্দির উপরে পুলিশের এই ধরনের নজরদারি এই প্রথম। কারা প্রশাসন সূত্র জানাচ্ছে, শুক্রবার রাতে জেলে সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। রবিবার কুণাল জেলে ফিরছেন, এটা মাথায় রেখে তার আগেই ডিসি (দক্ষিণ) মুরলীধর শর্মার নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল দু’দিনে ক্যামেরা লাগানোর কাজ শেষ করেছে।

কুণালের আত্মহত্যার চেষ্টার পরে কারা প্রশাসন সার্বিক ভাবেই বন্দিদের উপরে নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কুণালের মতো ‘হাই-প্রোফাইল’ বন্দিদেরও সারা শরীর খুঁটিয়ে তল্লাশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জেল সুপারদের। প্রাণসংশয় হতে পারে, এমন ওষুধ আর বন্দিদের হাতে দেওয়া যাবে না। কারারক্ষীরাই ওষুধ খাইয়ে দেবেন বন্দিদের।

আরও পড়ুন

Advertisement