ডিএ মামলায় বকেয়া সংক্রান্ত আবেদনে পুরনো নির্দেশই বহাল রাখল সুপ্রিম কোর্ট। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
২০১৯ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের যে বকেয়া ডিএ ছিল, তার ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। বেঁধে দিল সময়ও। বাকি বকেয়ার ৭৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার জন্য নতুন কমিটি গঠনের কথা বলে সুপ্রিম কোর্ট। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে চার সদস্যের কমিটি হবে। বকেয়া কী ভাবে, কতগুলি কিস্তিতে দিতে হবে সে বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে ওই কমিটি। তবে কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের বর্তমানে যে ৪০ শতাংশ ডিএ-র ফারাক, তার সঙ্গে বৃহস্পতিবারের নির্দেশের কোনও সম্পর্ক নেই। প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিল, তা পুরনো বকেয়া পরিশোধ সংক্রান্ত মামলাতেই।
গত বছর ১৬ মে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্রের বেঞ্চ রাজ্যেকে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মিটিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট প্রথমে জানিয়েছিল, বকেয়া ডিএ-র ৫০ শতাংশ দিয়ে দিতে হবে রাজ্যকে। কিন্তু রাজ্যের তরফে আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি জানান, ৫০ শতাংশ বকেয়া ডিএ দেওয়া এখনই সম্ভব নয়। তা হলে রাজ্য চালানো যাবে না। তখন আদালত জানায়, অন্তত ২৫ শতাংশ বকেয়া ডিএ দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। অর্থাৎ, ২০০৮ সালের অগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যে পরিমাণ ডিএ বকেয়া ছিল, তার ২৫ শতাংশ মেটানোর নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেই নির্দেশের ভিত্তিতে আবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার। বকেয়া মেটানোর সময় বৃদ্ধির আবেদন করা হয়। বৃহস্পতিবার সেই মামলার রায় দিতে গিয়ে আদালত জানাল, ডিএ সরকারি কর্মচারীদের আইনি অধিকার। তাই বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দিতে হবে। অর্থাৎ, নিজেদের পুরনো অবস্থানেই অনড় রইল সুপ্রিম কোর্ট।
রাজ্য সরকারি কর্মীদের একাংশের আইনজীবী করুণা নন্দী বলেন, ‘‘এর আগে সুপ্রিম কোর্ট অন্তবর্তী নির্দেশে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দিয়ে দিতে বলেছিল। রায় ঘোষণা করে আদালত ওই ২৫ শতাংশ এখনই দিতে বলেছে। বাকি বকেয়া নিয়ে একটি কমিটি গঠন করতে বলেছে শীর্ষ আদালত। সেই কমিটি রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে কী ভাবে বাকি বকেয়া দেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্পষ্ট, বকেয়া ডিএ দিতে হবে রাজ্যকে।’’
২৫ শতাংশ দেওয়ার পরেও বকেয়া ডিএ-র আরও ৭৫ শতাংশ বাকি থাকবে। সেই বকেয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ওই চার সদস্যের কমিটি। বকেয়া কী ভাবে, কতগুলি কিস্তিতে দিতে হবে সে বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে ওই কমিটি।
পুরনো রায়ই বহাল রইল সুপ্রিম কোর্টে। বৃহস্পতিবার আদালত স্পষ্ট জানায়, বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দিতে হবে। মার্চের মধ্যে বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। তবে কবের মধ্যে তা দিতে হবে, সেই তারিখ স্পষ্ট নয়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রতিলিপি মিললে তবেই তা জানা যাবে।
বকেয়া ডিএ দেওয়ার বিষয়ে নতুন কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিল সুপ্রিম কোর্ট। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে চার সদস্যের কমিটি হবে। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, রোপা রুল নিয়ে অনুযায়ী ডিএ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের অধিকার।
সুপ্রিম কোর্টে রায়দান শুরু। ডিএ মামলার রায় পড়ছেন বিচারপতি সঞ্জয় কারোল।
রাজ্যের আবেদন খারিজ করে সরকারি কর্মচারীদের পক্ষে রায় দিয়েছিল হাই কোর্ট। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় রাজ্য সরকার। সেই মামলায় রাজ্যকে আগেই বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল শীর্ষ আদালত। এ জন্য ছ’সপ্তাহ সময়ও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই সময়সীমার মধ্যে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ দিতে পারেনি। আদালতের কাছ থেকে আরও ছ’মাস সময় চাওয়া হয়। সেই আবেদনের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ৪ অগস্ট থেকে ৭ অগস্ট প্রতি দিনই শুনানি চলেছে বিচারপতি সঞ্জয় কারোল এবং বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্রের বেঞ্চে। এর পরে গত ১২ অগস্ট সুপ্রিম কোর্টে ডিএ মামলার শুনানি পিছিয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গত ৮ সেপ্টেম্বর এই মামলার শুনানি শেষ হয়।
রাজ্যের দাবির প্রেক্ষিতে আদালত জানিয়েছিল, ওই রায়গুলি ছিল কারখানার শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। সেখানে কোনও আইনগত সার্ভিস রুল ছিল না। কিন্তু এখানে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্ট্যাটিউটরি রুল (রোপা) আছে। তাই রাজ্য সরকারের দেওয়া উদাহরণ গ্রহণযোগ্য নয়।
আদালত আরও জানায়, সবাই একই রাজ্য সরকারের কর্মচারী। সবাই একই নিয়মে নিয়োগ পেয়েছেন। আলাদা ডিএ দেওয়ার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। এটি সংবিধানের ১৪ নম্বর ধারার লঙ্ঘন।
রাজ্যের দাবি, দিল্লি, কলকাতা, গ্রামের জীবনযাত্রার খরচ এক নয়। তাই ডিএ এক রকম হওয়া জরুরি নয়। সুপ্রিম কোর্টের পুরনো রায়ের উদাহরণ দিয়ে রাজ্য সরকার বলে, ‘‘ডিএ নির্ভর করে কর্মস্থলের উপর। ডিএ কোনও স্থায়ী অধিকার নয়।’’
শুনানিতে সরকারের তরফে আদালতে জানানো হয়, রাজ্যের অর্থনৈতিক সামর্থ্য নেই। সব কর্মচারীকে কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিলে রাজ্য দেউলিয়া হয়ে যাবে।
মামলায় রাজ্যের যুক্তি, মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বাধ্যতামূলক নয়। সে জন্য কর্মীদের মৌলিক অধিকারও নয় এটি। তাই কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দিতে বাধ্য নয় রাজ্য। কেন্দ্র ও রাজ্যের আর্থিক কাঠামোও ভিন্ন। তাই কেন্দ্র যে হারে ডিএ দেয়, তার সঙ্গে রাজ্যের তুলনা চলে না।
মামলাকারীদের বক্তব্য, সরকার আইএএস, আইপিএস অফিসারদের পুরো ডিএ দেয়। দিল্লি–চেন্নাই কর্মচারীরা পুরো ডিএ পান। তা হলে সাধারণ কর্মচারীদের বেলায় টাকা নেই—এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়!
মামলাকারীদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কর্মচারীরা, যাঁরা—বঙ্গভবন (নয়াদিল্লি) বা চেন্নাই-এ কর্মরত তাঁরা কিন্তু কেন্দ্রীয় হারে ডিএ পাচ্ছেন। কিন্তু একই নিয়মে নিয়োগপ্রাপ্ত একই রাজ্য সরকারের কর্মচারী পশ্চিমবঙ্গে কর্মরত কর্মচারীরা পাচ্ছেন কম ডিএ। এটা সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৪ (সমতার অধিকার) লঙ্ঘন।
রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের বক্তব্য, ‘‘ডিএ পাওয়া আমাদের আইনগত অধিকার। রাজ্য সরকার পঞ্চম বেতন কমিশন গঠন করেছিল। সেই কমিশনের রিপোর্ট সরকার গ্রহণ করে। তার ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছে আরওপিএ রুল্স, ২০০৯। এই নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা আছে— ডিএ বেতনের অংশ। ডিএ হিসাব হবে এআইসিআইপি অনুযায়ী। এই অবস্থায় এক বার আইন তৈরি হলে সরকার ইচ্ছা মতো তা অমান্য করতে পারে না।
কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা নিয়মিত এবং বেশি হারে ডিএ পান। সেই তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা অনেক কম ডিএ পাচ্ছেন। ডিএ পাওয়া অনিয়মিত। বহু বছরের ডিএ বকেয়া পড়ে আছে। এই কারণেই রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের সংগঠন আদালতের দ্বারস্থ হয়।
বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়লে বেতনের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার জন্যই সরকার তাদের কর্মচারীদের ডিএ দেয়।
গত রাজ্য বাজেটে তিন শতাশ ডিএ বৃদ্ধির ঘোষণা করেছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। গত বছর ১ এপ্রিল থেকে বর্ধিত হারে ডিএ পান রাজ্য সরকারের কর্মচারীরা। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাদের কর্মচারীদের ডিএ দেয় ১৮ শতাংশ হারে। রাজ্য সরকারের কর্মীদের পাশাপাশি সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মী, সরকার অধিকৃত, পঞ্চায়েত, পুরসভার কর্মীরা এই হারে ডিএ পেয়ে থাকেন।
তবে তার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের সঙ্গে এ রাজ্যের সরকারি কর্মচারীদের ফারাক অনেকটাই। গত বছরের জুলাইয়ে মহার্ঘ ভাতার অঙ্ক ৫৫ থেকে ৫৮ শতাংশ করে কেন্দ্র। অর্থাৎ ডিএ-র ফারাক বর্তমানে ৪০ শতাংশ। বর্তমানে সপ্তম বেতন কমিশন মেনে মাসমাইনে পাচ্ছেন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীরা। তবে নতুন বছরে অষ্টম বেতন কমিশন চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অষ্টম বেতন কমিশন চালু হলে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ডিএ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তা হলে ফারাক আরও বাড়বে।
ডিএ নিয়ে মামলা করেছিল কনফেডারেশন অফ স্টেট গভর্মেন্ট এমপ্লয়িজ, সরকারি কর্মচারী পরিষদ, ইউনিটি ফোরাম। কলকাতা হাই কোর্টে সরকারি কর্মচারীদের হয়ে সওয়াল করেন পাঁচ আইনজীবী। তাঁরা হলেন বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য, ফিরদৌস শামিম, গোপা বিশ্বাস, কল্লোল বসু এবং সুমন বন্দ্যোপাধ্যায়।
ডিএ মামলায় কলকাতা হাই কোর্টে ধাক্কা খায় পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০২২ সালের ২০ মে ওই মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি হরিশ টন্ডন এবং বিচারপতি রবীন্দ্রনাথ সামন্তের ডিভিশন বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেছিল। সেই রায় গিয়েছিল সরকারি কর্মীদের পক্ষে। হাই কোর্ট বলেছিল, ডিএ রাজ্য সরকারের কর্মীদের অধিকার। কর্মীরা কেন্দ্রীয় হারে তা পাওয়ার যোগ্য। মিটিয়ে দিতে হবে বকেয়া ডিএ।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy