×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

ওই ছেলেও কৃষ্ণ, সেই কিশোরী রাধাপ্রতিম

অলখ মুখোপাধ্যায়
২২ মার্চ ২০১৬ ০৬:৪০
অভিষেক। মায়াপুরের ইস্কনে তোলা নিজস্ব চিত্র।

অভিষেক। মায়াপুরের ইস্কনে তোলা নিজস্ব চিত্র।

শুকদেব বললেন, মহারাজ পরীক্ষিৎ শুনুন তবে, কৃষ্ণকথা আসলে একটি যাত্রাকালীন কাহিনি। সেই যাত্রার সময়েই সময়ও বদলে যায়। যে শোনে তার গায়ে এসে পড়ে ব্রজের রজ। সে ভাবে পাশের ছেলেটি কৃষ্ণ, ওই কিশোরী রাধাপ্রতিম। সকল প্রাণে, সর্বত্র সঞ্চারিত হয়ে যায় কৃষ্ণকথা। সে বড় সুখের সময়।

সে খুব সাধারণ সময়ও নয়। কেননা, সাধারণ সময়ের কথাই যে তখন বলা হচ্ছে না। সাহিত্যের মাধুরী তখন এমন এক কথা বলছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সে ইচ্ছে করেই সাধারণের জন্য রাখছে না। সে দাবি করছে পরম এক ভক্তি, যে ভক্তিতে বিশ্বাসের শক্তি তৈরি হয়, সেই শক্তিটুকুকেই ভরসা করে পেরিয়ে যেতে হয় যমুনা। তার ও দিকে বৃন্দাবন।

কাহিনি দিয়ে গাঁথা সেই বৃন্দাবনের রূপের কথা শেষ হয় না। চারিদিকে সবুজ আর সবুজ। বড় মনোহর তার অরণ্য। গোবর্ধন পাহাড়। আর এই এমন এক দেশ, যেখানে দেবতারাও নিজেদের প্রচ্ছন্ন রাখেন। কৃষ্ণের কাহিনিতে প্রকৃতি থেকে পরম, সকলই তাঁরই মায়ায় ঘেরা।

Advertisement

তাতে প্রথমেই বলা হয়েছে বৃন্দাবনের রূপের কথা। এই এক ভূখণ্ড। যা মায়াময় এবং সাধারণত অগম্য। কেবল চিন্তাসূত্রেই সেখানে পৌঁছনো যায়। সেই চিন্তা যা ললিত কাব্যরসকে তরণী করে। সে যে মায়ায় তৈরি, তার প্রমাণে প্রথমেই বলে রাখা হল, প্রখর গ্রীষ্মেও সে সবুজ থাকত। অর্থাৎ, অন্য সব ভূমিখণ্ড যেমন ঋতুশাসন মানতে বাধ্য, বৃন্দাবন তা নয়। তার ব্যাখ্যাও দেওয়া হল, ‘অগাধতোয়হ্রদিনী-তটোর্মিভির্দ্রবৎপুরীষ্যাঃ পুলিনৈঃ সমন্ততঃ। ন যত্র চণ্ডাংশুকরা বিষোল্বণা ভুবো রসং শাদ্বলিতং চ গৃহ্নতে’। গ্রীষ্মকালে সূর্যের তেজ অত্যন্ত প্রখর ও বিষবৎ অসহ্য হলেও তা সেখানকার ভূমির সরসতা হরণ করতে বা হরিদ্বর্ণ তৃণগুলিকে শুষ্ক করতে পারত না। কারণ, অগাধ জলে পরিপূর্ণ নদীগুলির তরঙ্গরাজি তাদের তটের উপরে এসে আছড়ে পড়ে যেমন সেই উপকূল ভাগকে আর্দ্র ও সুপরিষ্কৃত রাখত, তেমনই বহু দূর পর্যন্ত মাটিকেও সিক্ত করে রাখত। ফলে সেখানে চারিদিকেই ছিল সবুজের সমারোহ।

শুকদেব বলতে চাইলেন, মহারাজ এই যে ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, এও এক লীলা। না হলে তো কেবল বলেই দেওয়া যেত, বৃন্দাবনে স্বর্গের মতোই ইচ্ছা ঋতু। তা বলা হচ্ছে না, নদীর কথা, জলের কথা বলা হচ্ছে আর তাতেই স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে কল্পনার জোরকে।

বৃন্দাবনে তাই নানা ঋতুরই প্রাধান্য রয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে ওই সাহিত্য-কল্পনার জোরে বৃন্দাবনের ঋতুর নিজস্ব রূপ রয়েছে। সেখানে কোকিল, ভ্রমরের সঙ্গে থাকে ময়ূরও। ‘বনং কুসুমিতং শ্রীমন্নদচ্চিত্তমৃগদ্বিজম। গায়ন্ময়ূরভ্রমরং কূজৎকোকিলসারসম’। বনের বৃক্ষলতা নানা বর্ণের বহুবিধ সুগন্ধ ফুলের ঐশ্বর্যে সারা বনটিকেই শ্রীমণ্ডিত করে রেখেছিল, আর সেই সঙ্গে ছিল অজস্র প্রকারের চিত্র বিচিত্র পশু পাখি, যাদের আনন্দ কলরবে অরণ্যের হর্ষই যেন ভাষা পাচ্ছিল। ভ্রমরের গুঞ্জন, ময়ূরের কেকাধ্বনি, কোকিলের কুহুতান, সারসের কলনাদ—সব মিলেমিশে এক মহা ঐকতান সৃষ্টি করছিল।

তার মধ্যে কৃষ্ণকে কেমন লাগত?

শুকদেব বললেন, ‘কৃষ্ণস্য নৃত্যতঃ কেচিজ্জগুঃ কেচিদবাদয়ন্। বেণুপাণিতলৈঃ শৃঙ্গৈঃ প্রশশংসুরথাপরে।’ কৃষ্ণ নাচতে থাকলে কোনও কোনও গোপবালক গান করছিল, অন্য কেউ করতালি, বাঁশি ও শিঙা বাজাচ্ছিল, আবার অপর কেউ কেউ উল্লাস বা অনুমোদন সূচক শব্দ করে তাঁর নৃত্যের প্রশংসা করছিল।

শুকদেব বললেন, মহারাজ পরীক্ষিৎ, সেই সময়ে গোপবালকের রূপ ধারণ করে দেবতারাও সেখানে এসেছিলেন। বলরাম ও কৃষ্ণের প্রশংসা করছিলেন, ঠিক যেমন পার্শ্বচরিত্রেরা প্রধান অভিনেতার প্রশংসা করেন।

কৃষ্ণ, বলরাম ও সেই গোপবালকেরা নিজেদের খেলায় মত্ত থাকতেন। সূর্য সহনীয় ছিলেন। পবন সুখপ্রদ। আশ্চর্যের কথা এই যে, কৃষ্ণ-বলরাম ও দেবতারা রাজা রাজা খেলতেন। আবার বালকের স্বাভাবিক খেলাও খেলতেন বৈকি। কখনও অন্যেরা স্পর্শ করার আগেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর খেলা খেলতেন। চোখ বেঁধে একে অপরকে ধরার খেলা খেলতেন। কখনও পশু পাখির আচরণের অনুকরণ করতেন। ‘এবং তৌ লোকসিদ্ধাভিঃ ক্রীড়াভিশ্চেরতুর্বনে। নদ্যদ্রিদ্রোণিকুঞ্জেষু কাননেষু সরঃসু চ।’ এই দু’জন লোকত্তর মায়া বালক ও লোকপ্রসিদ্ধ এই সব সাধারণ ক্রীড়া কৌতুকেই রত থেকে বৃন্দাবনের নদী, পর্বত, উপত্যকা কুঞ্জ কানন সরোবর প্রভৃতি অনুপম নিসর্গ শোভার উন্মুক্ত ক্ষেত্রে বিচরণ করছিলেন।

তারপরে সন্ধ্যা নামত। গোপীদের কথা মনে হয়েছিল ব্যাসদেবের। তাঁর লেখনীতে শুকদেব বলছেন, ‘গাঃ সন্নিবর্ত্য সায়াহ্নে সহরামো জনার্দনঃ। বেণুং বিরণয়ন্ গোষ্ঠমগাদ বীক্ষ্য তে মেনিরেহমহরম্।। গোপীনাং পরমানন্দে আসীদ্ গোবিন্দদর্শনে। ক্ষণং যুগশতমিব যাসাং যেন বিনাভবৎ।।’ দিনান্তবেলায় কৃষ্ণ বলরামের সঙ্গে সেই পশুযূথকে গোষ্ঠের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে চললেন। তখন তাঁর বংশীতে মধুর নিনাদ তুলে চলেছিলেন তিনি, সঙ্গে অগ্রজ বলরাম। সম্মুখে গাভীর দল। পিছনে গোপবালকেরা তাঁর অদ্ভুত কীর্তির জয়গাথা গেয়ে গেয়ে অনুসরণ করছিলেন। শ্রীগোবিন্দের বিরহে একটি ক্ষণও যাঁদের কাছে শতযুগ বলে মনে হত, সেই গোপীগণ ব্রজে প্রত্যাবৃত তাঁর দর্শন লাভ করে পরমানন্দসাগরে মগ্ন হলেন।

এই হল কৃষ্ণকথার আশ্চর্য একটি দিক। এমন সময়, যখন বোঝা যাচ্ছে, স্বয়ং কৃষ্ণই কৃষ্ণলীলা শুনছেন।

গোপীরা একে অপরকে এই বার বলছেন কৃষ্ণকথার সার কথা। তাঁর বাঁশির টানে কল্পনায় টান লাগে। তাতে সময় বদলে যায়। এমন এক সময় তৈরি হয়, বৃন্দাবন এমন এক স্থানে পরিণত হয়, যা কল্পনাতেই কেবল স্থিতি লাভ করে। তাই সে নশ্বর নয়।

শুকদেব বললেন, মহারাজ গোপীরা একে অপরকে বলছেন, তাঁর এই বেণুরবে ত্রিভুবনে কে না প্রভাবিত হয়, সখী? দেখিসনি, যখন সেই সুরের ধারা চরাচর প্লাবিত করে বয়ে যেতে থাকে, তখন বারিধারাবাহিনী যত নদীর অন্তরতল উন্মথিত হয়ে ওঠে সেই বেণুবাদককে পাওয়ার আকুল অভীপ্সায়, নদীর জলে তাই রচিত হয় আবর্ত, তাদের গতি হয় মন্দীভূত। তরঙ্গের বাহুতে তারা বয়ে আনে পদ্মের অর্ঘ্য, সেই উপহার অর্পণ করার কালে সাগ্রহে জড়়িয়ে ধরে তাঁর চরণদু’টি। (চলবে)

Advertisement