Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

রিনা খালার হাত ধরে বাড়ি ফিরল মেহবুব

সুজাউদ্দিন
জলঙ্গি ০৪ এপ্রিল ২০১৬ ০২:২৮
 রিনা বিবির সঙ্গে মেহবুব। — সাফিউল্লা ইসলাম

রিনা বিবির সঙ্গে মেহবুব। — সাফিউল্লা ইসলাম

মধ্যরাত। সারাদিনের হট্টগোলের পর শিয়ালদহ স্টেশন তখন আধো ঘুমে। লোকজন নেই বললেই চলে। একটু আগেই ঢুকেছে লালগোলা প্যাসেঞ্জার। তারই যা যাত্রী। ট্রেন থেকে নেমে সবে কয়েক পা এগিয়েছেন ডোমকলের কামুড়দেয়ার গ্রামের বাসিন্দা রিনা বিবি, হঠাৎই তাঁর কানে এল একটা বাচ্চার কান্নার আওয়াজ।

চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখেন এক কোণে বসে কেঁদেই চলেছে একটা ছেলে। বয়স, বড়জোড় বারো। অত রাতে একা একা এতটুকু ছেলেকে কাঁদতে দেখে ঠিক থাকতে পারেননি মহিলা। এগিয়ে যান তিনি। ফের চমক। কথায় যে একেবারে নিজের দেশের টান। নির্ঘাৎ মুর্শিদাবাদের ছেলে। রিনা বিবি এ বার কাছে টেনে নেন ছেলেটাকে। আঁচল দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিয়ে জানতে চান, ‘‘খিদে পেয়েছে?’’ তার পর সযত্নে নিজের টোল খাওয়া টিফিন বাক্স থেকে আলু সেদ্ধ আর ভাত বের করে খাওয়ান ছেলেটিকে। জানতে পারেন তাঁর আন্দাজই ঠিক। বাচ্চাটির বাড়ি তাঁরই জেলার লালগোলায়। নাম মেহেবুব হাসান।

রিনা বিবি নিজে কলকাতা গিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। সল্টলেকের একটা হোমিওপ্যাথি হাসপাতালে। ঠিক করেছিলেন সারা রাত হাসপাতালের করিডরে কাটিয়ে পরের দিন ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে যাবেন। এখন বাচ্চাটাকে নিয়ে কী করবেন বুঝে উঠতে না পেরে শেষে তাকেও সঙ্গে করে হাসপাতালে নিয়ে যান। ভোর হতে চেষ্টা করেন চেনাজানা কারও সঙ্গে লালগোলা পাঠিয়ে দিতে। কিন্তু তা আর হয়নি। অত আদর পেয়ে মেহেবুবও রিনা বিবিকে ছাড়তে নারাজ। বাধ্য হয়ে শুক্রবার একেবারে ডাক্তার দেখিয়ে মেহবুবকে নিয়েই ডোমকলে ফেরেন রিনা।

Advertisement

কিন্তু শনিবার ডোমকল থানায় যেতেই মেহেবুব কান্নাকাটি জুড়ে দেয়। তাই পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা আর হয়নি। শেষে উপায় খুঁজতে শনিবার রওনা দেন জলঙ্গির সাদিখাঁড়দেয়াড় এলাকার নওদাপাড়া গ্রামে। রিনা বিবির দাদা মোসারেফ হোসেনের বাড়ি সেখানে। এর পর এটা ওটা দিয়ে ভুলিয়ে দু’জনে মিলে মেহেবুবের কাছ থেকে উদ্ধার করে তার বন্ধুর ফোন নম্বর। আর সেই ফোনের সূত্র ধরেই খোঁজ মেলে মেহবুবের বাড়ির। রবিবার নওদাপাড়া পৌঁছে ছেলের দেখা পান মা হাসেম আক্তার বানু।

জানা যায়, এই প্রথম নয়। এর আগেও দু’দু’বার বাড়ি থেকে পালিয়েছিল মেহেবুব। একবার বজবজ ষ্টেশন চত্বর থেকে কিছু প্রাতঃভ্রমণকারী তাকে দেখতে পেয়ে থানায় নিয়ে যান। আর একবার উধাও হয়ে গেলে জেলার রঘুনাথগঞ্জ এলাকা থেকে পাওয়া যায় তাকে।

এ সবই বলছিলেন মা হাসেন বানু খাতুন। তাঁর কথায়, ‘‘দীর্ঘদিন হয়ে গেল, ওর বাবা ভিন্‌ রাজ্যে কাজ করেন। ফলে ওর লেখাপড়া-দেখাশোনার দায়িত্ব আমার কাঁধে। ছোট থেকে দেখছি লেখাপড়ায় একেবারে মন নেই। কেবল আকাশের দিকে তাকিয়ে পায়রার খোঁজে। আমি একটু মারধর শুরু করি লেখা পড়ার জন্য। আর তখন থেকেই বাড়ি ছেড়ে পালানো শুরু করেছে ছেলে।’’

বুধবার বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার নাম করে বেরিয়েছিল মেহেবুব। কিন্তু তার পর আর ফেরেনি। মায়ের সঙ্গে নাতিকে এ দিন নিতে এসেছিলেন দাদু শোহরব আলিও। তিনি বলেন, ‘‘এর আগে হারিয়ে যাওয়ার পরের দিনই পেয়ে যাই ওকে। কিন্তু বুধবার নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। চিন্তায় পড়ে যাই। লালগোলা থানায় নিখোঁজ ডায়েরিও করি। ও এভাবে মায়ের আদরে এক জনের কাছে আছে জানতে পেরে নিশ্চিন্ত হই।’’

যাকে ঘিরে এত হইচই পড়ে গিয়েছিল, কী বলছে সেই খুদে?

মেহেবুবের কথায়, ‘‘ষ্টেশনে গিয়ে দেখলাম ফাঁকা ট্রেন দাড়িয়ে আছে। চেপে বসলাম। কিন্তু যেখানে গিয়ে থামল সেখানে নেমে আর কিছুই ঠিক করতে পারিনি। ভয়ে কাঁদতে শুরু করি।’’ কিন্তু এ ভাবে বাড়ি ছেড়ে, মাকে ছেড়ে পালাল কেন সে? এর আর কোনও উত্তর দিতে পারেনি মেহবুব। বারবার পাশে বসা রিনা বিবির দিকে তাকিয়ে হাত কচলেছে।

রিনা বিবি বললেন, ‘‘কান্না দেখে বড্ড মায়া হচ্ছিল। কাছে গিয়ে আদর করতেই ও বললো ওর বাড়ি লালগোলার পণ্ডিতপুর গ্রামে। আবস্থাটা বুঝতে পেরে ওকে নিয়েই হাসপাতালে চলে যাই। আমার জন্য নিয়ে যাওয়া ভাতটুকু খেতে দিতেই ঘুমিয়ে পড়ে। তার পর তো কত গল্প...।’’

এ দিন দুপুরে জলঙ্গি থানায় যাবতীয় প্রমাণপত্র জমা দিয়ে ছেলেকে ফেরত পেয়েছেন হাসেন বানু খাতুন। কিন্তু বাড়ি আর ফেরা হয়নি। রিনা বিবির আবদার মেটাতে মা ও দাদু আর ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আবারও খালার (রিনা বিবি) বাড়ি রওনা দিয়েছে মেহেবুব।

আরও পড়ুন

Advertisement