Advertisement
E-Paper

কী দিয়েছেন? বাক্‌স্বাধীনতা

রাস্তার কলে জল এল। কলের সামনে অনেকগুলো হাঁড়ি-কলসি অপেক্ষা করছিল। কলে জল আসতেই রাস্তার ও পারে গাছের ছায়ায় অপেক্ষা করা জটলাটা এসে জড়ো হল এ পারে।

সুপ্রকাশ মণ্ডল

শেষ আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০১৬ ০৩:০৮

রাস্তার কলে জল এল।

কলের সামনে অনেকগুলো হাঁড়ি-কলসি অপেক্ষা করছিল। কলে জল আসতেই রাস্তার ও পারে গাছের ছায়ায় অপেক্ষা করা জটলাটা এসে জড়ো হল এ পারে।

আর তখনই হুশ করে একটা গাড়ি এসে থামল কলের সামনেটায়। গাড়ি থেকে দু’জন নেমে কলের উপরে গোঁজা জোড়াফুল আঁকা পতাকা খুলে নিলেন। ফের চড়ে বসলেন গাড়িতে।

এতক্ষণ বোবা হয়ে থাকা জটলা থেকে এক জন ফস করে জিগ্যেস গলা তুললেন, ‘‘খুলল কেন রে?’’ পাশ থেকে একটি বিজ্ঞ গলা বলে উঠল, ‘‘এটা তো সরকারি কল। হুঁহুঁ বাবা, এ বার আর ট্যাঁ-ফোঁ করতে হচ্ছে না, সব কমিশনের খেলা!’’

এ সবের মধ্যেই দূরে মিলিয়ে গেল নির্বাচন কমিশনের গাড়িটা।

তখন বিকেল।

হরিণঘাটার আধা-পাড়াগাঁ এলাকা দাসবেড়িয়া। গাঁয়ের বুক চিরে ঝাঁ চকচকে মিশকালো পিচের রাস্তা চলে গিয়েছে পাশের জেলায়, উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়ার দিকে। বাজারহাট করতে সেখানেই পা বাড়ান এলাকার অনেকে, চকচকে রাস্তা ধরে। কিন্তু গ্রামের ভিতরে রাস্তা আজও কাঁচা।

তা হলে ভোট দিয়ে মেলে কী? মাথা ঝাঁকিয়ে দাসবেড়িয়ার হরিপদ সর্দার বলেন, ‘‘ও সব তো নেতারা বলতে পারবে! এ বার বলেছে, গাঁয়ের ভিতরের রাস্তার উপরে পিচ পড়বে। দেখি, ভোট মিটলে কী হয়।’’

পাড়াগাঁ হয়তো বেশি তর্ক করে না। খাস সুবর্ণপুর বাজার কিন্তু তর্কে তেতে ওঠে কথায়-কথায়। পড়ন্ত বিকেলে আঁচলে ঘাম মুছতে মুছতে সেখানে হাজির তৃণমূল প্রার্থী নীলিমা নাগ মল্লিক। সঙ্গে বেশ লম্বা মিছিল। প্রতিটি দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে করজোড়ে হাসিমুখে ঘাড় নাড়ছেন প্রার্থী। সঙ্গের দাদারা বলছেন, ‘‘ভোটটা এ বারও বউদিকেই দিতে হবে কিন্তু।’’

২০০৩ সালে খুন হয়েছিলেন চাকদহের দাপুটে তৃণমূল নেতা সমীর নাগ, সিপিএমের ভরা বাজারেও যিনি পঞ্চায়েত দখল করতেন অনায়েসে। নেতার মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রী নীলিমা নাগ মল্লিককে ২০০৪-এ লোকসভা, ২০০৬-এ বিধানসভা ভোটে লড়তে পাঠান দলনেত্রী। কিন্তু শিকে ছেঁড়েনি। ২০১১-য় পরিবর্তন ঝড়ে হরিণঘাটায় বিধানসভার টিকিট জোগাড় করেন নীলিমা। কপ্টারে নগরউখড়া বাজারে উড়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একরাশ প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন সে বার। তার জোরেই হোক বা হাওয়ার জোরে, নীলিমার তরী শেষে তীরে ভিড়েছিল। পাটভাঙা শাড়ি পরে বিধানসভায় পা রেখেছিলেন নীলিমা।

দু’বছরের মধ্যে ফের গা ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামে সিপিএম। ২০১৩-র পঞ্চায়েত নির্বাচনে এই এলাকার ১০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের মধ্যে আটটি দখল করে বামেরা। এমনকী পঞ্চায়েত সমিতিও। হরিণঘাটা জোনাল অফিসে বসে এই কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক তথা মন্ত্রী বঙ্কিম ঘোষ বলেন, ‘‘মনে রাখতে হবে, তখনও পরিবর্তনের হাওয়া চলছে। সেই বাজারেও আস্ত একটা পঞ্চায়েত সমিতি এবং বেশির ভাগ পঞ্চায়েত মানুষ আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিল।’’ পঞ্চায়েত সমিতি ছাড়া বাকি সবই অবশ্য গত দু’বছরে তাঁদের হাতছাড়া হয়েছে।

পার্টি অফিসে বঙ্কিমের পাশেই বসেছিলেন জোনাল সম্পাদক হেমন্ত ভৌমিক। এক সময় জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি। হরিণঘাটায় দলের ‘ওয়ার রুম’ আপাতত সামলাচ্ছেন পোড়-খাওয়া এই দুই নেতাই। গত দু’বছরে তৃণমূলের হাতে সব চলে যাওয়ার কথা উঠতেই ফুঁসে ওঠেন হেমন্ত— ‘‘শুধু পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি। আমাদের হাতে থাকা পঞ্চায়েতগুলো তো ওরা জোর করে ছিনিয়ে নিয়েছে! পুরভোটে আমাদের লোকেদের ভোটই দিতে দেয়নি।

হরিণঘাটা ডেয়ারিতে উন্নত প্রকল্প গড়ে, সেখানে দশ হাজার লোকের চাকরি হবে বলে গত ভোটে আশ্বাস দিয়ে গিয়েছিলেন মমতা। সিপিএমের কটাক্ষ, এলাকার মানুষ এখন সেই দশ হাজার মানুষের নামের তালিকা চাইছে। ‘‘গত পাঁচ বছরে এখানে কী উন্নয়নের কাজ হয়েছে, ওরা জানাক,’’ চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে লালঝান্ডা।

কী হয়েছে উন্নয়নের কাজ?

প্রশ্ন শুনেই নীলিমা বলে ওঠেন, ‘‘আমি তো এখন প্রচার নিয়ে ব্যস্ত। আপনি একটু চঞ্চলের থেকে জেনে নিন। ও সব জানে।’’ চঞ্চল, অর্থাৎ জেলা পরিষদের কর্মাধ্যক্ষ তথা হরিণঘাটার ব্লক তৃণমূল সভাপতি চঞ্চল দেবনাথ। চাকদহ থেকে ভোট করতে আসা নীলিমার তিনিই ভরসা। এতটাই যে, এলাকার অনেক বাসিন্দা তাঁকেই ‘বিধায়ক’ বলে জানেন। ‘‘বিধায়কের সব কাজ উনি সামলান অসীম দক্ষতার সঙ্গে, এমনকী রত্নাকরদেরও’’— বলে মুচকি হাসেন তৃণমূলের এক নেতা।

কে না জানে, চাকদহের বিদায়ী বিধায়ক রত্না ঘোষ কর এই বিধানসভা এলাকারই বাসিন্দা। এখানে তাঁর কিছু অনুগামী কম নেই। নীলিমা গোষ্ঠীকে তাঁরা বেগ দিয়েছেন আগেও। দলনেত্রীর ধমকে আপাতত গুটিয়ে থাকলেও আবার যে দেবেন না, তারও কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবে আপাতত রত্নাকরদের ঝুলিতে ঢুকিয়ে রেখে নীলিমার ঢাল হয়ে দাঁড়ান চঞ্চল— ‘‘কাজ হয়নি?
বলেন কী? রাস্তাঘাট হয়েছে। স্কুলে-স্কুলে বেঞ্চ দেওয়া হয়েছে। আর্সেনিকমুক্ত পানীয় জলের কল বসেছে। শ্মশানের সৌন্দর্যায়নের কাজ হয়েছে।’’ আর? ‘‘আর? বাক্‌স্বাধীনতা! সিপিএমের সময়ে মানুষের কোনও বাক্‌স্বাধীনতা ছিল? আমরাই তো
এনে দিয়েছি।’’

সিপিএম প্রার্থী, স্কুলশিক্ষক অজয় দাস রাজনীতিতে নতুন। তবে এর মধ্যে তিনি সিপিএমোচিত চিমটি কাটার কায়দাটি দিব্যি রপ্ত করেছেন। হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, ‘‘মৃত্যুর পর মানুষ শ্মশানে যায়। কিন্তু জন্ম হয় যেখানে, সেই হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখলেই বোঝা যাবে এ আমলে মানুষ কীসের স্বাধীনতা পেয়েছে, সুস্থ জীবনের না কি মৃত্যুর!’’

পাটিগণিতের অঙ্ক কিন্তু তৃণমূলের জন্য খুব একটা সুবিধের নয়। ২০১৪ লোকসভা ভোটের ফলের নিরিখে তৃণমূল এবং বাম-কংগ্রেস জোটের শক্তি প্রায় সমান— ৩৯ শতাংশ। ওই নির্বাচনে মোদী হাওয়ায় ভর করে বিজেপি ৫ শতাংশ থেকে লাফিয়ে প্রায় ১৯ শতাংশে পৌঁছয়। বিজেপি প্রার্থী সুরেশ সিকদারের দাবি, এই ভোট আরও বাড়বে। যদিও এমন সম্ভাবনা প্রায় কেউই দেখছেন না। বরং বিজেপি ‘পুনর্মুষিক ভব’ হলে তাদের হাতছাড়া হওয়া ১৩-১৪ শতাংশ ভোট কার ঝুলিতে আসবে, অঙ্ক কষা চলছে তা নিয়েই।

বিজেপির বাড়বাড়ন্তের জেরে গত বিধানসভার তুলনায় লোকসভা নির্বাচনে ৮ শতাংশ ভোট হারিয়েছিল বামেরা। কংগ্রেস এবং তৃণমূল মিলিত ভাবে হারিয়েছিল ৫ শতাংশের আশপাশে। ফলে, বিজেপি-ফেরত ভোটের সিংহভাগ তাদের ঝুলিতে আসবে এবং তার ধাক্কায় ঘাসফুল উড়ে যাবে বলে আশা করছে জোট শিবির। যদিও তার জন্য যে তাদের নিজেদের ভোট অটুট রাখতে হবে, সেই শর্তটাও ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না।

চঞ্চলবাবুর টিপ্পনী, ‘‘পাটিগণিত শুধু নয়, রসায়নও তো রয়েছে। সিপিএম আর কংগ্রসের রসায়ন তাঁদের দলের কর্মীরা কী ভাবে নিচ্ছেন সেটা তো ওরা জানে না। কংগ্রেসের সিংহ ভাগ ভোট আমাদের ঝুলিতেই আসবে, দেখে নেবেন।’’

যা শুনেই ভুরু কুঁচকে যায় ব্লক কংগ্রেসের সভাপতি অনিল ঘোষের — ‘‘আমাদের লোকেরা কী ভাবছে, তা-ও জেনে বসে আছে! মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি!’’

Freedom of Speech
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy