×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৬ জুন ২০২১ ই-পেপার

পুরুলিয়ায় বলছে সব পক্ষই

প্রশাসনই ম্যাচের সেরা

প্রশান্ত পাল
পুরুলিয়া ২৭ এপ্রিল ২০১৫ ০১:০২
ভোট-উৎসবে মেতেছে খুদেরাও। পুরুলিয়ার ধবঘাটায়। ছবি: সুজিত মাহাতো।

ভোট-উৎসবে মেতেছে খুদেরাও। পুরুলিয়ার ধবঘাটায়। ছবি: সুজিত মাহাতো।

১১ নম্বর ওয়ার্ডের মহুলঘুটা প্রাথমিক বিদ্যালয়। এক যুবককে ভোটকেন্দ্রের কাছে ঘুরঘুর করতে দেখে পরিচয় জানতে চাইলেন কর্তব্যরত এক কমান্ডো অফিসার। যুবকটি আমতা আমতা করে জানালেন, তাঁদের পোলিং এজেন্টের কাছ থেকে খবর নিতে এসেছিলেন, তাঁর কোনও কিছুর প্রয়োজন রয়েছে কি না, কত শতাংশ ভোট পড়ল। কমান্ডো অফিসার ওই যুবককে জানিয়ে দিলেন, আপনার ভিতরে যাওয়ার দরকার নেই। যাঁর প্রয়োজন, তিনি নিজে বেরিয়ে এসে জানাবেন। সেই সঙ্গে ওই অফিসার সাফ জানিয়ে দিলেন, যদি ভোট দিতে যাবেন তবে পরিচয়পত্র ছাড়া এ ভাবে যেন আর তাঁকে ভোটকেন্দ্রের ভিতরে যেতে না দেখা যায়।

৪৮ ঘণ্টা আগের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। গন্ডগোল ও একাধিক সংঘর্ষের ঘটনার জন্য পুরুলিয়া শহরের এই ওয়ার্ড সংবাদের শিরোনামে স্থান নিয়েছিল। এই এলাকাতেই বিজেপি’র কর্মীকে রড দিয়ে মারার অভিযোগ উঠেছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে। এই ঘটনার কয়েকদিন আগে এক বিজেপি কর্মীর বাবাকে আক্রমণ করা হয়। সেই ঘটনাতেও অভিযোগ ওঠে তৃণমূল আশ্রিতদের বিরুদ্ধে। শাসকদলের সন্ত্রাসে এখানে অবাধ ভোট সম্ভব কি না প্রশ্ন তুলেছিল বিজেপি। শনিবার রেললাইন পার হয়ে শহরের একপ্রান্তে অবস্থিত এই এলাকায় ঢুকতেই চোখে পড়ল বিভিন্ন ক্যাম্পে তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীরা বসে রয়েছেন দিব্যি। দু’দিন আগের উত্তেজনা উধাও। ভোটের দিনে সেই এলাকাতে একেবারেই ভিন্ন ছবি। এলাকার রাস্তাঘাটে, গলিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সতর্ক দৃষ্টি। সন্দেহজনক কাউকে দেখলে পথ আটকে পরিচয় জানতে চাইছেন কর্তব্যরত অফিসারেরা। মাঝে মাঝেই দেখা মিলছে মোবাইল বাইক বাহিনীর।

এরই পাশাপাশি ভোটের দিন কখনও সেক্টর ইনচার্জের গাড়ি খোঁজ নিয়ে যাচ্ছে সব ঠিকঠাক রয়েছে কি না। তারমধ্যেই ১১ নম্বর ওয়ার্ডের এই মহুলঘুটা ভোটকন্দ্রের সামনে পৌঁছল জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তী ও পুলিশ সুপার রূপেশ কুমারের গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে ভোটকেন্দ্রের ভিতরে গিয়ে খোঁজ নিলেন জেলাশাসক নিজে। কথা বললেন, ভোটারদের সঙ্গেও। জেলাশাসক বললেন, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে কি না তা সরজমিনে দেখে নেওয়া। এলাকায় শান্তি রয়েছে কি না খোঁজ নিয়ে গন্তব্য পাশের ওয়ার্ড। আর এক দৃশ্য দেখা গেল ২২ নম্বর ওয়ার্ডে। দুপুর সাড়ে ১২টা। সরবাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়। লড়াই তৃণমূলের উপপুরপ্রধান সামিমদাদ খান ও কংগ্রেসের প্রাক্তন পুরপ্রধান সৈয়দ সাকিল আহমেদের মধ্যে। যথেষ্ঠ উত্তেজনা ছিল এখানেও। ভোটকেন্দ্রের বাইরে রোদের মধ্যেই পুরুষ ও মহিলাদের দীর্ঘ লাইন। দেখা গেল পুরুষদের লাইনের শেষ প্রান্তে একটি জটলা। একজন-দু’জন করে ভিড় বাড়ছে। কর্তব্যরত পুলিশকর্মী ভিড়কে সরে যেতে বলছিলেন। কিন্তু জটলা দু-পা পিছোচ্ছে তো মিনিট দু’য়েক পরেই খানিকটা এগোচ্ছে। পুলিশকর্মী ফের বললেন, ‘‘আপনারা সরে যান।’’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। একজন পুলিশকর্মীকে বললেন, ‘‘আপনি ডিউটি করুন। আমরা তো কিছু করছি না।’’ এ বার মৃদু বচসা বাধল পুলিশকর্মীর সঙ্গে। ভিড়ে ততক্ষণে দু-একজন করে যোগ দিচ্ছে। মোবাইলে খবর পাঠালেন ওই পুলিশকর্মী। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই হাজির বড় বাহিনী। নেমেই অ্যাকশন মুড। ফাঁকা হতে লাগল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। সরে গিয়ে এক তৃণমূল কর্মীর প্রতিক্রিয়া, ‘‘শাসকদলে থেকে আর কী হল! ভোটকেন্দ্রে থেকেও সরিয়ে দেওয়া হল।’’

Advertisement

কিন্তু ভোটের দিন এমন দৃশ্য দেখা যাবে কেউ ভাবেননি। কারণ, পুরুলিয়া শহরে গন্ডগোলের আবহ ছিলই। ভোটের আগে কোথাও বিরোধী দলের অস্থায়ী ক্যাম্প অফিসে আগুন, কখনও বিরোধীদের আক্রমণ, কোথাও খোদ বিরোধী প্রার্থীর বাড়িতে হামলা। কখনও আক্রান্ত হয়েছে শাসকদলের অস্থায়ী ক্যাম্প অফিসও। রক্ত ঝরেছে প্রচারের শেষ দিনেও। বিরোধী দলগুলি’র প্রায় সকলেই প্রশাসনের কাছে দাবি তুলছিল, পুরুলিয়ায় কখনও এমন আবহে ভোট হয়নি। ভোট যাতে শান্তিতে হয়, প্রশাসনকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। বিরোধীদের দাবি মতো প্রস্তুতিও নিয়েছিল প্রশাসন। ভোটকেন্দ্রের বাইরে-ভিতরে ক্যামেরার নজরদারি। তার সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীর সতর্ক দৃষ্টি। শহরে ঢোকার বিভিন্ন রাস্তায় তল্লাশি আর শহরের রাস্তাঘাটে পুলিশের টহলদারি। কিন্তু প্রশাসন ব্যবস্থা নিলেও ভোট শান্তিতে হবে তো, ভোটের আগের রাত এমনকী শনিবার সকালেও উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন বিরোধীরা। তবে সেই ভুল ভাঙতে বেশি সময় লাগেনি। কোথাও কোনও গন্ডগোল হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে প্রশাসনকে জানানোর পরে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দেখে তাঁরা নিশ্চিত হয়ে যান বড় গন্ডগোল হয় তো হবে না। বেলা যত গড়িয়েছে বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে তাঁদের মনে হয়েছে, ভোট হচ্ছে ঠিক পরবের মেজাজেই। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে বা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে রীতি মতো ছুটির মেজাজ দেখা গিয়েছে ভোটারদের মধ্যে। তেমনই সৌহার্দ্যের ছবিও দেখা গিয়েছে শান্তময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানে (১৩ নম্বর ওয়ার্ড) জেলা যুব তৃণমূল সভাপতি গৌতম রায়ের বিরুদ্ধে প্রার্থী সদ্য তৃণমূলত্যাগী প্রদীপ মুখোপাধ্যায়। এই লড়াইকে ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে উঠেছিল। কারণ, প্রদীপবাবুকে দল টিকিট দেয়নি। যে কারণে তিনি দল ছেড়ে নির্দলে। দেখা গেল এক কর্মীর কাছ থেকে একই বোতলের জল খেলেন দু’জনেই। দু‘জনেই বললেন, ‘‘লড়াই তো ভোটে।’’

সকাল থেকে বিকেল বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রে দেখা মিলেছে ডান-বাম দু’পক্ষের নেতা-কর্মীদের। দুপুরে শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয়ে ভোট দিয়ে বেরোচ্ছিলেন প্রাক্তন সিপিএম বিধায়ক নিখিল মুখোপাধ্যায়। বললেন, ‘‘এমনি ঠিকই রয়েছে।’’ একই প্রতিক্রিয়া ভোটারদেরও। বিষ্ণুপ্রিয়া সরকার নামে এক ভোটারের কথায়, ‘‘মনে হচ্ছে উৎসবের মেজাজে ভোট হচ্ছে। ভোট দিলাম। আজ তো ছুটি। এ বার বাড়ি গিয়ে মাংস-ভাত।’’

কেউই কোথাও গন্ডগোল হচ্ছে এই অভিযোগ করেননি। বিকেলে জিলা স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে সিপিএমের পুরুলিয়া জোনাল কমিটির সম্পাদক কৌশিক মজুমদার বললেন, ‘‘ভোট ঠিকই চলছে।’’ বিজেপি’র জেলা সভাপতি বিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায় আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, ‘‘পুরুলিয়ায় দারুণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট হয়েছে। আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম। প্রশাসনকে ধন্যবাদ।’’ জেলা কংগ্রেস সভাপতি নেপাল মাহাতোর কথায়, ‘‘আমরা প্রশাসনকে জানিয়েছিলাম যে অশান্তি হতে পারে। তা হয়নি প্রশাসন সতর্ক থাকায়। শান্তিতেই ভোট হয়েছে।’’ সব দেখে শুনে তৃণমূলের পুরুলিয়া জেলা সভাপতি শান্তিরাম মাহাতোর প্রতিক্রিয়া, ‘‘পুরুলিয়ায় নজিরবিহীন ভাবে শান্তিতে ভোট হয়েছে। অনেকেই তো আশঙ্কা করেছিলেন গন্ডগোল হবে। কিন্তু পুরুলিয়া তার সুনাম অক্ষুন্ন রেখেছে। এ বার যে ভাবে ভোট হয়েছে, কবে এমন শান্তিপূর্ণ ভাবে হয়েছে।’’ আর একজনকে ঘিরে এ বারের ভোট ছিল নজরকাড়া। তিনি তৃণমূলের বিদায়ী বোর্ডের পুরপ্রধান তারকেশ চট্টোপাধ্যায়। তিনিও দল ছেড়ে নির্দলে। ভোট শেষে তরকেশবাবু জানিয়েছেন, পুলিশ-প্রশাসন ভাল কাজ করেছে।

এ ব্যপারে জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘‘পুরুলিয়ায় ভোট পড়েছে ৭৫.৭৮ শতাংশ, ঝালদায় ৮৭.৪২ শতাংশ ও রঘুনাথপুরে ৮২.৫৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। জেলায় গড়ে ৭৭.৭২ শতাংশ। ভোট শান্তিপূর্ণই হয়েছে। তার কৃতিত্ব সকলেরই।’’ শনিবার যে ভাবে উৎসবের মেজাজে ভোট দিয়েছে পুরুলিয়া তা নিশ্চিত করতে পথে নেমেছিলেন স্বয়ং জেলাশাসক ও পুলিশ সুপার। পুরুলিয়ায় প্রচারে এসে যুব তৃণমূল নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলে গিয়েছিলেন, পুরভোট টেস্টম্যাচ নয়। টি-টোয়েন্টি। ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘‘সকাল সকাল গিয়ে ছক্কা মেরে আসবেন।’’ শনিবারের খেলায় প্রশাসনই ম্যান অব দ্য ম্যাচ, বলছেন বিরোধীরাই।

Advertisement