×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

দেবতারা কেন যে এত স্বার্থপর

শংকর
২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০১:২৭
ছবি : সুব্রত চৌধুরী

ছবি : সুব্রত চৌধুরী

ম্যানেজমেন্টে মন্ত্রমুগ্ধ মডার্ন শুভার্থীদের অনেকেই আজকাল দুর্গোৎসবকালে বয়োবৃদ্ধদের নস্টালজিয়া পছন্দ করেন না। তাঁদের শৈশব ও বাল্যকালে মানুষ কত ভাল ছিল, দেবী দুর্গার আবাহন কত আনন্দময় ছিল, নির্মলহৃদয় বঙ্গীয় ধনীরা গরিবদের দুঃখ সহ্য করতে না পেরে কেমন ভাবে নিজের সন্তানদের জন্যে সদ্য-কেনা জামাকাপড় তুলে দিতেন যাদের ম্লান মুখ বিষাদে বিরস, এ সব আজকাল তেমন জমে না। এখন কোমর-বেল্ট টাইট করতে করতে বিপজ্জনক সীমা অতিক্রম করছে, এখন সমগ্র পরিবারই টলমল, এমন সময় যৌথ বা বৃহত্তর পরিবারের কথা ভেবে চার দিনের আনন্দ সাত দিনের দুঃখে পরিণত করে এবং সেই ইনফেকশনকে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দিয়ে লাভ নেই। মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মার্কেটিং-বিশেষজ্ঞরা এই সময় পরম আগ্রহে এবং বেঙ্গলের মার্কেটে বাৎসরিক বিক্রি ডবল করতে মা দুর্গার এই পূর্ণকুম্ভে উপস্থিত থেকে জনমনের ইসিজি প্রতি মুহূর্তে তৈরি করেন এবং তাঁরাও এই নস্টালজিয়া পছন্দ করেন না, কারণ সিনিয়র সিটিজেনদের শরীর বা মন ঢাকবার জন্য তেমন কিছু আইটেম সৃষ্টি করবার সময় তাঁরা পান না।

অনেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বলেন, আগে মশাই এত বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক আমাদের সমাজে ছিল না, বেশির ভাগ হেড অব দ্য ফ্যামিলি তো পঁয়ত্রিশ হলেই ধরাধাম ছেড়ে চলে যেতেন। তার পর বিদায়সীমা পঞ্চাশ হল, ষাট হল, এখন সত্তর-আশিও মন্দ দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু যাঁর কোনও বয়স নেই— দেবী দুর্গা, তাঁর হাজব্যান্ড, এমনকী ইদানীং ইংলিশ মিডিয়াম ছাত্রছাত্রীদের কাছে ‘বাফেলো মনস্টার’ হিসেবে সুপরিচিত মহিষাসুরের বয়স কখনও বাড়ে না। জিজ্ঞেস করুন পূজামণ্ডপের ভাইস-প্রেসিডেন্টকে, তিনি বলবেন পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞেস করুন, তিনিই সব ডিটেল ঠিক করে দেন, হাইট কত, ওয়েট কত, কবে তিনি মণ্ডপে প্রতিষ্ঠিত হবেন, কখন মণ্ডপ থেকে চেক-আউট করবেন, সব সিপিই ঠিক করে দেন।

কেউ কেউ রসিকতা করেন, আগে ছিল পুজোর পুলিশ, এখন পুলিশের পুজো শব্দটা প্রায়ই শোনা যাচ্ছে। যাঁরা বিপণনে রয়েছেন তাঁরা চাইছেন, জনগণ কেনাবেচায় ব্যস্ত থাকুন, কারণ ব্যাপারটার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটেছে। এখন ফ্যামিলির পূজা শপিং আর কেন্দ্রীভূত নেই, পাঁচ বছরের মেয়েও নিজের শপিং-এর সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, প্রাপ্তেতু দ্বাদশবর্ষে প্রিয় পুত্র, কন্যার স্বনির্ভরতা মেনে নিয়ে আপনি শুধু টাকাটা দিয়ে দিন, বাকি যা করবার তা ওরা করবে। ‘ওরা’ কথাটা বোধহয় ঠিক হল না, ওটা হবে রুবি, বেবি, মোনালিসা, মৈত্রেয়ী, পাপিয়া এটসেটরা একটা নাম। বেশি অডিট করার কিছু নেই, কারণ পৈতৃক বোস, ঘোষ, দাস, হাজরা টাইট্‌লটা সাময়িকভাবে লিজ দেওয়া; আপনার সহধর্মিণীর সারা-সময়ের আশঙ্কা বিবাহ-পরবর্তী টাইট্‌লটা কী হবে তা হয়তো মেয়েটা নিজেই ঠিক করবে, আপনি কেবল ধৈর্য ধরে সময় থাকতে সাউথ ক্যালকাটার জুয়েলারি দোকানের সঙ্গে একটা ব্যবস্থা করে রাখুন, ইনস্টলমেন্টে গহনা কিনে চলুন। মনে রাখবেন, দেবী চণ্ডী হেভি গহনা পরেই রণক্ষেত্রে অবতীর্ণা হয়েছিলেন। তিনি যে কম-ওজনের ফ্যান্সি গহনা পছন্দ করতেন এমন কোনও ইঙ্গিত শ্রীশ্রীচণ্ডীতে নেই।

Advertisement

এখন দেবী দুর্গা সম্বন্ধে কিছু ‘ইস্যুভিত্তিক’ পর্যালোচনা প্রয়োজন। ভগীরথ নামক এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব যেমন পতিতোদ্ধারিণী গঙ্গাকে মর্তে এনে অক্ষয়কীর্তি স্থাপন করেছিলেন, তেমন ভাগীরথী তীরে দশপ্রহরণধারিণী দুর্গাকে বহু বছর আগে রেডিয়ো মারফত ভক্তজনের হৃদয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন এক ভদ্র কায়স্থ, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। আমরা ইতিহাসসচেতন থাকলে তিনি কবে লর্ড উপাধিতে ভূষিত হতেন, প্রত্যেক পূজামণ্ডপে মা দুর্গার ‘মিনিস্টারিয়াল’ উদ্বোধনের আগে তিনিই ‘মান্যবর’ উপাধিতে ভূষিত হতেন। কিন্তু সে সব হয়নি, আমরা দুর্গাসন্তানরা যার যা পাওনাগন্ডা তা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দিয়ে দিতে কস্মিনকালেও উৎসাহী নই।

দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গার দয়ায় এ কালে আমরা ছুটি পাই, বোনাস পাই, স্যালারি অ্যাডভান্স পাই, বাঙালিত্বের সন্ধান করার সুযোগও পাই, কিন্তু যা ছিল দুর্গাপুজো তা আমাদের অবহেলায় অনেকের কাছে স্রেফ দুর্গোৎসবে পর্যবসিত হয়েছে। আগে গ্রামবাংলার নিরক্ষর পুরুষ ও রমণী মা দুগ্গা অ্যান্ড ফ্যামিলির হাজার রকম খবরাখবর জানত। এখন জিজ্ঞেস করুন, কলাবউটা কার ওয়াইফ? বলতে পারবে না। আগে স্নান সেরে উপবাসপবিত্র শরীর নিয়ে ঘড়ি দেখে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার ধারাবাহিকতা ছিল, এখন ও সব বালাই প্রায় উঠে গিয়েছে। সাগরপারে পুজোর নিয়মভাঙা আরও বেশি, দক্ষিণের অনাবাসীরা খরচ করে স্বদেশ থেকে মার্কিন মুলুকে পুরোহিত নিয়ে যান, এনআরবি-রা অনেকে ওটা বাজে-খরচ মনে করেন।

নিয়মানুবর্তিতা না থাকলে দুর্গাপুজো হয় না, আবার কিছু বৈচিত্রের স্বাধীনতা না থাকলে কোনও পুজো আনন্দময় হয় না। আমাদের পুরোহিতরা পঞ্জিকা হাতে নিয়েও এই নানামুখী চিন্তাকে বাধা দেননি এবং এরই সুফল হল খোদ বঙ্গভূমিতে দেবী দুর্গার অবিশ্বাস্য গ্রহণযোগ্যতা। নানা নামে ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন মন্দিরে তিনি তো শত সহস্র বছর ধরে পূজিতা হচ্ছেন, সে তুলনায় বাংলায় তাঁর পূজা তো মাত্র কয়েকশো বছর ধরে শুরু হয়েছে, কিন্তু কোন বিস্ময়পথে তিনি নানা দুঃখে ভরা এই অঞ্চলের আনন্দময়ী হয়ে উঠলেন? ছন্দপতনের আশংকা থাকলেও বলে রাখি, বহু বছর আগে দুর্গাপুজোকেই বাঙালির বৃহত্তম উৎসব বলে চিহ্নিত করে লজ্জা পেয়েছিলাম। বিদেশ থেকে বঙ্গভাষাপ্রেমিক এক অচেনা মুসলমান বন্ধু আমার ভুল ভেঙে দিয়ে লিখেছিলেন, ওটা হিন্দুদের উৎসব, নিখিল বাঙালির বৃহত্তম উৎসব বোধহয় নববর্ষ।

মা দুর্গার আরও কত রকম কথা স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। বাল্যবয়সে পাড়ার রশিদ নামে এক সমবয়সি বন্ধুর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলাম। আমার যত চিন্তা মহিষাসুরকে নিয়ে, রেগেমেগে কখন না কাউকে কামড়ে দেয়। আমার বন্ধুর চিন্তা গণেশের শুঁড় নিয়ে, সে বুঝতেই পারছে না মিঞা গুড়ুক খায় কী করে?

এক-আধটা নয়, তিরাশি বছরের জীবনে বিরাশি বার দুর্গতিনাশিনীকে স্বচক্ষে দেখেছি, কখনও গর্ভধারিণীর কোলে শুয়ে, কখনও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে, কখনও দেশে, কখনও সাগরপারে। এই ২০১৭-র সেপ্টেম্বরেও মা-দুগ্গাকে দেখবার ইচ্ছে প্রবল, যদি তিনি রক্ষা করেন ও দয়া করেন সেই সাধ পূর্ণ হবে।

এই একই ইচ্ছে তো কোটি কোটি মানুষের। যে দেবী সপরিবারে মর্তভূমিতে আসছেন, তাঁর সহস্রনাম আছে, সেই সব নাম এক সময়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছি এবং বিস্মিত হয়েছি, আর ভেবেছি, আমার প্রিয় জন্মভূমি বৈচিত্রের মধ্যেও কেমন সহজ ভাবে ঐক্যকে প্রাধান্য দেওয়ার পথকে খুঁজে পাওয়ার উপায় আবিষ্কার করেছে। এবং কেন প্রতি বছরই একটু আলাদা হয়েও তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম্ থেকে যেতে সমর্থা হয়েছেন সংখ্যাহীন পুরুষ ও নারীর হৃদয়ে।

যৌবনকালে মানুষের এবং সমাজের নানা ভুল খুঁজে বার করবার প্রবণতা ছিল, তখন মনে হত স্বর্গের দেবতারা বড়ই স্বার্থপর, চরম বিপদের সময় নিজেদের গা বাঁচাবার জন্যে একাকিনী এক যুবতী রমণীকে নানা উপহারে ভূষিত করে নিষ্ঠুর এক অসুরের মোকাবিলার জন্য রণক্ষেত্রে পাঠালেন, নির্দ্বিধায় দেবতারা তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন এক অভিনব পানপাত্র যা সদা পূর্ণ থাকে, এবং তিনি যখন কাজ শেষ করে ফিরে এলেন, তখন যথাযোগ্য কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে দেবতারা রূপং দেহি, জয়ং দেহি ইত্যাদি এমন নির্লজ্জভাবে চাইতে লাগলেন যে তিনি রণক্লান্ত শরীরে নিজের প্রাইভেট আবাসনে চলে গেলেন। এ সব অন্যায় কেন হল তা এক সময় খুঁজে বার করবার ইচ্ছা হত, এখন হয় না। এখন শুধু গর্ভধারিণী জননীর কথা মনে পড়ে, ষষ্ঠীর দিনে উপবাস করে তিনি আমাদের বলতেন, মানুষের সব দুর্গতিনাশের জন্য বিশ্বজননী বছরে এক বার মর্তে আসেন, তিনি যা করেন সবই আমাদের মঙ্গলের জন্য, পুজোর ক’দিন তাঁকে বারবার নমস্কার করতে হয়।

Advertisement