Advertisement
E-Paper

বেলাগাম কিল-চড়-ঘুষি, তৃণমূলি শিক্ষাবন্ধুদের তাণ্ডব কল্যাণীতে

নাম নিয়েছেন ‘শিক্ষাবন্ধু।’ মঙ্গলবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্ধু’দের তাণ্ডব দেখে হতবাক গোটা রাজ্য। মহিলা শিক্ষক-পদস্থ আধিকারিকদের মারধর-ধাক্কাধাক্কি-গালিগালাজ থেকে গাড়ি ভাঙচুর কিছুই বাদ রাখলেন না এই ‘শিক্ষাবন্ধু’ ওরফে তৃণমূল-সমর্থিত শিক্ষাকর্মীরা। তাঁদের হাত থেকে বাঁচতে ঘরে তালা দিয়ে ঘণ্টা ছয়েক বসে ছিলেন উপাচার্য। শেষ অবধি শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ধমক খেয়ে ক্ষান্ত হন বিক্ষোভকারীরা।

সৌমিত্র সিকদার ও বিতান ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ ০৩:৪২

নাম নিয়েছেন ‘শিক্ষাবন্ধু।’ মঙ্গলবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘বন্ধু’দের তাণ্ডব দেখে হতবাক গোটা রাজ্য। মহিলা শিক্ষক-পদস্থ আধিকারিকদের মারধর-ধাক্কাধাক্কি-গালিগালাজ থেকে গাড়ি ভাঙচুর কিছুই বাদ রাখলেন না এই ‘শিক্ষাবন্ধু’ ওরফে তৃণমূল-সমর্থিত শিক্ষাকর্মীরা। তাঁদের হাত থেকে বাঁচতে ঘরে তালা দিয়ে ঘণ্টা ছয়েক বসে ছিলেন উপাচার্য। শেষ অবধি শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ধমক খেয়ে ক্ষান্ত হন বিক্ষোভকারীরা।

গত শনিবার শিক্ষামন্ত্রী দাবি করেছিলেন, রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বাম আমলের তুলনায় বিশৃঙ্খলা ৬০ শতাংশ কমে গিয়েছে। তার পরেই মঙ্গলবার কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশৃঙ্খলায় তৃণমূলের নাম জড়াল। উপাচার্য রতনলাল হাংলুর অভিযোগ, কল্যাণী শহর-এর যুব তৃণমূল সভাপতি অরূপ মুখোপাধ্যায় ওরফে টিঙ্কুর নেতৃত্বেই পুরো ঘটনাটি ঘটেছে। হামলাকারীরা সকলেই বহিরাগত। উপাচার্য বিষয়টি রাজ্যপালকে জানিয়েছেন। অরূপবাবুর অবশ্য দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ মিথ্যা। তবে অরূপবাবু যা-ই বলুন, শাসক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে লাগাতার যে নৈরাজ্য এবং নিগ্রহের ছবি উঠে আসছে, এ দিন কল্যাণীর ঘটনা তার অন্যতম উগ্র উদাহরণ বলে মানছেন শিক্ষাজগতের বড় অংশই।


সবিস্তার জানতে ক্লিক করুন।

কী ঘটেছিল এ দিন? মঙ্গলবার দুপুর ১২টা নাগাদ উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মিছিল বার হয়। উপাচার্য হাংলু এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ শিক্ষক-আধিকারিকদের একাংশের বিরুদ্ধে অনেক দিন ধরেই নানা বিষয়ে ক্ষোভ জমছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাকর্মী, গবেষক, আধিকারিক ও পড়ুয়াদের একটি অংশের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, উপাচার্য নিজের ঘনিষ্ঠ একটি বৃত্তের বাইরে কারও সঙ্গে কথা বলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকা-বেরনো নিয়ে কড়াকড়ি করেন। এ ছাড়া পরীক্ষা ব্যবস্থায় গলদ, অসমাপ্ত ফল প্রকাশ এবং কলেজগুলিতে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরেও পড়ুয়াদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের যদিও দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অব্যবস্থা কাটাতেই সক্রিয় হয়েছেন তাঁরা। কর্মীদের একাংশ তাতেই বাদ সাধছেন।

এ দিন শ’তিনেক লোকের মিছিলে কোনও রাজনৈতিক পতাকা-ব্যানার না থাকলেও অংশগ্রহণকারীরা বেশির ভাগই তৃণমূল সমর্থক বলে এলাকায় পরিচিত। বিক্ষোভকারীরা এ দিন উপাচার্য এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত শিক্ষক-আধিকারিকদের অনেকের বিরুদ্ধেই সুর চড়ান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দাবিদাওয়া-হইহল্লা ক্রমে গালিগালাজ এবং হাতাহাতি-মারামারিতে গড়িয়ে যায়। অভিযোগ, প্রথমে পরীক্ষা নিয়ামক পার্থপ্রতিম রায়ের ঘরে গিয়ে তাঁকে তীব্র গালিগালাজ করেন বিক্ষোভকারীরা। এর পর মিছিলের একটা অংশ ঢুকে পড়ে সিকিউরিটি ইন-চার্জ প্রতাপকুমার সাঁতরার ঘরে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে তাঁর এক প্রস্ত বচসা, ধস্তাধস্তি হয়। প্রতাপবাবুর নামে অভিযোগ, তিনি অনিমা দাশ নামে এক মহিলাকে নিগ্রহ করলে মহিলা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়।

এর পরই শুরু হয় পাল্টা মারধর। প্রতাপবাবুর অভিযোগ, “আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক মহিলা এসে আমাকে মারধর শুরু করেন। আমি তাঁকে চিনতেও পারিনি।” ওই মহিলা প্রতাপবাবুকে নাগাড়ে কিল, চড়, ঘুষি মারতে থাকেন। প্রতাপবাবুকে তুলে আনা হয় উপাচার্যের ঘরের সামনে। পাশাপাশি ওই মিছিলের কিছু লোক বটানি-র শিক্ষিকা তথা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি-সংক্রান্ত বিষয়ের চেয়ারপার্সন সুজাতা চৌধুরীকেও ধাক্কা দিতে দিতে তাঁর ঘর থেকে তুলে আনে উপাচার্যের ঘরের সামনে। উপাচার্যের ঘর বন্ধ থাকায় কিছুক্ষণ পরে সুজাতাদেবী নিজের ঘরে ফিরে যান। ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন আধিকারিক অলোককুমার ঘোষ উপাচার্যের সঙ্গে তাঁর ঘরে আটকে ছিলেন। তিনি পরে বলেন, “আজকের ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্কে কাটিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।”

উপাচার্যের ঘরে ঢোকার জন্য একটি গ্রিলও ভাঙার চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা। ভাঙচুর করা হয় সিসিটিভি। উপাচার্যের নিরাপত্তারক্ষীরা ঘরটি ভিতর থেকে তালা দিয়ে রেখেছিলেন। ঢুকতে না পেরে উপাচার্যের দফতরের সামনেই তখন অবস্থান বিক্ষোভ শুরু হয়। ইতিমধ্যে যাদবপুর, রবীন্দ্রভারতী, কলকাতা ও বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশ কয়েকটি বাস ভর্তি করে চলে আসেন ‘সারা বাংলা তৃণমূল শিক্ষাবন্ধু সমিতি’-র শ’দেড়েক সদস্য। তাঁরাও বিক্ষোভে সামিল হন। শিক্ষাবন্ধু সমিতির রাজ্য সভাপতি দেবব্রত সরকার বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে দমবন্ধ-করা পরিবেশ তৈরি করেছেন উপাচার্য। কোনও কর্মী স্বাভাবিক ভাবে কাজ করতে পারছেন না।” সেই সঙ্গে স্নাতক স্তরের পার্ট ১, পার্ট ২ পরীক্ষার ফল অসম্পূর্ণ থাকার অভিযোগেও উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন তিনি। কল্যাণীতে যখন এত কিছু ঘটে চলেছে, তপসিয়ায় তৃণমূল ভবনে বসে শিক্ষামন্ত্রী পার্থবাবু তখন দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলছিলেন। দলের যুব সংগঠনের রাজ্য সভাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই টিভিতে ঘটনাটি দেখে শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পার্থবাবু ঘটনাটি দেখে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। তিনি নিজে ফোন করে ‘শিক্ষাবন্ধু’ সংগঠনের কল্যাণীর নেতাদের স্পষ্ট বলেন, “আমরা মারধরের ঘটনা সমর্থন করছি না।” আজ, বুধবার তিনি নিজে কল্যাণী যাবেন বলেও জানিয়ে দেন। পার্থবাবুর কড়া বার্তাতেই সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ অবস্থান উঠে যায়। মন্ত্রীর নির্দেশে কল্যাণীর বিধায়ক রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাসও বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ব্যাপারে উদ্যোগী হন। প্রতাপবাবুর নামে অবশ্য থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন নিগৃহীতা অনিমা। প্রতাপবাবু নিজেও মার খেয়ে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। সেখান থেকেই তিনি দাবি করেন, “আমাকে ফাঁসাতে এ সব বলা হচ্ছে। আমি কেন ওঁকে মারতে যাব?”

উপাচার্য নিজে কী বলছেন? তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কেই বা তাঁর বক্তব্য কী? হাংলু বলেন, আসল ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে বিক্ষোভকারীরা অন্যান্য বিষয় সামনে টেনে আনছেন। উপাচার্য অভিযোগ করেন, এ দিনের ঘটনার পিছনে টিঙ্কুবাবুর (অরূপ মুখোপাধ্যায়) মদত রয়েছে। তাঁর দাবি, “বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনগুলোকে দখলমুক্ত করায় অনেকের গোঁসা হয়েছে। সেই রাগ থেকেই টিঙ্কুর নেতৃত্বে এ দিন এইসব ঘটেছে।”

বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে খবর, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু আবাসন দখল করে রেখেছিলেন কিছু কর্মী। তা নিয়ে সম্প্রতি কড়া পদক্ষেপ করেন উপাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্রে খবর, টিভির পর্দায় যে মহিলাকে এ দিন প্রতাপবাবুকে মারধর করতে দেখা গিয়েছে, তাঁকেও আবাসন ছাড়ার নোটিস দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। আর একটি সূত্রের দাবি, মহিলার স্বামী বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রুপ ডি কর্মী ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে বিধবা ওই মহিলা অনেক দিন ধরে তাঁর প্রাপ্য টাকা ঠিক মতো পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। সেই ক্ষোভ থেকেই তিনি এ দিনের মিছিলে আসেন বলে অনেকের দাবি।

স্থানীয় তৃণমূল সূত্রে অবশ্য হাংলুর সঙ্গে টিঙ্কুর বিরোধের আরও কাহিনি সামনে আসছে। অভিযোগ, গত জানুয়ারিতে অনুমতি না নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে বনগাঁর তৃণমূল প্রার্থী মমতা ঠাকুরের প্রচারসভা করেছিলেন কিছু শিক্ষাকর্মী। সে জন্য তিন জন অস্থায়ী কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাঁদের এক জন অঞ্জন দত্ত, টিঙ্কুর ঘনিষ্ঠ এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবন্ধু ইউনিটের সম্পাদক। অভিযোগ, অঞ্জনবাবুকে শো-কজ করা নিয়েও হাংলুুর সঙ্গে টিঙ্কবাবুর বিরোধ বেধেছিল। এর পরেই টিঙ্কু উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সংগঠিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ। তৃণমূলের অন্দরে একাংশের আবার দাবি, এই বিরোধের বীজ আরও গভীরে। কী রকম? তাঁদের বক্তব্য, কল্যাণী এলাকাটি মুকুল রায়ের প্রভাবাধীন। টিঙ্কু এবং তাঁর দলবল মূলত মুকুলপন্থী বলে পরিচিত। অন্য দিকে পার্থবাবু শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একটা বড় অংশে পার্থ-ঘনিষ্ঠদের প্রভাব বেড়েছে। এ দিনের ঘটনা সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের পরিণাম বলেও মনে করছেন অনেকে। অরূপবাবু ওরফে টিঙ্কুর নিজের অবশ্য দাবি, “দল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করার দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়নি। তাই সেখানকার বিষয় নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। গত দু’বছর আমি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ঢুকিইনি।”

তবে এ দিন আন্দোলনের নামে যে রকম মারামারি হয়েছে, সেটা অরূপও সমর্থন করছেন না বলেই জানিয়েছেন। এর জন্য প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থানেবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। কিন্তু তার আগে দিনভর সংবাদমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছবি উঠেএল, তাতে হতভম্ব শিক্ষাজগত। প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অমল মুখোপাধ্যায় মন্তব্য করেন, “দিন কয়েক আগেই শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা নাকি কমে গিয়েছে। কিন্তু কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কেমন ঘটনা!” রাজ্যের প্রাক্তন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী তথা সিপিএম নেতা সুদর্শন রায়চৌধুরীর প্রশ্ন, “কৃষ্ণগঞ্জ ওবনগাঁর উপনির্বাচনের ফল প্রকাশের পর কি জোর বেড়ে গেল ওদের (তৃণমূল)?” রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য পবিত্র সরকার সখেদে বলেন, “শিক্ষায়যে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে,তাতে এর থেকে বেশি কী প্রত্যাশা করা যায়?”

soumitra sikdar bitan bhattacharyay kalyani university tmc arup mukhopadhyay ratanlal hanglu
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy