Advertisement
E-Paper

অনিমেষ নেই, বিষাদ রাজনগরে

জাতীয় সড়কে লরি দাঁড় করিয়ে নথিপত্র পরীক্ষার সময় তেল ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় মৃত্যু হল পরিবহণ দফতরের এক ইনস্পেক্টরের। মঙ্গলবার রাতে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থানার মিলননগরের রেলসেতুর কাছে, হলদিয়া-মেচেদা ৪১ নম্বর জাতীয় সড়কের ঘটনা। পুলিশ জানায়, মৃতের নাম অনিমেষ দে (২৮)।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৫ ০১:০০
মৃত অনিমেষ দে।

মৃত অনিমেষ দে।

জাতীয় সড়কে লরি দাঁড় করিয়ে নথিপত্র পরীক্ষার সময় তেল ট্যাঙ্কারের ধাক্কায় মৃত্যু হল পরিবহণ দফতরের এক ইনস্পেক্টরের।

মঙ্গলবার রাতে পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থানার মিলননগরের রেলসেতুর কাছে, হলদিয়া-মেচেদা ৪১ নম্বর জাতীয় সড়কের ঘটনা। পুলিশ জানায়, মৃতের নাম অনিমেষ দে (২৮)। জেলা পরিবহণ দফতরের মোটর ভেহিক্যাল ইনস্পেক্টর (এমভিআই–নন টেকনিক্যাল) অনিমেষবাবুর বাড়ি বীরভূমের রাজনগরে। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ট্যাঙ্কার চালকেরও। তবে, তাঁর পরিচয় জানা যায়নি। আহত হয়েছেন অনিমেষবাবুর সঙ্গে থাকা দুই এনভিএফ কর্মী। কালাচাঁদ জানা এবং দীপক সাহু নামে ওই দুই এনভিএফ কর্মী বর্তমানে তমলুক জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, ৪১ নম্বর জাতীয় সড়ক দিয়ে মূলত হলদিয়া শিল্পাঞ্চলের পণ্যবাহী লরি যাতায়াত করে। গাড়িগুলি যাতে অতিরিক্ত পণ্য বহন করতে না পারে সে জন্য জাতীয় সড়কে নজরদারি চালানো হয়। অন্যদিনের মতোই মঙ্গলবার রাত ১০টা নাগাদ নজরদারির দায়িত্বে অনিমেষবাবুর সঙ্গে ছিলেন দফতরের আর এক ইনস্পেক্টর আওয়াল হোসেন। তাঁরা মিলননগর রেল সেতুর কাছে জাতীয় সড়কে বিভিন্ন পণ্যবাহী গাড়ির নথিপত্র পরীক্ষা করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন পুলিশের চারজন কনস্টেবল ও দু’জন এনভিএফ কর্মী।

পুলিশ সূত্রে খবর, এ দিন রাত সাড়ে ১১টা নাগাদ হলদিয়ার থেকে মেচেদাগামী একটি কয়লা বোঝাই লরি দাঁড় করিয়ে নথিপত্র পরীক্ষা করছিলেন অনিমেষবাবু। তাঁর ঠিক পাশেই ছিলেন আওয়াল হোসেন সহ পুলিশ কর্মীরা। সেই সময় হলদিয়া থেকে মেচেদাগামী একটি তেল ট্যাঙ্কার ওই লরির পিছনে সজোরে ধাক্কা মারে বলে অভিযোগ। তার জেরে কয়লা বোঝাই লরিটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এগিয়ে যাওয়ায় লরির চাকায় পিষ্ট হন অনিমেষবাবু। জখম হন দীপক ও কালাচাঁদ। গুরুতর আহত হন ট্যাঙ্কার চালকও।

দুর্ঘটনার পরেই অন্য পুলিশ কর্মীরা আহত চারজনকে উদ্ধার করে তমলুক জেলা হাসপাতালে নিয়ে এসে ভর্তি করে। রাতেই হাসপাতালে মৃত্যু হয় অনিমেষবাবুর। আহত ট্যাঙ্কার চালককে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পরেই লরির চালক ও দু’টি গাড়িরই খালাসি পালিয়ে যায়। পুলিশ গাড়ি দু’টি আটক করেছে।

বুধবার কালাচাঁদ ও দীপক বলেন, ‘‘অনিমেষবাবু কয়লা বোঝাই লরির পাশে দাঁড়িয়ে খালাসির কাছ থেকে নথিপত্র চেয়ে পরীক্ষা করার সময় পিছন দিক থেকে আসা একটি ট্যাঙ্কার ওই লরিতে ধাক্কা মারে। লরির চাকায় অনিমেষবাবু পিষ্ট হন। ট্যাঙ্কার চালক মদ্যপ অবস্থায় থাকার ফলেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।’’ যদিও রাতে কর্তব্যরত এনভিএফ কর্মীদের অভিযোগ, সড়কের বাঁ দিকে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নথিপত্র পরীক্ষাই নিয়ম। অথচ নিয়ম ভেঙে রাস্তার ডান দিকে লরি দাঁড় করিয়ে নথিপত্র পরীক্ষা করা হচ্ছিল। তার জেরেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। জেলা পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলেন, ‘‘জাতীয় সড়কে গাড়িতে অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই রুখতে পরিবহণ দফতরের ওই ইন্সপেক্টর নজরদারির দায়িত্বে ছিলেন। অন্য একটি গাড়ি তাঁকে ধাক্কা মারার ফলে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত চলছে।’’

এ দিন দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তমলুকে আসেন অনিমেষবাবুর দাদা অনির্বাণ দে-সহ পরিজনেরা। অনিমেষবাবুর মা, বাবা, দুই ভাই ও বৌদি মিলিয়ে পাঁচ জনের পরিবার। অনির্বাণবাবু পেশায় ব্যবসায়ী। ছোট ভাই অনিমেষ আগে বাড়ির কাছে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। বছর দু’য়েক আগে পরিবহণ দফতরের ইন্সপেক্টর পদের পরীক্ষায় পাশ করে তমলুকে কাজে যোগ দেন তিনি। ভাইয়ের মৃত্যুর খবরে শোকস্তব্ধ অনির্বাণবাবু বলেন, ‘‘ভাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে পরিবহণ দফতরের চাকরিতে যোগ দিয়েছিস। তবে ডব্লিউবিসিএস অফিসার হওয়াই ওঁর লক্ষ্য ছিল। সে জন্য একবার ডব্লিউববিসিএসের ডি পদের পরীক্ষায় পাশ করেও চাকরিতে যোগ দেয়নি। আরও ভাল করে পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।’’ অনিমেষবাবুর মামাতো ভাই অভিজিৎ নন্দনেরও বক্তব্য, ‘‘অনিমেষের বিয়ের জন্য কথাবার্তা চলছিল। একটি দুর্ঘটনায় সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেল।’’

এ দিকে, তরতাজা ছেলেটা আর নেই, সকালে খবরটা পাওয়ার পর থেকেই মন খারাপ রাজনগরের। কতটা মনখারাপ, বুধবার বিকেলে রাজনগরের বড়বাজারে অনিমেষদের শোকস্তব্ধ বাড়ির সামনে থমকে থাকা ভিড়ই তার প্রমাণ। তখনও অনিমেষের দেহ এসে পৌঁছয়নি। সন্তান হারিয়ে নিথর হয়ে গিয়েছেন বাবা তীর্থ দে, মা আদরীদেবী। অনিমেষের মতো তরুণের জন্যই যে মানুষের আক্ষেপ যাওয়ার নয়, জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা এবং অনিমেষের বন্ধুরা। প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা করতে করতেই সমাজের কী ভাবে ভাল করা যায়, সেই চিন্তায় মশগুল থকতেন অনিমেষ। ২০১১ সালে এমভিআই হিসাবে যোগ দেওয়ার পরেও যাতে ছেদ পড়েনি। শুক্রবার যত রাতই হোক, গ্রামে ফিরতেন তিনি। কী ভাবে গ্রামের তরুণেরা চাকুরি পেতে পারে, তার জন্য একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রও খুলেছিলেন। নিজে পড়াতেন, সঙ্গী ছিলেন বন্ধুরাও। গড়ে দিয়েছিলেন শরীর চর্চার জন্য জিম। রাজনগরের বাছাই ১৫ জন শিশুকে নিয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতিও শুরু করেছিলেন এখন থেকেই। ছোটবেলার বন্ধু কুদরত আলি খান, সোমনাথ কর্মকার, রাকেশ ওঝারা বলেন, ‘‘গরিব মেয়ের বিয়ে আটকেছে, কিংবা কেউ বিপদে পড়েছেন— সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন অনিমেষ। এ রকম একটা পরোপকারী ছেলে ডিউটি করতে করতেই মারা গেল, কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।’’

এ দিন হাসপাতালে অনিমেষবাবুকে শ্রদ্ধা জানান পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক অন্তরা আচার্য-সহ প্রশাসন এবং জেলা পরিবহণ দফতরের আধিকারিক এবং কর্মীরা। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী জেলাশাসক অনিমেষবাবুর শেষকৃত্যের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা সাহায্য ও পরিবারের যে কোনও একজন সদস্যকে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিপত্র দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন। জেলাশাসক বলেন, ‘‘দুর্ঘটনায় যুক্ত দু’টি গাড়ি ও তাঁদের কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

Transport inspector bus accident Rajnagar
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy