প্রশ্ন: এ বছরই আপনাকে পশ্চিমবঙ্গ শিশুসুরক্ষা কমিশন পুরস্কৃত করেছে। কেমন লাগছে?

উত্তর: এমনিতে আগে আরও পুরস্কার পেয়েছি স্থানীয় স্তরে। কিন্তু রাজ্যের একটি শীর্ষ সংস্থা আমার কাজে প্রশংসা করলে তো ভালই লাগে। মনে হয় যেন আরও কাজ করি। তাই এই পুরস্কার পেয়ে আমার দায়িত্ব অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আরও মন দিয়ে কাজ করতে হবে। প্রচুর দরিদ্র পরিবারের কাছে পৌঁছতে হবে। তাদের বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করাতে হবে। অল্পবয়সী মেয়েদের বিয়ে ঠেকাতে হবে। 

 

প্রশ্ন: এর আগে কী কী পুরস্কার পেয়েছিলেন? 

উত্তর: এর আগে বিহারী কল্যাণ মঞ্চ, চাইল্ড লাইন এবং কেন্দ্রীয় একটি সংস্থা থেকেও পুরস্কার পেয়েছি। 

 

প্রশ্ন: বাচ্চাদের অধিকার নিয়ে কবে থেকে কাজ শুরু করলেন? 

উত্তর: আমি এখন রাজেন্দ্রপ্রসাদ গার্লস হাইস্কুলে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছি। প্রায় ৬-৭ বছর আগে শিশুদের নিয়ে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দাদারা এসে স্কুলে বাচ্চাদের অধিকার নিয়ে বললেন। আমাদের সাহায্য চাইলেন। তখনই আমি ঠিক করি, এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হব। তাঁরা একটি দল তৈরি করে দিলেন। আমাদের শিলিগুড়ি জংশন লাগোয়া কুলিপাড়া বস্তি এলাকায় কাজ শুরু হল। ব্যস। সেই শুরু। আজও করছি। আরও বেশি করে দায়িত্ব আসছে রোজ রোজ। 

 

প্রশ্ন: পরিবারে কে কে রয়েছে? 

উত্তর: বাবা মারা গিয়েছেন অনেকদিন আগেই। অভাবের সংসারে মা গুলমা বনাঞ্চল থেকে খড়ি কুড়িয়ে বা কখনও কম দামে কিনে নিয়ে আসেন। ছোড়দি রজনী দশম শ্রেণি পাশ করে আর পড়তে পারেনি। বড়দি সুমন দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করেছে। এখন ও আমাকে শিশু সুরক্ষার কাজে সাহায্য করে। বাড়ির কাজ, যেমন রান্নাবান্নার কাজও কিছুটা করতে হয়, স্কুল যেতে হয়। তারপরেও সংসারের অন্য কাজ আছে, যেমন পোষ্য ছাগল দেখা। দাদা শঙ্কর আলাদা থাকে। তবে আমার পড়াশোনার জন্য কিছু টাকা সে দেয়। এ ভাবেই চলছে আমাদের জীবন। 

 

প্রশ্ন: এলাকায় কোনও কেন্দ্র রয়েছে আপনাদের কাজের? 

উত্তর: কুলিপাড়া বস্তিতেই হনুমান মন্দিরের পাশে বাগিচা সেন্টার রয়েছে। এটা ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থারই। সেখানে সপ্তাহের শেষে অনেক বাচ্চা আসে। তাদের নানারকম বৃত্তিমূলক কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখানো হয়। ওই কেন্দ্র থেকেই আমি হাতের কাজ শিখছি। তা ছাড়াও এলাকার একটি নার্সারি স্কুলের বাচ্চাকে বিনা পয়সায় পড়াই। ওই কেন্দ্রে আসা বাচ্চাদের স্কুলে যাওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করি। 

 

প্রশ্ন: কেন্দ্রের বাইরে কিভাবে কাজ করেন? 

উত্তর: এলাকায় পাশাপাশি অনেকগুলি রেল কলোনি এবং বস্তি রয়েছে। কুলিপাড়া ছাড়াও ডিজেল বস্তি রয়েছে। এই সমস্ত এলাকায় গিয়ে বাচ্চাদের বাবা-মায়েদের সঙ্গে কথা বলি। তাদের বলি, বাচ্চাদের পড়াতে হবে, স্কুলে পাঠাতে হবে। মেয়েদের ১৮ বছর না হলে বিয়ে দেবেন না। এই সমস্ত প্রচারের কাজই করছি। অনেক কষ্ট হয়। কারণ বেশিরভাগ বাবা-মা পড়াশোনা করেনি। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর কথা শুনলে তাদের কেমন যেন একটা অদ্ভুত মনোভাব কাজ করে তাদের। কথা বলে সেগুলোর সঙ্গে লড়তে হয়। 

 

প্রশ্ন: কীরকম সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কাজ করতে গিয়ে? 

উত্তর: মূলত দু’রকমের সমস্যা দেখতে পাই। প্রথমত, বাবা মায়েদের সচেতনতা থাকে না যে বাচ্চাকে স্কুলে পাঠাতে হবে। অনেক বাচ্চা স্কুলে না গিয়ে বাড়িতে বসে থাকে। অনেক বাচ্চাদের আবার তাদের বাবা মায়েরা শিশুশ্রমিকের মতো কাজ করিয়ে টাকা আয় করানো। একজন শিশুকে দিয়ে দিনে ১০০ থেকে ২০০ টাকা আয় করানো হয়। তাই তাদের বাবা-মায়েদের বলতে গেলে তাঁরা দাবি করেন, বাচ্চাটি যে টাকা আয় করছে, সেই ক্ষতিপূরণ কে দেবে? তা-ও তাদের বাচ্চাদের সুস্থ ভবিষ্যতের কথা বুঝিয়েই কাজ করতে হয়।

 

প্রশ্ন: তা হলে উপায়? 

উত্তর: স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্তারা জানিয়েছেন, আগামী দু’মাসে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য আরও কিছু সরকারি পরিকল্পনা রূপায়ণ করার কথা। এখন বাচ্চারা স্কুলে গেলে তাদের মিড-ডে মিল খাওয়ার সুযোগ থাকে। আরও কিছু সুবিধা পায় তারা। তবে নতুন স্কিমে তাদের জন্য আর্থিক সাহায্যেরও কিছু পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। সেগুলি পেলে হয়তো এলাকায় স্কুলছুটের হার কমবে এবং বস্তি এলাকা থেকে আরও বাচ্চা ছেলেমেয়েরা স্কুলের গণ্ডির মধ্যে এসে পড়তে পারবে।

 

প্রশ্ন: হতাশা আসে কাজ করতে গিয়ে? 

উত্তর: আগে আসত। প্রথম প্রথম যখন এই কাজ শুরু করি, তখন অনেক বাবা-মায়েরাই এ সব ভাল চোখে নিতেন না। বাড়িতে গেলেই দূর দূর করে তাড়িয়েও দিতেন। অনেক জায়গায় ঝামেলাও হয়েছে। বাবা মায়েরা বুঝতেই চাইতেন না। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। এখনও পর্যন্ত এলাকার প্রায় ২০০ দরিদ্র পরিবারের বাচ্চাকে স্কুলের উঠোনে নিয়ে যেতে পেরেছি। তাই হতাশা থাকলেও আগের চেয়ে অনেকটাই মানসিক জোরও বেড়েছে। 

 

প্রশ্ন: এলাকার সামাজিক অবস্থা ঠিক কীরকম? 

উত্তর: চোখের সামনে দেখছি, এলাকায় নেশার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চারা ডেনড্রাইটের গন্ধে নেশা করে। আরও নানারকম নেশার প্রকোপ রয়েছে এলাকায়। তবে ওই পরিবেশ থেকেই বাচ্চাদের স্কুলে ফেরানোর বা নতুন করে স্কুলে ভর্তি করানোর কাজ করি। স্কুলে ভর্তির পরেও খোঁজ রাখতে হয়, তারা মাঝপথে স্কুলে আসা ছেড়ে দিল কিনা। তারপর আমরা না পারলে সংস্থার দাদাদের বলতে হয়। 

 

প্রশ্ন: কীভাবে বোঝেন কোন কোন বাড়ির বাচ্চা সমস্যায় রয়েছে। 

উত্তর: আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এলাকায় একটি শিশুর সব রকমের অধিকার রক্ষা হচ্ছে কি না তা নিয়ে একটি ম্যাপিং বা সমীক্ষা করা হয়েছিল। ওই ম্যাপিংয়ে আমরা বুঝতে পেরেছি, এলাকায় কী কী সমস্যা বাচ্চাদের উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কোন কোন এলাকা শিশুকন্যাদের জন্য ভাল নয়। কোন এলাকায় নেশার প্রভাব বেশি। কারা করছে এগুলি। এগুলি জানা গেলেই সমাধানের রাস্তাটা ঠিক বেরিয়ে আসে। 

 

প্রশ্ন: বাল্যবিবাহ আটকানোর কাজও করেন? 

উত্তর: হ্যাঁ। ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে তৈরি করে দেওয়া আমাদের এলাকায় ২০ জনের একটি দল রয়েছে। আমরা নিয়মিত ভাবে খোঁজখবর রাখি এলাকায় কার কার বিয়ে অল্প বয়েসে হচ্ছে। কয়েকমাস আগেই এলাকায় এরকম একটি নাবালিকা মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আমরা গিয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলি, তাঁদের বোঝানোর চেষ্টা করি। কারণ বস্তি এবং দরিদ্র এলাকা থেকেই বিয়ের নামে পাচারের ভয় থাকে। আমরা সেগুলো আমাদের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রশিক্ষণে গিয়ে শিখেছি। শেষ পর্যন্ত তার বিয়ে আটকানো গিয়েছে। সে আবার স্কুলে যেতে শুরু করেছে। এরকম আরও কয়েকটি ঘটনার ক্ষেত্রেও আমরা কথা বলে বাবা-মায়েদের সচেতন করি।  

 

প্রশ্ন: পড়াশোনা আর কাজের বাইরে বাড়িতে কীভাবে সময় কাটান? 

উত্তর: বাড়িতে টিভিটি খারাপ হয়ে গিয়েছে প্রায় দু’বছর হল। স্কুল, বাচ্চাদের নিয়ে কাজ শেষ হলে মায়ের সঙ্গে সময় কাটাই। সংসারের কাজ কিছুটা এগিয়ে দিই, দিদিদের সঙ্গে আড্ডা দিই। মোবাইলে একটু গেমও খেলি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে ভাল লাগে। এ বার ছটপুজোয় বেশ আনন্দ হয়েছে। পুজোর প্রস্তুতি, পরিবারের সঙ্গে আনন্দ করা, নদীতে গিয়ে পুজোয় অংশ নেওয়ার মতো কাজও বেশ উপভোগ করেছি। সব মিলিয়ে পুজো ভালই কেটেছে। 

 

প্রশ্ন: এলাকার মানুষের আপনাকে নিয়ে কী ধারণা? 

উত্তর: আগে এলাকার মানুষের ধারণা আমাকে নিয়ে একেবারেই ভাল ছিল না। তাঁরা ভাবতেন, আমি সারা দিন বোধহয় অকাজে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মাকে এসে তারা নানা নালিশ করতেন। তারপর তাঁরা যখন বুঝতে পারলেন, আমার কাজ সম্পর্কে একটা ধারণা পেলেন, তখন থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। এখন তাঁরা মায়ের কাছেই আমার কাজের প্রশংসা করেন। বাড়িতে অনেকেই দেখা করতে আসে। আমার কাজের খোঁজখবর নিতে আসে। 

 

প্রশ্ন: কী করতে চান ভবিষ্যতে? 

উত্তর: হিন্দিতে অনার্স নিয়ে পড়তে চাই। স্কুলের শিক্ষিকা হতে চাই। বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে ভাল লাগে। তাদের সঙ্গে থেকে যদি সারা জীবন এ ভাবেই তাদের কিছু উপকারে লাগতে পারি, তা হলে আমার ভাল লাগবে। কারণ দরিদ্র বস্তি এলাকার বাচ্চাদের তার চার পাশের সামাজিক পরিবেশের কু-প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে তাদের নিজের পায়ে দাঁড় করানো প্রয়োজন। এলাকায় শিশুশ্রম আটকানো প্রয়োজন। নেশামুক্তি করা প্রয়োজন রয়েছে। আমি সেই কাজের সঙ্গে সারাজীবনই থাকতে চাই।