Advertisement
E-Paper

আদতে কি ‘সমঝোতা’, প্রশ্ন তেহরান থেকে ওয়াশিংটনে

অবশেষে কাটল জট। টানা প্রায় এক দশকের অচলাবস্থা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মিলল সমাধানসূত্র। মঙ্গলবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে চুক্তি সই করল আমেরিকা-সহ ছ’টি দেশ। যে চুক্তিকে কেউ বলছেন ‘ঐতিহাসিক’, কারও মতে, ‘ঐতিহাসিক ভুল’!

সংবাদ সংস্থা

শেষ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৫ ০২:৫৬
চুক্তি সইয়ের পর। দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তৃতা ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির। মঙ্গলবার তেহরানে। ছবি: এএফপি

চুক্তি সইয়ের পর। দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তৃতা ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির। মঙ্গলবার তেহরানে। ছবি: এএফপি

অবশেষে কাটল জট। টানা প্রায় এক দশকের অচলাবস্থা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত মিলল সমাধানসূত্র। মঙ্গলবার অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে চুক্তি সই করল আমেরিকা-সহ ছ’টি দেশ। যে চুক্তিকে কেউ বলছেন ‘ঐতিহাসিক’, কারও মতে, ‘ঐতিহাসিক ভুল’! তবে ঘটনা এই যে, পশ্চিম এশিয়া জুড়ে জঙ্গি-গোষ্ঠী আইএস-এর দাপট যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি এক অন্য বার্তা বয়ে নিয়ে এল বলেই মনে করছেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা।

কিছু দিন আগে পর্যন্ত ইরানকে ‘শয়তানের অক্ষ’ বলে ডেকেছে আমেরিকা। পাল্টা আমেরিকাকে ‘শয়তান’ বলতে ছাড়েনি ইরানও। আজ এই চুক্তির পরে কিন্তু ইরানকে সম্ভাব্য সহযোগী ভাবছে পশ্চিমী বিশ্বের অনেক দেশই! আর সম্ভবত এই চুক্তির এটাই সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক! তবে অন্য দিকও আছে। আমেরিকার দীর্ঘদিনের ‘মিত্র’ এবং ইরানের দীর্ঘদিনের ‘শত্রু’ ইজরায়েল তো বটেই, আরব দুনিয়ার একাধিক দেশের কপালেও ভাঁজ ফেলেছে এই চুক্তি। তাদের তরফে সমালোচনার ঝড়ও উঠেছে। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এক নয়া মেরুকরণের দরজায় দাঁড়িয়ে। যদিও নিন্দামন্দকে আপাতত পাত্তা দিচ্ছে না পশ্চিমী দেশগুলি। তবে প্রশ্ন উঠছে, চুক্তিতে ইরানকে যে সব শর্ত মানার কথা বলা হয়েছে, তা কি ইরান মানবে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দিনের শুরুতেই হুমকি দিয়েছেন, যে কোনও মূল্যে ইরানকে চুক্তির শর্ত মানতে হবে। আর ইরান? তাদের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি চুক্তি ঘিরে শুধুই আবেগে ভাসছেন। নতুন দিগন্ত খুলে যাওয়ার বার্তাও তিনি দিয়ে রেখেছেন ৮ কোটি দেশবাসীকে।

কিন্তু কী এই পরমাণু চুক্তি? কার এতে লাভ, কার ক্ষতি? ইরানের সঙ্গে যে ছ’টি দেশের চুক্তি হয়েছে, তার মধ্যে রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, চিন— পরমাণু শক্তিধর। চুক্তির টেবিলে সমঝোতায় এসেছে জার্মানিও। সরকারি ভাবে চুক্তিপত্রের বিস্তারিত ঘোষণা না হলেও মনে করা হচ্ছে, এটাই ইরানের পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ রূপরেখা। ওয়াশিংটনের দাবি, চুক্তি মানলে আগামী ১০ বছর পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারবে না তেহরান। বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয়েছে আমেরিকা, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাষ্ট্রপুঞ্জ। একাংশের আশা, এর ফলে অর্থনীতির জোয়ার আসবে ইরানে। চুক্তির শর্ত এবং বিশ্বশক্তির দাবি মেনে, নিজেদের পরমাণু কর্মসূচিতে কাটছাঁট করতে রাজি হয়েছে ইরানও। তাই বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে আশাবাদী অনেকেই। বিশেষত আমেরিকা।

অন্য দিকে, নিষেধাজ্ঞার জেরে দীর্ঘ দিন ধরে অপরিশোধিত তেলের বাজারে ব্রাত্য ছিল ইরান। এ বার সেই পথ খুলে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের জোগান বাড়বে বলে অনুমান। অর্থাৎ তেলের দাম কমবে। যার সুফল মেলার আশা ভারতেও।

তবু আশঙ্কা কিছু থাকছেই। কারণ চুক্তি নিয়ে প্রথম থেকেই ঘরে-বাইরে প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে ওবামা এবং রুহানিকে। ওবামা অবশ্য আজ সাফ বলেছেন, ‘‘কাউকে বিশ্বাস করে নয়। ইরানের সঙ্গে এই চুক্তি হয়েছে সব দিক খতিয়ে দেখেই।’’ চুক্তি বাস্তবায়িত করার ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসকে পাশে পাওয়া নিয়ে তিনি নিজেই চিন্তিত। কংগ্রেসে এই মুহূর্তে প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদের রমরমা। ওয়াশিংটন সূত্রের খবর, আগামী দু’মাস ধরে চুক্তির খুঁটিনাটি পর্যালোচনা হবে কংগ্রেসে। কংগ্রেস বেঁকে বসতে পারে। সে ক্ষেত্রে ওবামার অবশ্য ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা আছে। এ দিন তা জানিয়েও দেন তিনি।

চুক্তির প্রতিটি শর্ত খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন ওবামা। তার পরেই ইরানের উপর থেকে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা উঠবে। তাই এখনই উৎসবে মাততে নারাজ তেহরান। তেহরানে বিরোধী শিবিরের এক নেতার কথায়, ‘‘আমাদের নিরাপত্তা পরিষদও চুক্তিপত্র খতিয়ে দেখবে। জাতীয় স্বার্থের বিরোধী মনে হলে আমরা এই চুক্তি বাতিলও করতে পারি।’’

চুক্তি ঘিরে ইরানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে বলেও মত অনেকের। দেশের ধর্মীয় প্রধান আলি খামেনেই সম্প্রতি পশ্চিমী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখার কথা বলেছিলেন। তিনি কি মেনে নেবেন এই চুক্তি? প্রশ্ন থাকছে। দেশের স্বার্থে যদি তা মেনেও নেন, প্রেসিডেন্টের বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তা হজম করতে পারবেন তো? সে প্রশ্নও উঠছে।

এ দিকে চুক্তি সইয়ের খবর পেয়েই বোমা ফাটাতে শুরু করেছেন ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। টুইটারে তিনি বলেন, ‘‘এ এক ঐতিহাসিক ভুল! যে পরমাণু অস্ত্র নিয়ে আমেরিকার আপত্তি, চুক্তিতে সেই পথটাই যেন আরও সহজ হয়ে গেল ইরানের কাছে!’’ ২০০৬-এ শুরুটা হলেও ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট পদে রুহানি আসার পরই গতি পায় এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা। মাস কয়েক আগে সুইৎজারল্যান্ডের লুসানে সমঝোতার খসড়া মোটামুটি স্থির হয়ে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয় চলতি মাসে ভিয়েনায়। সমাধানসূত্র মিলল ঠিক আঠারো দিনের মাথায়। কূটনীতিকদের একটা বড় অংশ অবশ্য বিষয়টিকে ‘চুক্তি’ নয়, ‘সমঝোতা’-ই বলতে চাইছেন। তাঁদের দাবি, দু’পক্ষকেই আপস করতে হয়েছে বেশ কিছু ক্ষেত্রে।

কোথায় কোথায় আপস? আলোচনার শুরুতে নিজেদের সামরিক ঘাঁটিগুলিতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের যেতে দেওয়া নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিল তেহরান। কিন্তু ওয়াশিংটন সূত্রের খবর, চুক্তি সইয়ের পর রাষ্ট্রপুঞ্জের পরিদর্শকরা তাদের পরমাণু কেন্দ্রগুলি পরীক্ষা করতে পারবে বলে মেনে নিয়েছে ইরান। তবে অবাধ পরিদর্শনের অনুমতি নয় কোনও ভাবেই।

ইরান নিজে থেকে চুক্তির কোনও শর্ত ভাঙলে ৬৫ দিনের মধ্যে ফের আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারির কথা আছে চুক্তিপত্রে। তবে চুক্তি মানা হলে ইরানের উপর অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে যে দু’টি নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা যথাক্রমে পাঁচ ও আট বছর পরে উঠে যাবে বলে মেনেছে রাষ্ট্রপুঞ্জ।

iran nuclear deal six nation nuclear deal vienna us iran nuclear deal historical nuclear deal hasan rouhani iran president vienna talks ayatollah khomeini
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy