Follow us on
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors
Powered by
Co-Powered by
Co-Sponsors

১ মাইলের ভাড়া ৩ আনা, ভাড়া হত ঘণ্টাপিছুও, ব্যক্তিগত পালকি ছিল সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠি

কলকাতা| ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১১:১০ শেষ আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১১:১৫
১৪ ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার পালকি কিন্তু শুধু গ্রামের মেঠো পথের নয়। ব্রিটিশ কলকাতাতেও যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই পালকি। ছাপোষা মধ্যবিত্ত থেকে ধনী বাবু। প্রত্যেক শ্রেণির মানুষ সওয়ার হতেন চতুর্দোলায়।
ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতার পালকি কিন্তু শুধু গ্রামের মেঠো পথের নয়। ব্রিটিশ কলকাতাতেও যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই পালকি। ছাপোষা মধ্যবিত্ত থেকে ধনী বাবু। প্রত্যেক শ্রেণির মানুষ সওয়ার হতেন চতুর্দোলায়।
১৪ অষ্টাদশ শতকে পালকিই ছিল সঙ্গতিপন্ন কলকাতার বাহন। ঘোড়ার গাড়ি আসার পরেও কিন্তু পালকির প্রচলন কমেনি। বাঙালি এবং ইওরোপীয়, দু’পক্ষেরই পছন্দের বাহন ছিল পালকি।
অষ্টাদশ শতকে পালকিই ছিল সঙ্গতিপন্ন কলকাতার বাহন। ঘোড়ার গাড়ি আসার পরেও কিন্তু পালকির প্রচলন কমেনি। বাঙালি এবং ইওরোপীয়, দু’পক্ষেরই পছন্দের বাহন ছিল পালকি।
১৪ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড় বাবুরা ব্যক্তিগত পালকি এবং বেহারা রাখতেন। তাঁরা আবার তাঁদের অধস্তন কর্মীদের পালকি রাখা পছন্দ করতেন না। কারণ পালকি চড়া ছিল সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিও। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই সকল শ্রেণির ইওরোপীয়রা পালকিতে সওয়ার হতেন।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বড় বাবুরা ব্যক্তিগত পালকি এবং বেহারা রাখতেন। তাঁরা আবার তাঁদের অধস্তন কর্মীদের পালকি রাখা পছন্দ করতেন না। কারণ পালকি চড়া ছিল সামাজিক মর্যাদার মাপকাঠিও। কিন্তু সেই বিধিনিষেধ উপেক্ষা করেই সকল শ্রেণির ইওরোপীয়রা পালকিতে সওয়ার হতেন।
১৪ রাধারমণ মিত্রের ‘কলিকাতা-দর্পণ’ বইয়ে বলা হয়েছে, ডেভিড হেয়ার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীরা ঘোড়ার গাড়ির তুলনায় বেশি পছন্দ করতেন পালকিই। হেয়ার সাহেব কোনও দিন এক্কাগাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ি চড়েননি। তাঁর বাহন ছিল পালকিই। পাশাপাশি, সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেয়ে-বউরা পালকি করেই যেতেন গঙ্গাস্নানে। পালকিসমেত গঙ্গায় তাঁদের চুবিয়ে দেওয়া হত। তাঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালেই সারতেন গঙ্গাস্নান।
রাধারমণ মিত্রের ‘কলিকাতা-দর্পণ’ বইয়ে বলা হয়েছে, ডেভিড হেয়ার, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো মনীষীরা ঘোড়ার গাড়ির তুলনায় বেশি পছন্দ করতেন পালকিই। হেয়ার সাহেব কোনও দিন এক্কাগাড়ি বা ঘোড়ার গাড়ি চড়েননি। তাঁর বাহন ছিল পালকিই। পাশাপাশি, সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেয়ে-বউরা পালকি করেই যেতেন গঙ্গাস্নানে। পালকিসমেত গঙ্গায় তাঁদের চুবিয়ে দেওয়া হত। তাঁরা লোকচক্ষুর অন্তরালেই সারতেন গঙ্গাস্নান।
১৪ কলকাতায় পালকি বেহারার কাজ করতেন দুলে ও বাগদি শ্রেণির মানুষ। কিন্তু পরে তাঁদের জায়গা নিয়ে নেয় অবাঙালি বেহারা। তাঁরা মূলত ছিলেন হিন্দুস্তানি এবং ওড়িয়া। কথিত, ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজা’ উপাধি পাওয়ার পরে নবকৃষ্ণ দেব ওড়িশা ও হিন্দিবলয় থেকে বেহারাদের আনিয়েছিলেন। কারণ দুলে, বাগদি তাঁর কাছে ছিল ‘অস্পৃশ্য’। নথি বলছে, ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় একজন হিন্দুস্তানি পালকি বেহারার প্রতি মাসে বেতন ছিল ৪ টাকা। ওড়িয়া বেহারা পেতেন ৫ টাকা।
কলকাতায় পালকি বেহারার কাজ করতেন দুলে ও বাগদি শ্রেণির মানুষ। কিন্তু পরে তাঁদের জায়গা নিয়ে নেয় অবাঙালি বেহারা। তাঁরা মূলত ছিলেন হিন্দুস্তানি এবং ওড়িয়া। কথিত, ১৭৬৭ খ্রিস্টাব্দে ‘রাজা’ উপাধি পাওয়ার পরে নবকৃষ্ণ দেব ওড়িশা ও হিন্দিবলয় থেকে বেহারাদের আনিয়েছিলেন। কারণ দুলে, বাগদি তাঁর কাছে ছিল ‘অস্পৃশ্য’। নথি বলছে, ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় একজন হিন্দুস্তানি পালকি বেহারার প্রতি মাসে বেতন ছিল ৪ টাকা। ওড়িয়া বেহারা পেতেন ৫ টাকা।
১৪ এখন যেমন বাঙালির বাহন দু’রকম। হয় নিজস্ব গাড়ি, নয়তো অ্যাপ থেকে ভাড়া করা গাড়ি বা বাস। আজ থেকে ১৭০ বছর আগেও কলকাতার ছবিটা ছিল কমবেশি এইরকমই। কারও নিজের পালকি থাকত। কেউ আবার পালকি ভাড়া করতেন। স্বভাবতই ব্যক্তিগত পালকি ছিল ভাড়া করা পালকির তুলনায় অনেক বেশি বাহারি।
এখন যেমন বাঙালির বাহন দু’রকম। হয় নিজস্ব গাড়ি, নয়তো অ্যাপ থেকে ভাড়া করা গাড়ি বা বাস। আজ থেকে ১৭০ বছর আগেও কলকাতার ছবিটা ছিল কমবেশি এইরকমই। কারও নিজের পালকি থাকত। কেউ আবার পালকি ভাড়া করতেন। স্বভাবতই ব্যক্তিগত পালকি ছিল ভাড়া করা পালকির তুলনায় অনেক বেশি বাহারি।
১৪ বেতের বোনা নিজস্ব পালকিতে থাকত গদি। আরোহীর পিঠের দিকে এবং দু’পাশে থাকত নরম তাকিয়া। ভাড়া পালকিতে গদি-তাকিয়া মোড়া থাকত খুব সরু কাঠির মাদুর অথবা শীতলপাটি দিয়ে। ব্যক্তিগত পালকিতে সে জায়গা নিত মরক্কো চামড়া। পালকির সাজ কেমন হবে, তার জন্যেও লাগত অনুমতি। ব্রিটিশ জমানা শুরুর আগে মুঘলদের অনুমতি সাপেক্ষে সমাজের বিশিষ্ট অভিজাতরা ব্যবহার করতেন রেশমের ঝালর লাগানো পালকি।
বেতের বোনা নিজস্ব পালকিতে থাকত গদি। আরোহীর পিঠের দিকে এবং দু’পাশে থাকত নরম তাকিয়া। ভাড়া পালকিতে গদি-তাকিয়া মোড়া থাকত খুব সরু কাঠির মাদুর অথবা শীতলপাটি দিয়ে। ব্যক্তিগত পালকিতে সে জায়গা নিত মরক্কো চামড়া। পালকির সাজ কেমন হবে, তার জন্যেও লাগত অনুমতি। ব্রিটিশ জমানা শুরুর আগে মুঘলদের অনুমতি সাপেক্ষে সমাজের বিশিষ্ট অভিজাতরা ব্যবহার করতেন রেশমের ঝালর লাগানো পালকি।
১৪ সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেত পালকির সজ্জা। সেইসঙ্গে পালকির আগে পিছে চলা বাহিনীও। পালকির সওয়ার যত গণ্যমান্য, তত লম্বা হত সেই বাহিনীর যাত্রা। পালকির সামনে এবং পিছনে থাকতেন মশালচি, পেয়াদা, পাইক, বরকন্দাজ, হরকরার দল। বিশেষ বিশেষ জায়গায় বদলে যেত বেহারাও। ঠিক যেমন এখন দূরপাল্লার ট্রেনে নির্দিষ্ট স্টেশনে পরিবর্তিত হয় চালক।
সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যেত পালকির সজ্জা। সেইসঙ্গে পালকির আগে পিছে চলা বাহিনীও। পালকির সওয়ার যত গণ্যমান্য, তত লম্বা হত সেই বাহিনীর যাত্রা। পালকির সামনে এবং পিছনে থাকতেন মশালচি, পেয়াদা, পাইক, বরকন্দাজ, হরকরার দল। বিশেষ বিশেষ জায়গায় বদলে যেত বেহারাও। ঠিক যেমন এখন দূরপাল্লার ট্রেনে নির্দিষ্ট স্টেশনে পরিবর্তিত হয় চালক।
১৪ শ্রীপান্থর ‘কলকাতা’ থেকে জানা যায়, সে সময়কার পালকি বেহারাদের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন ইটালি থেকে আসা চিত্রশিল্পী বালসাজার। তাঁদের দক্ষতা সম্বন্ধে তিনি লিখেও গিয়েছেন। বলেছেন, আরোহীকে কিছুমাত্র টের পেতে না দিয়ে যে ভাবে তাঁরা কাঁধবদল করেন, তা বিস্ময়কর। শুধু অফিস-কাছারি, নতুন কনের শ্বশুরবাড়ি বা অভিজাত পরিবারের বধূর গঙ্গাস্নানই নয়। পালকিতে চেপে বাঙালি যেত তীর্থযাত্রাতেও।
শ্রীপান্থর ‘কলকাতা’ থেকে জানা যায়, সে সময়কার পালকি বেহারাদের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়েছিলেন ইটালি থেকে আসা চিত্রশিল্পী বালসাজার। তাঁদের দক্ষতা সম্বন্ধে তিনি লিখেও গিয়েছেন। বলেছেন, আরোহীকে কিছুমাত্র টের পেতে না দিয়ে যে ভাবে তাঁরা কাঁধবদল করেন, তা বিস্ময়কর। শুধু অফিস-কাছারি, নতুন কনের শ্বশুরবাড়ি বা অভিজাত পরিবারের বধূর গঙ্গাস্নানই নয়। পালকিতে চেপে বাঙালি যেত তীর্থযাত্রাতেও।
১০১৪ তবে পালকিতে তীর্থযাত্রার জন্য পকেটে যথেষ্ট রেস্ত থাকতে হত। সে সব ছিল ধনীদের অভ্যাস। মধ্যবিত্তের কাছে তা ছিল আকাশকুসুম। তাই তাঁরা পালকি ভাড়া করতে পারতেন কাছেপিঠে কোথাও যাওয়ার জন্যই। অন্য দিকে ধনী বাঙালি বাবুরা একে অন্যের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে বেহারা রাখতেন। দুই বেহারার পালকিতে মন ভরত না। মানও উঠত না। তাই নিদেনপক্ষে ৪ জন বা ছ’জন বেহারা না হলে বাঙালি বাবুশ্রেণির পছন্দ হত না।
তবে পালকিতে তীর্থযাত্রার জন্য পকেটে যথেষ্ট রেস্ত থাকতে হত। সে সব ছিল ধনীদের অভ্যাস। মধ্যবিত্তের কাছে তা ছিল আকাশকুসুম। তাই তাঁরা পালকি ভাড়া করতে পারতেন কাছেপিঠে কোথাও যাওয়ার জন্যই। অন্য দিকে ধনী বাঙালি বাবুরা একে অন্যের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে বেহারা রাখতেন। দুই বেহারার পালকিতে মন ভরত না। মানও উঠত না। তাই নিদেনপক্ষে ৪ জন বা ছ’জন বেহারা না হলে বাঙালি বাবুশ্রেণির পছন্দ হত না।
১১১৪ পালকির সাজসজ্জা, বেহারাদের বেতন— সব মিলিয়ে খরচ বেশ ভালই ছিল। এখনকার দিনের গাড়ি রাখার থেকে তার বহর কিছু কম ছিল না। কিন্তু তাই বলে বেহারাদের অবস্থাও খুব একটা মসৃণ ছিল না। সামান্য মজুরির বড় অংশ নিয়ে নিতেন পালকির মালিক। বাকিটা ভাগ হয়ে যেত সব বেহারাদের মধ্যে। ফলে প্রত্যেকের হাতে থাকত সামান্যই।
পালকির সাজসজ্জা, বেহারাদের বেতন— সব মিলিয়ে খরচ বেশ ভালই ছিল। এখনকার দিনের গাড়ি রাখার থেকে তার বহর কিছু কম ছিল না। কিন্তু তাই বলে বেহারাদের অবস্থাও খুব একটা মসৃণ ছিল না। সামান্য মজুরির বড় অংশ নিয়ে নিতেন পালকির মালিক। বাকিটা ভাগ হয়ে যেত সব বেহারাদের মধ্যে। ফলে প্রত্যেকের হাতে থাকত সামান্যই।
১২১৪ ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে কলকাতার পালকি ভাড়া ছিল ১ মাইল পর্যন্ত ৩ আনা। তার বেশি হলে প্রতি মাইলের জন্য ৩ আনা করে। সময়ের নিরিখেও পালকি পাওয়া যেত। সে ক্ষেত্রে ঘণ্টা পিছু পালকি ভাড়া ছিল ৬ আনা। তার বেশি হলে প্রতি ঘণ্টায় ৩ আনা। এই ভাড়া বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সরকারের তরফে।
ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে কলকাতার পালকি ভাড়া ছিল ১ মাইল পর্যন্ত ৩ আনা। তার বেশি হলে প্রতি মাইলের জন্য ৩ আনা করে। সময়ের নিরিখেও পালকি পাওয়া যেত। সে ক্ষেত্রে ঘণ্টা পিছু পালকি ভাড়া ছিল ৬ আনা। তার বেশি হলে প্রতি ঘণ্টায় ৩ আনা। এই ভাড়া বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সরকারের তরফে।
১৩১৪ এর পর এল ঘোড়ার গাড়ি। তার সঙ্গেও পালকি পাল্লা দিয়েছিল। তার পর ঘোড়ায় টানা ট্রামের পাশেও প্রতিযোগিতা থেকে হারিয়ে যায়নি চতুর্দোলা। কারণ এই দু’টি বাহনই ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি ঠিকাও ছিল। কিন্তু তাদের পরে যা এল, সেই মোটরগাড়ির সঙ্গে টেক্কা দেওয়া গেল না।
এর পর এল ঘোড়ার গাড়ি। তার সঙ্গেও পালকি পাল্লা দিয়েছিল। তার পর ঘোড়ায় টানা ট্রামের পাশেও প্রতিযোগিতা থেকে হারিয়ে যায়নি চতুর্দোলা। কারণ এই দু’টি বাহনই ব্যক্তিগত মালিকানার পাশাপাশি ঠিকাও ছিল। কিন্তু তাদের পরে যা এল, সেই মোটরগাড়ির সঙ্গে টেক্কা দেওয়া গেল না।
১৪১৪ মোটরগাড়ি প্রথম থেকেই ব্যক্তিগত। ভাড়া বা ঠিকা মোটরগাড়ি তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। তাই, ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি প্রথম থেকেই ছিল ধনীদের পছন্দের তালিকায়। ফলে পালকির দিন ফুরিয়ে এল। মোটরগাড়ির ধোঁয়ায় হারিয়ে গেল ‘হুন হুন না’ ছন্দ।
মোটরগাড়ি প্রথম থেকেই ব্যক্তিগত। ভাড়া বা ঠিকা মোটরগাড়ি তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। তাই, ব্যক্তিগত মোটরগাড়ি প্রথম থেকেই ছিল ধনীদের পছন্দের তালিকায়। ফলে পালকির দিন ফুরিয়ে এল। মোটরগাড়ির ধোঁয়ায় হারিয়ে গেল ‘হুন হুন না’ ছন্দ।
(ঋণস্বীকার: ‘কলকাতা’, শ্রীপান্থ; ‘কলিকাতা দর্পণ’, রাধারমণ মিত্র)

আরও পড়ুন