বাঙালির নেয়াপাতি ভুঁড়ি কেন হয়? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
বাঙালি মানেই বেশ লুচি-তরকারি, মাছ-ভাত খাওয়া চেহারা। মোটা না হলেও ছোট্ট একটা ভুঁড়ি তো থাকতেই হবে। বিশেষ করে বাঙালি মধ্যবয়সি পুরুষদের চেহারায় একটা বিষয়ে মিল থাকে, তা হল ‘নেয়াপাতি’ ভুঁড়ি। হাত-পা তুলনামূলক ভাবে সরু, শরীরও হয়তো খুব একটা ভারী নয়, কিন্তু পেটের কাছে ফুলেপেঁপে ওঠে ছোট্ট একটা গোলগাল ভুঁড়ি। শার্ট ভেদ করে তা যেন বাইরেও বেরিয়ে আসতে চায়। চল্লিশ পেরোলে এমন ভুঁড়ি হবেই, এই মনোভাব অনেকেরই। আবার অনেকে ভাবেন, বাবা-ঠাকুরদার ছিল, অতএব তাঁর তো হবেই। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে, চেহারা স্থূল নয়, অথচ পেটের কাছে ফেঁপে ওঠা ভুঁড়ি মোটেই হেলাফেলা করার ব্যাপার নয়। সবটাই যে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের জন্য হয়, তা-ও নয়। এর নেপথ্যে অন্য কারণও থাকে।
পাবমেড থেকে এই বিষয়ে একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে ইদানীং। গবেষকেরা এমন ভুঁড়ির জন্য দুষেছেন বিপাকীয় সমস্যাকেই, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘মেটাবলিক ডিজ়অর্ডার’। অনেকেই পেটের সাময়িক ফোলাভাব বা গ্যাস-অম্বলের সঙ্গে ভুঁড়ি হওয়াকে গুলিয়ে ফেলেন। হজমের সমস্যা, অতিরিক্ত খাওয়া বা গ্যাসের কারণে পেট সাময়িক ভাবে ফুলে যেতে পারে ঠিকই, তবে নেয়াপাতি ভুঁড়ি তা নয়। পেটের ঠিক মধ্যিখানে গজিয়ে ওঠা চর্বির স্তর এক দিনে তৈরি হয় না। এটি ধীরে ধীরে স্থায়ী রূপ নেয় এবং সহজে কমতে চায় না। একে বলে ‘ভিসেরাল ফ্যাট’। গবেষকদের মতে, এই চর্বিই শরীরের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক।
কেন হয় নেয়াপাতি ভুঁড়ি?
গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশীয়, বিশেষ করে ভারতীয় ও বাঙালি পুরুষদের পেটে এমন চর্বি জমার প্রবণতা জিনগত ভাবেই আসে। পূর্বপুরুষের জিন এর জন্য অনেকাংশেই দায়ী। এঁদের ‘বডি-মাস-ইনডেক্স’ অর্থাৎ, উচ্চতার সঙ্গে ওজনের অনুপাত হয়তো ঠিক থাকে, চেহারার গড়নও খুব একটা স্থূল হয় না, অথচ পেটের কাছে গোলগাল ভুঁড়ি গজিয়ে ওঠে। এর জন্য নানা প্রকারের জিন দায়ী হতে পারে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ‘এ৫৫টি’ ও ‘কে১৫৩আর’ জিন দু’টি পেটের মেদের জন্য অনেকটাই দায়ী। বংশ পরম্পরায় তারা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও যায়।
কতটা ক্ষতিকর?
ভুঁড়ির জন্য জিন দায়ী হলেও, জীবনযাত্রার ভূমিকাও কম নয়। গবেষকেরা বলছেন, এই ধরনের ‘ভিসেরাল ফ্যাট যে’ কেবল চামড়ার নীচে জমা হয়, তা নয়। এই মেদ হার্ট, লিভার, অন্ত্র ও পাকস্থলীর চারপাশেও জমতে থাকে। শরীরের বাইরে এর প্রকাশ তেমন ভাবে হয় না বটে, তবে ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিতে চর্বি জমা হতে থাকে যা পরবর্তীতে হার্টের রোগ, ফ্যাটি লিভার বা পাকস্থলীর জটিল অসুখের কারণ হয়ে উঠতে পারে। টাইপ-২ ডায়াবিটিসের আশঙ্কাও বাড়ে। কেবল খাদ্যাভ্যাস এর জন্য দায়ী নয়, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা, কম কায়িক পরিশ্রম ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকার কারণেও এমন মেদ জমতে পারে পেটের মধ্যিখানে।
নেয়াপাতি ভুঁড়ি কমানো সহজ নয়। এর জন্য শারীরচর্চাই সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হতে পারে। নিয়মিত হাঁটা, দৌড়োনো, জগিং বা যোগাসনে ভুঁড়ি কমতে পারে। পিলাটেজ়ের মতো ব্যায়াম ও পেটের স্ট্রেচিং করলেও ভুঁড়ি কমতে পারে সহজেই।