১৭ জুন ২০২৪
Vastu

বাস্তু পুরুষের জন্ম ও বাস্তুশাস্ত্রের উৎপত্তি

কী এই বাস্তু, কী ভাবে বাস্তু আমাদের জীবনের অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হল?

বাস্তুশাস্ত্রের ইতিকথা

বাস্তুশাস্ত্রের ইতিকথা

এবিপি ডিজিটাল ব্র্যান্ড স্টুডিয়ো
শেষ আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৭:৩৬
Share: Save:

'আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল, শুধাইল না কেহ'...

আমাদের হৃদয়, মন, মস্তিস্ক কী চায়? চায়, ভালবাসা, স্বীকৃতি, সম্মান, স্বস্তি-আরাম, পারিবারিক একাত্মতা। আমরা চাই, অতীত যতই কষ্টদায়ক হোক, বর্তমান যেন আনন্দময় হয়। ভবিষ্যৎ যেন সুরক্ষিত হয়। কেরিয়ার যেন নিরাপদ থাকে। সিদ্ধান্ত যেন সঠিক থাকে। জীবন যেন সুরক্ষিত, সুগঠিত, সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। কোনও ঝুঁকি, ভয়, দারিদ্র, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, অর্থহানি, মান-প্রতিষ্ঠাহানি যেন কখনই আমাদের নাগপাশে জড়িয়ে না ফেলে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষেই জীবনটা কি এমনই প্রেম-মধু-স্বীকৃতিময়? অধিকাংশ মানুষেরই জীবন কি তিক্ততা, ঘৃণা, রাগ, শোক, দুঃখ, যন্ত্রণা, অনুশোচনার আগুনে ঝলসানো নয়?

প্রশ্ন হল, এমনটা ঘটছে কেন? কারণ, আমাদের দুঃখ-অপ্রাপ্তি-যন্ত্রণা ক্লিষ্ট জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আমাদের বাসগৃহ বা কর্মগৃহ বা এককথায় বাস্তু। কী এই বাস্তু, কী ভাবে বাস্তু আমাদের জীবনের অন্যতম প্রধান নির্ণায়ক শক্তিতে পরিণত হল? তা জানতে হলে আমাদের জানতে হবে প্রাচীন পুরাণ কথা

বাস্তু পুরুষের জন্ম ও বাস্তুশাস্ত্রের উৎপত্তি

বাস্তুশাস্ত্র হল স্থাপত্যকলা-বিজ্ঞান। এই বাস্তু শাস্ত্রের উৎপত্তি বর্ণিত রয়েছে হিন্দু-সংস্কৃত সাহিত্যের ১৮টি পুরাণের অন্যতম মহাপুরাণ 'মৎস্যপুরাণ'-এ। মৎস্যপুরাণের ২৫২ নম্বর অধ্যায়ে দেবতা এবং অসুরদের এক অদ্ভুৎ প্রতিকাত্মক যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। দেবাসুরের এই যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন দেবাদিদেব মহাদেব এবং অন্ধকাসুর। যুদ্ধ চলাকালীন অন্ধকাসুর এবং দেবাদিদেব মহাদেবের শরীর থেকে নির্গত ঘাম ভূমিতে পড়ে এক অত্যন্ত বলশালী, বিরাট ও ভয়ঙ্কর পুরুষের জন্ম হল। এই বিরাট পুরুষের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে দেবতা-অসুর দু’পক্ষেই মহাভয়ের সঞ্চার হল, কিছুক্ষণের জন্য যুদ্ধ থেমে গেল। দেবতারা ভাবলেন, এই ভয়ঙ্কর পুরুষ হয়তো কোনও অসুর, অপরদিকে অসুরকুলের মনে হল নতুন কোনও দেবতা প্রকট হয়েছেন। আবির্ভাব মাত্রেই স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল- এই ত্রিলোককে ভক্ষণ করতে উদ্যত সেই বিরাট পুরুষকে ব্রহ্মার কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ব্রহ্মা সেই বিরাট পুরুষকে তাঁর মানস পুত্র রূপে অ্যাখ্যায়িত করে নাম দিলেন বাস্তু পুরুষ। বাস্তু পুরুষকে এক বিশেষ মুদ্রায় শায়িত করলেন দেবতারা, ঠিক সেই মুহূর্তে এক অদ্ভুদ আকাশবাণীতে নির্দেশ এল, ‘বিরাট অনন্ত বাস্তু পুরুষের শায়িত শরীরের বিভিন্ন অংশে দেবতা এবং অসুরেরা নিজ নিজ স্থান গ্রহণ করবেন এবং বাস্তু পুরুষ নিজেও দেবতা রূপে পূজিত হবেন’। বাস্তু পুরুষের শায়িত শরীরে স্থান গ্রহণ করলেন বিভিন্ন দেবতা ও অসুর, তাঁদের দৈব ও আসুরিক শক্তি তথা উর্জা প্রকট হল। জন্ম হল বাস্তু দেবতার, তৈরি হল বাস্তু শাস্ত্র তথা নির্মাণ বিধি। কিন্তু যে সর্বগ্রাসী ক্ষুধা নিবৃত্তির লক্ষ্যে ত্রিলোক ভক্ষণ করতে উদ্যত হয়েছিলেন বাস্তুপুরুষ, সেই ক্ষুধার নিবৃত্তি হবে কী ভাবে?

উপায় বের করলেন প্রজাপতি ব্রহ্মা। তিনি আদেশ দিলেন, বাস্তুতে দেবতা ও অসুরের অবস্থান খেয়াল না রেখে, বাস্তুশাস্ত্রের নিয়মাবলি না মেনে ভবন, নগর, জলাশয়, মন্দির, অট্টালিকা, প্রাসাদ যা কিছু নির্মাণ হোক সেই শুভকার্যকে ভক্ষণ করবে বাস্তুতে অবস্থিত অসুরকুল। এভাবেই বাস্তু পুরুষের ক্ষুন্নিবৃত্তি হবে। অন্যদিকে যে ব্যক্তি বাস্তুশাস্ত্র মেনে নির্মাণ করবে, তার নিজস্ব কার্যপ্রণালীকে সাহায্য করবে বাস্তুতে অবস্থিত দৈবশক্তি।

কী এই দৈব শক্তি? আসুরিক শক্তিই বা কী?দেব বা দৈব শব্দটি স্বয়ং প্রকাশমান। যে শক্তি বিশেষ কোনও কার্যকে সহায়তা করে সেই শক্তিকেই দৈব শক্তি বলা হয়। অর্থাৎ সমগ্র সংসারের নির্মাণ, চালনা এবং বর্ধনকারী, সহায়ক শক্তিই হল দৈবশক্তি। এই শুভ শক্তির বিপরীত শক্তি হল আসুরিক শক্তি। অ-সুর অর্থাৎ যে সুরে নেই, ছন্দে নেই, তালে নেই। যা কিছু ধ্বংসাত্মক, যা কিছু মানুষের মনমস্তিস্কে লোকসান, অন্যায়, ভয়, শঙ্কা অনৈতিকতার ছন্দ নির্মাণ করে, যা অজ্ঞানতা যুক্ত সেই তত্ত্বই আসুরিক তত্ত্ব, সেই শক্তিই আসুরিক শক্তি। ভীত হওয়া, দ্বন্দ্ব নির্মাণ হওয়া, জীবনে নেতিবাচক চিন্তা, অন্ধকার নেমে আসা অর্থাৎ যা কিছু অজ্ঞানতার প্রতীক তাই অসুরত্ত্ব।

অন্য দিকে যে শক্তি সুরে থাকে, তালে থাকে। যে শক্তি কল্যাণকর, সহায়ক, সর্বদা শুভ নির্মাণকারী তাই হল দৈবশক্তি। ছোট্ট কণার মধ্যেও এই সমীকরণ আবার বিরাট প্রকাণ্ডের মধ্যেও একই রসায়ন। বেদে তো এই কথাই বলছে, 'যৎ পিণ্ডে তৎ ব্রহ্মাণ্ডে'। মানুষের মনমস্তিস্কে উৎপন্ন যে বিচারধারা নিজের এবং অন্যের জীবনকে সুখী করতে পারে, যা রচনাত্মক উর্জা শক্তি যুক্ত তাই দেব তত্ত্ব, এর বিপরীত উর্জাই আসুরিক উর্জা। অন্ধকাসুর বনাম দেবাদিদেবের যুদ্ধ তো আসুরিক শক্তি বনাম দৈবশক্তির যুদ্ধ। প্রত্যেক ব্যক্তির ভিতর অন্নময়, প্রাণময় এবং মনোময় কোষে, প্রতিটি ক্ষণে এই যুদ্ধ চলছে। অন্ধকাসুর অর্থাৎ সম্পূর্ণ আসুরিক অজ্ঞানতা যুক্ত ক্ষেত্র অন্যদিকে শিব অর্থাৎ পরম চৈতন্য, শক্তিমান কল্যাণকারী আলো। এ এক অদ্ভুৎ মন্থন, কখনও কল্যাণকারী আলো কখনও সর্বনাশা অন্ধকার। যেমন আদিতে, অমৃতের সন্ধানে শুরু হওয়া সমুদ্রমন্থনে সর্বাগ্রে উঠে এসেছিল সুতীব্র হলাহল(মারণ বিষ)। মহাদেব তাঁর কণ্ঠদেশে সেই বিষ ধারণ করার পর, হলাহলের নীল ছায়া পেরিয়ে একে একে প্রকট হয়েছিল পারিজাত বৃক্ষ (Beautiful and fragrant tree, now planted in Indra's heaven), চন্দ্র(The Moon) ঐরাবত হাতি, কল্পবৃক্ষ, অপ্সরাগণ, দেবী লক্ষ্মী(Who became Vishnu's wife) পাঞ্চজন্য(Vishnu's Conch) বিবিধ রত্ন, এবং সর্বশেষে অমৃতের কলস হাতে প্রকট হয়েছিলেন ধন্বন্তরি(The physician of the demi gods, who rose up out of the water caring in his hands the supreme treasure, 'The Amrita')। এখন প্রশ্ন হল অমৃত এখন কোথায় আছে? বিষ্ণুলোকে অবস্থিত 'ব্রহ্ম কুণ্ডে' সুরক্ষিত আছে অমৃত। সেখান থেকে সর্বদা বিন্দু বিন্দু অমৃত ক্ষরিত হচ্ছে। বৈদিক যুগে মহাদেব এবং বিষ্ণু সেই স্থান পরিদর্শন করেছিলেন। ব্রহ্ম কুণ্ডে তাঁদের পদচিহ্ন রয়েছে বলে মনে করা হয়। এই কাহিনি প্রতিকাত্মক, সমুদ্রমন্থনও প্রতিকাত্মক।

এই ভাবেই প্রতি মুহূর্তে আমাদেরও আত্ম-মন্থন করতে হয়। মানুষ চেতনা-চৈতন্যের মন্থনের মাধ্যমে নানারূপ সম্ভাবনাময় নির্মাণ করতে সক্ষম। সেই মন্থনে কখনও দুঃখ-শোক-যন্ত্রণার মতো হলাহল বেরিয়ে আসে, কখনও আনন্দ-বিহার-সাফল্য-ভোগ-শুভ কর্মের মতো অমৃত। এই আনন্দ-সাফল্য অমৃতলাভের উপায় হল কল্যাণের সাধনা। সঠিক কল্যাণময়ী ধ্যান মানেই দৈব শক্তি, এবং লোকসান, ভয়, ক্ষতি, উদ্বেগ মানেই অসুর। মানুষের শরীরেও তা বিদ্যমান, বাস্তু বা ভবনেও বিদ্যমান।

কী ভাবে বাস্তুতে অমৃতের নিরন্তর ক্ষরণ সম্ভব, জানতে পরবর্তী পর্বগুলি পড়তে থাকুন..... (ক্রমশ)। বাস্তু বিষয়ক পরামর্শ পেতে WhatsApp - 86173 72545/98306 83986 (Payable & Non-Refundable)

ডিসক্লেইমার: এটি একটি বিজ্ঞাপন প্রতিবেদন এবং বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত। প্রতিবেদনে প্রকাশিত সমস্ত বক্তব্য / মন্তব্য একান্তই বিজ্ঞাপনদাতার নিজস্ব। এর সঙ্গে আনন্দবাজার অনলাইনের সম্পাদকীয় দফতরের কোনও সম্পর্ক নেই। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই যাচাই করে নিন।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

Vastu Astrology
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

Share this article

CLOSE