বহুজাতিক সংস্থার চাকরি ছেড়ে ২০১৪ সালে স্টার্ট-আপ (নতুন উদ্যোগ) তৈরি করেছিলেন নিধি। পুঁজি পেয়েছিলেন রতন টাটার তহবিল থেকে। কিন্তু বাজার ও পরবর্তী লগ্নির অভাবে বছর তিনেক পরে গুটিয়ে ফেলতে হয় অনলাইন ফ্যাশন ব্যবসাটি। আপাতত তিনি স্টার্ট-আপদের পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করছেন। 

বিদেশ থেকে ফিরে মাইক্রোসফটের মতো সংস্থা ছেড়ে স্টার্ট-আপ তৈরি করেছেন অনিমেষ গোস্বামী। কলকাতায় তাঁর ‘ডিজিটাল ব্র্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ সংস্থায় এখন কর্মী সংখ্যা ২৫। পাঁচ বছর পরেও কিন্তু আর্থিক টানাটানি থেকে গিয়েছে। এই টুকরো টুকরো ছবিগুলো দেশের স্টার্ট-আপ ক্যানভাসেরই অঙ্গ। 

২০১৫ সালের ১৫ অগস্ট। লালকেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে প্রথম উঠে এসেছিল ‘স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া’। পরের বছর তা কেন্দ্রীয় প্রকল্প হিসেবে ঘোষিত হয়। তহবিল ঘোষণা হয় ১০,০০০ কোটি টাকার। লক্ষ্য, ২০২০ সালের মধ্যে এই সব নতুন সংস্থায় ১৮ লক্ষ কর্মসংস্থান। 

এর পর সাড়ে তিন বছর কেটে গিয়েছে। চলছে আরও একটি লোকসভা ভোট। কিন্তু স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া কতটা স্বপ্ন পূরণ করতে পারল? বিজেপি ইস্তাহারে বলেছে ‘সিড স্টার্ট-আপ ফান্ড’ হিসেবে তৈরি হবে ২০,০০০ কোটির তহবিল। কংগ্রেসের ইস্তাহারে বলা হয়েছে ‘এঞ্জেল ট্যাক্স’ তোলার কথা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডিপার্টমেন্ট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি অ্যান্ড প্রোমোশনের (ডিআইপিপি) নথিভুক্ত নতুন উদ্যোগের সংখ্যা ১৫ হাজারের সামান্য বেশি।

আর ওই ১০,০০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত ৬০০ কোটি স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়াকে (সিডবি) দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মাত্র ৬% টাকা। কিন্তু সেটাও খাতায় কলমে। খোদ নীতি আয়োগের হিসেবই বলছে, ওই টাকার পুরোটা বিলি হয়নি। সেই কারণে ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে নতুন করে টাকা বরাদ্দ করতে নারাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক। স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়ার সাইট বলছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৬৩টি সংস্থা টাকা পেয়েছে। তৈরি হয়েছে প্রায় দেড় লক্ষ কর্মসংস্থান। সরকারি হিসেব অনুযায়ী, নথিভুক্ত সংস্থাগুলোর এক শতাংশও তহবিল থেকে টাকা পায়নি। 

বাধা কোথায়? অনেকে বলছেন, সরকারি তহবিল থেকে পুঁজি পাওয়ার প্রক্রিয়া জটিল। অনিমেষবাবু বলেন, ‘‘ওই টাকা পাওয়ার জন্য প্রথমেই টাকা খরচ করে পরামর্শদাতা নিয়োগ করতে হবে। অধিকাংশ স্টার্ট-আপের পক্ষেই তা সম্ভব নয়।’’ 

সরকারি হিসেবের তুলনায় আরও ফিকে বেসরকারি তথ্য পরিসংখ্যান। আইবিএম-অক্সফোর্ড রিপোর্ট বলছে, এ দেশে ৯০% স্টার্ট-আপ শুরুর প্রথম পাঁচ বছরেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ‘গ্লোবাল অন্ত্রেপ্রেনরশিপ মনিটর’ রিপোর্ট অনুযায়ী ব্রাজিল, চিনের চেয়ে ভারতে নতুন সংস্থা তৈরির হার কম। সদ্য তৈরি সংস্থাগুলি আগামী পাঁচ বছরে এক থেকে পাঁচ জন কর্মী নিয়োগের কথা বলেছে। মাত্র ৫% জানিয়েছে পাঁচের বেশি কর্মী নিয়োগ করার কথা। 

স্টার্ট-আপ মহলের অভিযোগ, ব্যাঙ্ক ও আর্থিক সংস্থার থেকে পুঁজি পাওয়ার পথ এখনও মসৃণ নয়। ফলে নীতি থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের দরবারে এখনও পয়লা নম্বর ‘স্টার্ট-আপ গন্তব্য’ হয়ে উঠতে পারেনি ভারত। তবে শুধুই সরকারি নীতির ব্যর্থতা নয়। স্টার্ট-আপ গুটিয়ে ফেলার কারণ হিসেবে উঠে এসেছে উদ্ভাবনী শক্তি ও বিপণন কৌশলের অভাবও। দেখা যাচ্ছে, একই ধরনের পরিষেবা, পণ্য ভিড় জমাচ্ছে বাজারে। টান পড়ছে ক্রেতার। 

ইন্ডিয়ান এঞ্জেল নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পদ্মজা রূপারেলের অবশ্য দাবি, ছবিটা বদলাচ্ছে। ভারতীয় স্টার্ট-আপদের টাকা দিচ্ছে দেশি-বিদেশি উদ্যোগ পুঁজি সংস্থা। তবে তাঁর মতে, প্রথম দফার তিন-চার কোটি টাকার পুঁজি ঠিক সময়ে পাওয়া যায়। সমস্যা হয় পরে সংস্থা সম্প্রসারণের সময় ১০-১২ কোটি পেতে। এই ফাঁক ভরাট করলে স্টার্ট-আপ ‘ইকোসিস্টেম’ তৈরির লক্ষ্য পূরণ করা সম্ভব বলে তাঁর দাবি।