সব রইল। শুধু আপনি নেই। সারা জীবনের সঞ্চয়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগারের টাকায় তৈরি সম্পত্তি। আর প্রিয় জনেরা। বরাবর যাঁদের হাতে এই সঞ্চয় আর সম্পত্তির উত্তরাধিকার দিয়ে যেতে চেয়েছেন আপনি। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, আপনার অবর্তমানে সেই অধিকারের প্রশ্নে তেতো হবে না তো ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোনেদের সম্পর্ক? ন্যায্য উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করে কারও সব কিছু আত্মসাতের বাসনায় রক্ত ঝরবে না তো? খবরের কাগজে যে ঘটনাগুলো আকছার দেখতে পাই আমরা!

শুধু তাই নয়, রক্তের সম্পর্ক হোক বা না হোক, আপনার ইচ্ছে হতে পারে সব থেকে প্রিয় কাউকে সম্পত্তির একটু বেশি অংশ দিয়ে যেতে। আপনি শয্যাশায়ী জেনেও খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি যে ছেলে, তাঁকে হয়তো সেই অধিকার দিতেই চান না। আবার ভাল রোজগেরে সন্তানের তুলনায় আর্থিক ভাবে দুর্বল যে, তার সংসার চালানোর পথটা হয়তো সহজ করতে চান সম্পদের ভাগ খানিকটা বেশি দিয়ে!

এই সব কিছুই স্রেফ আপনার ইচ্ছে। যত দিন না সেই ইচ্ছেটাকে লিখিত পড়িত ভাবে বাস্তবায়িত করার পথ করে দিয়ে যাচ্ছেন। যাতে চোখ বোজার পরে সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতা তৈরি না হয়। তখন আইন মেনে ঠিক সেই ইচ্ছে মিলিয়েই আপনার সম্পত্তির ভাগবাঁটোয়ারা হবে। আপনি যাকে যতটা দিতে চাইছেন, সে ততটাই পাবে। আর এই ভাগবাঁটোয়ারার পোশাকি নাম উইল।

এ বার চেনার চেষ্টা করব তারই খুঁটিনাটি। দেখব, কেন তা করে যাওয়া জরুরি। করার সময় কী কী মাথায় রাখতে হবে। বা উত্তরাধিকারী হিসেবে উইল সূত্রে পাওয়া সম্পত্তির দখল নিতেই বা ঠিক কী করতে হবে।

 

কাকে বলে?

উইল শব্দটার বাংলা মানে ইচ্ছে। অর্থাৎ আপনার ইচ্ছে অনুযায়ী আইন মেনে তৈরি হবে একটি নথি। এর মাধ্যমে সম্পত্তি বা জমানো অর্থ ইচ্ছেমতো উত্তরাধিকারীদের (স্ত্রী বা স্বামী, ছেলে, মেয়ে ইত্যাদি), যাকে যতটা চান দিয়ে যেতে পারেন। শুধুমাত্র এই পথেই বেঁচে থাকাকালীন সম্পত্তি ভাগবাঁটোয়ারা করে দিয়ে যাওয়া সম্ভব। যেখানে পরিষ্কার লেখা থাকবে, আপনার মৃত্যুর পরে যাবতীয় স্থাব-অস্থাবর সম্পত্তির মালিকানা কার হাতে যাবে। এটি কার্যকর হবে উইলকারীর মারা যাওয়ার পরে।

 

জরুরি কেন?

একটা চলতি ধারণা আছে যে, উইল তাঁরাই করেন যাঁদের বিপুল ধন-সম্পত্তি। সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত সংসারে ও সব ঝামেলা-ঝক্কির মধ্যে যাওয়ার যৌক্তিকতা আদৌ আছে কি না, তাই নিয়ে দ্বিধা কাজ করে অনেকের মধ্যেই। এখানে আমার অনেকগুলি প্রশ্ন আছে। আপনি চোখ বোজার পরে উত্তরাধিকারী বলতে একটি সন্তান পড়ে রইল কি? স্ত্রী বা স্বামী যাঁকে রেখে গেলেন, তাঁকে ছেলেমেয়েরা দেখবেন তো? সন্তান কি একাধিক? তাঁদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন? সকলে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সম্পত্তি সমান ভাবে ভাগাভাগি করে নিতে রাজি হবে তো? এমন কেউ কি রয়েছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে যাঁর আপনার সম্পত্তি পাওয়ার কথা নয়। অথচ পাওয়া উচিত বা আপনি তাকে দিয়ে যেতে চান?

উইল কেন জরুরি, এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে এই সমস্ত প্রশ্নের মধ্যে। বরং মনে রাখবেন— 

• উইল করা থাকলে, কারও মৃত্যুর পরে ছেলে-মেয়েদের হাতে সম্পত্তি হস্তান্তরে ঝক্কি অনেক কম। একাধিক সন্তান থাকলে সম্পত্তি ঘিরে বিবাদ, অশান্ত, তিক্ততা এড়ানো যায়।

• উইল না থাকলে উত্তরাধিকারীরা নিজেদের মধ্যে সমান ভাবে সম্পত্তি ভাগ করে নিতে পারেন। কিন্তু পছন্দের কারণেই হোক বা প্রয়োজন, কাউকে বেশি বা কম দিয়ে যাবেন ঠিক করলে উইল ছাড়া গতি নেই।

• নিজে না-খেয়ে, উদায়স্ত খেটেখুটে, যে সন্তানকে জীবনের পথে এগিয়ে দিয়েছেন হাত ধরে, সে হয়তো আপনার শেষ জীবন ভরিয়ে দিল অনাদর, অযত্ন আর ভালবাসাহীনতায়। তাকে আপনার সব সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে মন চাইবে না কি? কিংবা সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার কারণে স্বামী যদি তাঁর স্ত্রীকে সম্পত্তি দিতে না চান? উইল না করে গেলে আপনার মৃত্যুর পরে ডিভোর্স না হওয়া স্ত্রী বা দায়িত্বহীন, অকালকুষ্মাণ্ড ছেলেও কিন্তু সম্পত্তির ভাগ দাবি করতে পারে।

• তবে যাঁরা ন্যায্য/ স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী (স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে), তাঁদের সম্পত্তি দিয়ে যেতে না-চাইলে তার কারণও স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করতে হবে উইলে। তা না-করলে, সেটি পরে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

 

করতে পারেন কারা?

উইল করতে হলে—

• উইলকারীকে প্রাপ্তবয়স্ক (কমপক্ষে ১৮ বছর) হতে হবে।

• মানসিক ভারসাম্যহীন হলে চলবে না। কারণ তা হলে অনেকে অনেক কিছু করিয়ে নিতে পারেন।

• তবে সুস্থ ও সচেতন ভাবে উইল করার পরে কোনও কারণে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লে, সেই উইল আইনের চোখে গ্রাহ্য।

• দৃষ্টি, বাক্ কিংবা শ্রবণশক্তি না-থাকলেও উইল করতে পারেন। কিন্তু উইলের ফলশ্রুতি সম্পর্কে তাঁকে পুরোদস্তুর ওয়াকিবহাল হতে হবে।

• এ বিষয়ে বিশদ জানতে ১৯২৫ সালের ইন্ডিয়ান সাকসেশন আইনের ৫৯ নম্বর ধারা দেখে নিতে পারেন।

 

সাদা কাগজে?

এ বার প্রশ্ন আসে কোন কাগজে উইল করতে হবে? সাধারণ সাদা কাগজে উইল করলে তা আইনি ভাবে গ্রহণযোগ্য কি? উত্তর হল, উইল যে স্ট্যাম্প পেপারেই করতে হবে, তা নয়। সাদা কাগজে করলেও 

আইনের মাপকাঠিতে স্বীকৃত।

 

কী কী দিতে পারেন

যে সম্পত্তি আপনার নিজের অর্থাৎ যার উপর পূর্ণ মালিকানা আছে, সেই সমস্তই উইল করে কাউকে দিয়ে যেতে পারেন। এই তালিকায় রয়েছে—

• ঘর-বাড়ি, জমি, টাকা-পয়সা, গয়নাগাঁটি, বাসন, নিজের আঁকা বা সংগ্রহ করা ছবি, বই, রয়্যালটির অর্থ, ব্যাঙ্কের আমানত থেকে আয় ইত্যাদি

• যে সব সম্পত্তিতে মালিকানা নয়, শুধু আপনার ভোগ-দখলের অধিকার (লাইফ ইন্টারেস্ট/ রাইট অব রেসিডেন্স) রয়েছে, সেগুলি উইল করে কাউকে দেওয়া যায় না।

• যৌথ পরিবারের অবিভক্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিজের মালিকানার অংশটুকু উইল করতে পারেন।

• লিজের মাধ্যমে পাওয়া জমি, বাড়িও উইল করা যায়। তবে ওই লিজের মেয়াদ যত দিন, তত দিন পর্যন্ত উত্তরাধিকারী সম্পত্তিটি ভোগ করতে পারবেন।

• আবার ধরুন, লিজের বাড়ি বা জমি কেউ উইল করলেন। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকাকালীনই লিজের মেয়াদ শেষ হয়ে গেল। সে ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী সেটির মালিকানা পাবেন না।

 

বদলাতে চাইলে

নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী যত বার খুশি উইল বদলানো সম্ভব। এমন ঘটনা আকছার ঘটে। কারণ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে। আর তার ছাপ তো উইলে পড়বেই।

যেমন, হয়তো দুই ছেলে এক মেয়েকে সমান ভাবে সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়ার কথা ভেবে উইল তৈরি করেছিলেন। কিন্তু আচমকা দুর্ঘটনায় আর্থিক ভাবে নড়বড়ে হয়ে গেল মেয়ের জীবন। তখন উইল পাল্টে তাকে একটু বাড়তি টাকার ব্যবস্থা করাটা মোটেই অন্যায় নয়।

সে ক্ষেত্রে একেবারে শেষ বার যে উইলটি করবেন (বেঁচে থাকা অবস্থায় শেষ তারিখে), সেটি মেনেই ভাগ হবে আপনার সম্পত্তি।

 

সাক্ষী অবশ্যই

উইল সইয়ের সময় সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক। যিনি নিজের চোখে দেখবেন আপনাকে সই করতে। দু’তিন জন সাক্ষী থাকা বাঞ্ছনীয়। এঁদের মধ্যে এক জন ডাক্তার আর এক জন আইনজীবী থাকলে ভাল হয়। কারণ উইল করার সময় আপনি যে সুস্থ মস্তিষ্কে ছিলেন, তা প্রমাণের ক্ষেত্রে ডাক্তারের বয়ান গুরুত্ব পেতে পারে। তেমনই আইনি জটিলতায় কাজে আসতে পারে আইনজীবীর সাক্ষ্য।

 

এ বার রেজিস্ট্রি

উইল রেজিস্ট্রি (নথিভুক্ত) করা বাধ্যতামূলক নয়। তবে করে রাখলে, কিছু বাড়তি সুবিধা আছে। যেমন—

• সে ক্ষেত্রে উইলের কপি থাকবে রেজিস্ট্রারের দফতরে। ফলে কেউ যদি সব হাতিয়ে নিতে তা বিকৃত (ট্যাম্পার) করে, তা হলে পার পাওয়া শক্ত।

• উইল হারিয়ে গেলে কিংবা নষ্ট হলে অথবা কেউ ইচ্ছে করে তা নষ্ট করে দিলে, রেজিস্ট্রারের দফতর থেকে সার্টিফায়েড কপি মিলবে।

• এ ছাড়া রেজিস্ট্রি করা উইলের মাধ্যমে প্রবেট পাওয়ার আগেও লিজহোল্ড সম্পত্তির ক্ষেত্রে নাম খারিজ বা মিউটেশন করানো যায়।

• অসুস্থতার কারণে উইলকারী অফিসে যেতে না-পারলে, বাড়িতে রেজিস্ট্রারকে এনে রেজিস্ট্রি করা যায়।

তবে...

উইল রেজিস্ট্রির সুবিধার পাশাপাশি অসুবিধাও আছে। জেনে রাখুন—

• এমনিতে উইল বদলানো বেশ সহজ। কিন্তু তা রেজিস্ট্রি করা থাকলে, সেটি বাতিল করার জন্য বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হতে পারে।

• এক বার উইল নথিবদ্ধ করা হলে, যত বার তা পাল্টাবেন, তত বারই কিন্তু নতুন করে রেজিস্ট্রি করতে হবে।

• সুতরাং রেজিস্ট্রি তখনই করা উচিত, যদি মনে হয় খুব গুরুতর কিছু না ঘটলে তা একই থাকবে।

 

এগ্‌জ়িকিউটর জরুরি

যিনি উইল কার্যকর (এগ্‌জ়িকিউট) করেন, তিনিই এগ্‌জ়িকিউটর। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি—

• উইল করার সময় এগ্‌জ়িকিউটর নিয়োগ করা বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু তা থাকলে, উইল কার্যকর করার ক্ষেত্রে সুবিধা হয়।

• সাধারণত কোনও বিশ্বস্ত কাছের মানুষকে এগ্‌জ়িকিউটর করা হয়।

• যাঁরা সম্পত্তি পাবেন, তাঁদের কাউকেও এগ্‌জ়িকিউটর হিসেবে বাছা যেতে পারে। কোনও সলিসিটর ফার্ম (আইনি পরামর্শদানের সংস্থা), কোম্পানি, ট্রাস্ট (অছি পরিষদ) কিংবা ব্যাঙ্কও এগ্‌জ়িকিউটর হতে পারে।

• উইলকারীর চেয়ে এগ্‌জ়িকিউটরের বয়স কম হলে ভাল। কারণ উইল যখন কার্যকর হবে তখন তো উইলকারী চোখ বুজেছেন। আবার 

প্রবেট স্থানীয় আদালতের থেকেই নিতে হয়। তাই এগ্‌জ়িকিউটরও সেই এলাকার হলে সুবিধা।

 

কাজের তালিকা

উইলে বলা কথা অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করাই এগ্‌জ়িকিউটরের কাজ। সে জন্য ওই ব্যক্তিকে—

• উইলের প্রবেট আদালতের কাছ থেকে পাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে।

• সম্পদ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে, তা এক জায়গায় করে তার থেকে প্রথমে উইলকারীর দেনা মেটাতে হবে। অর্থাৎ ব্যাঙ্কের ধার, পুরসভার কর, বাড়ি ভাড়া, সরকারের পাওনা টাকা ইত্যাদি সব মিটিয়ে বাকি সম্পত্তি উত্তারাধিকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

ট্রাস্ট গড়তে?

ধরুন কেউ নিঃসন্তান বা তেমন  নিকটাত্মীয় নেই। তাই উইল করে সমাজ সেবা, ধর্মীয় কাজ বা কল্যাণমূলক প্রকল্পে সম্পত্তি দিয়ে যেতে চান। সেই অর্থ যাতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সঠিক ভাবে খরচ হয়, তা নিশ্চিত করতে উইলের মাধ্যমে ট্রাস্ট তৈরি করে দেন তাঁদের অনেকে।

তবে সেই ট্রাস্টের সদস্য (ট্রাস্টি) কারা হবেন, তা ভেবে স্থির করুন। এমন প্রতিনিধি বাছা উচিত, যিনি আপনার স্বপ্নকে সম্মান ও তা সঠিক ভাবে রূপায়িত করতে পারবেন।

 

পত্রপাঠ বাতিল!

উইল করার জন্য এক জনের ন্যূনতম কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। তা না-মানলে উইল এমনিই আইনের চোখে গ্রাহ্য হবে না। তবে আরও কিছু ক্ষেত্রে উইল বাতিল হতে পারে। যেমন—

• যদি কেউ প্রমাণ করেন যে, তা জোর করে বা ভুল বুঝিয়ে করানো হয়েছে।

• যদি দেখা যায় যে, উইল করার সময় কোনও কারণে নিজের স্বাধীন চিন্তা প্রয়োগের রাস্তা খেলা ছিল না। এ নিয়ে বিস্তারিত জানতে ইন্ডিয়ান সাকসেশন আইনের ৬১ নম্বর ধারায় চোখ বোলাতে পারেন।

 

লেখক: কলকাতা 

হাইকোর্টের আইনজীবী (মতামত ব্যক্তিগত)