নান্টিকে মনে আছে? নান্টি ওরফে বাবলু ঘোষ। সেই যে, হরিদেবপুরের ত্রাস!

আর একটু মনে করানো যাক। ২০১৫ সালের ৯ জুলাই। হরিদেবপুরের কবরডাঙা মোড়ে ‘হার্ড রকস্’ পানশালায় গায়িকা-নর্তকীদের সঙ্গে নাচ-গান করা নিয়ে ঝামেলা হয়। তার জেরে পানশালার ভিতরেই চলে গোলাগুলি। গুলি চলে পানশালার বাইরেও। কোনও গন্ডগোলের মধ্যে না থেকেও গুলিতে প্রাণ গিয়েছিল ২৪ বছরের রাজা ওরফে রাহুল মজুমদার নামে এক যুবকের। জখম হয়েছিলেন সঞ্জয় ছেত্রী এবং উত্তম সাহা নামে দুই অটোচালক।

সেই সময়েই প্রকাশ্যে এসেছিল নান্টি ঘোষের নাম। পুলিশ ওই গুলি চালানোর পিছনে টিম-নান্টির হাত দেখেছিল। ঘটনার ১২ দিন পর গুজরাতের সুরাত থেকে নান্টিকে গ্রেফতার করেছিল কলকাতা পুলিশের গুন্ডাদমন শাখার অফিসাররা। তত দিনে পুলিশ জানতে পেরেছে, হরিদেবপুর-কবরডাঙা থেকে শুরু করে বাঁশদ্রোণী-রেনিয়া-সহ একটা বিস্তীর্ন এলাকার ‘ডন’ এই নান্টি। পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, নান্টি এবং তার গ্যাং-এর একের পর এক ‘অপরাধের খতিয়ান’। গ্রেফতার হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই জামিন পেয়ে যায় সে। এখনও আলিপুর আদালতে চলছে সেই খুনের মামলা। নান্টির আইনজীবী গোবিন্দ পাল সোমবার বলেন, ‘‘হরিদেবপুরে পানশালায় গুলি ও খুনের মামলায় পুলিশ চার্জশিট জমা দিয়েছে আদালতে। এখনও চার্জগঠন ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। জামিনে বাইরে রয়েছে নান্টি-সহ বাকি অভিযু্ক্তরা।’’ 

আরও পড়ুন
বীরভূমে তৃণমূলের পার্টি অফিসে বিস্ফোরণ, অনুব্রত বললেন, বিজেপি লোক ঢুকিয়ে করিয়েছে

২০১৫ থেকে ২০১৮— নান্টির এলাকার টালি নালা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। ঠিক তেমন ভাবেই সমাজবিরোধী নান্টির জীবনেও অনেক পরিবর্তন। এখন সমাজসেবীর ভূমিকায় নিজেকে তুলে ধরছেন এক সময়ের কুখ্যাত দুষ্কৃতী নান্টি।

মঞ্চে মদন মিত্রের ডান দিকে নান্টি, পিছনে দাঁড়িয়ে কালা, মদনের বাঁ-দিকে স্থানীয় কাউন্সিলর গৌরহরি দাস।

হরিদেবপুরের ওই গুলিকাণ্ডের সময়েই সামনে এসেছিল এলাকার ত্রাস নান্টি শাসকদল তৃণমূলের অনেক দাপুটে নেতারই স্নেহধন্য। সেই স্নেহ যে গত তিন বছরে একচুলও কমেনি বরং বেড়েছে, তার নমুনা পাওয়া গেল রবিবার। নান্টির বাড়ি রেনিয়ায়। ওই দিন স্থানীয় নিবেদিতা পার্কে ‘রেনিয়া সহযাত্রী সঙ্ঘ’স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবিরের আয়োজন করে। শিবির শেষে ওই ক্লাবের উদ্যোগেই বস্ত্র বিতরণ করা হয়। ওই দিন কিন্তু গোটা অনুষ্ঠানের প্রধান আয়োজকের ভূমিকায় দেখা গেল সেই নান্টি এবং তার ছায়াসঙ্গী কালাকে। তিন বছর আগের গুলি-কাণ্ডেও ‘দাদা’র সঙ্গী ছিল এই কালাই। এখনও মাঝে মাঝেই লালবাজারের সেন্ট্রাল লকআপের পরিচিত ‘অতিথি’ সে।

আরও পড়ুন
তালা ঝুলিয়ে আন্দোলন প্রেসিডেন্সিতে, গেটের মুখ থেকে ফিরে গেলেন উপাচার্য

শুধু কি নান্টি-কালা? আয়োজকদের পাশাপাশি অতিথি তালিকাতেও ‘চমক’ ছিল। রক্তদান শিবিরের মঞ্চে ব্যাজ পরিয়ে বিশেষ অতিথির মর্যাদা দেওয়া হল দিলীপ ওরফে বিশাল মিশ্রকে! কে এই বিশাল? কলকাতার অপরাধ জগত তাকে কুখ্যাত অস্ত্র চোরাচালানকারী হিসাবেই চেনে। মালঞ্চ এলাকার বাসিন্দা বিশালকে ২০১০ সালের জুন মাসে কলকাতা পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স গ্রেফতার করেছিল। পটনা থেকে নিয়ে আসা প্রচুর পরিমাণ বেআইনি অস্ত্র এবং গুলি ভর্তি গাড়ি নিয়ে ধরা পড়ে তিনজন। ধৃতদের জেরা করে জানা গিয়েছিল, সেই অস্ত্র বিশালের কাছেই আসছিল। এখনও অস্ত্রের ব্যাপারে কলকাতার অপরাধীরা বিশালের উপরই ভরসা করে। সেই বিশালকেই মঞ্চে ব্যাজ পরিয়ে দেয় কালা!

বেআইনি অস্ত্র চোরাচালানের দায়ে গ্রেফতার হওয়া বিশাল মিশ্রকে ব্যাজ পরিয়ে সংবর্ধনা দিচ্ছে কালা।

নান্টি, বিশাল, কালাই নয়, রবিবারের ওই রক্তদান শিবির ‘আলো করে’ অনেকেই ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা তাদের অনেককেই চিনতে পেরেছেন। যেমন, শেখ বিনোদের ঘনিষ্ঠ শাগরেদ ভিক্টর, টালিগঞ্জের চালিয়ায় তপন কুণ্ডু খুনে অভিযুক্ত লাল্টু সরকার, কালীঘাটের কুখ্যাত দুষ্কৃতী সরযূ— কে নেই!

নান্টি-কালার আতিথ্যেই রক্তদান শিবিরের মঞ্চে তখনএই সব ‘তারকা’দের পাশাপাশি মঞ্চ আলো করে রয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্র। তাঁর ডান পাশে সর্বক্ষণ দেখা গেল ডোরাকাটা ফুলহাতা টি-শার্ট পরে নান্টি স্বয়ং, পেছনে সাদা শার্ট পরে দাঁড়িয়ে কালা। মদনের বাঁ-পাশে সোনারপুর রাজপুর পুরসভার ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর গৌরহরি দাসসহঅনেকেই! ছিলেন কলকাতা পুরসভার ১১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোপাল রায়, ১৪২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রঘুরাম পাত্র, কলকাতা পুরসভার ১১৩ নম্বর ওয়ার্ডেরতৃণমূল সভাপতি প্রদীপ দাস ছাড়াও এলাকার বিভিন্ন মাপের তৃণমূল নেতারা।

মূল আয়োজক কে, তা না জেনেই নাকি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন মদন মিত্র। খুনের মামলায় অভিযুক্ত এক জন ‘দাগি অপরাধী’র ডাকে কী ভাবে সাড়া দিলেন তিনি? মদনের জবাব, “যে এলাকায় রক্তদান শিবিরটা হয়েছে, সেটা খুব পিছিয়ে পড়া একটা এলাকা। একটি ক্লাবের তরফ থেকে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। যাঁরা আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাঁরা কেউ ক্রিমিনাল নন। তাঁদের ডাকে সাড়া দিয়েই গিয়েছিলাম।’’

গৌরহরি দাসও ওই এলাকার দাপুটে নেতা। তিনি হঠাৎ এক জন ‘দাগি অপরাধী’র সঙ্গে এক মঞ্চে কেন? কাউন্সিলরের জবাব, “শুধু আমি কেন, অনেক নেতানেত্রীই তো উপস্থিত ছিলেন। আপনারা খালি আমার পেছনে পড়ে থাকেন কেন বলুন তো? আমার ওয়ার্ডের অনুষ্ঠান। নিমন্ত্রণ করেছিল। গিয়েছি। না গেলে দলীয় কর্মীদের খারাপ লাগবে। কী করব? যাই হোক, ওরা তো সমাজসেবাই করছে, নাকি!”

সমাজসেবার তত্ত্ব তুলে ধরেছেন মদনও। তিনি বলছেন, ‘‘যাঁরা এই রক্তদান শিবির আয়োজন করেছিলেন, তাঁরা অত্যন্ত সফল ভাবেই কাজটা করেছেন। কোনও উপহারের ব্যবস্থা ছিল না। তা সত্ত্বেও বহু মানুষ ওই শিবিরে গিয়ে রক্ত দিচ্ছিলেন বলে খবর পেয়েছিলাম। এই রকম একটা কর্মসূচিতে না গিয়ে থাকা যায়! সমাজসেবাই তো করি আমরা।’’

মঞ্চে যে কোনও অপরাধী আছে, তা দেখতে পাননি ১১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোপাল রায়ও। সোমবার তিনি বলেন, “সহযাত্রী ক্লাবের তরফে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। দলের তরফে আমিই ওই এলাকা দেখি। তাই আমি গিয়েছিলাম। ওখানে কে অপরাধী তা আমি জানি না।”

কিন্তু, কার অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন, সেই অনুষ্ঠানে কারা থাকছেন, এ সব না জেনেই কেন গেলেন শাসকদলের নেতারা? মদনবাবুর জবাব খুবই স্পষ্ট। তাঁর কথায়, ‘‘আমরা তো কর্পোরেট নেতা নই। কোনও অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে বলতে পারি না যে, স্নিফার ডগ এনে চেক করো, কারা আসছে খোঁজ নাও, আধার কার্ড দেখ, পরিচয়পত্র দেখ, কেওয়াইসি নাও। তাই কারা এসে মঞ্চে দাঁড়ালেন, তাঁরা ক্রিমিনাল কি না— এ সব বোঝা সম্ভব নয়। তবে আবার বলছি, যাঁরা আমাকে ডেকেছিলেন, তাঁরা কেউ ক্রিমিনাল নন।”

রক্তদান শিবিরের পোস্টারে আহ্বায়ক হিসাবে রয়েছে নান্টির নাম।

সত্যিই তো মদনবাবু জানবেন কী করে! তবে, এলাকার অনেকেই জানতেন। কারণ গোটা এলাকায় প্রায় এক সপ্তাহ আগে থেকে যে পোস্টার সাঁটা হয়েছে বা স্থানীয় বাসিন্দা-সহ অন্য অতিথিদের নিমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছে তাতে কিন্তু স্পষ্ট লেখা, ‘রক্তদান শিবিরের আহ্বায়ক বাবলু ঘোষ ওরফে নান্টি’।

শাসক দলের তাবড় নেতারা যেখানে বুঝতে পারছেন না বিতর্ক কোথায়, সেখানে নান্টিই বা বুঝবে কী করে! তাই রবিবার বিকেলে তাকে ফোন করা হলে সে বলে, “আমি ওই ক্লাবের সদস্য। আমার উদ্যোগেই এই রক্তদান শিবির এবং বিকেলে বস্ত্র বিতরণ অনুষ্ঠান হয়েছে। ৩৩২ জন রক্ত দিয়েছেন। মদনদা থেকে শুরু করে অনেক নেতাই ছিলেন। আমাকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক তা আমি বুঝতেই পারছি না!”

নান্টি, কালা, বিশাল, ভিক্টর, লাল্টু, সরযূ— তালিকা অতি দীর্ঘ। স্থানীয় এক বাসিন্দা আরও একটি নাম যোগ করলেন। তাঁর কথায়, ‘‘রক্তদান শিবিরের মঞ্চ থেকেই ঘোষণা করা হচ্ছিল বিভিন্ন নাম। তার মধ্যে হঠাৎই মাইকে একটা নাম শুনে চমকে গেলাম— বস্ত্র বিতরণের উপস্থিত থাকবেন বিশিষ্ট সমাজসেবী কুমার সাহা। ভাবুন এক বার! কুমার নাকি সমাজসেবী!’’ এলাকার অনেকের মতো তিনিও জানেন এই কুমারকে ক’দিন আগেও লালবাজারের গুন্ডা দমন শাখা তাড়া করে বেড়াত।

কুমারের পর তা হলে নান্টিই এখন এলাকার ‘বিশিষ্ট সমাজসেবী’! আশ্চর্য হচ্ছেন এলাকাবাসী।

—নিজস্ব চিত্র।

 

(কলকাতা শহরের রোজকার ঘটনার বাছাই করা বাংলা খবর পড়তে চোখ রাখুন আমাদের কলকাতা বিভাগে।)