প্রশ্ন ছিল দু’টি। একটির জবাব এল, ‘‘মনে পড়ছে না।’’ অন্যটির উত্তর, ‘‘অত কথা বলার সময় এখন নেই!’’ মঙ্গলবার মাঝেরহাট সেতু ভাঙা নিয়ে পূর্ত দফতরের এক শীর্ষ কর্তার সঙ্গে কথোপকথনের এটাই নির্যাস।

দীর্ঘদিন আগেই গোটা রাজ্যের সেতু ও উড়ালপুলগুলির ‘ফিজিক্যাল অডিট’-এর নির্দেশ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। কিন্তু ‘স্বাস্থ্যপরীক্ষা’র সেই নির্দেশ মাঝেরহাট সেতুর ক্ষেত্রে মানা হয়েছিল কি না, প্রশ্ন উঠেছে মঙ্গলবার। যার উত্তরে সংশ্লিষ্ট কর্তা বলেছেন, ‘‘যা যা করার কথা, তার সবই হয়েছে।’’ শেষ কবে মাঝেরহাট সেতুর ফিজিক্যাল অডিট হয়েছিল? কর্তাটির জবাব, ‘‘এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না।’’

তিনি জানান, পাশেই জোকা-বিবাদী বাগ মেট্রো রেলের নির্মাণকাজের কম্পনের জেরেই সেতুটির একটি অংশ এ দিন ভেঙে পড়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ফের প্রশ্ন ওঠে, সেতুটি ওই নির্মাণকাজের কম্পন সহ্য করতে পারবে কি না, মেট্রো প্রকল্প শুরুর আগে তার কী পরীক্ষা করা হয়েছিল? কর্তার উত্তর, ‘‘অত কথা বলার সময় এখন নেই।’’ এই অভিযোগ উড়িয়ে জোকা-বিবাদী বাগ মেট্রোর নির্মাণ সংস্থা রেল বিকাশ নিগম লিমিটেডের দাবি, মেট্রোর নির্মাণকাজের সঙ্গে সেতু ভেঙে পড়ার কোনও সম্পর্ক নেই। জীর্ণ গার্ডার ভেঙেছে বলেই সেতুটি ভেঙেছে।

এ দিন ঘটনাস্থল ঘুরে দেখে সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী। তিনি বলেছেন, ‘‘একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বেশ কিছু দিন ধরে ওখানে একটি গর্ত আছে। পূর্ত আধিকারিকেরা সে দিকে নজর দিয়েছিলেন কি না জানি না।’’ বস্তুত, দুর্ঘটনা ঘটা ইস্তক সেতুটির রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অজস্র বিক্ষিপ্ত তথ্য উঠে আসছে। একটি সূত্রের দাবি, মাত্র ছ’মাস আগে সেতুটির স্বাস্থ্যপরীক্ষার পরে সেটিকে ফিট সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল। এ দিনের ঘটনার পরে তাই তৎকালীন পূর্ত দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের ব্যাখ্যা তলব করেছেন রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা। পূর্ত দফতরের আধিকারিকদের একটি অংশও মানছেন, আদর্শ পরিস্থিতিতে মাঝেরহাট সেতুর মতো পুরনো এবং ব্যস্ত সেতুর স্বাস্থ্যপরীক্ষা কয়েক মাস পর-পরই করা দরকার। সম্প্রতি আইআইটি খড়গপুরকে দিয়ে সেতুর একটি সমীক্ষা করানোর পরিকল্পনাও নাকি হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে ভেঙে বলেননি কেউ।

মাঝেরহাট সেতু

• বয়স: ৫০ বছরেরও বেশি

• দৈর্ঘ্য: আনুমানিক ৪৫০ মিটার

• নির্মাণকারী সংস্থা: পূর্ত দফতরের একাংশের দাবি, কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ সেতুটি তৈরি করেছিল। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য তারা ওই সেতু তৈরি করেনি।

• রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে: রাজ্য পূর্ত দফতর

• এলাকা: ডায়মন্ড হারবার রোডে মাঝেরহাট রেল লাইনের উপর

• গঠন: ‘কংক্রিট-গার্ডার’ কাঠামোর সেতু এটি

• পূর্ত দফতরের প্রাথমিক দাবি: জোকা-বি বা দী বাগ মেট্রোপথের নির্মাণ কাজে হওয়া প্রবল কম্পন

পূর্ত দফতরের অন্দরের খবর, বেশ কয়েক মাস আগে সেতুটির উপরিভাগের রাস্তার ক্ষত মেরামত করা হয়। প্রায় দেড় মাস আগে আগে ওই সেতুর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিপুল অর্থও বরাদ্দ করা হয়েছিল। দফতরের একাংশের হিসেবে, সেতুটির এক-একটি গার্ডারের (যে অংশগুলি জুড়ে সেতু তৈরি হয়, সেগুলিকেই পোশাকি ভাষায় ‘গার্ডার’ বলে) জন্য সাত কোটি টাকা করে বরাদ্দ হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের কারও কারও ব্যাখ্যায়, ওই টাকায় গার্ডারগুলিতে ব্যবহৃত ধাতব উপাদান বদলের পরিকল্পনা ছিল। টাকা বরাদ্দ হলেও কেন কাজ শুরু করা গেল না? সদুত্তর মেলেনি পূর্ত দফতরের কাছে।

আরও পড়ুন: প্রকাণ্ড সেতুটা ঝুলে রয়েছে ‘ভি’-এর আকারে

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক গোকুল মণ্ডল জানান, নির্দিষ্ট সময়ের পরে যে কোনও সেতুরই স্বাস্থ্যপরীক্ষার প্রয়োজন হয়। কারণ, ওই পরীক্ষাতেই ধরা পড়ে, ব্রিজটি ভার বহনে সক্ষম কি না, বা তার কাঠামোতে কোনও ‘ফ্যাটিগ’ বা ‘ক্লান্তি’ জমা হয়েছে কি না। গোকুলবাবুর বক্তব্য, ‘‘মনে রাখতে হবে, ব্রিজটির একটা ‘পাস্ট পারফরম্যান্স’ রয়েছে। অর্থাৎ, সেটি দিয়ে এত দিন ভালই যান চলাচল করেছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, যে ভাবে অডিট হয়েছে, তাতে কোনও গাফিলতি থাকলেও থাকতে পারে।’’ নিউ ইয়র্ক সিটির ডিপার্টমেন্ট অব ট্রান্সপোর্টের প্রাক্তন প্রজেক্ট ম্যানেজার অলক সরকার বলেন, ‘‘প্রতিটি সেতুর ওজন এবং চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কমতে থাকে। কারণ, যে মালমশলা দিয়ে সেতু তৈরি হয়েছে, সেগুলো ক্ষয়ে যায়। তখন ইঞ্জিনিয়ারদের একটি অঙ্ক করতে হয়, যাকে ‘ব্রিজ রেটিং অ্যানালিসিস’ বলে। আমার ধারণা, এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।’’ সেতুটির দেখভাল ঠিকমতো হয়নি বলে মনে করছেন তিনিও।

আরও পড়ুন: ‘গাড়ি নিয়ে উঠতেই দুলে উঠল সেতুটা’

সেতুর স্বাস্থ্য-অডিটে কী কী দেখা হয়?

গোকুলবাবু জানাচ্ছেন, মূলত তিনটি বিষয়। ব্রিজটির নকশা ঠিক রয়েছে কি না। যে নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, তার গুণগত মান কেমন। এবং ব্রিজটি তৈরিতে কোনও ত্রুটি রয়েছে কি না। কিন্তু প্রধান যে বিষয়টি দেখা প্রয়োজন (বিশেষত মাঝেরহাটের মতো পুরনো সেতুর ক্ষেত্রে) তা হল, সেতুর প্রাথমিক কাঠামোতে কোনও পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে কি না। গোকুলবাবুর মতে, ‘‘শুরুতে ব্রিজের ভার-বহনের ক্ষমতা যা ছিল, বর্তমানেও তা-ই রয়েছে কি না, সেটা দেখা দরকার। ব্রিজের একটা নির্দিষ্ট অংশ দুর্বল হয়ে গেলে সেটা ভেঙে পড়তেই পারে। কিন্তু কোন অংশটা দুর্বল হয়েছে, হেলথ-অডিটে তা-ও উঠে আসে। সেই কারণে ব্রিজ তৈরির পাঁচ বছর পর থেকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার।’’

ভূমিকম্প বা বাতাসের ঠেলায় ব্রিজের গার্ডারের প্রাথমিক অবস্থানের কোনও বিচ্যুতি হয়েছে কি না— সেতুর স্বাস্থ্যপরীক্ষায় সেটিও দেখা প্রয়োজন বলে গোকুলবাবুর মত। পূর্ত কর্তারা যে হেতু মেট্রোর নির্মাণকাজকে প্রাথমিক ভাবে দায়ী করেছেন, সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, গার্ডারের বিচ্যুতির বিষয়টি মেট্রো প্রকল্প শুরুর আগে বা প্রকল্প চলাকালীন খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি? উত্তর মেলেনি।

রেল বিকাশ নিগম লিমিটেডের চিফ প্রোজেক্ট ম্যানেজার এ কে রায় যদিও এ দিন লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের পুরনো ‘আরসিসি’ গার্ডারের (রিইনফোর্সড কংক্রিট গার্ডার) মাঝের অংশ ভেঙে পড়াতেই সেতুটি ভেঙে পড়েছে। তাঁর দাবি, মাঝেরহাট সেতুর দু’দিকেই ওঠার মুখে যে স্তম্ভ রয়েছে, তাতে কোনও বিকৃতি ঘটেনি। নির্মীয়মাণ মেট্রো স্টেশনের স্তম্ভও তৈরি হয়েছে এক বছর আগে।

পূর্ত দফতরের আধিকারিকদের একটি অংশের ব্যাখ্যা, প্রশ্নটা নির্দিষ্ট গার্ডারের বিচ্যুতি বা কম্পন নিয়ে নয়। বরং যে ব্রিজের উপর দিয়ে সারা দিন ধরে প্রচুর যাত্রিবাহী গাড়ি চলাচল করে এবং বন্দর এলাকা থেকে ভারী পণ্যবাহী গাড়িরও যাতায়াত রয়েছে, সেখানে বাড়তি সতর্কতা জরুরি ছিল।

পূর্তমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস মঙ্গলবারই নির্দেশ দিয়েছেন, যত দ্রুত সম্ভব গোটা রাজ্যের সমস্ত সেতুর রিপোর্ট দিতে হবে। তাতে কোন সেতুর কখন স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে, সেগুলির বর্তমান পরিস্থিতি, সংস্কারের প্রয়োজনীয় কাজ হচ্ছে কি না, ইত্যাদি সব তথ্য দিতে বলা হয়েছে।

নবান্নের এক অফিসারের মন্তব্য, ‘‘ঘুম ভাঙল, তবে বড় দেরিতে।’’

(সহ প্রতিবেদন: ফিরোজ ইসলাম)

(শহরের প্রতি মুহূর্তের সেরা বাংলা খবর জানতে পড়ুন আমাদের কলকাতা বিভাগ।)