×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৭ জুন ২০২১ ই-পেপার

মেধায় উজ্জ্বল অন্য শান্তিনিকেতন

নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
২২ মে ২০২১ ০৬:৫০

অগ্নিযুগে শান্তিনিকেতনে হাঙ্গেরীয় দম্পতির স্মৃতিলিপি
জি রোজা হইনোসি (অনুবাদ: বিচিত্রা ভট্টাচার্য)
১০০০.০০
আনন্দ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশায় শান্তিনিকেতনের আপাত-সঙ্কীর্ণ পরিসরে এসে মিলেছিল গোটা পৃথিবী। আশ্রম বিদ্যালয়ের সূচনালগ্ন থেকেই শান্তিনিকেতনে যাতায়াত করেছেন অগণিত বিদেশি। তাঁদের অনেকেই লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন শান্তিনিকেতন এবং ভারতের স্মৃতি। তেমনই এক জন মানুষ হাঙ্গেরির জি রোজা হইনোসি, যিনি তাঁর স্বামী জ্যুলা গারমানুশের সঙ্গে ভারতে ছিলেন ১৯২৯ থেকে ১৯৩২-এর কিছু সময় অবধি। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে গারমানুশ শান্তিনিকেতনে আসেন, বিশ্বভারতীর ইসলাম ধর্ম-দর্শন এবং সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে। ভারতে নিজের লেখা দিনলিপির ভিত্তিতে জি রোজা হইনোসি পরবর্তী কালে একটি স্মৃতিলিপি রচনা করেন। অনেকটা উপন্যাসের আদলে লেখা। হাঙ্গেরীয় ভাষা থেকে অনবদ্য বাংলায় বইটি অনুবাদ করেছেন বিচিত্রা ভট্টাচার্য। এ যেন এক ‘টাইমমেশিন’, যা আমাদের নিয়ে চলে যায় বিশ শতকের তৃতীয় দশকের শান্তিনিকেতনে। সীমানাবিহীন, বাহুল্যবর্জিত, অভাবে লালিত, মেধা সৃজন আর তর্কের আলোয় উজ্জ্বল এক শান্তিনিকেতন।

ম্যালেরিয়া, আগুনে হাওয়া আর ব্যাকটিরিয়ার ডেরা ভারতে রওনা হওয়ার প্রাক্কালে রোজার মা তাঁকে সাবধান করে বলেছিলেন, “তোমরা দু’জনেই মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছ।” যে জাহাজে তাঁরা ভারতে আসছিলেন, সেখানেই আলাপ এক সদ্য বিবাহিত ভারতীয় ভদ্রলোক ও তাঁর ড্যানিশ স্ত্রীর সঙ্গে। ইউরোপের গভীর প্রেমে পড়া রবীন্দ্রনাথের সচিব অমিয় চক্রবর্তী আর ভারতকে ভাল লাগা হেলগা, পরে যার নাম হয় হৈমন্তী। কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের সুবিশাল বাসভবনের সব কিছু যেন ‘নোংরা’য় মোড়া। রাস্তায় মানুষের ঢল, অনেকের খালি গা। পবিত্র ষাঁড়ের পিছনে ঝুড়ি নিয়ে অজানা কারণে গোবর কুড়োচ্ছেন স্ত্রীলোকেরা। প্রথম দর্শনেই শুধু কলকাতা নয়, শান্তিনিকেতনও দুর্বিষহ মনে হয় কবির ডাকে ছুটে আসা হাঙ্গেরীয় দম্পতির। ঔপনিবেশিক শক্তির প্রতিনিধি না হলেও রোজা লক্ষ করলেন যে, তাঁদের দেখে গ্রামের কুকুররা চেঁচায়, সাঁওতাল শিশুরা কাঁদে। তিনি লিখছেন, “...ভারতে শ্বেতকায় লোকদের সমীহ করা হয় কারণ তাঁরা শক্তিশালী এবং ভিন্ন জায়গা থেকে এসেছে। এই সমীহ...মনে করিয়ে দেয় যে আমরা ওদের চেয়ে সত্যিই আলাদা।” শান্তিনিকেতনের একঘেয়ে জীবনে ক্লান্ত রোজা। সেই বিষণ্ণতার আবর্তে এক দিন অন্ধকার আশ্রমে সান্ধ্যভ্রমণের সময় চাঁদের নীচে চুম্বনরত অমিয় আর হৈমন্তীকে দেখলেন তিনি। “শান্তিনিকেতনের এই সন্ধ্যায় যেন প্রাচ্য আর প্রতীচ্যের দাবদাহ আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের মাথার উপরের তালগাছগুলো যেন আগত গ্রীষ্মের স্বপ্নগুলো ফিসফিস করে বলছে আর তাদের ডালগুলো যেন বড় বড় পাতা দিয়ে একে অপরকে আদর করছে।” এমনই রুদ্ধশ্বাস কাব্যিক হাতছানি আমাদের ক্রমশ টেনে নিয়ে যায় এক বিদেশিনির স্মৃতির অতলে। আশ্রমের বাতাস একটু ঠান্ডা হতেই রোজার শান্তিনিকেতনকে ভালবাসার শুরু।

Advertisement

যে শান্তিনিকেতনের ছবি এঁকেছেন রোজা, সেই আশ্রমে তখন শিক্ষকতা করছেন শ্রীলঙ্কার উইলিয়ম আরিয়ম, আর ফরাসি শেখাচ্ছেন মঁসিয়ে বেনোই। দুই আফগান ভৃত্য নিয়োগ করে বিড়ম্বনার পাত্র হয়ে উঠেছেন সপত্নীক আশ্রমে আসা রাশিয়ান অধ্যাপক বোগদানভ। তাঁর দেশ ফ্যাসিস্ট নয়, এই মর্মে ইটালীয় অধ্যাপক পিয়েত্রো গুয়াদাগনি প্রবল তর্ক জুড়েছেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে, আর কবি তাঁকে বলছেন: “শক্তিধরের কোনও অধিকার নেই দুর্বলের উপর নিজেদের ইচ্ছে চাপিয়ে দেওয়ার।” আবার তিনিই বলছেন, “যদি রাজনীতি আশ্রমে ঢুকত তা হলে আমার আত্মিক সন্তান, শান্তিনিকেতনও বিলীয়মান স্বর্গ হয়ে যেত।” মহাত্মা গাঁধী আর রবীন্দ্রনাথের আদর্শগত টানাপড়েনে দ্বিধাবিভক্ত আশ্রম। আছেন জার্মান ছাত্র ভালেন্টিন ট্রাপ; বিপথগামী স্ত্রীর ছায়া থেকে পালিয়ে, গোপনে নিবিড় অধ্যয়নে মগ্ন, প্রায় চল্লিশটি ভাষায় পারদর্শী মার্ক কলিন্স। আমেরিকার এক চিকিৎসক দম্পতি মনপ্রাণ সঁপে দিয়ে জাগিয়ে তুলছেন অন্ধবিশ্বাসে ডুবে থাকা, ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। নতুন আইনে বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার মুখে চার পাশের গ্রামে-গঞ্জে নাবালিকাদের বিয়ে দেওয়ার হিড়িক, সেই আবহে ডাক্তার টিম্বার্সের সঙ্গে আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ বলছেন যে, যৌন আকাঙ্ক্ষা প্রবলতার সঙ্গে উদয় হওয়ার আগেই বিয়ে দিতে হবে এবং “এই কারণেই পণ্ডিতরা বাল্যবিবাহের রায় দিয়েছেন।” রবীন্দ্রনাথ মাঝেমধ্যে বিদেশ ভ্রমণ করছেন। যখন আশ্রমে, কখনও পথে যেতে যেতে গারমানুশের ভায়োলিন শুনতে পাচ্ছেন। ‘বখাটে’, মহিলাদের প্রতি অনুরক্ত ভাস্কর বার্গনার রবীন্দ্রনাথকে সামনে বসিয়ে তাঁর মূর্তি তৈরি করছেন, আর এক সাঁওতাল মেয়েকে নিয়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে বেধড়ক মার খাচ্ছেন। দিনেন্দ্রনাথ গান শেখাচ্ছেন, জাপানি শিক্ষক শেখাচ্ছেন জুজুৎসু। রোজা দেখছেন, দুর্গোৎসবের সময় আশ্রম ছুটি হয়ে গেল। লিখছেন, “যদিও এই বিশ্ববিদ্যালয় হিন্দু দেবতাদের শ্রদ্ধা করে না, কিন্তু প্রত্যেকেই উৎসবের মেজাজে।” আশ্রমের জার্মান বিয়ার পার্টিতে বিহ্বল হয়ে পিতার বিব্রত ধিক্কারের বিষয় হচ্ছেন পণ্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রীর পুত্র প্রসাদ।



কিছু ব্যক্তির নাম নিয়ে সংশয় রয়েছে। এই স্মৃতিলিপির একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আশ্রমের দুই আশ্চর্য প্রণয়ের উপাখ্যান। এক দিকে অমিয়-হৈমন্তী, অন্য দিকে পাহাড়-ভালবাসা, জার্মান সুদর্শনা গেরট্রুড রুডিগার এবং তাঁর প্রেমে উন্মাদ, শান্তিনিকেতনে কোরান আর আরবি ভাষা শিখতে আসা মুলতানের চপল যুবরাজ আলি হায়দর আব্বাসি। ছেলের পছন্দের পাত্রী দেখতে শান্তিনিকেতনে চলে আসছেন নবাব, আর কবির বাসভবনে পাটের চিক দিয়ে তৈরি করে নিচ্ছেন সঙ্গে আসা নিজের কন্যার অস্থায়ী হারেম। এক কালে বিদেশের হোটেলে কর্মরতা, ঘনিষ্ঠতায় উৎসাহী পুরুষদের আবেদন ফিরিয়ে দেওয়া হৈমন্তীর মধ্যে অমিয় যেন ইউরোপকেই চেয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে, আচারে-অভ্যাসে হৈমন্তী হয়ে উঠছেন ঘোর হিন্দু, গাঁধীর আদর্শে প্রাণিত হয়ে জড়াচ্ছেন ভারতের মুক্তি আন্দোলনে, কখনও প্রতিবাদে লুটিয়ে পড়ছেন রাস্তায়, যোগ দিচ্ছেন লবণ সত্যাগ্রহে, জেলে যাচ্ছেন। সেই অবকাশে, শান্তিনিকেতন কখন যেন কাছাকাছি এনে দেয় অমিয় আর গেরট্রুডকে। ঈর্ষায় কাতর আশ্রমের গুঞ্জন অগ্রাহ্য করে বাঁধনহারা উদ্দামতায় সদ্য কেনা ‘স্পোর্টস-কার’এ গেরট্রুডকে নিয়ে পঁচাত্তর ‘স্পিড’-এ গাড়ি ছোটাচ্ছেন অমিয়, হাওয়ায় উড়ে অমিয়র মুখে সেই সুন্দরীর সোনালি চুল; ‘কর্মদোষ’-এ জেল খেটে হৈমন্তী আশ্রমে ফিরে এলে রবীন্দ্রনাথ এড়িয়ে চলছেন তাঁর সঙ্গ, আর অমিয় তাঁর স্ত্রীকে বলছেন, “তুমি আর আমার নেই, তুমি গাঁধীর হয়ে গেছ।”

শুধু শান্তিনিকেতনই নয়, এই বইয়ে লিপিবদ্ধ হয়েছে শিলং, মুর্শিদাবাদ, সবরমতী, দার্জিলিং-এর স্মৃতিও। তবে আর সব কিছুকেই ছাপিয়ে গিয়েছে সময়ের আলোয় ভাস্বর এক শান্তিনিকেতনের ছবি। স্মৃতিলিপির এক জায়গায় ক্ষিতিমোহন সেন গল্প শোনান, “…যখন কবির বাবা মহর্ষি এই আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তখন তাঁকে বলা হয়েছিল চারপাশে বেড়া দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি এই ধারণার বিপক্ষে ছিলেন। তিনি বলতেন, “‘লোকেরা ভাববে এটা একটা পাগলখানা, কারণ এর চারিদিকে দেওয়াল ঘেরা। না, উন্মুক্ত থাকুক’—তিনি আদেশ দিলেন। ‘যদি কোনও পাগল ঢোকে তাহলে সে তার ফেরার পথও খুঁজে নেবে।”’ আগলভাঙা আর বাঁধনহারা সোনালি সেই সময়ের শান্তিনিকেতনের এক নির্বিকল্প উপাখ্যান হাঙ্গেরীয় জি রোজা হইনোসির এই বইটি। যেন তার শেষ হয় না রেশ।

Advertisement