×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মার্চ ২০২১ ই-পেপার

নিজভূমে পরবাসী, তাই শরণার্থী

দেবদত্তা চৌধুরী
১২ ডিসেম্বর ২০২০ ০০:০১
ভাসমান: বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসান চর দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। রয়টার্স

ভাসমান: বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভাসান চর দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ৪ ডিসেম্বর ২০২০। রয়টার্স

আমরা যে জায়গাটিকে আরাকান বলে চিনি (বর্তমানে মায়ানমারের উত্তর-পশ্চিমে রাখাইন প্রদেশ), সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা মুখ্যত ইসলাম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গারা। বর্তমানের ভারত-বাংলাদেশ-মায়ানমারের সংযোগস্থলে অবস্থিত আরাকান। ইসলাম ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির সংযোগস্থলও এই আরাকান। ইংরেজদের শাসনের সময় থেকে আরাকানি মুসলমান ও বর্মি বৌদ্ধদের মধ্যে দ্বন্দ্বের শুরু। উপনিবেশ-উত্তর পর্বেও চলতে থাকে বর্মি বৌদ্ধদের হাতে আরাকানি মুসলমানদের ধর্মীয় নিগ্রহ। ফলে রোহিঙ্গাদের বাস্তুভিটে ছেড়ে অন্যত্র, মূলত পড়শি দেশে, পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা ক্রমশই বাড়তে থাকে। পরবর্তী কালে, মায়ানমার রাষ্ট্রের মধ্যে থেকেও স্বশাসিত রাখাইন প্রদেশের দাবি, আরাকানি রাজনীতিকে আরও জটিল করে। বাড়ে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ও উৎখাত। ক্রমেই বিশ্বব্যাপী উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের তালিকায় সংখ্যা বাড়ে রোহিঙ্গাদের।

রোহিঙ্গাদের বাস্তু-সঙ্কটের ইতিহাস এত পুরনো হওয়া সত্ত্বেও এই বিষয়ে গবেষণামূলক কাজের অভাব রয়েছে; বিশেষ করে ভারতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে। ‘ক্যালকাটা রিসার্চ গ্রুপ’ সেই অর্থে ব্যতিক্রমী একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেখানে বহু দিন ধরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলেছে। প্রতিষ্ঠাতা রণবীর সমাদ্দার এবং সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী সেই কাজের প্রতিফলন হিসেবেই এই বইটি সম্পাদনা করেছেন। উদ্বাস্তু সমস্যা বিষয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণে দুই সম্পাদকেরই আন্তর্জাতিক স্তরে উল্লেখযোগ্য অবদান আছে। সম্পাদকেরা ছাড়াও আর যে সমস্ত গবেষক বইটিতে কাজ করেছেন তাঁদের লেখা তথ্যপূর্ণ, বিশ্লেষণধর্মী ও সুন্দর। তাঁদের এই শ্রমনিষ্ঠ কাজটি পাঠকদের সমৃদ্ধ করবে, তাতে সন্দেহ নেই।

বিশ্ব জুড়ে উদ্বাস্তু সমস্যার যে বিপুল বিস্ফোরণ, তার মূলে রয়েছে গুটিকতক ক্ষমতাশীল রাষ্ট্রের জাত এবং ধর্মের গোঁড়ামি। বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘুরা এই রাজনীতির শিকার। রোহিঙ্গারাও বাদ পড়েননি। এই পরিপ্রেক্ষিতে বইয়ের ভূমিকাতে রোহিঙ্গাদের ইতিহাস বিষয়ে বিশদে আলোচনা করা হয়েছে, যা পরবর্তী অধ্যায়গুলি বুঝতে সাহায্য করে। কারণ, এখনও বহু মানুষই রোহিঙ্গা ও তাঁদের সমস্যাটি নিয়ে যথাযথ ভাবে অবহিত নন। (রবীন্দ্রনাথের ‘দালিয়া’ ছাড়া আরাকানিদের সঙ্গে বিশেষ পরিচয় ঘটেনি বাঙালি পাঠকের।)

Advertisement

দ্য রোহিঙ্গাজ় ইন সাউথ এশিয়া: পিপল উইদাউট আ স্টেট

সম্পাদনা: সব্যসাচী বসু রায়চৌধুরী ও রণবীর সমাদ্দার

৯৯৫.০০

রাউটলেজ

রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে মাইগ্রেশন বা পরিযাণ মূলত ঘটে সমুদ্রপথে— স্থলপথে যাত্রার তুলনায় অনেক বেশি বিপদসঙ্কুল। ডিঙি নৌকায় বিপজ্জনক যাত্রা করে রোহিঙ্গারা কখনও পৌঁছন বাংলদেশ, কখনও বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া, তাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়াতে। অনেক সময়েই এই যাত্রার পরিণাম নৌকাডুবি, মৃত্যু। যাঁরা কোনও মতে অন্য রাষ্ট্রে পৌঁছতে পারেন, তাঁদের ঠাঁই জোটে শরণার্থী শিবিরে। কখনও বা শিবিরের বাইরে। অকল্পনীয় অমানবিক পরিকাঠামোর মধ্যে তাঁদের থাকতে বাধ্য করা হয়। সুচরিতা সেনগুপ্ত তাঁর অধ্যায়ে রোহিঙ্গাদের ‘বোট পিপল’ হয়ে ওঠার কারণটিকে, এবং সমুদ্রপাড়ির নানা বিপদের কথা বিশ্লেষণ করেছেন। বিভিন্ন সময় নিপীড়ন-দমন ছাড়াও, শুধুমাত্র রুজির টানে ভারত-বাংলাদেশ-মায়ানমারের মধ্যে মানুষের যাতায়াতের ইতিহাস নতুন নয়। আইনি ও বেআইনি, দুই পথেই রোহিঙ্গারা বহু দিন ধরে পাড়ি দিচ্ছেন প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। হামেশা পাচারকারীর শিকার হয়েছেন। রুজির টানে পরিযাণ, শরণার্থীদের যাত্রা ও মানুষ পাচারের আখ্যান একাকার হয়ে গিয়েছে বহু সময়ে। এই কারণে জাতীয় সুরক্ষা নীতি যত কড়া হয়েছে, শরণার্থীরা হয়ে পড়েছেন সন্দেহভাজন; পরিচিত হয়েছেন ‘জাতীয়’ সুরক্ষার অন্তরায় হিসেবে। সুচরিতার লেখা এই জটিল রাজনীতির উপর আলোকপাত করে।



১৯৭৪-এর সংবিধানে, মায়ানমার সরকার আরাকানকে রাখাইন নামকরণের মাধ্যমে বৌদ্ধ পরিচয় চাপিয়ে দেয়। ফলস্বরূপ ইসলামধর্মী আরাকানিদের পাকাপাকি বহিষ্কারের ব্যবস্থা তৈরি হয়। ১৯৮২-র নাগরিকত্ব আইন এই বহিষ্করণ নীতিতে সিলমোহর দিয়ে রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিকত্ব থেকে পুরোপুরি বর্জন করে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত মায়ানমারের ইতিহাস বহন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হারানোর সাক্ষ্য। ২০১৭ থেকে মায়ানমার সেনা নতুন করে রোহিঙ্গা-দমন শুরু করে। তাঁদের কার্যত বাধ্য করে দেশান্তরী হতে। মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে রোহিঙ্গাদের এক করে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে ভিটেছাড়া করা হয় রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু নাগরিকদের।

বাংলদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলি ছাড়াও রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ প্রবেশ করে ভারতে, মূলত বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে। সাহানা বাসভপাতনা, প্রিয়ঙ্কা মাথুর ভেলাথ, কৃতি চোপড়া, ও শুচিস্মিতা মজুমদারের লেখা অধ্যায়গুলিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে রোহিঙ্গাদের বসবাস ও দুরবস্থার কথা বিশদে আলোচিত। শরণার্থী ও উদ্বাস্তুদের জন্য আইনি ব্যবস্থা ও নীতি থাকা সত্ত্বেও, ভারত সরকার রোহিঙ্গাদের এই ধরনের কোনও আইনের আওতায় কেন নিয়ে আসতে চাইছে না বা পারছে না, এই প্রশ্নটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। উদ্বাস্তু পরিচয়ের সঙ্গে কিছু ন্যূনতম অধিকার দাবি করা গেলেও, শরণার্থী হিসেবে সেটুকুও প্রাপ্য নয় রোহিঙ্গাদের। ২০১২ সালে দিল্লিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রতিবাদ জমায়েতের মূল কারণ ছিল উদ্বাস্তু পরিচয় দাবি। ভারতে উদ্বাস্তুদের বেশির ভাগ রাষ্ট্রপুঞ্জের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশন-এর উদ্বাস্তু ও শরণার্থী নীতির আওতায় পড়েন। বাকিরা ভারত সরকারের উদ্বাস্তু নীতির মুখাপেক্ষী। ভারত যে হেতু ১৯৫১ সালের রেফিউজি কনভেনশন-এর স্বাক্ষরকারী নয়, কাজেই ভারতের উদ্বাস্তু বা শরণার্থী আশ্রয় ও পুনর্বাসন নীতি নির্ভর করে শরণার্থীদের প্রতি এ দেশের মনোভাবের উপর। যে কারণে রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে তাঁদের ধর্ম (ইসলাম) তাঁদের বার বার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। ভারতীয়দের মনেও তৈরি করেছে রোহিঙ্গাদের প্রতি গভীর সন্দেহ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এই সন্দেহ ও বিদ্বেষের প্রতিফলনের ছবি তুলে ধরেছেন মধুরা চক্রবর্তী। ৯/১১-পরবর্তী সময়ে এই সন্দেহ আরও গাঢ় হয়েছে। ফলে আশ্রয় ও পুনর্বাসন প্রণয়ন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে ।

শার্লট-অ্যান মালিচিউস্কি অত্যন্ত দক্ষ ভাবে আন্তর্জাতিক নাগরিকত্ব, উদ্বাস্তু ও শরণার্থী আইন ও অধিকারের চিত্র তুলে ধরেছেন । অধ্যায়টি তথ্যের পাশাপাশি আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করে। জানায়, কী ভাবে কিছু উদ্বাস্তু সমস্যা আইনের ফাঁক গলে তলিয়ে যায় জাত ও ধর্মের বিদ্বেষের অন্ধকারে। শুভ্র প্রসূন সরকারের লেখাতে এই বিষয়টি, ভারতের রাজনীতি ও উদ্বাস্তু নীতির প্রেক্ষাপটে আরও স্পষ্ট হয়। ফলে সাম্প্রতিক কালে, ভারতের নাগরিকত্ব আইনের প্রেক্ষাপটে, রোহিঙ্গাদের বিষয়টি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

এই বই থেকে সবচেয়ে মূল্যবান যে ভাবনার রসদ পাওয়া যায় তা হল: কী ভাবে আন্তর্জাতিক আইন ‘উদ্বাস্তু’ ও ‘বাস্তুহীন’/‘রাষ্ট্রহীন’ (রেফিউজি ও স্টেটলেস) এই দু’টি ধারণা ও সংজ্ঞার মধ্যে পার্থক্য করে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রহীন শরণার্থীদের সমস্যা, উদ্বাস্তু সমস্যার চেয়ে জটিলতর। আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতার মঞ্চ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে বিফল। ভারত, তথা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিও অক্ষম নিজেদের মধ্যে কোনও উদ্বাস্তু নিরাপত্তা বা উদ্বাস্তু সুরক্ষা নীতি তৈরি করতে। বিশ্বায়নের একটি পরিণতি হিসেবে ১৯৯০-এর দশক থেকে গবেষকরা বিশ্বাস করেছিলেন এক দিকে রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা হ্রাস, অন্য দিকে শরণার্থী, উদ্বাস্তু, ও নারী ক্ষমতায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রবিহীন গোষ্ঠীগুলির গুরুত্ব বৃদ্ধি হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা এই তত্ত্বকে অনেকাংশেই ভুল প্রমাণ করেছে। দেখিয়ে দিয়েছে আসলে রাষ্ট্রের হাতেই মানুষের পরিচয়, তথা জীবন বাঁধা। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এমন ক্ষমতাশালী যে উদ্বাস্তু, শরণার্থী, বা নিরাপত্তা সমস্যা হলে রাষ্ট্রের মাধ্যমেই তা নিরসন হবে।

শুধু ছোট একটি বিষয়ে সম্পাদকরা আর একটু দৃষ্টি দিতে পারতেন। রচনাগুলি যেহেতু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গবেষকের লেখা, তাঁরা প্রত্যেকেই নিজের অধ্যায়ের শুরুতে এক বার রোহিঙ্গাদের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, যা ভূমিকা ও প্রথম অধ্যায়ের পরে খানিকটা পুনরাবৃত্তি। এ ছাড়া বইটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে খুব জরুরি এক সংযোজন।

Advertisement