Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৪ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি করেছেন

তাপস সিংহ
১৫ জুলাই ২০১৮ ০০:০৫
রূপটান: নকশাল আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে সুসজ্জিত স্মারক। নকশালবাড়ি, ২৪ মে ২০১৭

রূপটান: নকশাল আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তিতে সুসজ্জিত স্মারক। নকশালবাড়ি, ২৪ মে ২০১৭

রাজনীতির এক জীবন, সন্তোষ রাণা, ৪০০.০০, আনন্দ পাবলিশার্স

বর্ষার সময় ছাড়া কেন যেন সুবর্ণরেখাকে ক্ষীণতোয়া বলে মনে হয়। অথচ, সেই সুবর্ণরেখায় বন্যার বছরে যে ছেলের জন্ম হয়েছিল, পরবর্তী কয়েক দশক ধরে সেই ছেলেই কার্যত ‘বানের জলে ভেসে আসা’ মানুষগুলোর জন্য শোষণহীন, প্রকৃত অর্থেই গণতান্ত্রিক আবহের জন্ম দেওয়ার জন্য কাজ করে গেল। তাদের ভিন্নতর এক স্বপ্ন দেখানোর ভিত তৈরির কাজে লেগে রইল। এই নির্মাণ পর্বের আগাগোড়া যে আদৌ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না বা এখনও নেই তা বলাই বাহুল্য।

তবু, রাজনীতির এক জীবন নামে যে গ্রন্থ সন্তোষ রাণা আমাদের উপহার দিলেন তার পাতায় পাতায় কোথাও এমন বর্ণন নেই যাতে মনে হতে পারে, নকশালপন্থী এই নেতা নিদারুণ সংগ্রাম করে, বিপুল ত্যাগ স্বীকার করে, ঝকঝকে কেরিয়ার হেলায় ওই সুবর্ণরেখার জলে ভাসিয়ে দিয়ে দেশের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন! ৩৩৫ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে কোথাও সজ্ঞানে এমন কিছু বলতে চাননি যাতে মনে হয়, তিনি এক মহান বিপ্লবী!

Advertisement

অথচ, এ গ্রন্থ শুরু হয়েছে এই বাংলার পল্লিচিত্র দিয়ে। যে পল্লির বুকের ভিতর নানা সম্প্রদায়ের, নানা মতের, নানা আর্থিক বৈষম্যের মানুষজন পাশাপাশি বসবাস করেন। এক সঙ্গে গ্রাম গড়েন, যুগের পর যুগ ধরে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ শোষিত হন, আবার যুগের পর যুগ তাঁদেরই মধ্যে কেউ কেউ শোষকের ভূমিকা পালন করে যান।

তৎকালীন মেদিনীপুর জেলার ওড়িশা-ঝাড়খণ্ড সীমানায় ধরমপুর গ্রামে ১৯৪৩ সালে জন্ম সন্তোষের। থানা গোপীবল্লভপুর। তাঁর আখ্যানে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়েছে ধরমপুর গ্রামের সমাজ ও অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক জীবন, উৎসব, ফসল, ঋণ নেওয়া ও তা শোধের প্রক্রিয়ায় তীব্র শোষণের ছবি। এসেছে ধরমপুরের হাট-বাজার, শিক্ষার অবস্থা এবং গ্রামীণ বিচার ও সভার খুঁটিনাটি বিবরণ।

এই সবিস্তার বর্ণনার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে প্রাথমিক ভাবে মনে হতে পারে, সন্তোষ রাণার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের কর্মকাণ্ড ও যাত্রাপথের আখ্যানে এই বর্ণনা কতটা প্রাসঙ্গিক? কিন্তু কি‌ছু পরেই মনে হয়, ভাগ্যিস বাংলার পল্লিসমাজের ছবিটা লেখক এত নিখুঁত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন! তা না হলে ষাটের দশকের শেষে কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটটি বোঝাই যেত না! দক্ষিণবঙ্গের গোপীবল্লভপুরের সমাজজীবন ও জাতি বৈষম্যের এই বিশ্লেষণ না থাকলে সুদূর উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি মহকুমার নকশালবাড়ি ব্লকে ১৯৬৭-র ২৫ মে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, তার প্রেক্ষাপটও এ ভাবে বিশ্লেষণ করা যেত না।



সামাজিক বৈষম্যের অসাধারণ এক ছবি সন্তোষ রাণা ফুটিয়ে তুলেছেন গ্রামীণ সভার বর্ণনায়। ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা বা পুজো পরিচালনার জন্য গ্রামীণ সভা বসত। গ্রামের প্রতিটি পরিবারের তাতে যোগদানের অধিকার ছিল। রীতি অনুযায়ী যাঁরা সভা পরিচালনা করতেন তাঁরা বসতেন চেয়ারে বা তক্তপোষে। নীচে যে আসন পাতা হত সেখানে বসতেন তেলি, খণ্ডায়েত ও স্বর্ণকার জাতির লোকজন। কিন্তু বাগদি পাড়ার লোকজন আসনে না বসে কিছুটা দূরে মাটিতে বসতেন অথবা দাঁড়িয়ে থাকতেন। সন্তোষ লিখছেন, ‘‘দোষ যারই হোক না কেন বা অপরাধ যতই লঘু হোক না কেন, বিচারপতিরা বাগদি পাড়ার লোকদেরই দোষী সাব্যস্ত করতেন।... শুধু বাগদিরা নয়, তেলি বা অন্য জাতির গরিবরাও এই অবিচারের শিকার ছিলেন।’’ এ ধরনের বর্ণনায় তিনি কিন্তু নিজের পরিবারের লোকজনকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।

গোপীবল্লভপুর থেকে বিজ্ঞানের ছাত্র সন্তোষের তৎকালীন প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি, পরে বি টেক, এম টেক, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে গবেষণা— সে-ও আর এক দীর্ঘ যাত্রার কাহিনি। নিঃশব্দ বিপ্লবের আর এক অধ্যায়। অনুপ্রেরণার অফুরন্ত জোগান!

দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক যাত্রায়, বিশেষ করে একেবারে ভিন্ন ধারার রাজনৈতিক পথে থাকলে স্বাভাবিক ভাবেই চিন্তন প্রক্রিয়ায় একটা আস্তরণ পড়ে। কেবল মনে হতে থাকে, আমি যে রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে এই পথ বেছে নিয়েছি, সেই বিশ্বাস থেকেই ভেবেছি, এখনও ভাবছি, সেটাই প্রকৃত উন্নয়নের পথ, মানুষের মুক্তির পথ। কিন্তু, সন্তোষ রাণা তা করেননি। অত্যন্ত ব্যতিক্রমী ভাবেই করেননি। বরং, বার বার গণতান্ত্রিক পরিসরের কথা বলেছেন, বাস্তবসম্মত অবস্থার কথা বলেছেন। প্রবীণ এই নকশালপন্থী নেতা লিখছেন, ‘‘আসলে, ভারতের বাস্তব অবস্থা বিচার না করে কেউ যদি যান্ত্রিকভাবে মার্কসবাদী তত্ত্বকে প্রয়োগ করতে চায়, তা হলে সে ভুল সিদ্ধান্তেই পৌঁছবে। ভারতীয় সমাজ এমন সমাজ নয় যা বুর্জোয়া ও প্রোলেতারিয়েত এই দুই বৃহৎ শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে গেছে। বরং এখানে রয়েছে সামাজিক অবস্থানের নানাবিধ ধাপ। সামাজিক উৎপাদনে কোন ব্যক্তি কী ভাবে অংশগ্রহণ করবে এবং ফলত সামাজিক উৎপন্নের কতখানি অংশ সে ভোগ করবে তা অনেকটা নির্ভর করে সে কোন ধাপে জন্মেছে তার উপর। ১৯৬৭ সালে এই সব প্রশ্নের উত্তর আমি খুঁজিনি, যদিও কাজ করতে গিয়ে অনেক বিষয়েই খটকা লেগেছিল।’’

এই গ্রন্থের ভূমিকায় যথার্থই লেখা হয়েছে, ‘‘আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলি এই লোকতন্ত্রকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। দিলে, দিতে পারলে হয়তো তাদের ইতিহাস অন্যরকম হত। সন্তোষ রাণার লেখা পড়তে পড়তে সে-কথাটা বিশেষ ভাবে মনে হয়।... তিনি আজও বামপন্থীদের সংগ্রামী ঐক্যের উপরে জোর দেন, যে ঐক্য কোনও শিলীভূত প্রজ্ঞার কেতাব থেকে পার্টি লাইন পেড়ে এনে সবাইকে সেই লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয় না, যা বহু মানুষের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার পারস্পরিক লেনদেনের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠে, গড়ে উঠতে থাকে। যথার্থ সাম্যবাদী চেতনার সঙ্গে এই বহুমাত্রিকতার কোনও বিরোধ তো নেইই, বরং তা সেই চেতনার এক আবশ্যিক শর্ত।’’

কিন্তু, সন্তোষ রাণা কী করেছেন? এই গ্রন্থের প্রণেতা একেবারেই নৈর্ব্যক্তিক ভঙ্গিমায়, এক জন যথার্থ ইতিহাসবেত্তার ঢঙে নিজের শৈশব থেকে জীবনের প্রান্তে পৌঁছনোর আখ্যান রচনা করেছেন। সেই আখ্যানে আত্মবিশ্লেষণ তো এসেছেই, তারই পাশাপাশি কাউকে এতটুকুও ছোট না করে, অন্যান্য রাজনৈতিক মতকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি করে দিয়েছেন তিনি। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ভাবে ব্যক্তিমানুষের নানা টানাপড়েন সেখানে এলেও তা যেন এসেছে বুড়িছোঁয়ার মতো। যেমন, স্ত্রী জয়শ্রীর সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ, কিংবা পুলিশি হেফাজতে তাঁর উপরে দৈহিক নির্যাতনের প্রসঙ্গ।

এই আত্মজীবনীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিয়েছে শিক্ষার প্রসঙ্গ। নাম ‘রাজনীতির এক জীবন’ হতে পারে বটে, কিন্তু এই গ্রন্থের এক-তৃতীয়াংশের বেশি জায়গা জুড়ে আছে শিক্ষার কথা। এবং সমাজবিপ্লবে শিক্ষার যে প্রচণ্ড গুরুত্ব আছে, তা বোঝাচ্ছেন যিনি, তাঁরই দলের নেতা চারু মজুমদার ছাত্র-যুবদের মিটিংয়ে এক বার বলেছিলেন, যে যত পড়ে, সে তত মূর্খ হয়! দীর্ঘ কাল শিক্ষকতা করেছেন সন্তোষ রাণা। ফলে আমাদের এই সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষার গুরুত্বের কথা তিনি সম্যক উপলব্ধি করেছেন।

এখানেই প্রথম নয়, এর আগে বামপন্থা ও গণতন্ত্র নামে তাঁর অন্য গ্রন্থে ‘শিক্ষার অধিকার আইন প্রসঙ্গে’ শীর্ষক একটি নিবন্ধে সন্তোষ রাণা শিক্ষার অধিকার, বিশেষত শ্রমজীবী মানুষের শিক্ষার অধিকার প্রসঙ্গে অসাধারণ বিশ্লেষণ করেছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘‘ভারতের শ্রমজীবীদের যেমন কাজের অধিকার, খাদ্যের অধিকার, পেনসানের অধিকার ও স্বাস্থ্যের অধিকার নিয়ে লড়াই করতে হবে, তেমনি ‘সাধারণ স্কুল ব্যবস্থা’ ও শিক্ষার অধিকার নিয়েও লড়াই করতে হবে।’’

আর একটি বিষয়ের কথা বলা প্রয়োজন। অতি বাম রাজনৈতিক সংগঠনগুলির নিরন্তর ভাঙনের প্রসঙ্গ এই গ্রন্থে এসেছে বটে, তবে সে প্রসঙ্গে আরও সবিস্তার আলোচনার প্রয়োজন আছে। পরবর্তী আন্দোলনের জন্য তা জরুরিও বটে। সন্তোষ রাণার মতো মুক্তমনা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বই এই ভাঙনের ইতিহাস ও তার কারণকে ভিন্ন ভাবে দেখবেন ও দেখাবেন, এই প্রত্যাশা রইল।

তবে, এই মানের এক গ্রন্থে এমন বানান বিভ্রাট কি আদৌ কাম্য ছিল? আগের পঙ্‌ক্তিতে ‘রোহিণী’, পরের পঙ্‌ক্তিতে ‘রোহিনী’র সঙ্গেই বহু জায়গায় ‘নির্বাচনি’ বিপর্যয় ঘটেছে। খোদ সন্তোষ রাণার গ্রন্থেই লেনিন হয়ে গিয়েছেন ‘লেলিন’!

নানা রাজনৈতিক গ্রন্থ আমরা অনেক সময়েই পড়ি। বহু গ্রন্থেই সংশ্লিষ্ট গ্রন্থকার তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস ও মতের কথা জোর গলায় বলেন। সেখানে অন্য মতের কথা বললেও সেই বিকল্প মত নিয়ে ভাবনাচিন্তা তৈরির পরিসর বড় একটা দেন না। কিন্তু সন্তোষ রাণার এ গ্রন্থের বিশেষত্ব হল, সিপিআই (এমএল) বা অন্য নকশালপন্থী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক লাইনের গণ্ডিতে আবদ্ধ না থেকে এটি প্রকৃত রাজনৈতিক ভাবনার ভিত্তি নির্মাণে সাহায্য করেছে। কূপমণ্ডূকতায় আবদ্ধ থাকেনি। এখানেই ‘দেশবাসী’-কে উৎসর্গ করা গ্রন্থ রাজনীতির এক জীবন-এর সার্থকতা।

আরও পড়ুন

Advertisement