নৈহাটির মাছ ব্যবসায়ী রাসমোহন ঘোষ ওরফে বাবুয়াকে খুনের অভিযোগে পরিবারের দুই আত্মীয়কে গ্রেফতার করল পুলিশ। ধৃত বাপ্পাদিত্য ঘোষ বাবুয়ার ভাইপো। তাঁর মা রত্নাকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। 

জমি বিক্রির টাকার বখরা নিয়ে গোলমালের জেরেই এই খুন বলে দাবি তদন্তকারীদের। প্রমাণ লোপাট এবং খুনের পরে ছেলেকে সাহায্য করার অভিযোগ আছে রত্নার বিরুদ্ধে। সোমবার দু’জনকে গ্রেফতারের পরে এ দিনই ব্যারাকপুর আদালতে তোলা হয়। রত্নাকে দু’দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছেন বিচারক। এজলাসের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাপ্পাদিত্য। তাঁকে ব্যারাকপুর বিএন বসু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ।

পরিবারের বাকি সদস্যেরা অবশ্য পুলিশের ভূমিকায় খুশি নন। তাঁদের বক্তব্য, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করতেই পরিবারের লোকেদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

২১ অগস্ট রাতে নিজের শোওয়ার ঘরে খুন হন বাবুয়া। এলাকায় জনপ্রিয় ছিলেন তৃণমূল কর্মী বাবুয়া। বেলা পর্যন্ত তাঁকে ঘুম থেকে উঠতে না দেখে ডাকাডাকি করেন বাড়ির লোকজন। দেখা যায়, বিছানায় উপুড় হয়ে পড়ে তিনি। মাথায় এবং বুকে ভারী কিছু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। বাড়িতে তাঁর তিনটি কুকুর ছিল। বেলা পর্যন্ত সেই কুকুরগুলিও অচেতন ছিল। 

পুলিশের দাবি, তদন্তে নেমে এটুক বোঝা যায়, বাইরে থেকে কেউ ওই ঘরে ঢোকেনি। পুলিশ কুকুর নিয়ে গিয়ে দেখা যায়, সে বাড়ির মধ্যেই ঘোরাঘুরি করেছে। বাড়ির সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। বাপ্পাদিত্য এবং রত্নার কথায় প্রচুর অসঙ্গতি মেলে বলে দাবি তদন্তকারীদের। দফায় দফায় জেরা করা হয় তাঁদের। 

পুলিশের দাবি, একটা সময়ে জেরায় ভেঙে পড়েন রত্না। রবিবার রাতে স্বীকার করে নেন, তাঁর ছেলে বাপ্পাদিত্যই বাবুয়াকে খুন করেছে। ঘটনাটিকে ডাকাতির চেহারা দিতে আলমারি থেকে ব্যাঙ্কের কাগজপত্রও সরিয়ে রাখেন মা-ছেলে। গা থেকে গয়নাও খুলে নেওয়া হয়।

কিন্তু কেন এই খুন?

পুলিশ এব‌ং বাবুয়ার পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, বাপ্পাদিত্যর বাবা নিখিল ঘোষ ২০০০ সালে রাঁচিতে গিয়ে উধাও হয়ে যান। এখনও পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি। তারপর থেকে বাপ্পাদিত্যদের পরিবারকে দেখতেন অকৃতদার বাবুয়া। তিনি রত্নাদের বাড়িতেই খাওয়া-দাওয়া করতেন। সম্প্রতি বাবুয়াদের একটি জমি বিক্রির জন্য এক জনের সঙ্গে চুক্তি হয়। সেই জমিতে ভাগ ছিল বাপ্পাদিত্যদেরও। 

সেই জমি বাবদ বাবুয়া ৪০ লক্ষ টাকা পেলেও মাত্র ৯ লক্ষ টাকা পান রত্নারা। ঘটনার রাতে বাবুয়ার সঙ্গে বসে মদ খাচ্ছিলেন বাপ্পা। জমির টাকার ভাগ নিয়ে বচসা হয়। পুলিশের দাবি, জেরায় বাপ্পা জানিয়েছেন, রাগের মাথায় দরজার খিল দিয়ে তিনি কাকাকে মারেন। বিছানায় উল্টে পড়লে ফের বুকে পরপর আঘাত করেন। তাতেই মৃত্যু হয় বাবুয়ার। 

রত্না শব্দ পেয়ে চলে আসেন। পুলিশ জানিয়েছে, ছেলে যাতে ফেঁসে না যান, সে জন্য মেঝের রক্ত পরিষ্কার করেন মা। বাবুয়ার গায়ের গয়না খুলে নেন। খুনে ব্যবহৃত দরজার খিলটি পুলিশ বাপ্পার খাটের তলা থেকে উদ্ধার করেছে। 

প্রশ্ন উঠছে, ক্লোরোফর্ম জাতীয় কিছু স্প্রে করে কুকুরগুলিকে কখন ঘুম পাড়ানো হল? কেনই বা তার প্রয়োজন প়ড়ল? তদন্তকারীদের একটি সূত্র জানাচ্ছে, প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, রাগের মাথায় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিলেন বাপ্পা। সে সময়ে কাকার পোষ্যেরা ঘরের বাইরে ছিল। তারা মালিকের দেহ দেখে খেপে উঠতে পারে, এই ভয়ে বাপ্পা ও তাঁর মা ক্লোরোফর্ম জাতীয় কিছু ছিটিয়ে কুকুরদের ঘুম পাড়িয়ে দেন। ওই ওষুধ কোথা থেকে জোগাড় হল, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। পরিবারের কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, ঘরের মধ্যে খিলের ঘা মেরে মালিককে খুন করা হল, তা টের পেল না পোষ্যেরা, এটা মেনে নেওয়া মুশকিল। কুকুরগুলি বাবুয়ার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল। তাঁর গায়ে সামান্য ধাক্কাটুকু দিলে তেড়ে আসত পোষ্যেরা। আততায়ীরা কুকুরকে ঘুম পাড়িয়ে তবেই বাবুয়ার উপরে আক্রমণ করেছে বলে পরিবারের সদস্যদের অনেকের দাবি। সে ক্ষেত্রে বাপ্পা হঠাৎ মাথা গরম করে খুন করে ফেলেছেন কাকাকে, পুলিশের এই যুক্তি মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।