তিন ভাইয়ের সংসার। বাবা ব্লক অফিসে সামান্য চাকরি করতেন। টানাটানির সংসার না হলেও খুব একটা স্বচ্ছলও ছিল না। ছোট থেকেই অর্থ উপার্জনের বিষয়টি মাথায় ছিল। সঙ্গে ছিল নানা পরিকল্পনা এবং পরিশ্রম করার মানসিকতা। এই সব গুণই পথ দেখিয়েছিল সাধারণ এক বেকার যুবককে।

সফল হওয়ার স্বপ্নকে সম্বল করে ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ান তিনি। নানা ভাবনা-চিন্তার পরে এক দিন নিজেই খুলে ফেললেন একটি পেরেক তৈরির কারখানা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পেরেক তৈরি করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতেও আজ তিনি সফল। বর্ধমান শহরের অদূরে বড়শুল শিল্পতালুকে বসে সেই কাহিনিই শোনাচ্ছিলেন সুমন্ত ঘোষ।

তখন সবে মাধ্যমিক পাশ করেছেন সুমন্তবাবু। সংসারে স্বচ্ছলতা বাড়াতে অর্থ উপার্জনের পথ খুঁজছেন। এক বার পোলট্রি ফার্ম খোলার চেষ্টা করলেও বিশেষ সফলতা মেলেনি। তার পরে এটা সেটা করে জীবিকানির্বাহের চেষ্টা করছিলেন। তার পরে হঠাৎই একটা সুযোগ মেলে। একটি বন্ধ হয়ে যাওয়া পেরেক কারখানা লিজ নেন তিনি। সময়টা ২০০৫। এর পরে চার বছরের মধ্যে তিনি নিজেই খুলে ফেলেন একটি পেরেক তৈরির কারখানা।

সুমন্ত ঘোষ, পেরেক উৎপাদক

 কী ভাবে হল এই অসাধ্য সাধন?

মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের  আমলে বর্ধমানের বড়শুলে তৈরি হয় শিল্পতালুক। এখনও সেখানে বেশ কিছু মাঝারি শিল্প কারখানা রয়েছে। এই শিল্পতালুকের পাশেই থাকতেন সুমন্তবাবুরা। তাঁর বাবা সুনীলকুমার ঘোষ বড়শুলে ব্লক অফিসের এক জন সাধারণ কর্মী ছিলেন। বাড়িতে তাঁরা তিন ভাই। সুমন্তবাবু মেজ। ব্যবসা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা ভাবছিলেন সুমন্তবাবু। তখনই সুমন্তবাবুর পরিচয় হয় শিল্পতালুকের একটি কারখানার ম্যানেজারের সঙ্গে। কথায় কথায় তাঁর কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন ওই শিল্পতালুকে একটি পেরেক তৈরির কারখানা সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কারখানার যন্ত্রপাতি সব আছে। এ কথা শুনেই মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল সুমন্তবাবুর। বাড়ি ফিরেই শুরু হল তোড়জোড়।

আরও পড়ুন: একশো দিনের কাজে শীর্ষে জেলা

সব ঠিকঠাক করে খুব অল্প টাকায় এক বছরের জন্য কারখানাটি লিজ নিলেন সুমন্তবাবু। এক বছর ওই কারখানায় পেরেক উৎপাদন করলেন। বিশাল লাভ যে হল তা নয়, তবে এর মধ্যেই ব্যবসার আঁটঘাট জেনে ফেললেন তিনি। লিজ শেষ হওয়ার পরে আর লিজ নবীকরণ না করে একটু বড় করে ভাবনা শুরু করলেন তিনি। তাঁর মাথায় তখন ঘুরছে নিজের একটি পেরেক কারখানা খোলার চিন্তা। কিন্তু সেই পথে প্রধান বাধা ছিল অর্থ। কারণ, বড় জায়গা লিজ নিতে হলে অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন। প্রয়োজন নতুন যন্ত্রেরও।

নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে ঋণ সংগ্রহের চেষ্টা করতে লাগলেন সুমন্তবাবু। শেষে ২০০৯ সালে সুযোগ মিলল। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘প্রধানমন্ত্রী এমপ্লয়মেন্ট জেনারেশন স্কিম’ (পিএমইজিপি) প্রকল্পে ঋণ পাওয়ার জন্য মনোনীত হন সুমন্তবাবু। এই প্রকল্প থেকে আট লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে নতুন ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েন সুমন্তবাবু। ওই শিল্পতালুকেরই বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি কারখানার বড় জায়গা ভাড়া নেন তিনি। একই সঙ্গে পঞ্জাব থেকে নিয়ে আসেন দু’টি ওয়্যার নেল মেকিং মেশিন। সেই যন্ত্রেই শুরু হয় উৎপাদন। শেষ পর্যন্ত নিজের পেরেক কারখানা তৈরির স্বপ্ন বাস্তব রূপ পায়।

এর পরে টানা উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছিলেন সুমন্তবাবু। তাঁর দুই ভাইও পরোক্ষ ভাবে ব্যবসার কাজে সাহায্য করছিলেন। ব্যবসায় লাভও বাড়ছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী পেরেকের জোগান দিতে পারছিলেন না। উৎপাদন আরও বাড়ানোর দরকার ছিল। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ছিল অর্থের। অর্থ জোগাতে সুমন্তবাবু কিছু পরিবারিক জমি বিক্রি করে দেন। সেই টাকায় আরও ছ’টি পেরেক তৈরির যন্ত্র কেনেন। কারখানায় যন্ত্রের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় আটে। শুরু হয় পুরোদমে উৎপাদন। এর পরে আর সে ভাবে ফিরে দেখতে হয়নি।

কী ভাবে তৈরি হয় এই পেরেক? সুমন্তবাবু জানান, লিলুয়া ও ডানকুনি থেকে তাঁরা লোহার তার কিনে আনেন। এই তার ওয়্যার নেল মেকিং মেশিনে গলিয়ে তৈরি হয় পেরেক। এই যন্ত্রে প্রতি ঘণ্টায় ১৫ কিলোগ্রাম পেরেক তৈরি হয়। দিনে আট ঘণ্টা কাজ হয় কারখানায়। অর্থাৎ দিনে দু’টি যন্ত্র থেকে ২৪০ কিলোগ্রাম করে পেরেক তৈরি হয় তাঁদের এই কারখানায়। সুমন্তবাবু জানান, তাঁর কারখানায় ২.৫-৩ ইঞ্চি, ১-১.৫ ইঞ্চি এবং দুই ইঞ্চি— এই তিনটি মাপের পেরেক তৈরি হয়। এই মুহূর্তে সুমন্তবাবুর এই কারখানায় পাঁচ জন শ্রমিক কাজ করেন। সুমন্তবাবু জানান, এর সঙ্গে কাঁচামাল নিয়ে আসা বা পেরেক তৈরি হওয়ার পরে তা বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য ভ্যানচালক, জেনারেটর মেকানিক-সহ পরোক্ষ ভাবে বেশ কয়েক জন তাঁর এই উদ্যোগের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তাঁদের সকলের ঘরেই অন্নের জোগান দিচ্ছে এই পেরেক তৈরির কারখানাই।

সুমন্তবাবু জানান, প্রথমে তার গলিয়ে কেটে যন্ত্রের মাধ্যমে ‘হেড’ তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে পেরেকের তলার দিকে ছুঁচলো অংশও তৈরি করা হয়। এর পরে যন্ত্রের মাধ্যমে পুরো পেরেক তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসে। যন্ত্র থেকে যে পেরেক পাওয়া যায়, তা কিছুটা কালচে রঙের হয়। এই পেরেক পালিশ ড্রামে ফেলে দেওয়া হয়। সেখানে নানা রাসায়নিক ও কাঠের গুঁড়ো থাকে। পালিশের ড্রাম থেকে পেরেকগুলি যখন তোলা হয়, তখন সেগুলি রুপোর মতো চকচকে হয়ে যায়। তার পরে সেই  পেরেক বিভিন্ন বাজারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ইতিহাসের পাতায় আজকের তারিখ, দেখতে ক্লিক করুন — ফিরে দেখা এই দিন

বর্ধমান, শক্তিগড়, বড়শুল-সহ জেলার বিভিন্ন জায়গায় তাঁর কারখানায় উৎপাদিত পেরেক পাঠানো হয় বলে জানান সুমন্তবাবু। এ ছাড়া কলকাতার বড়বাজারেও সুমন্তবাবুর বড়শুলের কারখানায় তৈরি পেরেক আসে। সাধারণত, ৫০ কিলোগ্রামের বস্তায় পেরেক বিক্রি হয়। এক বস্তার দাম পড়ে একুশ থেকে বাইশ হাজার টাকা। সুমন্তবাবু জানিয়েছেন, ২৫ কিলোগ্রামের ছোট বস্তাও হয়। এগারো থেকে বারোশো টাকায় এই বস্তা বিক্রি হয়। কলকাতায় পেরেকের বাজারদরের উপরে রাজ্যে পেরেকের বাজারদর নির্ভর করে বলে সুমন্তবাবু জানান। এই পেরেকের ব্যবসা করেই সুমন্তবাবু একটি গাড়িও কিনেছেন। যে গাড়ি নিয়ে তিনি নানা জায়গায় উৎপাদিত দ্রব্য পৌঁছে দিয়ে আসেন। তাঁর দাবি, জায়গা ভাড়া নিয়ে তিনি উৎপাদন চালাচ্ছেন। খুব বেশি অর্থ তাঁকে এখানে লগ্নি করতে হয়নি।

সুমন্তবাবুর মতে, প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে তাঁকে লক্ষ্মীর মুখ দেখিয়েছে পেরেক। বিদ্যুতের খরচ, পরিবহণ খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং কারখানা ভাড়া ছাড়া তাঁর আর কোনও খরচ নেই। উল্টো দিকে, পেরেকের চাহিদাও ব্যাপক। বাড়ি তৈরি থেকে শুরু করে আসবাব তৈরি বা নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা কাজে পেরেক কাজে লাগে। সারা বছর এই পেরেকের চাহিদাও থাকে। উৎপাদন প্রায় পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভর বলে খুব কম শ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। ফলে এই ব্যবসায় শ্রমিক সমস্যাও বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে না।

আরও পড়ুন: অস্ত্রোপচারে গলা থেকে বেরোল লোহার কোঁচ

আগামী দিনে কী লক্ষ্য রয়েছে? সুমন্তবাবু বলেন, ‘‘সরকার ছোট শিল্প নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা করলেও এই উদ্যোগের দিকে সে ভাবে নজর দেয়নি। সরকার অন্য নানা শিল্পে বিভিন্ন ধরনের ভর্তুকি দেয়। কিন্তু পেরেক শিল্পের ক্ষেত্রে সরকারি ভাবে বিশেষ সাহায্যের ব্যবস্থা নেই। সরকারি সাহায্য পেলে এই ব্যবসাকে ঢেলে সাজতে পারতাম।’’ 

সুমন্তবাবু আরও জানান, সরকার যদি এই বিষয়ে একটু নজর দেন, তা হলে তিনি আরও বড় জায়গা নিয়ে কারখানা খুলতে চান। যে কারখানায় তিনি পেরেক তৈরির পাশাপাশি পেরেক তৈরির কাঁচামাল লোহার তারও তৈরি করতে পারবেন। একই সঙ্গে ছোট নাটবল্টু তৈরি করাও তাঁর লক্ষ্য। সে ক্ষেত্রে এই শিল্পতালুকে আরও কিছু লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

তা এই উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য কত খরচ হতে পারে? গোটা পরিকল্পনাটি রূপায়ণ করতে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা প্রয়োজন বলে দাবি সুমন্তবাবুর। এ প্রসঙ্গে এলাকার বিধায়ক নিশীথ মালিক বলেন, ‘‘বিষয়টি জানলাম। ওঁর তরফ থেকে যদি কোনও প্রস্তাব আসে, তা হলে আমরা বিষয়টি রাজ্য সরকারের কাছে তুলে ধরব। এ ছাড়াও ব্যক্তিগত ভাবে এই বিষয়ে কী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করব। সরকার এই ধরনের উদ্যোগপতিদের সঙ্গে রয়েছে।’’

শিল্প থাকলে দূষণের আশঙ্কাও থাকে। তবে সুমন্তবাবুর কারখানার বিরুদ্ধে তেমন কোনও অভিযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বড়শুল পঞ্চায়েতের উপপ্রধান রমেশচন্দ্র সরকার। তিনি বলেন, ‘‘এই কারখানা দীর্ঘদিন এলাকায় রয়েছে। আমরা এলাকাবাসীদের তরফে দূষণ নিয়ে কখনও কোনও অভিযোগ পাইনি। আমরা নিজেরাও তেমন কিছু লক্ষ করিনি। যন্ত্র চলার সময়ে একটু শব্দ হয়, তবে সেটা নির্দিষ্ট মাত্রার মধ্যেই থাকে। আমরা এই শিল্পের সঙ্গে রয়েছি।’’

পেরেক তৈরির খুঁটিনাটি

১.  লিলুয়া ও ডানকুনি থেকে প্রথমে লোহার তার কিনে আনা হয়।

২. এই তার ওয়্যার নেল মেকিং মেশিনের মাধ্যমে গলিয়ে তৈরি হয় পেরেক।

৩. প্রথমে তার গলিয়ে, কেটে যন্ত্রের মাধ্যমে ‘হেড’ তৈরি হয়। একই সঙ্গে পেরেকের তলার দিকে ছুঁচলো অংশও তৈরি করা হয়। এর পরে যন্ত্রের মাধ্যমে পুরো পেরেক তৈরি হয়ে বেরিয়ে আসে।

৪. যন্ত্র থেকে পাওয়া পেরেকগুলি কালচে রঙের হয়। সেগুলি পালিশ ড্রামে ফেলে রাসায়নিক ও কাঠের গুঁড়ো দিয়ে পালিশ করা হয়। পালিশের পরে পেরেকগুলি রুপোর মতো চকচকে হয়ে যায়।

 

দুই বর্ধমান, দুর্গাপুর, আসানসোল, পুরুলিয়া, দুই মেদিনীপুর, বাঁকুড়া সহ দক্ষিণবঙ্গের খবর, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা খবর, 'বাংলার' খবর পড়ুন আমাদের রাজ্য বিভাগে।