দিঘা-সহ পূর্ব মেদিনীপুরের উপকূল এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নেরল কথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বার বার বলেছেন। ২০১২ সালে প্রথম তাজপুরে এসে এখানকার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হন মুখ্যমন্ত্রী। সেদিন তাজপুরের সৈকতে দাঁড়িয়ে জেলা প্রশাসনের কর্তাদের ডেকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, তাজপুরকে তিনি আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চান। শুধু তাই নয়, তাজপুর সৈকতে বৈআইনি নির্মাণ নিয়েও স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন।

কিন্তু তথ্য বলছে, মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশ সত্ত্বেও তাজপুরে বেআইনি নির্মাণ চলছেই। তাজপুর হোটেলিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যই বলছে, ২০১২ সালে তাজপুরে হোটেল ছিল ১৯টি। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৪টি বেআইনি হোটেল ভেঙে দেয় প্রশাসন। অতঃপর হোটেলের সংখ্যা হওয়ার কথা ছিল ১৫টি। অথচ ২০১৭ সালেই তাজপুরের হোটেলের সংখ্যা ৩১টি। অর্থাৎ মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পরেও এখন পর্যন্ত ১৬টি হোটেল তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরেও কী ভাবে ওই হোটেলগুলি তৈরি হল। তার উপর সেগুলি বৈধ না অবৈধ সেই প্রশ্নও উঠেছে। প্রশ্নের মুখে স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকাও।

রামনগর-১ এর বিডিও অনুপম বাগ বলেন, “আমরা যতটা পারছি পদক্ষেপ করছি। পুলিশকেও বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে ১৬৫টি হোটেল তৈরির জন্য আবেদন জমা পড়েছে। কিন্তু কেন্দ্রের কোস্টাল রেগুলেটিং জোন আইনে তা আটকে আছে।’’ তিনি জানান, এই আইন অনুযায়ী সমুদ্রের জোয়ারের জাল যতটা আসে, সেখান থেকে ২০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় কোনও নির্মাণ করা যাবে না। কিন্তু কেন্দ্র পুরো তাজপুর মৌজাকেই এই আইনের আওতায় এনেছে। য়ার মধ্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও রয়েছে। অথচ সেখানে নির্মাণ করা যাচ্ছে না। এতে ক্ষোভ বাড়ছে এলাকায়।

বিডিও জানান, সম্ভবত আকাশ পথে ছবি তোলা হয়েছে। এই এলাকায় প্রচুর ভেড়ি আছে। তাই জল দেখে মনে হয়েছে তাজপুর মৌজাটাই সিআরজেড-এর মধ্যে পড়ছে। তাই এমন আইন জারি হয়েছে। এ নিয়ে কেন্দ্রের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। তিনি বলেন, ‘‘বেআইনি নির্মাণ বন্ধে পুলিশকে বলা হয়েছে নজরদারির জন্য।’’

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইন্দ্রজিৎ বসু বলেন, ‘‘পুলিশ নজরদারি রয়েছে। অভিযানও হয়। নির্দিষ্ট অভিযোগ এলে আমরা ব্যবস্থা নিই। ইতিমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে বেআইনি নির্মাণের জন্য পুলিশ গ্রেফতারও করেছে।’’

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, বহিরাগত কিছু ধনী ব্যক্তি এখানে স্থানীয় ঠিকাদারকে ধরে বেআইনি নির্মাণ চালিয়ে যাচ্ছে। পঞ্চায়েত থেকে ব্লক প্রশাসনের নাকের ডগাতেই তা চললেও কোনও নজরদারি নেই।

তাজপুরে যে হোটেল বাড়ছে সে কথা মেনে নিয়েছেন তাজপুর হোটেলিয়ার্স এসোসিয়েশনের দুই কর্তা শ্যামল দাস ও  শান্তনু সাহা। তাঁদের বক্তব্য, ‘‘এখানে হোটেল হলে পর্যটকও বাড়বে। সেটা পর্যটন শিল্পের পক্ষেও মঙ্গল। কিন্তু বেআইনি ভাবে হোটেল তৈরি হলে তা দেখার দায়িত্ব প্রশাসনের।’’

২০১১ সাল থেকে দিঘা শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদ (ডিএসডিএ)-এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাজপুর। যেখানে হোটেল মালিকদের সংগঠনই স্বীকার করছেন যে তাজপুরে নির্মাণ হয়ে চলেছে, সেখানে কী বলছে ডিএসডিএ?

ডিএসডিএ-র প্রশাসক সুজন দত্তর দাবি, “তাজপুরে বেআইনি নির্মাণ হচ্ছে এমন খবর পাইনি। তবে মাস দেড়েক পর থেকে তাজপুরে কোনও নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের অনুমোদন লাগবে।’’ তাঁর আশা সে ক্ষেত্রে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে অভিযোগও কমবে।

তাজপুরে বেড়াতে আসা দুর্গাপুরের মনোরমা কুইতি, কলকাতার বাগুইহাটির শেখ গুলশনের মতো পর্যটকদের দাবি, ‘‘দিঘার মতো তাজপুর ঘিঞ্জি নয়। এখানে ঝাউ গাছের শোভা ও নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করেন পর্যটকেরা। কিন্তু যে ভাবে ঝাউবন কেটে একের পর এক হোটেল তৈরি হচ্ছে তাতে তাজপুরও একদিন ঘিঞ্জি হয়ে যাবে। হারাবে তার সৌন্দর্য।’’