মনীষীর মূর্তি ভেঙে ফেলা যায়। কিন্তু তাঁর আদর্শ, সমাজে তাঁর অবদান কি কখনও অস্বীকার করা যায়! যাঁর নামেই সাগর তাঁকে ছোঁবে এমন সাধ্য কার!

কলকাতায় মঙ্গলবার বিদ্যাসাগর কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে বুধবার জেলাজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে ক্ষোভের সঙ্গে মিশেছিল এই সুর। 

তমলুক শহরের হাসপাতালমোড় থেকে শহরের জেলা আদালত চত্বরে বিদ্যাসাগর মূর্তির পাদদেশ পর্যন্ত এ দিন মিছিল করেন এসইউসিআই দলের নেতা ও কর্মী-সমর্থকরা। মিছিলের নেতৃত্ব দেন দলের জেলা কমিটির সদস্য লেখা রায় ও প্রণব মাইতি। ঘটনার প্রতিবাদে এদিন সকালে তমলুক শহরের হাসপাতাল মোড়ে বিক্ষোভ দেখায় বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি। সমিতির সদস্য-সমর্থক শিক্ষক-শিক্ষিকারা হাসপাতাল মোড়ে বিদ্যাসাগরের মূর্তির প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানান। পরে বিক্ষোভ সভার আয়োজন করা হয়। মেচেদায় পাঁচমাথা মোড়ে বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানান ও বিক্ষোভ দেখান এসইউসি কর্মী-সমর্থকরা। দলের জেলা সম্পাদিকা অনুরূপা দাস বলেন, ‘‘ত্রিপুরায় লেনিন, অসমে রবীন্দ্রনাথের মূর্তির পর এ রাজ্যে বিদ্যাসাগরের  মূর্তি ভাঙা হল। এই বর্বরোচিত ঘটনার তীব্র নিন্দা ও ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করছি।’’ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনার প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির জেলা কমিটির তরফে জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। সংগঠনের তরফে অরূপকুমার ভৌমিকের অভিযোগ, ‘‘যে ভাবে একটি রাজনৈতিক দলের মিছিলকে কেন্দ্র করে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে তা লজ্জাজনক। আমরা এর নিন্দা করছি।’’ এদিন বিকেলে তমলুক শহরে জেলা গ্রন্থাগারের কাছে বিদ্যাসাগরের মূর্তির পাদদেশে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ সভা করে ঘটনার প্রতিবাদ জানান এলাকার -মানুষ।        

কাঁথিতে বুধবার ধিক্কার দিবস পালন করে এসইউসিআই। এদিন সকালে ক্যানাল পাড়ে দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমলের মূর্তির পাদদেশ থেকে বিদ্যাসাগরের ছবি নিয়ে একটি মিছিল শহর পরিক্রমা  করে কাঁথি মহকুমাশাসকের অফিস চত্বরে পৌঁছয়। সেখানে বিদ্যাসাগরের মূর্তিতে  মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানানো হয়। দলের জেলা কমিটির সদস্য মানস প্রধান বলেন, ‘‘ত্রিপুরায় লেনিন, রবীন্দ্রনাথ, সুকান্তের মূর্তি ভাঙার পর বিজেপি বাংলাতেও বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে আজ সারা বাংলা প্রতিবাদ দিবসের ডাক দেওয়া হয়েছে। আসলে বিদ্যাসাগরের চিন্তা ও আদর্শ বিজেপি, আরএসএসের চিন্তার বিরোধী। তাই বিদ্যাসাগরের মতো মহামানবের মূর্তি ধ্বংস করার মধ্যদিয়ে বিদ্যাসাগরের চিন্তাকেই মুছে ফেলতে চায়। বিদ্যাসাগরের দ্বিশত জন্মবর্ষের প্রাক্কালে তাঁর মূর্তি ভাঙার মতো বর্বরোচিত ঘটনার আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’’

পাঁশকুড়া, কোলাঘাট, ভোগপুর, মেছেদা, তমলুক, নোনাকুড়ি সহ বিভিন্ন স্থানে বিদ্যাসাগরের প্রতিকৃতি সহ ধিক্কার মিছিল ও পথসভা অনুষ্ঠিত হয় এসইউসির পক্ষ থেকে। ধিক্কার মিছিলের আয়োজন করা হয় শাসক তৃণমূলের তরফেও। এদিন মাইশোরা অঞ্চল তৃণমূল কংগ্রেসের উদ্যোগে পাঁশকুড়ার মাইশোরা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার সিমলা হাট থেকে মাইশোরা বাজার পর্যন্ত ধিক্কার মিছিল করে তৃণমূল। এগরা মহকুমাতেও বামেদের পক্ষ থেকে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার প্রতিবাদে বিক্ষোভ-মিছিল হয়। 

বিদ্যাসাগরের জন্মের দ্বিশতবর্ষ উদযাপন চলছে। রাজ্য সরকার কমিটি গড়েছে। রাজ্য জুড়ে উদযাপনের প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। এমন সময় মূর্তি ভাঙার ঘটনায় কার্যত বাকরূদ্ধ বিদ্বদজনেরা। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচায রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘এটা বাঙালির লজ্জা। নিন্দার কোনও ভাষা নেই। এটা এক রকমের সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ও।”