কয়েক দিন ধরেই জলটা কালো হয়ে আসছিল। কিন্তু সকলের টনক নড়ল যখন সেই কালো জলে ভেসে উঠতে থাকল ছোট-বড় নানা ধরনের মাছ। অনেকেই বলছেন, বেশ কয়েক বছর আগে এমন ভাবেই জল কালো হয়ে মাছ ভেসে উঠেছিল। 

মৎস্য দফতরের কর্তারা বলছেন, নদীর কালো জল বিষাক্ত। সেই কারণে মাছ মরতে শুরু করেছে। কিন্তু জলঙ্গি নদীতে কোথা থেকে আসছে বিষাক্ত কালো জল? সেচ দফতর থেকে শুরু করে মৎস্য দফতরের কর্তারা সন্ধান করছেন সেই উৎসের। তাঁদের কারও-কারও দাবি, পাট পচানোর কারণেই জলঙ্গির জল বিষিয়ে উঠেছে। 

নদিয়া জেলার মৎস্য আধিকারিক রামকৃষ্ণ সর্দার বলছেন, “বিষয়টা ভাল করে খোঁজ নিতে আমরা মঙ্গলবার জলঙ্গির জল দেখতে যাব। প্রাথমিক ভাবে যা খবর পাচ্ছি, তাতে পাট পচা জল থেকেই এমনটা হয়েছে।” তাঁর মতে, “তুলনামূলক ভাবে বৃষ্টি কম হওয়ার কারণে এমটা হচ্ছে।” কর্তাদের কথায়, বৃষ্টি কম হওয়ায় খালে বিলে পুকুরে জল না থাকায় চাষিরা জলঙ্গির জলে পাট পচাচ্ছেন। সেটার পরিমান অন্যবারের তুলনায় অনেক বেশি। তার উপরে বর্ষার অভাবে জলঙ্গিতেও জল অনেক কম। সব মিলিয়ে তাই সহজে জলঙ্গির জল দূষিত হয়ে যাচ্ছে।

এমনিতেই সারা বছর জলঙ্গিতে জল তেমন থাকে না। কবেই শুকিয়ে গিয়েছে উৎসমুখ। মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি এলাকায় এই নদী পদ্মা থেকে সৃষ্টি হয়ে মায়াপুরের কাছে ভাগীরথী নদীতে এসে মিশেছে। নদীর মোট গতিপথ প্রায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। কিন্তু জলঙ্গি থেকে মোক্তারপুর পর্যন্ত প্রায় ৪৮ কিলোমিটার নদী শুকিয়ে গিয়েছে। একে একে তার পাগলাচণ্ডী, কলমা, ভৈরবনালার মতো উপনদীও হারিয়ে গিয়েছে, যারা ভাগীরথী থেকে সারা বছরই জল এনে দিত জলঙ্গিতে। 

নদী বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, এখন কেবল মাত্র ভৈরব নদ পদ্মা থেকে জল এনে সারা বছর জলঙ্গিতে ঢালে। ওই পর্যন্তই। ফলে জলঙ্গি আসলে পরিণত হয়েছে কার্যত বর্ষার জলে পুষ্ট নদীতে। এক দিকে উৎসমুখ শুকিয়ে যাওয়া, তার উপরে বর্ষার জল না পাওয়ায় জলঙ্গির বুকে জলের কোনও স্রোত নেই। ভাগীরথীর থেকে জলঙ্গি নদীর জলস্তরও নিচু। ফলে জল পিছন দিকে ফিরে আসে বলেও দাবি নদী বিশেষজ্ঞদের। 

দীর্ঘ দিন ধরে জলঙ্গি নিয়ে কাজ করছেন নদী বিশেষজ্ঞ সুপ্রতিম কর্মকার। তিনি বলছেন, “জল বদ্ধ হয়ে যাওয়ায় পাট পচানো বিষাক্ত জল বেরিয়ে যেতে পারছে না। বরং সেই জল ভাগীরথীর কাছে গিয়ে আটকে যাচ্ছে। সেই কারণেই এ বার পাট পচানো জলে মাছ মারা যাচ্ছে। জলঙ্গির স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে না পারলে এমনটাই ঘটতে থাকবে।” 

গোটা বিষয়টিতে উদ্বিগ্ন জলঙ্গি নদীতীরের মৎস্যজীবীরা। এমনিই এই নদীতে মাছ কমছে। এখন সারা দিন জাল ফেলে যা মাছ পাওয়া যায়, কয়েক বছর আগে তার চেয়ে অনেক বেশি মাছ পাওয়া যেত বলে মৎস্যজীবীদের দাবি। দৈয়েরবাজারের এক মৎস্যজীবীর কথায়, “এমনিতেই জলে মাছ নেই। তার উপরে এই কালো জলে বড় মাছের পাশাপাশি চারা মাছও মারা যাচ্ছে। এমনটা চলতে থাকলে আমরা জীবিকাহীন হয়ে পড়ব।” জেলার সেচ দফতরের এগজ়িকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার সুরজিৎ ধর অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছেন, “আমরা বিষয়টি ভাল করে বোঝার চেষ্টা করছি।”

কর্তারা বুঝে উঠতে-উঠতে আবার বড্ড বেশি দেরি না হয়ে যায়!