‘ব্রিটিশ’ আমলে তৈরি সেবকের করোনেশন সেতুতে ১০ টনের বেশি ওজনের ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ফলে, রাজ্যের তো বটেই, দেশের বাকি অঞ্চলের সঙ্গে সড়ক পরিবহণের অন্যতম ভরসা হল জলপাইগুড়ি শহরের উপকণ্ঠে তিস্তার ১ কিলোমিটার লম্বা সেতু। যার বয়সও ৫৭ পেরিয়েছে। সেই সেতুর নানা সন্ধিস্থলও জীর্ণ। বেশি ভারী গাড়ি একযোগে উঠলেই সেতু ভীষণ ভাবে দুলতে থাকে। সেতুর খানাখন্দে পড়ে ট্রাক, ট্যাঙ্কার বিকল হয়ে যানজট তো প্রায় নিত্যকার ঘটনা। শনিবার রাত থেকে রবিবার দিনভর দফায় দফায় এমন যানজটে জেরবার ছিল সেতু ও জাতীয় সড়ক। সেই সময়ে অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, ট্রাক, বাসের মতো ভারী গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে কাঁপছিল তিস্তা সেতু।

এমনই বিপদ মাথায় নিয়ে যান চলাচল চলেছে এই রাস্তায়। তবু তৃতীয় ‘লাইফলাইন’ তৈরিতে কেন গড়িমসি, তা নিয়েই গোটা উত্তরবঙ্গে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।

ক্ষোভের কারণ বুঝতে পারছেন রাজ্যের নেতা-কর্তা-আমলাদের অনেকে। খোদ উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ কোচবিহার থেকে শিলিগুড়ির উত্তরকন্যায় তাঁর দফতরে নিয়মিত যাতায়াত করতে গিয়ে কতবার যে এই তিস্তা সেতুতে আটকে পড়েছেন, তার হিসেব নেই। মন্ত্রী বলেন, ‘‘যানজট হলে অনেক মালপত্র বোঝাই ট্রাক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে সেতু পেরোতে ভয় লাগে। তখন সেতু ভীষণ কাঁপতে থাকে। মনে হয় ভেঙে পড়বে নাকি!’’ তিনি নিজেই স্বীকার করেন, ‘‘পাশের সেতুর কাজ অস্বাভাবিক ঢিমেতালে হচ্ছে বলেই জনতার ক্ষোভ-উদ্বেগ বাড়ছে।’’

জলপাইগুড়ির তিস্তা সেতুর গা ঘেঁষেই চলছে অন্য সেতুটির নির্মাণ কাজ। বিকল্প সেতুটি করছে কেন্দ্রের আওতায় থাকা জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ। তা প্রায় দেড় বছর আগে কাজ শুরু হয়েছে। ৩ বছরে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু, এখনও যা কাজ হয়েছে তাতে নির্ধারিত সময়ে সেতু তৈরি করা মুশকিল বলে পূর্ত দফতরের ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশের মত। যদিও জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের বরাতপ্রাপ্ত সংস্থার এক প্রতিনিধির দাবি, ২০২০ সালের মধ্যেই তৃতীয় ‘লাইফলাইন’ তৈরি সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।

সাধারণ মানুষ অবশ্য অন্য কথা বলছেন। তাঁরা তুলে ধরছেন মাঝেরহাট সেতুর কথাও। জলপাইগুড়ি-মালবাজার রুটের নিত্যযাত্রী এক ব্যাঙ্ককর্মী বলেন, ‘‘গজলডোবায় তিস্তার উপরে রাজ্য আর একটা সেতু তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে। সেটা তাড়াতাড়ি শুরু হোক। শুধু কেন্দ্রের ভরসায় থাকলে আমাদের ভোগান্তি কমবে না।’’ তাঁর কথায়, না হলে তিস্তা সেতু মাঝেরহাট সেতুর মতো ভেঙে পড়তে পারে। 

রাজ্যের বাকি অংশের সঙ্গে ডুয়ার্স হয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতে পণ্য ও যাত্রী পরিবহণের অন্যতম ‘লাইফলাইন’ হল জলপাইগুড়ির তিস্তা সেতু। এর ভার কমাতে রাজ্য সেবক বাজারের কাছে আর একটি সেতু তৈরির পরিকল্পনা জমা দিয়েছে। কেন্দ্রের সম্মতি মিললেও অর্থ বরাদ্দ হয়নি। গজলডোবায় ব্যারাজের উপর দিয়ে ভারী গাড়ি চলাচল করে না। সেখানে একটি সেতু তৈরির জন্য খসড়া করেছে রাজ্য। সেই কাজও কবে শুরু হবে তা পূর্ত বা সেচ দফতরের কাছে স্পষ্ট নয়।

উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের প্রধান সচিব বরুণ রায়ের কথায়, রাজ্যও বিকল্প লাইফলাইন তৈরিতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘সেবকের দ্বিতীয় সেতুর জন্য কেন্দ্রের কাছে লাগাতার তদ্বির চলছে। গজলডোবায় সেতুর সমীক্ষা হয়ে গিয়েছে। হলদিবাড়ি-মেখলিগঞ্জ রুটে জয়ী সেতুর কাজও চলছে।’’ 

তিনি জানান, জলপাইগুড়ির কাছে চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণ সংস্থার আওতায় যে সেতু তৈরি হচ্ছে, সে জন্য প্রয়োজনী জমি অধিগ্রহণের কাজ দ্রুত সম্পূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘তবুও কাজ ঢিমেতালে চলার অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। সেটাও নির্মাতা সংস্থাকে জানানো হবে।’’