হুসেইন মহম্মদ এরশাদের আশ্বাসে আবার ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশের মেয়ে রূপা।

দেড় বছর আগে এক দালাল-চক্রের ফাঁদে পড়ে পাচার হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের এই কিশোরী। চ্যাংড়াবান্ধায় বিএসএফ তাঁকে উদ্ধার করে। তারপর থেকেই তাঁর দিন কাটছে কোচবিহারের ‘শহিদবন্দনা’ সরকারি হোমে। তাঁকে বাড়িতে ফেরাতে বাংলাদেশ হাই কমিশন থেকে পশ্চিমবঙ্গ টাস্ক ফোর্স সর্বত্র চিঠি লিখেছে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি। কিন্তু বাড়ি ফেরা হয়নি রূপার। বৃহস্পতিবার ওই হোমে গিয়ে রূপাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দিলেন বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মহম্মদ এরশাদ।

তিনি বলেন, “আমরা রাজনীতি করি। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলাম। রূপার ঠিকানা খুঁজে পেতে আমার খুব বেশি সময় লাগবে না। ঠিকানা খুঁজে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে কথা বলে রূপাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব।” চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির কাছ থেকে ওই সংক্রান্ত একটি ফাইল তিনি নিয়ে গিয়েছেন। কোচবিহার চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান স্নেহাশিস চৌধুরী বলেন, “আমরা আশাবাদী এবারে বাড়ি ফিরে যেতে পারবে রূপা।”

বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলে খুশি রূপাও। তার কথায়, “আমি বাড়ি ফিরতে চাই।” হোম সূত্রে জানা গিয়েছে, বাংলাদেশের দিনাজপুরের একটি গ্রামে রূপার বাড়ি। এখন তাঁর বয়স ১৫ বছর। রূপা এরশাদকে জানায়, তাঁদের পরিবার খুব গরিব। দেড় বছর আগে এক ব্যক্তি কাজের টোপ দিয়ে তাঁকে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় এক পাচারকারীর হাতে। ওই পাচারকারী জোর করে তাঁকে সীমান্ত টপকাতে বাধ্য করে। রূপা ওই সরকারি হোমের অনেককেই জানিয়েছে, তাঁকে মারধরও করত ওই পাচারকারী। সীমান্ত টপকে অবশ্য সফল হতে পারেনি ওই অভিযুক্ত। বিএসএফের নজরে পড়ে যাওয়ায় ওই কিশোরীকে ছেড়েই পালিয়ে যায় সে। বিএসএফ ওই কিশোরীকে উদ্ধার করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তারপর আদালতের মাধ্যমে তাঁকে তুলে দেওয়া চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির হাতে। সেখান থেকে রূপার ঠাঁই হয় বাবুরহাটের ওই সরকারি হোমে।

চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি সূত্রের খবর, রূপাকে বাড়ি ফেরানোর জন্য মাস ছয়েক আগে বাংলাদেশ হাইকমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি পশ্চিমবঙ্গ টাস্ক ফোর্সকেও জানানো হয়। নিয়মানুযায়ী হাই কমিশন ওই চিঠির প্রেক্ষিতে ঠিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে টাস্ক ফোর্সকে বিষয়টি জানাবে। পরে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটিকে বিষয়টি জানিয়ে রূপাকে ওই ঠিকানায় পৌঁছে দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে ওই চিঠির কোনও উত্তর আসেনি।

রূপা অবশ্য চাইল্ড ওয়েলফেয়ারকে তার পুরো ঠিকানা দিয়েছে। বাবা ও মায়ের নামও জানিয়েছে। এরপরেও তাঁকে বাড়ি ফেরাতে দেরি হওয়ায় একটু হতাশ হয়ে পড়েছিল রূপা। এখন এরশাদের আশ্বাসে আবার মনোবল ফিরে পাচ্ছে সে। হোমের সুপার সুপর্ণা বর্মন বলেন, “বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আমাদের এখানে এসেছিলেন। আমরা খুব খুশি হয়েছি। রূপাকে এখানে পড়াশোনা শেখানো হচ্ছে।’’

এদিন বাবুরহাটে  দৃষ্টিহীনদের একটি বেসরকারি স্কুলেও যান এরশাদ। দৃষ্টিহীন ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলার পর বক্তব্য রাখার সময় তাঁর গলা জড়িয়ে যায়। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতি ছিলাম। কখনও এমন অভিজ্ঞতা হয়নি। এই দিনটি আমার কাছে স্মরণীয় এবং অত্যন্ত বেদনাদায়ক। যাঁরা এদের জন্য কাজ করছেন তাঁরা মানুষের উপরে।” বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতিকে কাছে পেয়ে খুশি স্কুলের ছাত্রী দীপালী, পদ্মারা।

এখান থেকেই বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি চলে যান ডুয়ার্সে। বাতাবাড়ি ক্লাব এলাকায় ভাইপো জাকারিয়া হোসেনের শ্বশুরবাড়িতে যান তিনি।  এখানে মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে চলে যান সামসিং সুনতালেখোলার কমলা বাগান দেখতে। পরে বলেন,‘‘ডুয়ার্সের নাম অনেক শুনেছিলাম, এখানকার পাহাড় জঙ্গলকে একবার নিজের চোখে দেখার ইচ্ছেও ছিল অনেকদিনের। এবারে সেই সাধটা পূরণ হল।’’ আজ শুক্রবার গরুমারার জঙ্গলের নজরমিনারে ঘুরে বিকালে ফের দিনহাটায় ফিরবেন তিনি।

 

 (কিশোরীর নাম পরিবর্তিত)