কখনও চালকের কানে ফোন থাকায় সেতু থেকে ছিটকে পড়ছে দুরন্ত গতির বাস। বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছেন ৪০-৪২ জন। কখনও বেপরোয়া বাস পিষে দিচ্ছে আর এক বেপরোয়া সাইকেল আরোহীকে। মুর্শিদাবাদের দৌলতাবাদ থেকে কলকাতা, গত কয়েক দিনে ঘটে যাওয়া পথ দুর্ঘটনা কিন্তু হুঁশ ফেরাতে পারেনি পথচারী, গাড়িচালকদের। উত্তরবঙ্গের বেপরোয়া, আইন ভাঙা যাত্রাপথের আজ আর এক পর্ব।

পুলিশের সামনেই

বালুরঘাট: সকাল ১১টা। বালুরঘাট শহরের চকভবানি থানার সামনে তিন রাস্তার মোড়। বালুরঘাট-তপন সড়ক যোগাযোগের অন্যতম ব্যস্ত রাস্তায় প্রধান ট্রাফিক মোড়। সেখানে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সিভিক ভলেন্টিয়ারদের সামনে হেলমেটহীন এক আইনজীবীকে বাইক নিয়ে আদালত থেকে থানামোড়ের পাশে বাড়ির পথে যেতে দেখা গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে বাঁ হাতে মোবাইল নিয়ে কথা বলা অবস্থায় আর এক মোটরবাইক চালক ওই মোড় পেরিয়ে গেলেন। মোড়ের পাশে ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফের’ প্রচার ক্যাম্পে বসে থাকা পুলিশের সামনেই মোবাইলে কথা বলতে বলতে অনায়াসে রাস্তা পেরোচ্ছিলেন পথচারী ও সাইকেল আরোহীরা। কেউ কিছু বলার নেই।

অথচ, পথনিরাপত্তা সপ্তাহের প্রথম দিন, ১১ জানুয়ারিই বালুরঘাট থানার পতিরাম মোড়ের রাস্তায় সুকুমার সরকার (৫০) নামে এক ভবঘুরে ট্রাক চাপা  পড়ে মারা যান। তার দু’দিন আগে মঙ্গলবার রাতে বালুরঘাটের চিঙ্গিশপুর এলাকায় পথ দুর্ঘটনায় চার যুবকের মৃত্যু হয়েছিল। পথ নিরাপত্তা সপ্তাহের মতো বিশেষ উপলক্ষের আটসাঁটো কর্মসূচি ও নজরদারির মধ্যেই যদি জেলায় পর পর দুর্ঘটনায় ওই মৃত্যু হয়, অন্য দিন তা হলে কী অবস্থা হবে!

তারই প্রমাণ দিয়েছে গত ২ জানুয়ারি বংশীহারি থানার নারায়ণপুর এলাকার ৫১২ নম্বর জাতীয় সড়ক। সেখানে পুলিশের স্টিকার লাগানো মোটরবাইক নিয়ে চালাতে গিয়ে ট্রাকের ধাক্কায় রামকমল মণ্ডল (৩৪) ও অজিত সরকার (২৮) নামে দুজনের মৃত্যু হয়। মাথায় হেলমেট ছিল না। কানে কিন্তু মোবাইল।

এই বেপরোয়া বাইক ও গাড়ি ছোটানোর প্রবণতা বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, কেবল বালুরঘাট শহরের মধ্যে পুলিশের প্রচার ও পদক্ষেপ দেখা যায়। গঙ্গারামপুর ও বুনিয়াদপুর শহরে অধিকাংশ বাইক চালকের মাথায় হেলমেট দেখাই যায় না। পাশাপাশি মদ্যপ হয়ে বাইক ছোটানোর জেরে বালুরঘাট শহরে ছোটখাটো দুর্ঘটনা লেগেই আছে। অথচ দ্রুত গতিতে ছোটা গাড়ি কিংবা বাইককে নিয়ন্ত্রণে আনতে বালুরঘাটে ট্রাফিক পুলিশকে কয়েকটি স্পিড লেজার গান দেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশের দাবি সেগুলি ব্যবহার শুরু হয়েছে। ধরে কেসও দেওয়া হচ্ছে। 

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালে দক্ষিণ দিনাজপুরে মোট ২৬৬টি পথ দুর্ঘটনায় ১২৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০১৭ সালের নভেম্বর অবধি জেলায় পথ দুর্ঘটনার সংখ্যা ২২৩টি। মারা যান ১১৭ জন। এসপি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, এক বছরে প্রায় ১৬ শতাংশ পথ দুর্ঘটনা কমেছে। কিন্তু রোজকার ছবিতে এখনও স্বস্তি আসেনি, বলছেন বাসিন্দারাই।

অবাধেই আইনভঙ্গ

মালদহ: বেলা দুটো। মালদহের রথবাড়ি মোড়ে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে লরি, বাস-সহ নানা যানবাহনের দাপাদাপি চলছে রমরমিয়ে। ঠিক তখনই মাঝবয়সী এক ব্যক্তি কানে মোবাইল গুঁজে স্কুটি নিয়ে কথা বলতে বলতে জাতীয় সড়ক ধরেই চলেছেন ৪২০ মোড়ের দিকে। ওই স্কুটি আরোহীর মাথায় অবশ্য হেলমেট ছিল। কাছেই দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন বয়স্ক ট্রাফিক পুলিশ কর্মী। তাঁর চোখেই পড়ল না এই দৃশ্য।

রথবাড়ি মোড়ে শুধু নয়, মালদহ জেলার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া ৩৪, ৮১, ৫১২ নম্বর জাতীয় সড়ক ও রাজ্য সড়কের ওপর দিয়ে এ ভাবে বিনা হেলমেটে বহু বাইক চালকই রোজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তেমনি মোবাইল কানে গুঁজেও চলছেন অনেকেই। দৌলতাবাদের বাসকাণ্ডের পরও কারও হুঁশ ফেরেনি।

জেলা পুলিশ অবশ্য দাবি করছে, কানে ফোন গুঁজে বাইক বা অন্যান্য গাড়ি চালানোর অপরাধে ২০১৭ সালে জেলার ৩৭৩৫ জনের কাছ থেকে একশো টাকা করে জরিমানা আদায় করা হয়েছে। মালদহের ওসি ট্রাফিক জয়দীপ দাস জানিয়েছেন, মোবাইল গাড়ি-বাইক চালানোর সময় মোবাইলের ব্যবহার ও বিনা হেলমেটের বাইক চালকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে।