উচ্চ মাধ্যমিকে ভাল নম্বর। অথচ বিজ্ঞান ও কলা বিভাগে অর্নাসে ভর্তি হতে পারছেন না পুরুলিয়ার বহু ছেলেমেয়ে। একই অবস্থা পাস কোর্সের ক্ষেত্রেও। শহরাঞ্চলের কলেজগুলিতে ভর্তি হতে না পারার সমস্যা যেমন তীব্র, মফস্সলের কলেজগুলিতে আবার উল্টো ছবি। প্রত্যন্ত কলেজগুলিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় সেখানে আবার ভর্তি হতে আগ্রহী হচ্ছেন না পড়ুয়ারা।

এই অবস্থায় ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হতে চললেও জেলায় বহু সংখ্যক ছাত্রছাত্রী এ বার কলেজমুখো হতে পারেনি বলে অভিযোগ তুলছে ছাত্র সংগঠন ডিএসও। সম্প্রতি ওই ছাত্র সংগঠন আবেদন করা সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে ভর্তির ব্যবস্থা করার দাবিতে রঘুনাথপুর ও বলরামপুর কলেজে বিক্ষোভও দেখায়।

সংগঠনটির দাবি, রঘুনাথপুর কলেজ, জগন্নাথ কিশোর কলেজ, কাশীপুরের মাইকেল মধুসূদন কলেজগুলি মতো কয়েকটি কলেজে আবেদন করেও ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না পড়ুয়ারা। ডিএসও-র জেলা সভাপতি স্বদেশপ্রিয় মাহাতোর দাবি, তাদের হিসাব মতো এখনও হাজারের কিছু বেশি ছাত্রছাত্রী শহরাঞ্চলের কলেজগুলিতে ভর্তির আবেদন জানিয়েও ভর্তি হতে পারেনি। যদিও কোথাও ভর্তি না হতে পারার সমস্যার কথা তাঁরা শোনেননি বলে দাবি করেছেন সিধো কানহো বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসি প্রিয়নাথ হালদার। তিনি বলেন, ‘‘সম্প্রতি কলেজগুলির অধ্যক্ষদের নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে কেউই কলেজে ভর্তির সমস্যা কথা জানাননি।”

গত কয়েক বছর ধরেই উচ্চ মাধ্যমিকে পুরুলিয়ার ছেলেমেয়েদের প্রাপ্ত নম্বরের হার অনেকটাই বেড়েছে বলে মত কয়েকটি কলেজের অধ্যক্ষের। তাঁরা জানাচ্ছেন, এ বছর বিজ্ঞান বিভাগে ভাল নম্বর উঠেছে। তাতেই সমস্যা তৈরি হয়েছে বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স ও পাস কোর্সের ক্ষেত্রে। কমবেশি একই সমস্যা কলা বিভাগের ক্ষেত্রেও। ৮০ শতাংশ পেয়েও বিজ্ঞানে অনার্স না পাওয়ার নজির যেমন রয়েছে, তেমনই ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়েও বিজ্ঞানে পাস কোর্সে ভর্তি হতে পারেনি অনেকেই। কলা বিভাগের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ নম্বর পেয়েও পাস কোর্সে ভর্তি হতে পারেনি বহু ছাত্রছাত্রী। তবে এই সমস্যা মূলত শহরাঞ্চলের কলেজগুলির ক্ষেত্রেই।

জেলার অন্যতম বড় দুই কলেজ পুরুলিয়া শহরের জগন্নাথ কিশোর (জে কে কলেজ) ও রঘুনাথপুরের দিকে তাকালেই ছবিটা অনেকটাই স্পষ্ট। জে কে কলেজের অধ্যক্ষ শান্তনু চট্টোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, তাঁদের কলেজে ৮০ শতাংশ নম্বর পেয়েও বিজ্ঞান বিভাগের অনার্সে ভর্তি হতে পারেনি ছাত্রছাত্রীরা। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিতে অনার্সের সব আসন পূর্ণ হয়ে গিয়েছে ৮২ শতাংশ নম্বরেই। রঘুনাথপুর কলেজের অধ্যক্ষ ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় জানান, রসায়নের অনার্স ৮২ শতাংশ নম্বর পর্যন্ত নেমেছে। বিজ্ঞানের অন্যান্য বিষয়গুলিতে নম্বর নেমেছে ৭০ শতাংশে।

জে কে কলেজের ক্ষেত্রে আবার বিজ্ঞান বিভাগের পাস কোর্সে ৬০ শতাংশ নম্বর পেয়েও ভর্তি হতে পারছে না পড়ুয়ারা। কলা বিভাগের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়েও ভর্তি হতে পারেনি বহু পড়ুয়া। রঘুনাথপুর কলেজের ক্ষেত্রে ৪৫ শতাংশ নম্বর পেয়েও কলা বিভাগে ভর্তি হতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ছাত্রছাত্রীদের। জে কে কলেজের অধ্যক্ষ বলেন, ‘‘এ বছর প্রাপ্ত নম্বরের হার অনেকটাই বেশি। গত বছরেও ৮০ শতাংশের কিছু কম নম্বর পাওয়া ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান বিভাগের অনার্সে ভর্তি হতে পেরেছিল।”

এর ফলে কম নম্বর পাওয়া শহরাঞ্চলের ছেলেমেয়েরা ঘরের কাছে কলেজে ভর্তি হতে পারছেন না। আবার প্রত্যন্ত এলাকার কলেজগুলিতে যাতায়াতের ব্যবস্থা ভাল না হওয়ায় সেখানে তাঁরা ভর্তি হতে আগ্রহী নয়। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রেই জানা যাচ্ছে, ঝালদার চিত্ত মাহাতো মেমোরিয়াল কলেজ, সুইসার নেতাজি কলেজ, কোটশিলা কলেজ, সাঁওতালডিহি কলেজে অনার্স ও পাস কোর্সে অনেক আসন এখন পূর্ণ হয়নি। ডিএসও-র দাবি, যে কলেজে যে ছাত্র ভর্তির আবেদন করেছেন, তাঁকে সেই কলেজেই ভর্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সংগঠনের জেলা সভাপতি স্বদেশপ্রিয় মাহাতো বলেন, ‘‘অনেক ছাত্রছাত্রী ভেবেছিলেন, অনার্স না পেলেও শহরাঞ্চলের কলেজে অন্তত পাস কোর্সেও পড়ার সুযোগ পাবেন। তাই তাঁদের অনেকে প্রত্যন্ত এলাকার কলেজগুলিতে আবেদনই করেনি। কিন্তু কলেজগুলির শেষ মেধা তালিকা প্রকাশের পরে দেখা যাচ্ছে, তাঁরা সেখানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না।”

যদিও শাসকদলের ছাত্র সংগঠন টিএমসিপি-র দাবি, জেলায় ভর্তির সমস্যা নেই। সংগঠনের জেলা সভাপতি নিরঞ্জন মাহাতো বলেন, ‘‘গত কয়েক বছরে জেলায় কয়েকটি নতুন কলেজ শুরু হয়েছে। বাড়ির ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কলেজ পাচ্ছেন পড়ুয়ারা। ফলে কলেজে ভর্তি হতে ছাত্রদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না।” যদিও ডিএসও-র সংগঠনের জেলা সম্পাদক বিকাশরঞ্জন কুমার বলেন, ‘‘বছরে পঁচাত্তর শতাংশ ক্লাস করা বাধ্যতামূলক করেছে বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু, প্রত্যন্ত এলাকার কলেজে যাতায়াতের সুব্যবস্থা না থাকায় রোজ কলেজে যাওয়া দুষ্কর দূরের ছেলেমেয়েদের।’’